হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসার ওয়ারিশ দিয়ে যাবো

আমার চোদ্দ গুষ্টির আশেপাশে কোথাও ‘আহমেদ’ উপাধি নেই। কিন্তু আমি আজ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে লিমন আহমেদ নামে বিনোদন সাংবাদিকতা করছি। এখানে সেখানে লিখছি, লিখছি নাটক-কবিতা-গল্প ও গান। যদিও সংখ্যায় তারা সামান্য আর প্রচারে তারা বিলাঙ্গই। তবুও লিখছি। কিভাবে? হুমায়ূন আহমেদ-এর কারণে। এই মানুষটির লেখা-কর্ম-জীবন এতটাই মুগ্ধ করেছিলো কৈশোরে, তখনই ভেবেছিলাম লেখালেখি করবো। আর অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের মতো। কাছের মানুষদের অনেকেই হাসাহাসি করেছে নামের শেষে আহমেদ লাগানোতে। কী এলো গেলো তাতে! হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমার ভালোবাসাটাই বড় কথা। সেই ভালোবাসাটাকে আমি জয় করেছি এটাই আমার বড় সার্থকতা…..


আমার চোদ্দ গুষ্টির আশেপাশে কোথাও ‘আহমেদ’ উপাধি নেই। কিন্তু আমি আজ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে লিমন আহমেদ নামে বিনোদন সাংবাদিকতা করছি। এখানে সেখানে লিখছি, লিখছি নাটক-কবিতা-গল্প ও গান। যদিও সংখ্যায় তারা সামান্য আর প্রচারে তারা বিলাঙ্গই। তবুও লিখছি। কিভাবে? হুমায়ূন আহমেদ-এর কারণে। এই মানুষটির লেখা-কর্ম-জীবন এতটাই মুগ্ধ করেছিলো কৈশোরে, তখনই ভেবেছিলাম লেখালেখি করবো। আর অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের মতো। কাছের মানুষদের অনেকেই হাসাহাসি করেছে নামের শেষে আহমেদ লাগানোতে। কী এলো গেলো তাতে! হুমায়ূন আহমেদের প্রতি আমার ভালোবাসাটাই বড় কথা। সেই ভালোবাসাটাকে আমি জয় করেছি এটাই আমার বড় সার্থকতা…..

হুমায়ূন আহমেদ গাছে ধরে না। তার মতো হওয়া যায় না। হ্যাঁ, ভাগ্যে থাকলে হয়তো তাকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু তার মতো হওয়া যায় না। আমি স্বপ্ন দেখি প্রিয় মানুষটির জুতোর পায়ে পা গলানোর। অনেক টানপোড়েন আমার জীবনের অলিতে গলিতে। তবুও কোন বিষণ্ন ক্ষণে কিংবা একাকীত্বের রাতে আমি তার জুতো পায়ে দেই। হিমুর সাথে হাঁটি, মিসির আলীর সাথে যুক্তি তক্কে ঝগড়া করি। রুপার অপার্থিব প্রেমে নি:স্ব হই, মারিয়ার স্বর্গীয় চোখের দিকে তাকিয়ে তার হাতে তুলে দেই সব কয়টি নীলপদ্ম আমার। আমার প্রিয় লেখক আমার প্রেমিক। তিনি আমাকে কৈশোররে বিড়ম্বনার দিনে ভালোবেসেছেন, আজো ভালো বাসছেন। এ ভালোবাসা চিরকাল রইবে এই আমার বিশ্বাস…..

হুমায়ূন আহমেদের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। অন্যপ্রকাশের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অন্যমেলায় আমি বেশ কিছুদিন কাজ করেছি ২০০৯ সালের দিকে। হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই আসতেন অন্যপ্রকাশের অফিসে। তাকে দেখেছি। পা ছুঁয়ে সালাম করেছি। কিন্তু তার প্রতি ‘দেবদাস’ মার্কা ভালোবাসাটা প্রকাশ করিনি। সেটা প্রকাশ হয়েছে ২০১১ সালের ৪ মার্চ। ঢাকার পাবলিক লাইব্রেরীতে অন্যপ্রকাশের বইমেলায়। সেবারের একুশে বইমেলায় লেখকের ‘বাদশাহ নামদার’ বইটি প্রকাশ হয়েছিলো। টাকার অভাবে কিনতে পারিনি। বইটি কিনেছিলাম ৪ মার্চ। ধার করে। কারণ, ওখানে হুমায়ূন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। বই কিনলেই অটোগ্রাফ পাওয়া যাচ্ছে। এক বন্ধুকে ফোন করে আনিয়ে তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বইটি কিনেছিলাম। সেদিন অটোগ্রাফ নিয়েছি। সালাম করতে যেতেই তিনি বললেন আমাকে কোথায় নাকি দেখেছেন। বললাম, অন্যপ্রকাশের অফিসে। জানতে চাইলেন এখন কী করি। জানালাম দৈনিক ইত্তেফাকে বিনোদন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছি। মনে হলো খুব খুশি হলেন। জানতে চাইলেন বাড়ি কোথায়? বললাম কিশোরগঞ্জ। শুনে নির্লিপ্ত গলায় বললেন, ‘লেগে থেকো। শিল্প সংস্কৃতিতে আমাদের বৃহত্তর ময়মনসিংহ পয়া অঞ্চল।’ মুচকি হেসে বেরিয়ে এলাম ভিড় ঠেলে। তারপর বেশ কিছু অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। কথা হয়নি আর। সর্বশেষ বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্সে। তিনি তখন খুব অসুস্থ। এসেছিলেন তার সর্বশেষ সিনেমা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র প্রিমিয়ারে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো বুকটা। বেঁচে আছেন, তবু তিনি নিষ্প্রাণ। যা করছেন-বলছেন সবই যেন জোর করে। না, এ কোনদিন ভাবতে চাইনি তিনি চলে যাবেন। আজো ভাবি না তিনি চলে গেছেন। হুমায়ূন আহমেদরা কোনদিন যান না। থেকে যান হৃদয়ের খুব গভীরে। আজন্মকাল। ঠিক ঋত্বিক ঘটকের নীতার মতো মেঘে ঢাকা তারার মতো। তাকে শ্রাবণ মেঘের দিনে পাওয়া যায় না বটে, দুই দুয়ারী মনের অনুভূতিতে তিনি দেখা দেন নিয়মিতই। যখন আমি একা; কোথাও আমার কেউ নেই….

খুব কষ্ট পাই একদল ভ্রষ্ট সাহিত্যিক-সাহিত্য সমালোচকদের মুর্খতাসুলভ কথাবার্তায়। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও সমালোচনা করেন। তারা মুখে লাগাম রাখেন না হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কথা বলতে। তাদের দাবি এই লেখকের লেখায় জীবন নেই, বাস্তবতা নেই, লজিক নেই। তার সব লেখাই হালকা। এ যে কতোবড় অপবাদ তা যারা অনুধাবণ না করতে পারবেন, তাদের বোঝানো অসম্ভব। এইসব কথার আসলে কোন যুক্তিকথা নেই। এইসব কথা বলা হয় সম্পূর্ণই ঈর্ষাকাতর হয়ে, হিংসায় জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে। হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় একজন সাহিত্যিক হিংসার শিকার হবেন এটা বালকেরও বোধগম্য। যারা তার সাহিত্যের অনুরাগী তারাই জানেন, হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের জীবনমুখিতা, ওজন, গুরুত্ব নিয়ে কথা বললে সেটা নোবেল পাওয়ার মতোই যোগ্য গবেষণা হবে। অনেকে আবার লেখকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সমালোচনায় পেরে না ওঠে হানা দেন তার ব্যক্তিগত জীবনে। তাদের উদ্দেশ্যে অনেক কথাই মুখে আসে। তবে অতো কথা বলে সময় নষ্ট করার কোন মানে নেই। কেবল এটুকু বলে যাই- ‘যখন কেউ বলে চাঁদের পূর্ণিমা ভালো লাগে না, ধরে নিতে হয় সে অন্ধ। তার মতো অভাগা আর কেউ নয়……..’

সম্প্রতি পত্রিকা মারফত জানলাম হুমায়ূন আহমেদের কিংবদন্তি চরিত্র হিমুকে নিয়ে সিনেমা বানাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোলকাতার স্বনামধণ্য পরিচালক রাজ চন্দ। এটা খুবই বেদনার, আমাদের দেশে এতোসব পন্ডিত চিত্র নির্মাতা থাকতেও হুমায়ূন আহমেদের হিমু নিয়ে কাজ করতে সর্বপ্রথম আগ্রহ প্রকাশ করলো ভারতের একজন নির্মাতা। যাই হোক, হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন আপত্তি তুলেছেন হিমুকে নিয়ে ছবি নির্মাণে। আপত্তি করবার অধিকার তার আছে। তবে হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত হিসেবে, প্রেমিক হিসেবে আমাদেরও নিশ্চয় কিছু বলবার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার থেকে বলছি, ‘আপত্তি করবেন না। কোলকাতায় এখন সিনেমা নির্মাণের স্বর্ণযুগ চলছে। বিশেষ করে বিকল্পধারা সিনেমায়। সেই যুগের বেশ মেধাবী একজন নির্মাতা রাজা চন্দ। তার চা্িতেও বড়ো বিষয় হিমুর চরিত্রে অভিনয় করবেন বলিউডের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন অভিনেতা ইরফান খান। হিমুর চরিত্রায়ণে এই অভিনেতা হিমুকে বাংলা ভঅষার গন্ডি ছাড়িয়ে বহুভাষার মানুষের মাঝে নিয়ে যাবেন বলেই বিশ্বাস। আমার আরো একটি বিশ্বাস, হুমায়ূন আহমেদের লেখাগুলো যদি আন্তর্জাতিক বাজারে বহু ভাষায় প্রকাশ করা যেতো তবে বাংলা সাহিত্যের ভাগ্যে অনেক প্রাপ্তি জুটত। সেটি তো হয়নি পরিতাপের বিষয়; কিন্তু তা যদি চলচ্চিত্র দিয়ে হয় তবে কেন আপত্তি করা? শাওন যে যুক্তি দিয়েছেন এটা ভুল। হুমায়ূন আহমেদ হিমুকে নিয়ে কাজ করেছেন। হিমু নামেই একটি নাটক বিটিভির জন্য নির্মাণ করা হয়েছিলো। সেখানে হিমু হয়েছেন আসাদুজ্জামান নূর, রুপা হয়েছেন তারানা হালিম। তাই হুমায়ূন আহমেদ হিমুকে নিয়ে কোন কাজ করেননি এই তথ্য ঠিক নয়। পাশাপাশি এই ভারতবর্ষে মানুষের কাছে শরৎচন্দ্র আর রবি ঠাকুরের জনপ্রিয়তার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে তাদের সাহিত্য নিয়ে নাটক-টেলিফিল্ম-তথ্যচিত্র-চলচ্চিত্র নির্মাণ হওেয়ায়। আমরা চা্ই হুমায়ূন আহমেদের বেলাতেও সেটা হোক, অবাধে। হুমায়ূন আহমেদ ও তার সাহিত্য সবার হোক, উম্মুক্ত। ভালো মন্দ বিচারের দায়িত্ব পাঠকের-দর্শকের…..

আজ ১৩ নভেম্বর। জননন্দিত কথাসাহিত্যক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। কতোতম জন্মদিন সে হিসেবে যাবো না। যাকে চিরকাল মানুষ ভালোবাসবে তাকে সময়ের ফ্রেমে বন্দী করা কেন? এ দেশের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে হুমায়ূন আহমেদের প্রচেষ্টা ছিলো অসীম। তাই তার জন্মদিন, মৃত্যুদিনের বিস্তৃতি-গুরুত্ব আমাদের কাছে অসীমেরও অজানা। চোখের দেখায় তিনি নেই। তার এই না থাকা চোখকে কাঁদায়, প্রাণকে নয়। চোখের আড়ালে গিয়ে তিনি চিরদিনের মতো ঠাঁই করে নিয়েছেন প্রাণের গহীনে। জানি না সেখানে কেমন আছেন। তবে তার ভালোবাসায় আমরা ভালো আছি, আমি ভালো আছি। সেই বিশ্বাস থেকে দাবি করছি, আমাদের, আমার হুমায়ূন আহমেদও ভালো আছেন। তাকে পেয়েছিলাম বাবার হাত ধরে, তিনি আছেন আমার অন্তরেও। এভাবেই ভালোবাসার ওয়ারিশ দিয়ে যাবো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে……..

১ thought on “হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসার ওয়ারিশ দিয়ে যাবো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *