বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্রই ‘ত্বকী’দের বাঁচতে দেয় না

সব ধরণের শোষণ,নিপীড়ণ,লুটপাটের বিরুদ্ধেই মুক্তিসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল ৭১’ সালে। পাকিস্তানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ যুদ্ধ করে শোষকদের পরাজিত করেই বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল। সেই স্বাধীন দেশে তো ত্বকী’দের খুন হবার কথা ছিল না! ৪২ বছরের এই বাংলাদেশ ত্বকী’দের বাঁচাতে পারছে না কেন, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে?
৭১’এ স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ শুরু থেকেই একটা লুটপাটনির্ভর অর্থনীতিকে বেঁছে নিয়ে যাত্রা করেছে, যা এখনো চলছে। প্রাণের নিরাপত্তা কিংবা মালের নিরাপত্তার চাইতে মূনাফার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রধান বিবেচনার বিষয় আকারে হাজির আছে। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ৪২ বছর ধরে শোষণ,নিপীড়ণ,লুটপাটের মাধ্যমেই মুনাফা লুটেছে, আর দেশকে উপহার দিয়েছে ‘অমানবিক রাষ্ট্রে’র খেতাব। এই মরার দেশে আজ অপরাধী নির্ভীক। প্রতিবাদ করা কিংবা অপরাধ দমন করতে যাওয়া বরং একটা ঝুঁকির কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে । হত্যা করাটা সহজ, সাধারণ, সাবলীল কাজের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। নিপীড়ণ করে বাঁচিয়ে রাখার চাইতে হত্যা করাটাই আজ বেশী নিরাপদ বলে প্রতীয়মান এই বাংলাদেশে। ঠিকই তো, বেঁচে থাকলে মামলা-মোকদ্দমা… (!) কি দরকার। তার চেয়ে মেরে ফেলাটাই ঝামেলাহীন ও নিরাপদ !!! এই খুনী শাসকশ্রেণী দেশের সামগ্রিক পুজির বিকাশ কখনোই চায় নি, চায় না। আর সে কারনেই ত্বকী’র দাম এই রাষ্ট্র, এই শাসকশ্রেণী বুঝবে না। লুন্ঠণকারী কখনো মেধার দাম বোঝে না। মানুষ, মানবিকতা, ভালোবাসা— ইত্যাদি শব্দমালা এই শাসকদের অভিধানে নেই, মুনাফা-ব্যবসা-পুজির বাইরে আর কোন শব্দ নেই তাদের। ত্বকী তো শুধু একজন মেধাবী কিশোরের নাম নয়, ত্বকী ছিল মানুষ, ত্বকী ছিল ভালোবাসা, ত্বকী ছিল স্বপ্ন, ত্বকী ছিল সম্ভাবনা। মানুষ, সপ্ন, ভালবাসা, সম্ভাবনা— এগুলোর স্থান নেই এই ‘আহত বাংলাদেশে’।
নারায়ণগঞ্জ বাসির বিপদ-আপদের সাথী, জনস্বার্থের যেকোন আন্দোলনের সামনের সারির সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব, তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলার আহবায়ক, নারায়ণগঞ্জ গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা রফিউর রাব্বির কিশোর ছেলে ত্বকি। ফলে ত্বকী’কে খুন করা মানে এই সংগ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করার তৎপরতা। রফিউর রাব্বি বাস ভাড়া কমানোর জন্য আন্দোলন করেন, তিনি যখন দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল করেন, তিনি যখন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার- তখন এই শাসকশ্রেণীর মুনাফা লুটতে ব্যাঘাত ঘটে। ত্বকী সেই ব্যাঘাত ঘটানো অংশের প্রতিনিধি ছিল। সংগ্রামী রফিউর রাব্বি ত্বকী’র পিতা- এটাই ছিল ত্বকী’র অপরাধ! কেন খুন হলো ত্বকি, তার অপরাধ কি ছিলো … এই জাতীয় প্রশ্ন খুবই জরুরি বটে। কিন্তু তার চাইতে জরুরী প্রশ্ন হলো- খুনীদের বিচার হবে কি ??? এই খুনিদের বিচার হওয়া না হওয়ার সাথে যুক্ত আরো আরো ত্বকী’র জীবন । আজকে যে “ত্বকী”রা বেঁচে আছে, তারা কাল বাঁচবে নাকি খুন হবে- তা নির্ভর করছে এই বিচারের উপর। কিন্ত যে করবে বিচার সেই তো খুনীর পৃষ্ঠপোষক!!! অপরাধীকে কে সাহস দেয়? কার পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধীরা নির্ভীক হয়ে ওঠে? প্রশ্ন দুটির উত্তর মোটা দাগে- “রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে যুক্ত শোসকশ্রেণী”। সমাধানও তাহলে অজানা নয়, সেটা হলো- তাদের প্রত্যাখ্যান করা। কিন্তু আমরা তা করছি না কিংবা পারছি না !!! এর একটা বড় কারণ হলো- অপরাধীরা জোটবদ্ধ। কিন্তু আমরা যারা শিকার(!) তারা পরস্পর থেকে ভীষণ বিচ্ছিন্ন। প্রত্যেকেই ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ নীতিতে চলি আর নিজে নিজে মরি। আমরা একবার ভাবি না, আজ যার বিপদে আমি প্রতিবাদ করবো, পাশে দাঁড়াবো কাল সেই মানুষটাই আমার বিপদে বন্ধু হবে। আমরা খেয়াল রাখি না, আমাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখাটাও ঐ খুনী রাষ্ট্রেরই তৎপরতার ফল। ঐক্যবদ্ধ না থাকার জন্য কত কত আয়োজন জারি রাখে এই শাসকশ্রেনী, তার ইয়ত্তা নেই। মানুষের সমস্থ বৈচিত্র্যগুলোকে বৈষম্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে আমাদের ঐক্যের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে রাখে এই শোষকশ্রেণী। সেই ফাটলের ফোঁকর দিয়েই আমাদের শোষণ করে যায় ক্রমাগত।
ত্বকী হত্যার বিচার করা এই বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য কঠিন কাজ। আন্দোলন- সংগ্রাম দিয়েই আমাদের বিচার আদায় করতে হবে, যা এই শাসকশ্রেণীকে প্রত্যাখ্যানের সংগ্রামের সাথেই যুক্ত। কেননা বিদ্যমান সমাজ কাঠামোতে অপরাধীরা হবে নির্ভীক, সাধারণ মানুষ হবে পরস্পরবিচ্ছিন্ন শিকার। এবং আমরা যদি আরো আরো ত্বকী’দের বাঁচাতে চাই, তাহলে এই শোষকশ্রেণীকে, বিদ্যমান এই কাঠামোকে উচ্ছেদ করতেই হবে, তাছাড়া আর কোন বিকল্প নাই। আমাদের সবসময় খেয়াল রাখতে হবে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই মুক্তির একমাত্র পথ।

৪ thoughts on “বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্রই ‘ত্বকী’দের বাঁচতে দেয় না

  1. এ দেশে হুমায়ুন আজাদ স্যার,
    এ দেশে হুমায়ুন আজাদ স্যার, কবি শামছুর রহমান সাহেবদের মত গুনী ব্যক্তিদের উপর হামলা হয়, শাহ্ এম এস কিবরিয়ার মত আন্তর্জাতিক খ্যাত সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, আহসান উল্লাহ মাষ্টারের মত জনপ্রিয় নেতাদেরকে হত্যা করা হয়, ত্বকীর মত ভবিষ্যতের উজ্জল নক্ষত্রকে হত্যা করা হয় কতিপয় রাজনীতিবিদদের প্রতিহিংসার কারণে। এসব চিহ্নিত রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহবান জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *