নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • রূপালীনা
  • নুর নবী দুলাল
  • সুব্রত শুভ

নতুন যাত্রী

  • মহক ঠাকুর
  • সুপ্ত শুভ
  • সাধু পুরুষ
  • মোনাজ হক
  • অচিন্তা দত্ত
  • নীল পদ্ম
  • ব্লগ সার্চম্যান
  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান

আপনি এখানে

ফরহাদ মজহারের “এবাদতনামা”ই কি হতে পারে বাঙালী মুমিনের কুরআন? পর্ব - ২


আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

এক.
এই লেখার মুল প্রস্তাবনা হচ্ছে কবি ফরহাদ মজহারের লেখা কবিতার পুস্তক “এবাদতনামা” সম্পর্কে। কোনও কোনও নাস্তিক এই পুস্তকটিকে নাস্তিকতার শামিল করেছেন। আমি বলি, এই পুস্তকটিকে নাস্তিক কিম্বা ধর্মবাদী দুই চোখ দিয়েই পাঠ করা যেতে পারে। আমি নাস্তিক কিন্তু এই পুস্তকটিকে নাস্তিকতার চোখ দিয়ে পড়তে চাইনি। আমি বরং এই পুস্তকটিকে মোটের উপরে ঈশ্বরবন্দনার পদ্য হিসাবেই পাঠ করেছি। এবাদতনামায় সকল ছত্রে স্রষ্টার প্রশংসার কথাই বলেছেন কবি ফরহাদ মজহার, সেই স্রষ্টা কখনওবা “প্রভু”, কখনও “ঈশ্বর” কখনও “যোগেশ্বর” আবার কখনও বা “আল্লাহ্‌”। মুসলমানদের প্রচলিত ধর্মগ্রন্থ কুরআনের চাইতে কয়েক কোটিগুন মানবিক গ্রন্থ এই “এবাদতনামা”, যার প্রতিটি অক্ষর সৃষ্টিকর্তার বন্দেগীতে নিবেদিত কিন্তু এই সকল বন্দেগীর মূলকেন্দ্র হচ্ছে পার্থিব মানুষ, মুসলমান নয়, হিন্দু নয়,কেবলি মানুষ। সমগ্র “এবাদতনামা”য় কোনও হিংসা্র কথা নেই, শাস্তির হুমকি নেই, জ্বিহাদের উসকানি নেই, আছে আল্লাহর প্রতি ঈশ্বরের প্রতি অকুন্ঠ সমর্পণ। অন্যদিকে কুরআনের ছত্রে ছত্রে আছে জবরদস্তি, হুমকি, আতংক, কর্তৃত্বপরায়নতা আর অসীম ক্ষমতাধর এক সত্ত্বার অহম। সেকারনেই, আমি মনেকরি, বাঙলা ভাষাভাষী মুসলমানেরা কবি ফরহাদ মজহারের এবাদতনামা পুস্তকখানাকে অবলীলায় তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবে গ্রহন করতে পারেন। সারা দুনিয়ার সুন্নী ইসলামের যে হিংস্র রুপ আমরা দেখতে পাচ্ছি আজকের দুনিয়ায়, “এবাদতনামা”র মতো একটি পুস্তকই পারবে সুন্নী মুসলমানদের মনে প্রেম জাগিয়ে তুলতে, ভালাবাসায় মজাতে। সেটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি এই ব্লগ সিরিজটিতে। কুরআন যারা বাংলায় পড়েছেন, তাঁরা এই ব্লগ সিরিজটি পড়ে বুঝতে পারবেন, কর্তৃত্বপরায়ন কুরআনের বিপরীতে “এবাদতনামা” যেনো এক ছায়া সুনিবিড় শান্তির ণীড় !

দুই.
বাংলাদেশে হাজার হাজার কিম্বা মতান্তরে লক্ষ লক্ষ সুন্নী আলেম আছেন, প্রযুক্তির কল্যানে, এঁদের অনেকেই আজ দেশের মানুষের কাছে দারুন পরিচিত, বিখ্যাত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এবং বিশেষত ইসলাম ধর্ম এখন প্রধান নিয়ামক। আর একারণেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী শেখ হাসিনার আওয়ামীলীগ সকল শক্তি দিয়ে “ইসলামিক” সাজার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ইসলামিক দল হিসাবে নিজেদের গড়ে তুলছেন। দেশকে ইসলামের নবী মুহাম্মদের আদর্শের আলোকে, মদীনা সনদের আলোকে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন জনগনকে। আওয়ামীলীগের এই “ইসলামিক” হয়ে ওঠার রথযাত্রায় তাদের প্রধান সঙ্গী হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। এদেশের সুন্নী ইসলামী জনগোষ্ঠীর ঈমান আকিদা সংরক্ষনের প্রধান কাফেলা বলে দাবীদার হেফাজতে ইসলাম। বাঙালীর জনজীবন থেকে সকল ধরনের পার্থিব – অসাম্প্রদায়িক, সেকুলার ও গণতান্ত্রিক উপাদান ঝেটিয়ে বিদায় করার জন্যে হেফাজত এখন প্রধান বাহিনীতে পরিনত হয়েছে। এ বাহিনী কখনও চড়াও হচ্ছে নাস্তিক – মুক্তমনাদের ফাসীর দাবী নিয়ে আবার কখনওবা চড়াও হচ্ছে নির্বাক সিমেন্ট-বালু-পাথরের ভাস্কর্যের উপরে। কখনও নারীর উপরে কখনওবা নিরেট প্রকৃতির উপরে। পল্টনে নারী সাংবাদিকের উপরে হামলা কিম্বা পল্টনের গাছ গুলোকে নিরবিচারে কেটে ফেলার সেই হেফাজতি তান্ডব আমরা এখনও ভুলিনি।

(মুফতি ফয়জুল্লাহ, বাঙালীর জীবনের সাংস্কৃতিক উপাদান গুলো যার কাছে কেবলই "হিন্দুয়ানী")

নোয়াম চমস্কি লিখেছিলেন, যেখানে পাওয়ার সেখানেই মিডিয়াগুলো ঘুরে ফিরে বেড়ায় ভন ভন করা মৌমাছিগুলোর মতো। তাইতো, দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুলোতে এখন হেফাজতে ইসলামীর সুন্নী আলেমদের দেখা যায় প্রতিদিন সন্ধ্যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠা এরকমের একজন আলেমের নাম মুফতি ফয়জুল্লাহ। “মরলে শহীদ – বাচলে গাজী”র মতো অসম সাহস নিয়ে তিনি ধরাশায়ী করে চলেছেন একের পর এক সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের। বাঙালী সংস্কৃতি মানেই যার কাছে “হিন্দুয়ানী” ব্যাপার স্যাপার। পহেলা বৈশাখ তাঁর কাছে আপাদমস্তক হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। তাইতো তিনি যুদ্ধংদেহী মূর্তি নিয়ে টকশো গুলোতে হাজির হন পহেলা বৈশাখের উতসবের বিরুদ্ধে উত্তেজক বক্তৃতারাজী নিয়ে। তিনি মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এসো হে বৈশাখ” গানটি এদেশের মুসলমানদের ঈমান-আকিদার সাথে সাঙ্ঘরষিক। তিনি উল্লেখ করেছেন, রবীঠাকুরের এই গানটির কিছু অংশ –

“মুছে যাক গ্লানী, ঘুচে যাক জরা
আগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা”।

এখানে "অগ্নিস্নানে" ধরাকে পবিত্র করে তোলার আহবানকে তিনি বলছেন “হিন্দুয়ানী”, কেননা আগুন কেবল হিন্দু ধর্মের রীতিতে ব্যবহৃত হয়। সেজন্যেই পহেলা বৈশাখে বাঙালী মুসলমানের জন্যে এই গান গাওয়াকে তিনি হারাম ঘোষণা করছেন। এটা ঠিক সারা দুনিয়াতে, মুসলমানেরা যে তান্ডব চালাচ্ছে ইদানীং, তাতে দুনিয়া “অগ্নিস্নানে” শুচি হয়ে উঠবে এটা যেকোনো একজন জিহাদী সুন্নী মোল্লার পছন্দ হবার কথা নয়। (হেফাজতি আলেম জনাব মুফতি ফয়জুল্লাহ’র ভিডিওটি দেখতে পারেন এখানে )। পৃথিবীকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে ইসলামী আদর্শে রাঙ্গীয়ে তোলাতে ইসলামী ঈমান-আকিদার কোনও সমস্যা না হলেও, রবিঠাকুরের ‘অগ্নিস্নানে’ পৃথিবীকে শুচি করে তোলার আহবানে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভুতি ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়।

কিন্তু ফরহাদ মজহার সুন্নী আলেম নন। তাই তাঁর ধর্মীয় অনুভুতির সাথে ইসলামী মোল্লা মুফতি ফয়জুল্লাহ’র ধর্মীয় অনুভুতির মাঝে আকাশ – পাতাল ফারাক। মুফতি ফয়জুল্লাহ’র দুনিয়া কেবল মাত্র দুই ভাগে বিভক্ত, একভাগে - মুমিন মুসলমান আর অন্যভাগে সকল কাফেরদের অবস্থান। আর মুমিন ও কাফেরের মাঝে চলছে অনন্ত জিহাদ। মুফতি ফয়জুল্লাহ’র মতো মানুষদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই অনন্ত জ্বিহাদে ইসলামী “জোশ” এর জ্বালানী সরবরাহ করা। কিন্তু “এবাদতনামা”র লেখক, কবি ফরহাদ মজহারের দুনিয়া মুমিন আর কাফেরে বিভক্ত নয়। কবি ফরহাদ মজহারের দুনিয়ায় শুধুই মানুষ আছে, প্রধানত মানুষ, কেবলই মানুষ। না সেখানে মুসলমান, না হিন্দু না নারী না পুরুষ, কোনও ভেদ নেই। তাইতো, “এবাদতনামা”র কবিতাগুলোতে ঘুরে ফিরে এসেছে ভারতীয় পুরাণের নানান চরিত্রগুলো। শ্রি রাধিকার কথা এসেছে বারে বারে। এসেছে গৌরাঙ্গের কথা, এসেছে গঙ্গা – যমুনা – সরস্বতী ভগ্নীত্রয়ের কথা। কবি ফরহাদ মজহারের ঈমান – আকিদা ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়না তাঁর কবিতায় শ্রি রাধিকার উপস্থিতির কারণে। সুন্নী মোল্লা মুফতি ফয়জুল্লাহ’র ঈমান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় কেবল “অগ্নিস্নানে” শব্দটির জন্যে, সেখানে কবি ফরহাদ মজহারের কবিতায় হিন্দু পুরাণের নানান চরিত্র এসে ঘরবাড়ী বানিয়ে গেরস্থালী করেন। তাইতো ফরহাদ মজহারের কলব থেকে যে শব্দের ঢেউ উঠে আসে বারবার সেখানে দিনের শেষে শ্রী রাধিকা হয়ে ওঠার আকুলতা এই ভাবে প্রকাশিত হয়ঃ

“জোয়ার দেখেছি আমি ঢেউ উঠিতেছে ত্রিবেণীতে
গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতী। যে প্রভু যোগেশ্বর
তিনটি মেয়ের লীলা দেখে আমি বেহুঁশ হয়েছি
এক কৃষ্ণা, দুই যুঁই আর তৃতীয়টি লালমতি।

তিন মেয়ে তিন গুণে গুণবতী কিঞ্চিত মহেশ্বর
তাহাদের গুণাবলী শুনেছেন পার্বতীর কাছে
কেউ তাঁর মস্তকে কেউ বুকে, কেউ সংগোপনে
আছে প্রেমকথা হয়ে – ভাসে শুধু মাসান্তে জোয়ারে

যাকে সংগোপনে রাখি সতর্ক সতীর মতো ঘরে
তাঁকে বলি আল্লা বলো। দেখি তুমি সত্যি তাঁর কিনা
দেখি কত শক্ত মেয়ে – বেঁধে রাখি ঘরের ভেতর
ঘরের শক্তি প্রভু ঘরে রাখি, সম্ভাবে তুমিও রয়েছো।

পরজন্মে মেয়ে হবো, মেয়ে হয়ে স্বয়ং তোমাকে
আস্বাদন করে আমি নাম নেবো শ্রীমতী রাধিকা।

(শ্রীরাধিকা, এবাদতনামা ৬২)

বাংলাদেশে এখন সুন্নী মুসলমানেরা দেশটিকে “মুসলমানের দেশ” হিসাবে ঘোষণা করে ফেলেছে। এখানে পাঠ্যপুস্তক রচিত হয় মুসলমানের ইচ্ছা মাফিক, উৎসব – পার্বণ হয় মুসলমানের ইচ্ছে মাফিক এমন কি ভিন্ন কোনও ক্ষুদ্র বিশ্বাসী গোষ্ঠীকে ধর্মচ্যুত করার ঘটনাও ঘটে সুন্নী মুসলমানদের ইচ্ছা মাফিক। সুন্নী মোল্লাদের দাপটের এই সময়ে এবাদতনামার কবি কৃষ্ণা, যুঁই আর লালমতির লীলা দেখে বেহুঁশ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পরকালে কবি খোদ শ্রীরাধিকা হয়েই পুনর্জন্ম লাভ করতে চাইছেন। আগ্রহ উদ্দীপক নয়?

কে না জানেন ত্রিবেনী হচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি পরম পবিত্র স্থান। এই ত্রিবেনীতেই মিলেছে হিন্দু পুরাণের তিনটি প্রখ্যাত নদী গঙ্গা, যমুনা আর সরস্বতী। এই তিন নদীর সংগমস্থলের নাম হয়েছে “ত্রিবেনী সঙ্গম”। হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার পুন্ন্যারথী মানুষ এই ত্রিবেনীসঙ্গমে স্নান করে জীবনের মোক্ষ লাভ করেন। সেই ত্রিবেণীর জোয়ার কবি মজহারকে আন্দোলিত করে, উচ্ছসিত করে, পুন্যবান করে তোলে।

পার্থিব জীবনে এই ত্রিবেনীতেই আছে হংসেশ্বর মন্দির, জাফর খাঁ গাজী মসজিদ আর পশ্চিমবঙ্গের সবচাইতে পুরাতন গির্জা “ব্যান্ডেল চার্চ” ! কোনটিই ভাঙ্গা হয়নি, দখল হয়ে যায়নি কিম্বা ভাঙ্গার হুমকি দেয়া হয়নি, বেশ চলছে যে যার মতন। ভাবা যায় ত্রিবেণীর এহেন আরেক সংশ্লেষ? কে জানে, কবির মনে কি এই অপূর্ব মিলনের কথাই জেগে উঠেছিলো কিনা এই কবিতাটি লেখার সময়?

“অগ্নিস্নান” শব্দে সুন্নী মোল্লা মুফতি ফয়জুল্লাহ’র ঈমান-আকিদা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেলেও, কবির হৃদয় প্রেমের সাগর, তাঁর ঈমান দুনিয়ার চাইতেও বড়, সর্বংসহা। কবির ভালোবাসা তাই সারাজাহানের তাবৎ প্রেমিকের ভালোবাসা, এই ভালোবাসায় তাই নেই কোনও জাত – পাত – ধর্ম – গোত্রের বালাই। তাইতো, শ্রীরাম কৃষ্ণ পরমহংস আর মা কালীর হাত দিয়ে খোদ আল্লাহ্‌ তায়ালাকে জবা ফুলের ভালোবাসা পাঠাতে চান ফরহাদ মজহার।

“আমি একটি জবা ফুল আজ প্রভু তোমার সন্মানে
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের হাতে দেবো
তিনি মুচকি হাসিবেন, ফোকলা দাঁত উঠিবে বিহসি
কহিবেন, ‘এলি নাকি ও আমার শেখের ছাওয়াল’?
আমি কি কোথাও গেনু? আমি তো কোত্থাও যাই নাই
আমি যদি যাই তবে সর্বত্রই সমভাবে যাই।
ভাবাবেশে নাচিতেছে দশাপ্রাপ্ত প্রেমের ঠাকুর
শেখের ছাওয়াল নাচে সমভাবে ঠাকুরের প্রেমে।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস মা কালীর মারেফতে প্রভু
ও জবা পাঠালে তুমি মহব্বতে করিও গ্রহন।

(শ্রীরাম পরমহংস, এবাদতনামা ৩০)

আহা কজন কবি পারেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস আর মা কালীর হাতে আল্লাহ্‌কে রক্তজবার ভালোবাসা পাঠাতে? শুধু পাঠানোই নয়, কবি আল্লাহ্‌কে বলেও দিচ্ছেন সেই ভালোবাসা মহব্বতের সাথে গ্রহন করার জন্যে। এই ভালোবাসার কথা, এই প্রেম নিবেদনের কথা কুরআনের একটি বাক্যের মাঝেও পাওয়া যাবেনা। এ কেবলই কবির পক্ষে সম্ভব। সুন্নী মোল্লারা হয়তো ভোজালী হাতে তেড়ে আসবেন, কিন্তু তাতে কবি ভীত নন। কবি তো আশেক, তিনি তাঁর এশক এর কথাই লিখে যান।

তিন.
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের জনপ্রিয় শিল্পী বেচারা সনু নিগম কি বিপদেই না পড়েছিলেন, আজানের শব্দে তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার মতো অনাকাংখিত ঘটনার কথা সহজ সরল ভাবে লেখার কারণে। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, একজন অমুসলিম নাগরিক হিসাবে তিনি কেনো পাঁচ বেলা আজানের এই শব্দদুষন কে পবিত্র আওয়াজ হিসাবে মেনে নেবেন? খুব সরাসরি টুইটারে লিখেছিলেন এভাবে –

"God bless everyone, I am not a muslim and I have to be woken up by the azaan in the morning. When this forced religiousness will end in India?"

(ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুণ। আমি মুসলমান নই, তবুও কেনও সকাল বেলা আজানের শব্দে আমার ঘুম ভাংতে হবে? কবে ভারতে এই ধরনের জবরদস্তিমুলক ধার্মিকতার শেষ হবে?)

বাংলাদেশের ফেসবুক চত্বরে ফরহাদ মজহারের শিষ্যদের কেউ কেউ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সনু নিগমের চৌদ্দ কিম্বা আঠাশ গুষ্ঠি উদ্ধার করেছিলেন, কেনও আজান নিয়ে বেচারা সনু নিগম এই রকমের প্রশ্ন উত্থাপন করলেন? সকলেই তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিলেন সনু নিগমের বিরুদ্ধে। কিন্তু সনু নিগম কি খুব অন্যায় কিছু বলেছিলেন? আসুন আবারো কবি ফরহাদ মজহারের এবাদতনামা থেকে একটি কবিতা পড়ি –

“তুমি কি বধির প্রভু? নাকি কানে তুলা দিয়ে থাক?
এভাবে হুঙ্কার দিয়ে পাঁচবার মাইক্রোফোনে কেন
মোয়াজ্জিন হাঁকিতেছে? প্রেমকথা কে কয় চিৎকারে?
দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে তোমাকে ধর্মের নামে ডাকা
কোথা থেকে এল প্রভু? তবে কি ধূর্ত শয়তানে
মনুষ্যেরে ডাকিতেছে অধর্মের সাজানো ময়দানে?”

(আজান, এবাদতনামা ৫৯)

ভেবে দেখুন, বেচারা অমুসলিম সনু নিগম কেবল নিজের ব্যক্তিগত অসুবিধার কথাই বলেছিলেন, ব্যস আর যায় কোথায়, মুসলমানেরা হামলে পড়েছিলো তাঁর উপরে হা রে রে রে বলে। কিন্তু দেখুন তো আমাদের প্রেমিক কবি ফরহাদ মজহার কি লিখছেন? তিনি দিনে পাঁচবার আজান দেয়া নিয়ে নিজের অসুবিধার কথা বলেছন না, বরং খোদ আল্লাহ্‌ তায়ালা কি বধির নাকি কানে তুলো দেয়া অনিচ্ছুক শ্রোতা, সেই প্রশ্ন তুলছেন। তিনি খুবই যৌক্তিক ভাবেই প্রশ্ন তুলছেন – প্রেমের কথা কি কেউ চিৎকার করে, হাউকাউ করে বলেন? এমন কি তিনি প্রশ্ন করছেন এই যে চিৎকার করে আজান দেয়ার সংস্কৃতি এটা আদৌ কি ধর্মের আহ্বান? নাকি অধর্মের আহ্বান? নাকি ধর্মের নামে শয়তানের আহ্বান? আহা কি হবে সেই সকল ফরহাদ মজহার শিষ্যদের? যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেদম ওকালতি করলেন আজানের পক্ষে আর সনু নিগমের চৌদ্দ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে? এখানেই কবি ও মুসলমানের পার্থক্য। এখানেই কোকিল ও কাক এর পার্থক্য। ফরহাদ মজহার হচ্ছেন এবাদতনামার কবি আর তার হেফাজতপন্থি শিষ্যরা হচ্ছেন বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ধর্ম ব্যবসায়ী। এবাদতনামার লেখক ফরহাদ মজহার হচ্ছেন কবি আর মুফতি ফয়জুল্লাহ হচ্ছেন মজহারের ভাষায় সেই “ধূর্ত শয়তান” যে “মনুষ্যেরে ডাকিতেছে অধর্মের সাজানো ময়দানে”।

সনু নিগম প্রশ্ন তুলেছিলেন লাউড স্পিকারে আজান দেয়ার সাথে তার নাগরিক ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ণ হবার প্রসঙ্গে। কিন্তু এবাদতনামায়, ফরহাদ মজহার নাগরিক অধিকার নিয়ে বলছেন না, তিনি বরং চিৎকার করে আজান দেয়ার উপযোগিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। মুমিনের কাছে আজান হচ্ছে পবিত্র আহ্বান। দিনে পাঁচবার আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করবার যে সময় সেই বিষয়ে মুমিনকে স্মরন করিয়ে দেবার জন্যে আজান। কিন্তু প্রকৃত মুমিনকে কি আসলে মনে করিয়ে দেয়ার দরকার আছে কখন তাঁকে নামাজ আদায় করতে হবে? বিশেষত আজকের যুগে? কবি ফরহাদ মজহার আজানকে দেখছেন এক ধরনের প্রেমের আহ্বান হিসাবে তাই লাউড স্পিকারের আজানের নান্দনিক সৌন্দর্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেননা প্রেমিক তো তার প্রেমের কথা চিৎকার করে বলেনা। প্রেমের ভাষা, সমর্পণের ভাষা, আহ্বানের ভাষা কখনই চিৎকার চ্যাঁচামেচি কিম্বা কর্কশ কণ্ঠের হয়না। লাউড স্পিকারের আজান তাই কবির কাছে “শয়তানের আহ্বান” হয়ে ওঠে।

বস্তুত আজান হচ্ছে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে ইসলামের উপস্থিতির একটি প্রকাশ মাত্র। পৃথিবীর বহু দেশে লাউড স্পিকারে আজান দেয়া হয়না কিন্তু সেখানেও মানুষ নামাজ আদায় করেন। পৃথিবীর সেই সব দেশেই লাউড স্পিকারে আজান দেয়া হয় যেখানে ইসলাম একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে গন্য। এমন কি ইসলামের প্রথম বছরগুলোতে আজানের কোনও চর্চাই ছিলোনা। আজানের প্রথাটি শুরু হয় সম্ভবত হিজরি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে যখন মদীনায় ইসলাম একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে সংগঠিত হয়ে উঠেছে এবং মক্কা দখলের প্রস্তুতি চলছে। আজান হচ্ছে মুমিনদের জড়ো করবার ডাক, এই ডাকে যখন প্রেম উঠে গিয়ে যান্ত্রিক চিৎকার যুক্ত হয়, তখন তা সন্দেহাতীত ভাবেই “শয়তানের আহ্বান” এ পরিনত হয় তা। তাই কবি ফরহাদ মজহার যথার্থই লিখেছেন –

"দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে তোমাকে ধর্মের নামে ডাকা
কোথা থেকে এল প্রভু? তবে কি ধূর্ত শয়তানে
মনুষ্যেরে ডাকিতেছে অধর্মের সাজানো ময়দানে?”

কিন্তু অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সনু নিগমকে যে চড়া মুল্য দিতে হয়েছে তার ছোট্ট একখানা টুইট এর জন্যে, ফরহাদ মজহারকে কোনও মুল্যই দিতে হয়নি, আজান এবং আল্লাহর বধিরতা নিয়ে এই পদ্যের জন্যে। আজান নিয়ে ফরহাদ মজহারের এই পদ্য পাঠ করে সুন্নী মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভুতি আঘাত প্রাপ্ত হয়না, ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়না। তার কারণ কি? কারণ ব্যক্তি ফরহাদ মজহার বাংলাদেশের রাজনীতির "পাওয়ার হাউস"এর কাছের মানুষ। তাই ব্যক্তি ফরহাদ মজহার রক্ষা করে চলেছেন কবি ফরহাদ মজহার কে। সেই আলোচনা এই লেখায় করবোনা, ভিন্ন কোনও লেখায় করবো। এই লেখার মূল প্রসঙ্গ “এবাদতনামা”র কুরআনের বিকল্প হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে। আপাতত সেই প্রসঙ্গেই থাকতে চাই।

আগ্রহী হলে পরের পর্বটি পড়ে দেখতে পারেন এখান থেকে

(চলবে)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 1 দিন ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর