নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সুমিত রায়
  • পৃথু স্যন্যাল
  • আরমান অর্ক
  • সত্যর সাথে সর্বদা

নতুন যাত্রী

  • অন্নপূর্ণা দেবী
  • অপরাজিত
  • বিকাশ দেবনাথ
  • কলা বিজ্ঞানী
  • সুবর্ণ জলের মাছ
  • সাবুল সাই
  • বিশ্বজিৎ বিশ্বাস
  • মাহফুজুর রহমান সুমন
  • নাইমুর রহমান
  • রাফি_আদনান_আকাশ

আপনি এখানে

বিএনপি’র ভিশন ২০৩০ কি “কল্যাণের রাজনীতির” সংস্কৃতি গড়ে তোলার আভাস? নাকি পুরোটাই বরাবরের মতো ভাওতাবাজি?


আগামী নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি হিসাবে বিএনপি তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দলিল “ভিশন ২০৩০” প্রকাশ করেছে। এই লেখাটি বিএনপি’র এই দলিলটি পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া। এটা কোনও বিশেষজ্ঞ মতামত নয়, বরং একজন নাগরিক হিসাবে আমার ব্যক্তিগত মতামত ও বিশ্লেষণ।

এক.
বিএনপি কি শিখছে জীবন থেকে? নাকি আবারো উল্টোপথে হাঁটছেন খালেদা জিয়া? বিএনপি’র প্রধান প্রতিপক্ষ মোহতারেমা শেখ হাসিনা’র আওয়ামীলীগ যেখানে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে প্রতিদিন, শুধুমাত্র ক্ষমতায় আরো অধিককাল থাকার জন্যে, সেখানে জনাবা খালেদা জিয়া আমাদের শোনাচ্ছেন – “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”।

মোহতারেমা শেখ হাসিনা চরম ইসলামী মৌলবাদীদের ডেকে নিচ্ছেন তাঁর শাহী দরবারে, গলায় গলায় জড়িয়ে ধরছেন ইসলামী উম্মাহর আবেগে, সেখানে বিএনপি আমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ক্ষুদ্র – বৃহৎ সকল ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সংবিধান সম্মত অধিকার সুনিশ্চিত করার। বিএনপি তাঁদের এই দলিলে নতুন করে শপথ নেবার আহবান জানিয়েছে এইভাবে –

“বাংলাদেশের সকল ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ, ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীসহ সকল জাতি-গোষ্ঠী ও মানুষের চিন্তা চেতনা ও আশা আকাংখা ধারণ করে একটি অংশীদারিত্বমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারসম্পন্ন, জনকল্যাণমূলক, সহিষ্ণু, মানবিক, শান্তিকামী ও সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (BNP) লক্ষ্য”।

মোট ২৫৬ টি প্রতিশ্রুতির এই স্বপ্নময় ডকুমেন্টটি পড়েছি আর অবাক হয়েছি, দারুনভাবে বিস্মিত হয়েছি। বিস্মিত হয়েছি, কনফিউজড হয়েছি, সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছি, এক রকম ধাঁধাঁয় পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে আমার। কনফিউজড হয়েছি এইজন্যে যে আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি কি বাংলাদেশের বিএনপি নামের একটি রাজনৈতিক দলের প্রাক-নির্বাচনী দলিল পড়ছি নাকি ইউরোপের কোনও সুসংগঠিত সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের কোনও দলিল পড়ছি। সেই হিসাবে আমার লিখতে কোনও দ্বিধা নেই যে এই দলিলটি দারুন সুলিখিত একটি প্রাক- নির্বাচনী দলিল বটে।

দুই.
মোহতারেমা শেখ হাসিনার দল এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে যখন নাসিরনগরের হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকদের বাড়ীগুলোর উপরে হামলা করা হয়, ভাংচুর করা হয়, পুরষ-নারী-শিশুদের উপরে নির্যাতন করা হয়, ধর্মীয় প্রতিক সমূহ ভাংচুর করা হয়, তখন বিএনপির এই ঘোষণা আমাদের কে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আশ্বাস দিচ্ছে। বিএনপি’র এই আশ্বাসে বাংলাদেশের মানুষ আশ্বস্ত হবে কিনা, সেই প্রশ্নটিকে আপাতত মুলতুবি রেখেই বলছি, এই আশ্বাস বাংলাদেশের আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খুব জরুরী। বিএনপি নিঃসন্দেহে এইজন্যে ধন্যবাদ দাবী করে।


(নাসির নগরে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় বিধ্বস্ত হিন্দু পরিবারের বসতভিটা)

আওয়ামীলীগ আর তার মিত্রদের যৌথ উদ্যোগে যখন সারা দেশজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি-জমা, ঘর-বাড়ী দখল করে নেয়ার প্রতিযোগিতা চলে তখন জনাবা খালেদা জিয়ার দল আমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেনঃ

  • দল-মত ও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ক্ষুদ্র-বৃহৎ সকল জাতি গোষ্ঠির সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মকর্মের অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম ও সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে। (মূল ডকুমেন্টে ২৫৪ নাম্বার প্রতিশ্রুতি)
  • প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ন অধিকার ভোগ করবেন। কাউকে কোন নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসকে আঘাত করতে দেয়া হবে না। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। (মূল ডকুমেন্টে ২৫৫ নাম্বার প্রতিশ্রুতি)
  • সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের সকল অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। (মূল ডকুমেন্টে ২৫৬ নাম্বার প্রতিশ্রুতি)

অবাক করা বিষয় নয়?

আমি জানি, আমাদের আওয়ামী বন্ধুরা তেড়ে আসবেন বিএনপির দ্বারা সংগঠিত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপরে নির্যাতনের ঘটনাগুলোর কথা বলে। বিশেষ করে ২০০১ এর নির্বাচনের পরে সংগঠিত হিন্দু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে বিএনপি ও জামাতের নির্যাতনের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। কিন্তু আওয়ামীলীগ সেই নির্যাতন বন্ধ করতে পেরেছে কি? সাম্প্রদায়িক হানাহানির কারণগুলোকে দূর করতে পেরেছে কি শেখ হাসিনার দল আওয়ামীলীগ? অন্য কারো কোনও বয়ান নয়, বরং আমরা আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আওয়ামীলীগ তা পারেনি। বরং সাম্প্রদায়িক হানাহানির দার্শনিক – রাজনৈতিক – সাংস্কৃতিক ভিত্তি আরো শক্ত হয়েছে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বেই। আওয়ামীলীগ উগ্র ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির পকেটস্থ হয়েছে অথবা মতান্তরে এই ইসলামিক শক্তিকে নিজের পকেটস্থ করেছে। এই সকল ইসলামী দলগুলো মনে করে বাংলাদেশ মুসলমানদের দেশ, এদেশে মুসলমানদের কথামত, রীতি অনুযায়ী সকলকে থাকতে হবে, চলতে হবে, কাজ করতে হবে, উৎসব পালন করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একটি উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার পরিবর্তে মোহতারেমা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ গড়ে উঠছে “মদীনা সনদের” দেশ হিসাবে। সেই পরিস্থিতিতে জনাবা খালেদা জিয়ার বিএনপি বলছেঃ

”বিএনপি এমন এক উদার গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে বিশ্বাস করে যেখানে জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। যত সংখ্যালঘিষ্ঠই হউক না কেন, কোন মত ও বিশ্বাসকে অমর্যাদা না করার নীতিতে বিএনপি দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ”।
(ভিশন ২০৩০ দলিলের ২ নম্বর প্রতিশ্রুতি)

শেখ হাসিনা যেখানে হেফাজতে ইসলাম আর চরমোনাই পীর সাহেবের নির্দেশনা মোতাবেক দেশের শিক্ষা – সংস্কৃতিকে গড়ে তুলছেন, সেখানে জনাবা খালেদা জিয়া আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজের, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীতে সংখ্যালঘিষ্ঠের মতামতকে অমর্যাদা করা হবেনা।

অবাক করা বিষয় নয়?

মোহতারেমা শেখ হাসিনা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছেন। বিরোধী দলকে রাজপথ থেকে রাজনীতির ময়দান থেকে নিশ্চিহ্ন করার সকল বন্দোবস্ত করেছেন। বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে মামলা, গুম, খুনের আতংক ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন সফল ভাবে। বিরোধী রাজনীতির বহু নেতা-কর্মীরা রাতে নিজ বাড়ীতে ঘুমাতে পারেন না। একটা সময় ছিলো, যখন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতারাই শিকার হতেন জেল – জুলুমের, কারাবরণ করতেন রাজনীতির অংশ হিসাবে। কিন্তু মোহতারেমা শেখ হাসিনার রাজনীতির সংস্কৃতি এই জেল – জুলুম – কারাবরণের আতংক ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন ইউনিয়ন পর্যায়ের এমন কি গ্রাম পর্যায়ের বিরোধী রাজনীতির নেতা –কর্মীদের মাঝে। যেকোনো সৎ বিবেকবান মানুষ স্বীকার করবেন, এটা গনতন্ত্রের নামে নিরেট ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছেন তিনি। এই সময়ে জনাবা খালেদা জিয়ার বিএনপি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেঃ

“শরতের আকাশে সাতটি রঙের বিচিত্র প্রভা নিয়ে রঙধনু যেভাবে মনোরম সৌন্দর্যের বিচ্ছূরণ ঘটায়, আমরা চাই সকল মত ও পথকে নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন ও পরিপুষ্ট করতে যে সংস্কৃতি বাংলাদেশকে একটি Rain-Bow Nation এ (রঙধনু-জাতিতে) পরিণত করবে”।
(ভিশন ২০৩০ এর ১০ নম্বর প্রতিশ্রুতি)

অবাক করা বিষয় নয়?

তিন.
উন্নত বিশ্বে এবং যে সকল দেশে মোটামুটি ধরনের গনতন্ত্রের চর্চা আছে সেখানে জনগনের কাছে দেয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অর্থ হচ্ছে, রাজনৈতিক দল গুলো জানেন কিভাবে সেই সকল প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব। অর্থাৎ এই প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে তাদের চুলচেরা “হোমওয়ার্ক” থাকে। তাঁরা শুধু প্রতিশ্রুতি দেননা, তাঁরা কিভাবে সেই সকল প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করবে তার ব্যাখ্যাও দেন। কিন্তু আমাদের দেশে এসবের কোনও দায়বদ্ধতা নেই। জনগণেরও কোনও আগ্রহ নেই তা জেনে নেবার। জনগন শুধু প্রতিশ্রুতিকেই ভালোবাসে। তা সে প্রতিশ্রুতি ডাহা মিথ্যা দিয়ে সাজানো কিম্বা নিরেট ভাওতাবাজির হলেও।

বিএনপি’র এই বিশাল প্রতিশ্রুতির তালিকা সমৃদ্ধ ডকুমেন্টটিতে কোনও ব্যাখ্যা নেই কেনও এই প্রতিশ্রুতিগুলো জরুরী এবং কিভাবে এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব। কিভাবে এই সকল প্রতিশ্রুতি দল হিসবে বিএনপি’র রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং কিভাবে বিএনপি একটি দল হিসাবে সাংগঠনিক ভাবে এই বিশাল প্রতিশ্রুতিমালার সাথে খাপ খাইয়ে নেবে নিজেদের, এই সকল বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নেই। এটা সত্যি, হয়তো এই সকল ব্যাখ্যা একই ডকুমেন্টে দেয়াটা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা। কিন্তু বিএনপি যদি এই সকল প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে চায়, তাহলে তাদেরকে অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে কিভাবে তাঁরা এই সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন।

চার.
ব্যক্তিগত ভাবে আমি এই দলিলটিকে স্বাগত জানাই। আমি মনে করি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে ফ্যাসীবাদী শাসন চলছে, তার বিপরীতে এই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দলিল সন্দেহাতীত ভাবেই আশা জাগানিয়া। কিন্তু আমার কিম্বা আমার মতো মানুষদের সংশয়ের স্থানটি হচ্ছে, আমরা আমাদের কিশোর বয়স থেকে এই দুই নেত্রীকে দেখে আসছি। আমরা দেখেছি, এই দীর্ঘ সময়ে, এই দুই নেত্রীই একই ভাবে একই তরিকায় জনগনের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিভঙ্গ করেছেন। তাঁদের রাজনীতির প্রধান চরিত্রই হচ্ছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নজির স্থাপন করা। প্রতিশ্রুতিভঙ্গের দৌড়ে দুজনেই সামরিক শাসকদের সকল রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছেন। তাই আমি জানি, জনাবা খালেদা জিয়ার এই ভিশন ২০৩০ এর বিপরীতে অচিরেই হয়তো মোহতারেমা শেখ হাসিনার ভিশন ২০৪০ চলে আসবে। প্রায় একই প্রতিশ্রুতিগুলো আরো আকর্ষণীয় ভাষায়, উপস্থাপনায় জনগনকে গেলানো হবে। তবে মোহতারেমা শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিপক্ষ জনাবা খালেদা জিয়ার চাইতে পাকা খেলোয়াড়, তিনি রাজনীতির বাতাস ভালো বুঝতে পারেন, তাই সন্দেহ নেই তাঁর ভিশন ২০৪০ তে হয়তো আরো অনেক মন ভোলানো প্রতিশ্রুতি থাকবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই সকল প্রতিশ্রুতি আর কিছুই নয়, কেবল জনগনের সাথে প্রতারণার নতুন বয়ান। দারুন শৈল্পিক বয়ান। মোটে ৩০ – ৪০ জনের একটি দল দু-চার মাস খেটে এই রকমের একটি দলিল তৈরী করা যায়। টাকা পয়সার সরবরাহ ভালো থাকলে এই রকমের দলিল সরাসরি বিদেশী কনসালটিং ফার্ম দিয়েও লিখিয়ে নেওয়া যায়। বিএনপি’র এই প্রতিশ্রুতির তালিকাটি ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মতোই (যদিও ইউরোপের কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোতে হয়তো এতো দীর্ঘ তালিকার দরকার হয়না এখন আর), লেখার পরও জোরালো সংশয় প্রকাশ করছি এর সত্যতা নিয়ে, বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। যারা বিএনপি’র রাজনীতিকে জানেন, যারা দল হিসাবে বিএনপি’কে জানেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন, এই দলিলটি জনাবা খালেদা জিয়া কিম্বা তাঁর পুত্র জনাব তারেক জিয়া’র মস্তিস্ক প্রসূত নয়। এই রকমের একটি দলিল রচনার জন্যে যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দরকার হয়, তা এই মা-পুত্রের নেই। বরং এই দলিলটি রচনায় বিএনপি’র সাথে সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ, একাডেমিকস এবং সাবেক আমলাদের সাহায্য নেয়া হয়েছে, এটা প্রায় পরিস্কার। হয়তো ভাড়াটে লোকেদের হাতে তৈরী হয়েছে এই স্বপ্নময় প্রতিশ্রুতির দলিল।

এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন কঠিন কাজ, এটা এই দলিলটিতে স্বীকার করা হয়েছে। একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে এটা কঠিন কিন্তু অসম্ভব কাজ নয়। কিন্তু আমি মনে করি, এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন বিএনপি’র জন্যে শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও বটে। আর এটা শুধু যে বিএনপি’র জন্যেই অসম্ভব তা নয়, এটা আওয়ামীলীগের জন্যেও অসম্ভব। আর এই অসম্ভবতার কারণও দুই দলের জন্যে একই।

পাঁচ.
এই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে যে সংশয় প্রকাশ করেছি, তার কারণও এই দলিলের রচনার প্রেক্ষাপটের সাথেই জড়িত। যেহেতু এই দলিলের রচনার সাথে বিএনপির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী জনাবা খালেদা জিয়া এবং জনাব তারেক জিয়ার কোনও সম্পৃক্ততা নেই বা থাকেনা, কিম্বা থাকার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য, তাই এর বাস্তবায়নও কঠিন। কেননা নির্বাচিত হবার পরে দল আর তা্র বুদ্ধিবৃত্তিক উপদেস্টাদের উপদেশ – বুদ্ধি – পরামর্শের ধার ধারেনা। তখন দলের গুলশানের অফিস আর বিকল্প অফিস হাওয়া ভবনের ইচ্ছে মাফিক চলে। তখন জনগনের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতির চাইতেও অনেক জরুরী – গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দেশের ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। জরুরী হয়ে ওঠে বিদেশী প্রভুদের প্রতি দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন।

কেনও এই সকল প্রতিশ্রুতি বিএনপি বা আওয়ামীলীগের মতো দলের পক্ষে বাস্তবায়ন অসম্ভব তা বোঝার জন্যে রকেট সায়েন্স বোঝার দরকার হয়না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে – এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করার জন্যে যে রাজনৈতিক – অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ থাকা দরকার তা এই দুইটি দলের কারোরই নেই। এই প্রতিশ্রুতি গুলো বাস্তবায়নের জন্যে সরকারের কাছে যে তহবিল থাকার দরকার হবে, তা কিভাবে অর্জিত হবে তাঁর কোনও হিসাব নিকাশ এই দুই দলের কাছে নেই। এই পরিমান তহবিল গঠনের জন্যে টাকাওয়ালাদের গাঁট থেকে যে পরিমান কর আদায় করতে হবে তা করে ওঠা সন্দেহাতীত ভাবেই অসম্ভব এই দুইটি দলের জন্যে। কেননা, এই দুইটি দল আর কিছুই নয়, আমাদের দেশের ব্যবসায়ী শ্রেনীর রাজনৈতিক ক্লাব মাত্র। আওয়ামীলীগ যে অর্থনৈতিক লুটপাট করেছে বিগত নয় বছরে, তা প্রায় আরেকটি সমান্তরাল অর্থনীতির সমান। ব্যাংকিং খাত সহ অর্থনৈতিক খাতে আওয়ামীলীগের দুর্নীতির কথা শুধু দেশে নয় বিদেশী মিডিয়া গুলোতেও এসেছে ফলাও করে। বিএনপি সেই একই অর্থনৈতিক লুটপাট করবেনা, তাঁর প্রতিশ্রুতি কে নিশ্চিত করবে? বরং আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি’র মূল প্রতিশ্রুতির জায়গাটি জনগন নয়, দেশের সাদা ও কালো ব্যবসায়ীদের কাছেই বাঁধা। মোহতারেমা শেখ হাসিনার পাশে সফেদ দাড়ি ওয়ালা দরবেশ বাবাকে দেখেও কি সেই বিষয়টি নিশ্চিত হয়না?

ছয়.

সে কারনেই বিএনপি’র জন্যে “ভিশন ২০৩০” একটি প্রতিশ্রুতির তালিকা মাত্র। যার বাস্তবায়নযোগ্যতা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি। বিষয়টি যেমন বিএনপির জন্যে প্রযোজ্য আরো বেশী ভাবে প্রযোজ্য আওয়ামীলীগের ক্ষেত্রেও। রাজনৈতিক প্রতারণা ব্যতীত আর কিছুই দেবার নেই এই দুই দলের। বাঙালী প্রতারিত হতে ভালোবাসে, বিকল্প গড়ে তোলার মুরোদ যেহেতু নেই বাঙালীর, তাই হয়তো কে কম প্রতারণা করে সেটাই হবে বাঙালীর বিবেচ্য বিষয় আগামীতে। সেই বিবেচনায়, সন্দেহাতীত ভাবেই, বিএনপি'র এই দলিলটি তাদেরকে রাজনীতির ময়দানে আবারো হয়তো আলোচনায় নিয়ে আসবে !

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 3 ঘন্টা 14 min ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর