ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন এবং অন্যান্য

সকালে উঠে ফেসবুক দেয়াল জুড়ে দেখি একটা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ইভেন্ট আর পোস্ট নিয়ে মাতামাতি। গত কদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের(এবং শহিদুল্লাহ হলের) একজন ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু আমি সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নই, তাই নীতিগতভাবে সরাসরি কোন দিকে সমর্থন দিতে পারি না। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে এ ঘটনা নিয়ে আমার কিছু মতামত অবশ্যই আছে।


সকালে উঠে ফেসবুক দেয়াল জুড়ে দেখি একটা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ইভেন্ট আর পোস্ট নিয়ে মাতামাতি। গত কদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের(এবং শহিদুল্লাহ হলের) একজন ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু আমি সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নই, তাই নীতিগতভাবে সরাসরি কোন দিকে সমর্থন দিতে পারি না। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে এ ঘটনা নিয়ে আমার কিছু মতামত অবশ্যই আছে।

আমরা সবাই জানি স্বাধীনতার প্রাগৈতিহাসিক সময় বায়ান্ন, বাষট্টি, ঊনসত্তর, একাত্তর থেকে শুরু করে সবসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অন্যায় ও স্বার্থবাদীতার প্রশ্নে আপোসহীন। আমার বিশ্বাস, এক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বাংলাদেশ দিতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার একদম প্রাণকেন্দ্রে বিধায় এর ভেতর দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় যাবার সড়কের অভাব নেই। অতি অবশ্যই কার্জন হলসহ কিছু কিছু যায়গা অত্যন্ত মনোরম হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও বহিরাগত অনেকেই এখানে বেড়াতে আসেন। আমি নিজেই যখন নটরডেমে পড়তাম প্রায় প্রতি শুক্রবার একবার এসে দেখে যেতাম। এই প্রাঙ্গন নিশ্চিতভাবে একজন ছাত্রের মনে তার ভবিষ্যৎ জীবনের সুচারু স্বপ্নের সন্ধান দেয়। আমি নিজেই সে স্বপ্নে বিভোর থাকতাম। প্রেসক্লাব পেরিয়ে শিক্ষা অফিসের সামনে গেলেই মনে হত এইতো চলে এসেছি, অথবা নীলক্ষেত সিগনাল পার হলেই মনে হত চলে এলাম স্বপ্নভুমিতে! বা কখনও শাহবাগে বাস থেকে নেমেই বিশ্ববিদ্যালয় মুখে হাঁটা দিলেই বুঝতাম আমি আমার স্বপ্নের বিদ্যায়তনে পা রেখেছি! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পড়েও সে অনুভূতি কাটেনি। আরও তীব্র হয়েছে। এতোগুলো কথা বললাম কারণ আমি নিজে মনে করি, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট যে কারও(উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া বা আরও ছোট) অবশ্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জীবনে একবার হলেও আসা উচিত। দেখে যাওয়া উচিত নজরুলের কবর, চারুকলা অনুষদের ভেতরের বিচিত্র সব সৃষ্টি, দোয়েল চত্তরের আশপাশটা, টিএসসির সম্মুখস্থ সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য ইত্যাদি। আমাদের অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের এসব দেখানো। আগ্রহটা কতটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয় তার দৃষ্টান্ত আমি নিজেই। একদিন সকালে দেখি যাত্রাবাড়ী ‘অমুক’ মাদ্রাসা থেকে বাচ্চাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখানোর জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের বাসের ব্যানারে লেখা আছে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহিদ মিনার এবং স্মৃতিসৌধ দর্শন”। আমার খুব আনন্দ হয়েছিল দেখে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখতে এসেছে! ছোট ছোট সুন্দর টুপি-হিজাব পড়া বাচ্চারা সেদিন আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে দেখছিল আমাদের স্থাপনাগুলো। কি সুন্দর!
এছাড়াও যেহেতু অনেকগুলো রাস্তা ঢাবির বুক চিরে অভিক্রমণ করেছে, নিশ্চয়ই সেসব এলাকার যাত্রীদের তাদের গন্তব্যে যেতে এপথে বাধা দেওয়া অনুচিত হবে।

২. কিন্তু
বাংলা ভাষায় অত্যন্ত চালু একটা শব্দ হল কিন্তু। আমারও কিছু কিন্তু আছে। প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছু ছাড়িয়ে একটি বিদ্যালয়। এখানে ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা একাধিক আবাসিক হল আছে। হলগুলোর প্রাঙ্গন একান্তই হলের। শহিদল্লাহ হলের পুকুরপাড় শহিদুল্লাহ হলের নিজের। দ্বিতীয়ত, আমি নিজের চোখে দেখেছি পুকুরপাড়ের একটা নারিকেল গাছের সাথে একটা সাইনবোর্ডে লেখা “বহিরাগতদের প্রবেশ ও বসা নিষেধ”। তৃতীয়ত, একটি ছেলেদের আবাসিক হলে মেয়েদের প্রবেশ আমার কাছে বরাবরই অস্বস্তির। চতুর্থত, একজন প্রাক্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীর নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ন্যূনতম সম্মান থাকলে নিশ্চিতভাবে সে আইন ভঙ্গ করবে না।

আরও অনেক কারণ মাথায় ঘুরছে, সেগুলো লিখলে পাঠক আমাকে বলবেন আমি হলের পক্ষে সাফাই গাইছি কেন। এখন আমার এই কারণগুলো যদি আপনি পড়ে থাকেন আপনার কি উচিত হবে এমন কোন যায়গায় প্রবেশ করা যেখানে নিষেধ করা হয়েছে? নিজেকেই উত্তর দিন। নিশ্চয়ই গোটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে লেখা নেই এখানে বসা নিষেধ, ঐখানে দাড়ানও নিষেধ। আমি যখন বহিরাগত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতাম, খুব লক্ষ্য করে দেখতাম কোথাও নিষেধ বা মানা আছে নাকি। কেন করতাম? কারণ এটা আপনার আমার নৈতিক দায়িত্ব।

নীতিকে ভুলে গিয়ে এক মহিলা সাংবাদিক লেখে বেড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত, হেনতেন, হাবিজাবি ইত্যাদি। আমিও তার সাথে একমত। কিন্তু ঐ যে শর্ত প্রযোজ্য! আমার বাসার উঠোনে এসে কেউ যদি আমার দেওয়া নিষেধ অমান্য করে কিছু করে, আমি কি তাকে ঘরে ডেকে আনব?

আমি এটাও অস্বীকার করব না যারা হলের হয়ে অন্যায় করেছে তাদের কোন দোষ নেই। তারা যদি সত্যি কোন দোষ করে থাকে সেটার সুষ্ঠু বিচার কাম্য। কিন্তু বিচিত্র পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা একটা ঘটনাকে এমনভাবে সাজায়, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে আপনি সেটার প্রতিবাদ করতে গেলে সেটা অন্যায় হয়ে যাবে; আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আপনি হবেন দোষী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন নিয়ে আরও কিছু বলি। প্রতি শুক্রবার টিএসসিতে আসা একটি দুষ্কর ব্যাপার। রিক্সা আর মানুষের(জোড়া জোড়া) ভীরে আমি সাইকেল নিয়ে ঢুকতে পারি না। প্রতিদিন সকালে টিএসসি থেকে দোয়েল চত্তরাভিমুখী সড়কের ডান পাশে তাকালে(সোহরাওয়ার্দী উদ্দান) ঘাসে, বেঞ্চে, গাছের নিচে ইত্যাদি যায়গায় যেসব দৃশ্য আমি নিজে অবলোকন করেছি তার বর্ণনা এই ব্লগে দিলে তা নিম্নমানের রসগল্প(!) হয়ে যাবে। শহিদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ের এর আগের রোজকার ঘটনার বিবরণ নাহয় নাই বা দিলাম। বিভিন্ন দিবসে, উৎসবের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় ধানক্ষেত। তারপর দিন দেখা যায় এর বাস্তব চিত্র। বিভিন্ন যায়গায় ছোট ছোট গাছের পাতা ছেড়া, গাছের ডাল ভাঙা, অস্থায়ী দোকানগুলোর যাবতীয় আবর্জনা ইত্যাদিতে ভরে যায় আমাদের ভালোবাসার প্রাঙ্গন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্দানের এসব অশ্লীল ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে ঢাবির একজন ছাত্র হয়ে যায় সন্ত্রাসী, শহিদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়ে কাউকে অন্যায় কিছু করতে দেখে প্রতিবাদ করলে ঢাবির একজন ছাত্র বনে যায় সন্ত্রাসী, টিএসসিতে এসে অশোভন আচরণকারীকে কিছু বললে ঢাবির একজন শিক্ষার্থী “পাড়ার মাস্তানি ক্যাম্পাসে দেখাইয়েন না” মন্তব্য পায় নিম্নামানের বুদ্ধিবেশ্যা কিছু সাংবাদিকের! এক সাংবাদিক দেখলাম সাধু, চলিত, ঢাকাইয়া বিভিন্ন শব্দ মিশিয়ে একটি রিপোর্ট লিখেছেন কেম্পাসলাইভ নামে এক নিউজসাইটে। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের “ফকিন্নি বাপের পোলাপান” নামে সম্বোধন করেছেন। এছাড়াও বেশ ক’বার কথায় বাবা-মাকে টেনে এনেছেন। এই হল রঙিন সাংবাদিকতা।

অনেক লিখলাম। মিথ্যা আর সত্যের মিশ্রণ খুব জটিল মিশ্রণ। এটাকে কোন প্রকার বিক্রিয়া দ্বারা পৃথক করা যায় না। নোংরা এসব মিশ্রণের প্রস্রবন বন্ধ হোক। জয় হোক সত্যের।
জয়তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

৪ thoughts on “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন এবং অন্যান্য

  1. “বহিরাগতদের প্রবেশ ও বসা

    “বহিরাগতদের প্রবেশ ও বসা নিষেধ”। তৃতীয়ত, একটি ছেলেদের আবাসিক হলে মেয়েদের প্রবেশ আমার কাছে বরাবরই অস্বস্তির। চতুর্থত, একজন প্রাক্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রীর নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ন্যূনতম সম্মান থাকলে নিশ্চিতভাবে সে আইন ভঙ্গ করবে না।

    এটা কি আইন? প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের মানে এই নয় একজন মানুষকে মারা, সাথে থাকা নারীদের গায়ে হাত তোলা নয়। অসভ্যতারও একটা সীমা থাকে। কারো গায়ে হাত তোলার পারমিট কি উপাচার্য নিজে দিয়েছেন আপনাদেরকে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যদি এই শিক্ষা পেয়ে থাকে, তাহলে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চাইতে মাদ্রাসায় পড়াটাই শ্রেয়।

    1. ধরুন একজন রমণী আপনার বাড়িতে
      ধরুন একজন রমণী আপনার বাড়িতে এসে আপনাকে কষে একটা চড় মেরে দিল। আপনি কি করবেন? তাকে ঘরে নিয়ে আসবেন? আপনার কি মনে হয় ছেলেদের হলে মেয়েদের এভাবে ঢোকা উচিত? আমি কখনই বলিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আসা উচিত নয়। আমি বলেছি কিছু যায়গা যা নিতান্তই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের। এটা মানেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কম্পিউটার ল্যাবে এসে যদি আপনি বলেন এটা ঢাবি, এখানে ঢোকার অধিকার সবার। আমার কি করা উচিত? বলেন? আর এটাও স্বীকার করি কেউ অন্যায় করলে তার শাস্তি তার পাওয়া উচিত। কিন্তু অন্যায় করে গায়ে মাখিয়ে আবার হলুদ সাংবাদিকতা করে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আর কত ডুবানোর অপচেষ্টা? ধন্যবাদ।

      1. কিসের সাথে কি মিলাইসেন?
        কিসের সাথে কি মিলাইসেন? যাদেরকে আপনারা গণধোলাই দিয়ে বীরের কাজ করসেন, তারা কি হলের কক্ষের ভেতরে ঢুকসিলো? আর কেউ ঢুকলেও আপনারে কে অধিকার দিলো, তাদের গায়ে হাত তোলার? প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম শুধু ঢাবির বেলায় না, সবখানেই প্রযোজ্য। কিন্তু তার মানে এই নয় আপনি তার গায়ে হাত তুলবেন। হাত তোলার প্রাতিষ্ঠানিক কোন নিয়ম নাই। অন্ততঃ আমি তা-ই মনে করি। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কোন বর্বরদের মাদ্রাসা নয়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, আবাসিক বাসা বাড়ি, প্রতিষ্ঠানও আছে, তার মানে কি সেটাকে ক্যান্টনমেন্ট বানায় ফেলতে হবে? চবি, জাবিতে মানুষ বেড়াতে যায়, সেখানে আপনাদের মতো পাহারাদার নাই। বিশ্বের কোথাও নাই। গুন্ডামি করতে হলে এলাকায় করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে হ্যাডম দেখানোর কি দরকার?

        1. ভাই আসলেই ঘটনা কি ঘটেছিল তা
          ভাই আসলেই ঘটনা কি ঘটেছিল তা আপনি কীভাবে জানেন? মিডিয়া থেকে?? কীভাবে মেনে নেব আপনি যা শুনেছেন তাই সত্যি?

          আর হলে ঢোকা বলতে শুধু রুমেই ঢোকা বোঝান? আপনি এখন দাবি করেই বসবেন, “এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কোন বর্বরদের মাদ্রাসা নয়। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, আবাসিক বাসা বাড়ি, প্রতিষ্ঠানও আছে… ইত্যাদি ইত্যাদি, তাই রোকেয়া হলে সবাইকে ঢুকতে দেওয়া হোক”…

          You know what I mean…!

          সাধারণ পাবলিক দোষ করলে কিছুই না। ঢাবির কেউ কিছু করলেই, “গুন্ডামি করতে হলে এলাকায় করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে হ্যাডম দেখানোর কি দরকার?”

          বাহ! কি সুশীলতা! :v

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *