নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • শাম্মী হক
  • সলিম সাহা

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

মানুষের সমাজ এবং কর্নেল তাহের


সমাজ বিপ্লবীরা মানুষকে কর্তৃত্ববাদী ভাবনা থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে দার্শনিক তত্ত্ব মানুষকে মুক্তি দিয়েছে ঈশ্বরের প্রতি অন্ধবিশ্বাস থেকে; কিন্তু এই সমাজেরই শ্রেণীবিভাজন মানুষের বোধ-বুদ্ধি ও জাগরণের চেষ্টাকে কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। মানুষকে এই শ্রেণীবিভাজনই দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করে দিয়েছে, শোষক ও শোষিত।

শোষক শ্রেণীটি ক্রমান্বয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব বহাল রাখার জন্য নানা ধরনের ছল-চাতুরি ও ফন্দি-ফিকির করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় একটি সময়ে ফরাসি বিপ্লবীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলো মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে, যেখানে থাকবে সাম্যবাদ, থাকবে স্বাধীনতা। সেই সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি ফরাসি বিপ্লব। আদর্শচ্যুত বিপ্লবীরাই ফরাসি মুল্লুকে বুর্জোয়াদের ক্ষমতায় আসীন করেছেন।
তারপর কেটে গেছে বহুটা কাল, এই সমাজে প্রতিষ্ঠা পায়নি কোনো সমাজ বিপ্লব। যে বিপ্লব মানুষকে মুক্তি দেবে বুর্জোয়াদের অমানবিক শৃঙ্খল থেকে, তৈরি করবে মানবিক বন্ধন।
মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যই যুগে যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-ট্রট্স্কি-চে গুয়েভারা ও মাওসেতুঙের মতো সমাজ বিপ্লবীরা। সমাজ বিপ্লবের এই ধারাবাহিকতায় এই ভূখণ্ডে, এই ভাটির দেশে সমাজ বিপ্লবের যাত্রাপথে যোগ দিয়েছিলেন কর্নেল তাহের। কর্নেল তাহেরের আলোচনায় আসার পূর্বে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা প্রয়োজন।

মানুষের সমাজ কথাটা মূলত টমাস মূর থেকেই সূত্রপাত, মূরের লেখা ইউটোপিয়া প্লেটোর ‘রিপাবলিক’র সাথে সাদৃশ্য আছে এক জায়গায়, মূর ও প্লেটোর সাদৃশ্য একবারে মূলগত। সাদৃশ্য এইখানে যে উভয় রাষ্ট্রেই ব্যাক্তিগত সম্পত্তি নেই, এবং বৈসাদৃশ্যের জায়গাটা এইখানে যে, প্লেটোর রাষ্ট্রে ব্যাক্তিগত সম্পত্তি না থাকলেও শ্রেণী রয়েছে, দেহের মাথা, বুক ও পায়ের মতো সেখানেও থাকবে শাসক, যোদ্ধা ও শ্রমিক, মূরের রাষ্ট্রে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না, প্লেটো যদি হন ফ্যাসিবাদী, মূর তাহলে সমাজতন্ত্রী। ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকা না থাকাটার ওপর টমাস মূর যতোটা গুরুত্ব দিয়েছেন ততোটা প্লেটো দেননি। মূর সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার বিরুদ্ধে। তাঁর মতে, ইউটোপিয়া’র বাইরে লোকে অবশ্যই সমষ্টির কল্যাণের কথা জোরেশারেই বলে থাকে, কিন্তু আসলে তারা কেবল নিজের কল্যাণটিই দেখে; ‘ইউটোপিয়া’ তে আছে অন্য কিছু, সেখানে যেহেতু ব্যক্তিগত বলতে কিছু নেই তাই লোকে সমষ্টির কল্যাণ ছাড়া অন্য কিছুর সঙ্গে নিজেদের জড়ায় না। উভয় ক্ষেত্রেই কাজটা যুক্তিসঙ্গত। সব কিছুর পক্ষে ভালো হওয়া সম্ভব নয়, যদি সব মানুষ ভালো না হয়। আর মানুষ ভালো হবে কি করে যদি ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে? ‘ইউটোপিয়া’র এক জায়গায় বলা হচ্ছে :
যেখানে সম্পত্তি রয়েছে ব্যক্তিমালিকানায়, যেখানে সবকিছুর অন্তরালে থাকে টাকা, সেখানে সমষ্টির কল্যাণ যে সুবিবেচনার সঙ্গে পরিচালিত এবং অব্যাহতরূপে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে থাকবে এটা প্রায় অসম্ভব, যদি না আপনি মনে করেন যে সেখানে ন্যায় বিচার রয়েছে যেখানে সবকিছুই নষ্টদের অধিকারে অথবা সেখানে ধন-সম্পদের বিকাশ ঘটছে সেখানে সবকিছুই অল্প কয়েকজনের দখলে, যে অল্প কয়েকজন থাকে প্রাচুর্যে এবং অন্যরা থাকে দুর্দশায়, হাহাকারে, অভাবে।

তাহের চেয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই সমাজতন্ত্র গড়ে উঠবে শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, শ্রমিক ও কৃষকেরাই হচ্ছে সেই সেনাপতি যারা কাঙ্খিত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। উড়ে এসে জুড়ে বসা নয়, কিংবা মেকিয়াভেলির সেই রাজপুত্রের মতো নিজেদের মধ্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য নয়, ওরা লড়াই করে মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে বেঁচে থাকার স্বার্থে। নিজেদেরকে মুক্ত করতে গিয়ে তারা মুক্ত করবে হাজার বছরের ইতিহাসকে। শাসক থাকবে না, রাষ্ট্র দুর্বল হবে। প্লেটো যে শ্রেণীকে পায়ের কাছে রেখেছিলেন, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তারা আর পা হয়ে থাকবে না, আসলে শাসন কাঠামোর ওপর-নীচ স্তরভেদটিই আর থাকবে না। সব মানুষ মিলে গতিশীল একটি সমাজ তৈরি করবে। কর্নেল তাহের মূলত এমনই একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়ার ফলে মার্কসের সঙ্গে টমাস মূরের একটি সাংস্কৃতিক ব্যবধান থাকতোই। যদি টমাস মূর ষোড়শ শতাব্দীতে জন্ম না নিয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নিতেন। মার্কস জার্মানীর দর্শন, ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং ফ্রান্সের সমাজতন্ত্রÑএই তিন ঐতিহ্যকে ধারণ করে তবেই মার্কস হয়েছেন, তবুও নিজে মার্কসবাদী হননি। মার্কস সাংস্কৃতিকভাবে একজন বড় মাপের আতেল ছিলেন, দার্শনিক এবং সমাজতাত্ত্বিকও ছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই মার্কস হতেন না যদি না বিপ্লবী হতেন। যে অনমনীয় নৈতিকতাবোধ থাকলে বিপ্লবী হওয়া যায়, মূরের মধ্যে সেটা ছিল। মূরের সঙ্গে তাঁর পরবর্তীকালের দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনের তুলনা করলেই ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
মূর ও বেকন দুজনেই ছিলেন নিজেদের কালে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, প্রধান বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তাঁরা দুজনেই, মূর মূরের কালে, বেকন বেকনের কালে। দুজনেই তাঁরা কারাবন্দী হয়েছিলেন; কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কারণে। বেকন জেলে গেছেন ঘুষ খাওয়ার অপরাধে, মূর গিয়েছিলেন বিয়ের ব্যাপারে রাজার অবৈধ পদক্ষেপকে সমর্থন না করার কারণে। একজন বৈষয়িক, অন্যজন নীতিবাদী। জেল থেকে বেকন ছাড়া পেয়েছেন, জেলের ভিতরেই হত্যা করা হয়েছে টমাস মূরকে। টমাস মূর ছিলেন স্থূল ভোগবিলাসের বিরুদ্ধে। যেমনটা আমরা পেয়েছিলাম আর্নেস্তো চে গুয়েভারা আর কর্নেল তাহেরের মধ্যে।

ইংরেজ কথাকার ড্যানিয়েল ডিফোর ১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে লেখা ‘রবিনসন ক্রুশো’ একটি কল্পকাহিনী, কিন্তু ক্রশোর সেই দ্বীপটি কোনো আদর্শ জগৎ নয়। পিউরিটোনের মনোবল ও ইংরেজের বুদ্ধি-বিবেচনা থাকলে বৈরী পরিবেশেও কেমন যে, শেকস্পীয়রের ১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে লেখা ‘দি টেমপেস্ট’ নাটকে বন্য ক্যালিবান যেমন হিংস্র, রবিনসনের দ্বীপের বন্য ফ্রাইডে মানুষখোকো হয়েও হিংস্র নয়। ফ্রাইডে ইংরেজদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে অতিউৎসাহে ইংরেজি ভাষা শেখে, এবং জন্মগত ঐতিহ্য ভেঙে পুঁজির শাসনে ইংরেজ হয়ে ওঠে। পরে পুঁজি যখন দুরন্ত হয়ে পড়ে বন্যকে তখন বন্য তো নয়ই, বরং মনে করা হয় বন্ধু ও পরামর্শদাতা। ঠিক এমনই আমরা দেখি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতায়। বলতে হয় কোলরিজ ওয়ার্ডসওয়ার্থের তুলনায় বাস্তববাদী ছিলেন। কোলরিজ প্রকৃতিতে প্রত্তাবর্তনকে আদর্শায়িত করতে পারেন নি। কোলরিজ আমেরিকার নির্জন একটি জায়গায় গিয়ে নতুন এক সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন ‘প্যান্টিসোক্রেসি’, সে হবে এমন একটি সমাজ যেখানে সব মানুষের থাকবে সমান অধিকার। ব্যক্তিগত সম্পত্তি রেখেই সমান অধিকার গড়ে উঠবে সকলের। কোলরিজ ভেবেছিলেন তাঁর সৃষ্ট সমাজে দৈনিক বাধ্যতামূলক সবাইকে দুই ঘণ্টা করে কাজ করতে হবে, অতিরিক্ত যে যতোটা শ্রম দিবে ততোটাই অতিরিক্ত সম্পত্তি পাবে সে। কিন্তু মুস্কিল বাঁধলো ওইখানেই। কারো সম্পদ বেশি হয়ে যেতো, কারোটা কম, এবং যাদের বেশি আছে তারা কর্তৃত্ব করতো কম সম্পদশালীদের ওপর। কোলরিজ তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন অচিরেই, তাই ত্যাগ করেছিলেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বজায় রেখে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ার চিন্তা। এইসব ঐতিহাসিক দিকগুলোকে পর্যালোচনা করে কর্নেল তাহের চেয়েছিলেন ব্যক্তিগত সম্পদবিহীন একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা। বুর্জোয়ারা ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে মেনে নেয়, কেনোনা এ তাদের স্বার্থে যায়, সর্বহারারা তা মানে না, কেনোনা এ তাদের স্বার্থবিরোধী। চূড়ান্ত সংগ্রামে সাম্যবাদীরা জয়ী হবে এবং তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ব্যবস্থাটিই সমূলে ধ্বংস করবে, এই ছিলো কর্নেল তাহেরের লক্ষ্য।

মার্কসবাদ পৃথিবীকে শুধু বুঝতে নয়, আমূল বদলাতেও চায় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। শেকস্পীয়রের ‘দি টেমপেস্ট’ নাটকের ভাববাদী স্বাপ্নিক গঞ্জালো এমন একটি ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখে যেখানে বিবাদ থাকবে না, থাকবে শুধু শান্তি, ওই ব্যবস্থাটাকে অত্যন্ত অবাস্তব মনে হয়, কেনোনা ওই নাটকই প্রমাণ করেছে, ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতা। মার্কসবাদ ওই বাস্তবতাকে যাদুর সাহায্যে বদলে দেবে না, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বদলে দিয়ে মানুষের সমাজ গড়ে তুলবে। কর্নেল তাহেরের ভাবনাও ছিলো মানুষের সমাজ গড়ার ভাবনা।

এটা সত্য যে মার্কস রাষ্ট্র সম্পর্কে ততোটা লেখেননি যতোটা অর্থনীতি সম্পর্কে লিখেছেন, কিন্তু তার মধ্যেও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট। অবশ্য এই বক্তব্য ক্রমান্বয়ে স্পষ্টতর হয়েছে, অভিজ্ঞতার কারণে। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে মার্কস ও এঙ্গেলস যৌথভাবে লিখেছেন, আধুনিক রাষ্ট্রের মূলকথা হচ্ছে বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রকে চূর্ণ করা ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির কোনোও উপায় নেই।

ফ্যাসিজমের আসল শত্রু পুঁজিবাদ নয়, তার আসল শত্রু সমাজতন্ত্র। এর বড় প্রমাণ শ্রমিক শ্রেণীকে নির্যাতনের যন্ত্র রাষ্ট্রকে যে আরো বেশি ভয়ঙ্কর করে তোলে তার উদাহরণ। উদারনীতি চায় রাষ্ট্রকে দারোয়ান করে রাখবে, ফ্যাসিবাদ চায় রাষ্ট্রকে দৈত্যে পরিণত করে। মুসোলিনী বলতেন, তাঁর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে শ্রদ্ধা, রক্ষা ও সম্প্রসারিত করা। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে মুসোলিনীর নেতৃত্ব দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ফ্যাসিবাদকে চিনতে তাঁর একটুও কষ্ট হয়নি, তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরোধীতা করেছেন, এবং সমাজকে রাষ্ট্রের ওপর গুরুত্ব দেবেন ভেবেছেন। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র ছিলো ওপরে, যে বাস্তবতা তাঁর ‘রক্ত করবী’ ও ‘তাসের দেশে’ অবগুণ্ঠিত থাকে নি।

বাট্রান্ড রাসেল তাঁর বইতে একটি চীনের একটি গল্পের কথা বলেছেন। সেই গল্পে এক বৃদ্ধাকে দেখা গেলো বনে বসবাস করছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তিনি সেখানে কেনো, যেখানে বাঘ থাকে? জবাবে বৃদ্ধা বলেছেন, তা থাকুক, সেখানে তো রাজা নেই। রাজা তথা রাষ্ট্র ওই রকমই ভয়ঙ্কর। এই সত্যটা অস্পষ্ট করে রাখার নানা ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু যাঁরা মানুষের মুক্তি চান তাঁদের পক্ষে এই সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে যাবার কোনো উপায় নেই। কর্নেল তাহেরও এই সত্যটিকে অনুধাবন করেছিলেন।

যখন বিপ্লব ঘটেছিলো রাশিয়াতে তখন সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের অসামান্য বিপ্লবী নারী রোজা লুকজেমবুর্গ, জার্মান রাষ্ট্রীয় বর্বরেরা তৎকালীন সোভিয়েত শাসক স্ট্যালিনের প্ররোচনায় যাঁকে আটকাবস্থায় হত্যা করেছিলো নির্মমভাবে, লেনিনের যিনি একই সঙ্গে বন্ধু ও সমালোচক ছিলেন, তিনি কারাগারে বসে বিপ্লবের সংবাদ শুনে বড়ই আশাবাদী হয়েছিলেন, কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন আমলাতান্ত্রিকতার বিপদ ও স্বতঃস্ফূর্ততার প্রয়োজন সম্পর্কে। লেনিন বিপ্লব সম্ভব করলেন পার্টিতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি প্রতিষ্ঠা করে। রোজা লুকজেমবুর্গ ও ট্রট্স্কি যেমনটা আশঙ্কা করেছিলেন তেমনটিই ঘটলো, আমজনতার একনায়কত্ব প্রথমে পার্টিতে পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে আরো পরে তা সাধারণ সম্পাদক স্ট্যালিনের একনায়কত্ব হয়ে দাঁড়ালো। বিপদটি লেনিন নিজেই দেখে গেলেন। দেখা যাচ্ছে যে, সমগ্র লেনিন রচনাবলীতে প্রায় তিনশত বার আমলাতন্ত্রের প্রসঙ্গ এসেছে, এর মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগই ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের পরের লেখা। বাকি এক ভাগ ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বের। লেনিনের স্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, স্ট্যালিনের আমলে বেঁচে থাকলে লেনিনকে কারাগারে যেতে হতো। ট্রট্স্কি পালিয়েছিলেন কিন্তু বাঁচতে পারেননি, স্ট্যালিনের গুপ্ত ঘাতক হত্যা করেছিলো কমিউনিস্ট বিশ্বের এই তাত্ত্বিক নেতাকে।

ট্রট্স্কি যে সর্বাংশে নির্ভুল ছিলেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, স্ট্যালিন ট্রট্স্কির সঙ্গে বিরোধকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু মার্কসবাদী আন্দোলনে এই অত্যন্ত মেধাবী এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের বিপ্লবী তাত্ত্বিক ট্রট্স্কির অবদান উপেক্ষণীয় নয়। ট্রট্স্কি বিশ্বাস করতেন অব্যাহত বিপ্লবে। ট্রট্স্কি অব্যাহত বিপ্লবের তত্ত্বকে আরো স্পষ্ট এবং রুশ বিপ্লবের পটভূমিতে তা যে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ট্রট্স্কির মতে অব্যাহত বিপ্লব কখনোই সংস্কারে সন্তুষ্ট নয়। একটি দুটি সংস্কার কিংবা বিজয়ের পর তা থেমে যাবে না, চলবে যতক্ষণ না সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পূর্ণ হচ্ছে, কেবল যে এক দেশে বিপ্লব করবে তা নয়, সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে, বিপ্লব সংঘটিত করবে। বলা বাহুল্য, লেনিনও তাই মনে করতেন। মার্কসবাদ শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী, তার মৌলিক প্রত্যয় এই যে, বিপ্লব পৃথিবীময় ঘটবে। রাশিয়ায় তাই সূত্রপাত ঘটানো হলো, অন্যত্র ছড়িয়ে দেবার জন্য। স্ট্যালিন অবিবেচকের মতোই এই তত্ত্বকে ভিন্ন রকম মনে করতেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লোভে।

কিন্তু বিপ্লব শুধু সোভিয়েত রাশিয়াতেই হলো, অন্য দেশে হলো না। স্ট্যালিনের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে পুঁজিবাদী বিশ্ব একজোট হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইলো। এক দেশের বিপ্লব অন্য অনেক দেশের শ্রমজীবী রাষ্ট্রের সমর্থন না পেয়ে বিপন্ন হবে বলে যে আশঙ্কা ট্রট্স্কি করেছিলেন বাস্তবে তাই সত্য প্রমাণিত হলো। হিটলার আক্রমণ করলো সোভিয়েত ইউনিয়নকে। ক্রুশ্চেভ স্ট্যালিনকে আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু নিজেও তিনি আমলাই ছিলেন একজন, তাঁর সেই আক্রমণে আমলাতন্ত্রই শক্তিশালী হয়েছে, দুর্বল না হয়ে। পার্টির অভ্যন্তরে সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে প্যারী কমিউনের পতন ঘটেছিলো, ওই দুর্বলতার সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে এখনও ব্যর্থতা কার্যকর রয়েছে।

হত্যার রাজনীতি কিছু ব্যক্তিকে সরাতে পারে ঠিকই, তাঁর আদর্শ কিংবা দেখিয়ে যাওয়া পথ থেকে মুক্তিকামী মানুষকে সরাতে পারে না। আজ এই মাটিতে স্বাধীন বাঙলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্মমভাবে হত্যা করে কর্নেল তাহেরকে, হত্যা করা পর্যন্তই নিষ্ঠুর ওই শাসকের সফলতা; মুক্তিকামী মানুষকে সরাতে পারেনি কর্নেল তাহেরের আদর্শ থেকে। বরং কর্নেল তাহেরের আদর্শ দীর্ঘ হতে হতে আজ ৫৬ হাজার বর্গমাইলকে আজ গিলে ফেলেছে।

অসাধারণ সাহস ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতার গুণ নিয়ে, এই বাঙলায় দুজন পুরুষ এসেছিলেন, সুভাষ বসু ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, একজন সরাসরি বিপ্লবী আরেকজন ট্রট্স্কির মতোই মার্কসবাদী তাত্ত্বিক। দুজন দু’ পথে গেছেন, কিন্তু দুজনই চেয়েছিলেন শোষকের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষকে মুক্ত করবেন। ইতিবাচক দিক থেকে দুজনের ঐক্য ছিলো আরো এক জায়গায়। উভয়ের ভেতরই ছিলো শৃঙ্খল ভাঙার দৃঢ় প্রত্যয়।

সুভাষ বসু অনেক দিক দিয়েই তাঁর শ্রেণীর মানুষ নন; শ্রেণীচ্যুতই বলা যায় তাঁকে। তিনি বিলেতে গিয়ে আই.সি.এস পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছেন, কিন্তু চাকরিতে যোগ দেন নি। স্বপ্ন ছিল দেশকে স্বাধীন করবেন। তিনি সম্মত হননি শৃঙ্খলাবদ্ধ ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে প্রবেশ করতে। সুভাষ শুধু যে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন তা নয়, রাষ্ট্রীয় মুক্তির মতো সামাজিক মুক্তিও লক্ষ্য ছিলো তাঁর। গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন, কিন্তু গান্ধীর নোংরা রাজনীতি বুঝতে পারেন নি, পরে বুঝতে পেরে গান্ধীর নোংরা রাজনীতিকে পরিত্যাগ পর্যন্ত করেছেন। গান্ধীর অরাজনৈতিক সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিক স্বরাজ সাধনাকে তাঁর কাছে কেবল দুর্বোধ্য বলে মনে হয়েছে। অসহযোগ আন্দোলনের ব্যর্থতার কথা বলেছিলেন সুভাষ। কিন্তু অসাধারণ সুভাষ বসুও যে তাঁর শ্রেণীরই মানুষ সেটা প্রকাশ পায় যখন তিনি সমাজতন্ত্রের প্রসঙ্গে কথা বলেন তখন। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লিখেছিলেন :
সব কিছু বিবেচনা করে দেখলে এই মতই পোষণ করতে হয় যে বিশ্ব-ইতিহাসের পর্যায়ে কম্যুনিজম ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে একটি সমন্বয়ের সৃষ্টি হবে; এবং সমন্বয় যদি ভারতেরই সৃষ্টি হয় তাহলে বিষ্ময়ের কি আছে? কমিউনিস্টরা জাতীয়তাবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, অথচ ভারতীয় আন্দোলন একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-ভারতবাসীর জাতীয় মুক্তির আন্দোলন। রাশিয়া এখন আত্মরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করেছে এবং বিশ্ব-বিপ্লব গড়ে তোলার ব্যাপারে আগ্রহ তার সামান্যই। কম্যুনিজমের অর্থনৈতিক মতবাদের অনেক কিছুই যেমন ভারতবাসীদের হৃদয়ে বিশেষভাবে সাড়া জাগাবে, অপরপক্ষে এমন অন্যান্য মত আছে যাতে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হবে। বস্তুবাদিতা ভারত নেবে না। অর্থনীতিরও অনেক কিছু নেবে না।

লক্ষ্য করবার বিষয় যে, সুভাষ বসুর দৃষ্টি খুব স্বচ্ছ। রাশিয়ার আত্মরক্ষামূলক ভূমিকার তাৎপর্য তাঁর কাছে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দেই স্পষ্ট ছিল, যা অন্যদের কাছে স্পষ্ট হতে অনেক সময় নিয়েছিলো। আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো তিনি যে কেবল আপোসের কথাই বলেছেন তা নয়, ওই প্রসঙ্গেই ওই আপসবাদকে ‘সাম্যবাদও’ বলেছেন, এবং তাকে জাতীয়তাবাদ বলে অভিহিত করেছেন। ঠিক ওই সময়েই হিটলার জার্মানীতে জাতীয় সমাজতন্ত্রের বাণী প্রচার করে ফ্যাসিবাদকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।

অবশ্য তিন বছর পরে লন্ডনে রজনিপাম দত্তের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সুভাষ স্বীকার করেছিলেন যে, ‘আপসের’ কথাটা বলা ঠিক হয়নি। তবে তিনি এও যোগ করেছিলেন :
‘আমি একথাও বলতে চাই যে, ভারতবর্ষে যারা কমিউনিজমের পথযাত্রী তাদের একটি বড় অংশ কমিউনিজমের যে রূপ প্রদর্শন করেন, তা জাতীয়তাবাদবিরোধী বলেই আমার ধারণা।’
তাঁর সমস্ত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আবেগ ও নতুন সমাজ গড়ার অনুপ্রেরণা সত্ত্বেও সুভাষ বসু যদি না পারেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে, তাহলে তো বুঝতে কোনো অসুবিধাই হয় না যে, শ্রেণীর নিঃশ্ব ও শান্ত শাসন আসলেই কতো প্রবল।

এর বাইরেও এই ভূখণ্ডে বিপ্লব এসেছিলো, আর সেই মানুষের সৃষ্ট বিপ্লবকে কিছু কতিপয় মানুষ প্রতিবিপ্লবের ধাক্কায় ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো তবে সেই সব বিপ্লবীদের আদর্শ বুকে ধারণ করে এখনো তরুণ প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। আর আমরা তার যোগ্য উত্তরসূরী, এই উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন ক্ষুদিরামের মতো বিপ্লবী, ক্ষুদিরামকে দিয়েই ব্রিটিশ শাসকেরা এই ভূখ-ে শুরু করেন রাজনৈতিক হত্যাকা- আর সেই হত্যাকাণ্ডের সমাপ্তি ঘটে স্বাধীন বাঙলাদেশে কর্নেল তাহের হত্যাকা-ের মাধ্যমে। কর্নেল তাহের তাঁর বিপ্লবী কর্মের ভূমিকায় লিখেছিলেন :
‘শুধুমাত্র নেতৃত্বের পরিবর্তনের জন্যে আমাদের এই বিপ্লব নয়, আমরা শোষিত শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমরা বিপ্লব করছি দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য।’

এরই ধারাবাহিকতায় সমাজবিপ্লবের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছিলেন কর্নেল তাহের। পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্তির অব্যাবহিত পরেই বুর্জোয়াদের যাতাকলে পিষ্ঠ হতে থাকে এই দেশ। এরই মধ্যে ১৯৭৫ সলের ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে একদল সেনা অফিসার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করেন সপরিবারে। সেই হত্যাকাণ্ডে সমর্থন ছিলো পাকিস্তান, চীন ও মার্কিন মুল্লুকের। এইসব সেনা অফিসারদের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কথা ছিলো না, তাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি তাদের শাসন। হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে সেনাবাহিনীর একটি অংশ যারা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। ১৯৭৫ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ডটি শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মন্ত্রে ঘটেছিলো, আর এই হত্যাকা- দুইটি ঘটিয়েছিলো ক্ষমতালোভী ষড়যন্ত্রকারীরা। যারা মার্কিন মদদপুষ্ট। এই দুইটি হত্যাকা-ের সাথে সাধারণ সেনাসদস্যদের কোনো সম্পর্ক ছিলো না। আর এখানেই কর্নেল তাহেরের ৭ নভেম্বরের তৃতীয় অভ্যুত্থানটির পার্থক্য। তাহেরের চিন্তা ও বাস্তবচর্চার দিক থেকে উভয় বিবেচনায় ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান ছিলো সিপাহীদের বিদ্রোহ, এটি এমন এক বিদ্রোহ যেই বিদ্রোহ অন্য অনেক কিছুর সাথে সেনাবাহিনীর অফিসারদের বিধিবহির্ভূত সুযোগ-সুবিধা বিলোপের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিলো। কর্নেল তাহের এই বিদ্রোহের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন সিপাহী বিদ্রোহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তাহেরের লেখেছিলেন :
সেদিন (৩ নভেম্বর ১৯৭৫) বেশ কিছু সিপাহী, এনসিও ও জেসিও আমার নারায়ণগঞ্জের বাসায় এসে হাজির হন। তাদের সবার সাথে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না, কেবল তাদের কয়েকজনের সাথে আমি আমার শোবার ঘরে কথা বলেছিলাম। তাদেরকে শান্ত থাকতে ও সৈন্যদের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে পরিস্থিতি সম্পর্কে সবার মতামত জানার জন্য পরামর্শ দেই। এ ছাড়া আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্নকারী যে কোন ধরণের তৎপরতার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে বলে দেই। আমি তাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলাম, সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যের কর্তব্য হলো সীমান্ত রক্ষা এবং প্রজাতন্ত্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা। আমাদের মত সমাজে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে নাক গলানো সশস্ত্র বাহিনীর কর্তব্য নয়। অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মূলে রয়েছে উচ্চাভিলাষী অফিসারদের ক্ষমতা দখলের দ্বন্দ্ব।

এসব অফিসার তাদের নিজ স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। আর তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তারা সাধারণ সৈন্যদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। দেশ কিভাবে পরিচালিত হবে তার চূড়ান্ত রায় দেবার মালিক হচ্ছে জনসাধারণ। আমি সৈন্যদের আরো বললাম কোন অবস্থাতেই তারা যেন নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি শুরু না করে। আমি তাদের বরং ব্যারাকে ফিরে যেতে বললাম। জনমানুষের সাথে সংহতি প্রকাশের প্রয়োজনে যে কোন মুহূর্তে একসাথে আঘাত হানবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ক্ষমতালোভী সামরিক ব্যক্তিদের উচ্চাভিলাষ গুড়িয়ে দেবার এটাই ছিল একমাত্র পথ।

১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম স্বধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব এবং ১৯৭৪ সালে পর্তুগালের স্বৈরাচারের পতন ঘটানো সেনা বিদ্রোহ তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছে। তাই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এই তৃতীয় অভ্যুত্থানের সাথে পূর্বের ঘটে যাওয়া দুইটি অভ্যুত্থানের বিভেদরেখা টানতে হবে। ৭ নভেম্বর-এর বিদ্রোহ ছিলো শোষিত শ্রেণীর উৎসবের দিন, ৭ নভেম্বর-এর এই অভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক সিপাহীরা অংশগ্রহণ করেছিলো।
যেভাবে কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী জীবনের শুরু, তাহের ক্যাপ্টেন থেকে মেজর পদে পদন্নতি পেলেন। ছুটিতে ঢাকা এসে ছোটো ভাই আনোয়ার হোসেন (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য)-এর মাধ্যমে সিরাজ শিকদার প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাঙলা শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেন তাহের। ঢাকার কলাবাগানে সংগঠনের কর্মীদের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম সংগঠিত করার জন্য তাহের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। কিছুদিন পরেই সিরাজ শিকদারের সাথে মতবিরোধ শুরু হয় কর্নেল তাহেরের।

এরপর তাহের সামরিক শাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্রলীগের কর্মীদের ও নিজের ভাইদেরকে গেরিলাযুদ্ধ ও বিস্ফোরক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর পূর্বে এরাই ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মীদেরকে কয়েক হাজার মলোটভ ককটেল ও হ্যান্ড গ্রেনেড সরবরাহ করেন। স্পেশাল এলিট কমান্ডো গ্রুপের কমান্ডার হন কর্নেল তাহের।

বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার খসড়া সংবিধান এবং বিপ্লবের স্তর চিহ্নিত করে রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণে ‘খসড়া থিসিস’ প্রণয়নের জন্য ‘জাসদ’ জাতীয় কমিটির বর্ধিত সভায় ৩২ সদস্যের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। তাহের সমন্বয় কমিটির অন্যতম কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২৭ জুন এই ‘খসড়া থিসিস’ প্রকাশিত হয়।

১৯৭৫ সালে বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার সশস্ত্র সংগঠন ‘বিপ্লবী গণবাহিনী ‘Revolutionary People’s Army’ গঠন করেন কর্নেল তাহের। কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ প্রত্যেক শাখা কমান্ডে একজন করে কমান্ডার ও একজন রাজনৈতিক কর্মীকে নিয়োগ প্রদান করেন তাহের। কেন্দ্রীয় কমান্ডের সর্বাধিনায়ক হন কর্নেল তাহের, উপ-সর্বাধিনায়ক হাসানুল হক ইনু (বর্তমান তথ্যমন্ত্রী)। ঢাকা নগর গণবাহিনীর অধিনায়ক হন কর্নেল তাহেরের ছোটভাই আনোয়ার হোসেন (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য)। গণবাহিনীর শাখা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে গঠিত হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের সংগঠকদের দ্বারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয়, বাঁচার কোনো উপায় না পেয়ে নিজের প্রাণভিক্ষা চেয়ে জিয়া টেলিফোন করেন কর্নেল তাহেরের কাছে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা কর্নেল তাহেরকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ধ্যায় ঢাকায় নিয়ে আসেন।

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাহেরের সাথে বৈঠকে বসে, নির্দেশনা নিয়ে আবার সেনানিবাসে যায়। জরুরি স্থায়ী কমিটি করণীয় নির্ধারণে বৈঠক অব্যাহত রাখে। ঢাকা সেনানিবাসের সর্বত্র বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রচারপত্র বিলি করার ব্যবস্থা করেন তাহের। জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এই ঘটনায়।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রকৌশলী আনোয়ার সিদ্দিকীর গুলশানের বাসভবনে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর প্রায় ৭০ জন প্রতিনিধির আলোচনায় সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তাব করা হয়। রাতে তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী পার্টি প্রক্রিয়ার জরুরি স্থায়ী কমিটি সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। ঢাকা নগর গণবাহিনীর সকল শাখাকে সিপাহীদের সাথে জনগণের সমন্বয় করার নির্দেশ দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতাকে সমাবেশ করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিপ্লবী গণবাহিনী ঢাকা নগর শাখার বিশেষ টিমকে ভ্রাম্যমাণ প্রচার ও সমন্বয় করার দায়িত্ব প্রদান করেন তাহের ওই বৈঠকে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীর উদ্যোগে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী জনতার রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান সম্পন্ন হয়। শেষ রাতে বাঙলাদেশ বেতারে বিপ্লবী গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেয়া হয়। ওই অভ্যুত্থানেই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়। এদিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সিপাহী, ছাত্র-জনতার মিলন মেলা শুরু হয়, ঠিক সকাল ১১টায় খন্দকার মোশতাক-রশিদ-ফারুকের সমর্থক সৈন্যরা গুলিবর্ষণ করে শহীদ মিনারের সমাবেশ সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্টে জিয়া ও তার পারিষদদের সাথে কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু ও ড. আখলাকের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সকল গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠনের জন্য জাসদ ও গণবাহিনী নেতৃবৃন্দের প্রস্তাব রাখা হয়। সন্ধ্যায় জিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার বেতার ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণের পূর্বে বেতার ভবনে বিপ্লবী সৈনিকদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও ১২ দফা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ ও তা মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন জিয়া।

১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর বিকেলে ঢাকার বায়তুল মোকাররমে জাসদের জনসভায় বিশ্বাসঘাতক জিয়ার হুকুমে পুলিশ প্রথমে বাধা দেয়, পরে বঙ্গবন্ধুর ঘাতক ফারুক-রশীদের সেনাদলের অতর্কিত গুলিবর্ষণে ছাত্রনেতা আ ফ ম মাহবুবুল হক গুরুতর আহত হয়, পরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হস্তক্ষেপে জনসভা সম্পন্ন হয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে জিয়ার সাথে বৈঠকে বসার জন্য জাসদ ও গণবাহিনী নেতৃবৃন্দ জিয়ার কাছে প্রস্তাব রাখেন। জিয়া সারা দেননি সেই প্রস্তাবে।

১৯৭৫ সালের ১২ থেকে ২২ নভেম্বর, এই ১০ দিনের মধ্যেই সিপাহী গণঅভ্যুত্থানের সাথে জিয়ার বিশ্বাসঘাতকতা ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর জাসদ নেতা মেজর (অ.) এম এ জলিল, আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু, আবু ইউসুফ খান (বীর বিক্রম), কে বি এম মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করা হয় জিয়ার হুকুমে। এরই মধ্যে জাসদের সাথে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেন বিশ্বাসঘাতক জিয়া রহমান।
১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটরের বাসা থেকে কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করে সরাসরি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কিছু দিনের মধ্যেই জিয়ার নির্দেশে দ্রুত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন সেলে বন্দি করে রাখা হয় জিয়ার জীবনদাতা এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাকে।

১৯৭৬ সালের ২২ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হেলিকপ্টারে করে তাহেরকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। ১৯৭৬ সালের ১৫ জুন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল ইউসুফ হায়দারকে চেয়ারম্যান করে ১নং বিশেষ সামরিক আইন আদালত গঠনের সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়। কর্নেল তাহেরসহ ৩৩ জন অভিযুক্ত, এর মধ্যে ২২ জন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ওই দিনই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান কারাগারে তাহেরের সাথে দেখা করেন। ১৫ তারিখ ঘোষণা দেয়া হলেও ওই সামরিক আদালত আরো আগে থেকেই প্রস্তুত করা হচ্ছিলো। ১৯৭৬ সালের ২১ জুন ১নং বিশেষ সামরিক আইন আদালতের প্রথম অধিবেশন শরু করা হয়।

১৯৭৬ সালের ২৮ জুন সামরিক আদালতের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়। কারাগারে বিচারানুষ্ঠানের জন্য প্রবেশরত প্রধান অভিযোগকারী এ টি এম আফজাল, বিচারক কর্নেল ইউসুফ হায়দারসহ অন্যান্যদের ছবি তোলায় রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ-এর ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ফিল্ম নষ্ট করে ফেলে ও লিফশুলৎজ’ কে, গ্রেফতার করে তিন দিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এরপর জিয়ার নির্দেশে তাঁকে বাঙলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুন থেকে ৮ জুলাই রাজসাক্ষী ও সরকারি সাক্ষীদের বক্তব্য প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১১ থেকে ১৪ জুলাই অভিযুক্তদের জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। ১২ জুলাই অনেক বাধা-বিপত্তির মাঝেও কর্নেল তাহের একটানা ৬ ঘন্টা বক্তব্য রাখেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই কর্নেল ইউসুফ হায়দার গোপন সামরিক আদালতের পক্ষে রায় ঘোষণা করেন, আবু তাহেরের মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্য সহবন্দীদের দীর্ঘমেয়াদী কারাদ- প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোর চারটায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চে কর্নেল আবু তাহের (বীরউত্তম)’কে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৭৬ সালের ১ জুলাই ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অবৈধভাবে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডকে বৈধতা দানের জন্য আইন মন্ত্রণালয় তাহের হত্যার ১০ দিন পরে সামরিক আইনের ২০তম সংশোধনী জারি করে।

সময় কাটতে থাকে দ্রুত, আসে সেই মহেন্দ্রক্ষণ ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট উচ্চ আদালত সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরই মাধ্যমে সূচনা হয় কর্নেল তাহের হত্যার বিচার প্রার্থনার সাংবিধানিক অধিকার। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা’র বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামাতের পক্ষ থেকে আপীল করা হলে সুপ্রীম কোর্ট তা খারিজ দেন। ২০১০ সালের ২৩ আগস্ট ড. মো. আনোয়ার হোসেন, লুৎফা তাহের ও ফাতেমা ইউসুফ-এর পক্ষে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক কর্তৃক দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী এবং বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি আদেশে কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসি ও গোপন বিচারের সব নথি হাইকোর্টে তলব করেন। একই সাথে তাহেরের ফাঁসির আদেশকে কেনো অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা তিন সপ্তাহের মধ্যে জানাতে সরকারকে নির্দেশ দেন।

২০১০ সালের ২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ কর্তৃক রিট শুনানি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ২০১০ সালের ১৩ ডিসেম্বর সরকারের আবেদনে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়। ১০ জানুয়ারি থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘ শুনানি হয়। শুনানি চলাকালে হাসানুল হক ইনু, মেজর জিয়াউদ্দিন, মাহামুদুর রহমান মান্না, সার্জেন্ট রফিকুল ইসলাম (বীরপ্রতীক), কর্পোরাল শামসুল হক, এডভোকেট রবিউল আলম, হাবিলদার আব্দুল হাই আদালতে বক্তব্য প্রদান করেন। রিট আবেদনকারী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন সম্পূরক রিট আবেদনের উপর আদালতে বক্তব্য প্রদান করেন।

তাহেরের মৃত্যুদ- কার্যকরকালে উপস্থিত সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট ফজলুর রহমান আদালতেকে জানান, ফাঁসির পূর্ব মুহূর্তে তাহেরের সর্বশেষ কথা ছিল ‘Long live my Country men’ ঢাকার উপ-কমিশনার মো. মজিবুল হককে আদালতে তলব করা হয়। ‘পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তাদের চাপে জিয়া তাহেরকে সরিয়ে দেন’। ব্যারিস্টার মওদুদের লেখা বইয়ের উদ্ধৃত অংশের ব্যাখ্যা আদালত লেখকের কাছে জানতে চান। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ই-মেইলে পাঠানো বার্তায় জিয়ার ডানহাত হিসেবে পরিচিতি জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু আদালতকে জানান যে, তাহেরের গোপন বিচার পরিকল্পনা করেন তিনজন জিয়া-সায়েম-সাত্তার। বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ আদালতে উপস্থিত হয়ে তাঁর দীর্ঘ জবানবন্দীতে জানান, ‘গোপন আদালতের বিচারে তাহেরের মৃত্যুদণ্ড একটি ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে জড়িত একজনের নাম বলতে বলা হলে, তিনি হলেন জিয়াউর রহমান।’

অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে অভিমত দেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমির-উল ইসলাম, ড. এম জহির, এডভোকেট এম আই ফারুকী, ব্যারিস্টার আখতার ইমাম, এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু, এডভোকেট এ এফ এম মেজবাহ উদ্দিন এবং এডভোকেট জেড আই খান পান্না। ড. শাহদীন মালিক এবং ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ রিট আবেদনকারীদের পক্ষে এবং এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এম কে রহমান ও ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এবিএম আলতাফ হোসেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন।

২০১১ সালের ২২ মার্চ ইতিহাসের দায়মুক্তির দিন আদালত রায় প্রদান করেন ‘তাহেরের বিচার অবৈধ’ এবং তাকে ‘ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। তাহেরকে শহীদ এবং মহান দেশপ্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করা হয় রায়ে। সহ-অভিযুক্তদের সকল সাজা মওকুফ করে তাদের যথাযোগ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বলা হয় রাষ্ট্রকে। জেনারেল জিয়াকে দায়ী করা হয় হত্যাকাণ্ডের জন্য। একমাত্র জীবিত ট্রাইব্যুনাল সদস্য আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয় হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে।

Comments

আনিস রায়হান এর ছবি
 

বিশাল লেখা। এখনো পড়তেছি...

_______________________________________
চেয়ারম্যান মাওয়ের তিনটি রচনা পড়ুন-
_______________________________________
'জনগণের সেবা করুন'
'যে বোকা বুড়ো পাহাড় সরিয়েছিলেন'
'মানুষের নির্ভুল চিন্তাধারা কোথা থেকে আসে'

 
লালু কসাই এর ছবি
 

প্রিয়তে নিলাম।

চমৎকার লেখা :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

...........................................................
ধর্ম যার যার কাছে রাষ্ট্রের কী করার আছে?

 
নুর নবী দুলাল এর ছবি
 

:থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:
চমৎকার লেখা। প্রথমে সাইজ দেখে সাহস করি নাই। শুরু করার পর নিমিষেই শেষ করে ফেললাম। শেয়ার দিলাম।

 
পথচারী এর ছবি
 

BAH , TUMAR BIPLOBI LEKHOK HAWAI UCIT COMRADE !! INFORMATIVE N COMPARISION WITHIN DA HISTORY , ALL THESE FACTS R MATUREDLY WRITTEN COMRADE !! CARRY ON !!

 
বোহেমিয়ান টিউন এর ছবি
 

পড়তে ম্যালা টাইম লাগছে । শেষ পর্যন্ত সময়ের অপচয় হয় নাই ।

-----------------------------
রাজাকারকে না বলুন

 
ব্রহ্মপুত্র এর ছবি
 

চমৎকার লেখা

 
রাহাত মুস্তাফিজ এর ছবি
 

পরে পড়বো । প্রিয় তে নিয়ে রাখলাম ।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রুদ্র সাইফুল
রুদ্র সাইফুল এর ছবি
Offline
Last seen: 5 years 2 months ago
Joined: মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী 19, 2013 - 3:25পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর