নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

আমার ক্লাসমেট মৃত্তিকার জীবনের গল্প !


চাকুরিতে ঢোকার আগে একটা ব্যবসার কাজে নিয়মিত চীন যেতাম আমি। রুটটি ছিল ঢাকা থেকে বিমানে হংকং। তারপর হংকং-র ‘উ-লুন’ ট্রেন স্টেশন থেকে হেঁটে সরাসরি চীনের ‘সেনঝেন’। অনেকবার এ রুটে চলাচল করেছি। একবার সখ হলো হংকং এর পাশের পর্তুগিজ দ্বীপ ‘ম্যাকাও’ যাবো। শুনেছি ভোগবাদ, আনন্দময়তা আর জুয়ার আর সেক্সের হাঁট এই ‘ম্যাকাও’। জুয়া খেলতে নয়, ভোগের জন্য নয়, দেখার আনন্দের সাধ নিতে যাওয়ার প্লান করলাম ঐ দ্বীপদেশে। নানাবিধ খোঁজ শেষে ‘কাউলুন’ থেকে ‘ম্যাকাও’-এর সমুদ্র কাঁপানো দ্রুতগামি জাহাজ ‘টার্বো ক্যাটে’ উঠলাম একদিন। চারদিকে নানাবিধ ছোট ছোট পাহাড়ি সবুজ দ্বীপ ঘেষে ঝড়ের বেগে ছুটে চললো টার্বোজেট। শেষে চীনের ‘সানিয়াও’ পাহাড়ি দ্বীপ ঘেষে অবশেষে ম্যাকাও ঘাটে ভিড়লো অত্যাধুনিক টার্বোজেট। জাহাজঘাটতো নয় যেন অত্যাধুনিক কোন বিমানবন্দর। মন জুড়িয়ে গেল ঘাটে জাহাজ ভেড়া, যাত্রী ওঠানামা, টিকেটিং, তল্লাসি ইত্যাদির মনোমুগ্ধকর ব্যবস্থা দেখে।
:
নেমে পাসপোর্টে সিল করিয়ে বাইরে বের হওয়া মাত্রই অনেক লাস্যময়ী ‘ললনা’ জানতে চাইলো কোথায় যাবো, কি-কি দেখবো, কি খাবো, কতক্ষণ থাকবো, ফ্লাট লাগবে কিনা ইত্যাদি? গাড়িসহ গাইড লাগবে কিনা এমনসব প্রস্তাবও দিলো তারা। আমি সবাইকে ‘না’ বলে সামনে হেঁটে যাচ্ছি পার্কের দিকে। প্লান পার্কে কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিয়ে তারপর একটু ঘুরে রাতের আগেই ম্যাকাও ছাড়বো। কারণ এ মায়াবি দ্বীপে নাকি কোন নারীর পাল্লায় পড়লে সব খুইয়ে ফিরে যেতে হবে হংকংয়ে। সুতরাং ভয় কাজ করছিল মনের ভেতর। কাছের ‘চই-কউ’ পার্ক এলাকায় একটা গাইড খুলে ম্যাকাওয়ের ম্যাপ দেখছিলাম, এমন সময় ভারতীয় চেহারার এক ললনা জানতে চাইলো আমি ইন্ডিয়ান কিনা? না তাকিয়েই বললাম, ‘না ভারতের পাশের দেশ বাংলাদেশের’। সহাস্যে নারী হাত বাড়িয়ে দিলো হ্যান্ডশেক করতে। বললো, ‘তার বাড়িও বাংলাদেশে ছিল একদিন, এখন ম্যাকাওয়ের নাগরিক’। একই কথা বললো, ঘন মেকাপে ঢাকা লাস্যময়ী এ রমণি। গাড়ি, গাইড, থাকা, মনোরঞ্জন কিসের ‘হেলপ’ চাই আমার? ইংরেজি বাংলা মিশ্রিত কথা শুনে ভাল করে এবার মুখের দিকে তাকালাম মেয়েটির। ‘রিতা’ নাম বললো সে তার। কিন্তু মুখটি আমার খুব পরিচিত মনে হলো। গভীরতায় তাকিয়ে খুব আগ্রহে বললাম, তোমাকে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। তুমি কি ইন্টারে ‘চট্টগ্রাম কলেজে’ পড়তে আমার সাথে ঐ ইয়ারে? এবার মুখ ঘুরিয়ে ‘সরি’ বলে চলে যেতে চাইলো মেয়েটি। মানে পরিচিত হয়ে যা্চ্ছে বিধায় সে থাকতে চাইলো না আমার কাছে। নিজের গাড়িতে গিয়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলো এবার। আমি দৌঁড়ে সামনে গিয়ে বললাল, তুমি ‘রিতা’ নও, তুমি ‘মৃত্তিকা’ তাইনা? তোমার ক্লাসমেটের সাথে দেখা প্রায় পনের বছর পর, আর তাকে ফেলে চলে যাবে তুমি? এবার মৃত্তিকা নামলো গাড়ি থেকে। বাক রুদ্ধ করলো সে! চোখ কিছুটা ভিজিয়ে বললো, এ অবস্থায় এক পরিচিত বন্ধুর সামনে দাঁড়াই কিভাবে বাঙালি মেয়ে হয়ে? বললাল, আজ না হয় বিজনেস নাই করলে। ম্যাকাও আসা স্বার্থক হয়েছে আমার তোমায় দেখে! অন্তত তোমার জীবনকথা শুনিয়ে দাও আমায় সারা দুপুর। বিকেলে আমি চলে গেলে তোমার বিজনেস শুরু করো আবার।
:
আমার অনুরোধে মৃত্তিকা লাঞ্চ করলো আমার সাথে। আমার অনেক পীড়াপীড়ির পরও মৃত্তিকাই বিল দিলো শেষাবধি। বললো, আমি এখানে ভাল টাকা আয় করি! তাই পুরণো ক্লাসমেটকে একদিন খাওয়াতে ভাল লাগবে আমার! ঐ দিন মৃত্তিকা তার বিজনেস মাটি করে সারা ম্যাকাও ঘুরালো আমায় নিজেই ড্রাইভ করে তার লেক্সাস গাড়িতে। সি-বিচে বসলাম দুজনে অনেকক্ষণ। শেষে মৃত্তিকার ফ্লাটে যেতে চাইলাম আমি। বললো, আমার সম্পর্কে যে শ্রদ্ধাটুকু বাকি আছে তোমার, তা কি শেষ করতো চাও আমার ফ্লাটে গিয়ে? বললাল, শেষ হবেনা! চলো ফ্লাটে যাই! দুবছর একসাথে চট্টগ্রাম কলেজে পড়ুয়া ক্লাসমেট মৃত্তিকা অবশেষে নিজের ফ্লাটে নিলো আমায়। চৌদ্দতলার উপরে সুন্দর সাজানো ফ্লাট কিন্তু পুরুষ আর নারীর নানাবিধ অশ্লীল ছবিতে নিপুণতায় সাজানো পুরো ঘরটি। বুঝলাম, মৃত্তিকা ‘সেক্সওয়ার্কার’ হিসেবে কাজ করে ম্যাকাও-এ। বললাল, ‘কবে এলে কেন এলে কিভাবে এলে এ পেশায়'? অনেকক্ষণ ধরে যা বললো মৃত্তিকা তার মর্মার্থ হচ্ছে, অনন্য সুন্দরী হিসেবে ইন্টার পরীক্ষার পরই বিয়ে হয়েছিল চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর সাথে। স্বামীর সাথে প্রায়ই হংকং যাতায়াত ছিল মৃত্তিকার। এক সময় স্বামীর নির্দেশে বড় ব্যবসায়ীদের মনোরঞ্জন করতে হতো বাধ্য হয়েছিল মৃত্তিকা ঢাকা আর হংকংএ। এক সময় ম্যাকাও নিয়ে আসে তার ব্যবসায়ী স্বামী। মৃত্তিকার শরীর বিক্রি করে অর্থ কামাতে চায় সে। এমনটি সেক্স র‍্যাকেট গ্রুপের সাথে সংযুক্তি করাতে চায় তাকে। উপায়ান্তর না দেখে চলে যায় ঢাকা সে। এ ইস্যুতে শেষে স্বামীকে ডিভোর্স দেয় সে। মৃত্তিকারো সখ ছিল বড় হওয়া, অর্থবিত্ত কামানো। দেশে কোন সুবিধা করতে না পারাতে নিজেই এক সময় একাকি চলে আসে ম্যাকাও। অন্য এক ভারতীয় নারীর সহায়তায় ফ্লাট ভাড়া নিয়ে নিজে এ পেশা গ্রহণ করে। তারমতো এ ভবনের সবাই একাকি এমন পেশায় নিয়োজিত। সবাইকে নাগরিকত্ব দিয়েছে ম্যাকাও সরকার। সরকার খুব সহযোগিতা করে তাদের। বিনিময়ে সরকারকে মোটা ট্যাক্স দিতে হয় তাদের।
:
মৃ্ত্তিকার পরিবারকে জানতাম না আমি, কেবল ক্লাসমেট হিসেবে পরিচিত ছিল কলেজেই। তারপরো সে অনুরোধ করলো, তার পরিবার যেন একথা না জানে কখনোই। প্রতিশ্রুতি দিলাম কখনোই জানবে না এ কথা। তারপরো বললাম, ম্যাকাওয়ের স্বাধীন নাগরিক সে। কে কি জানলো তাতে কিই বা আসে যায় তার? সন্ধ্যার প্রাক্কালে নিজেই ড্রাইভ করে ছাড়তে এলো আমায় বোট জেটিতে। ইমিগ্রেশনে ঢোকার আগে দুজনে কফিশপে শেষবার কফি খেলাম। এবার বিল দিতে পারলাম আমি। শেষ হাত মেলালাম মৃত্তিকার সাথে! বললাল গুড বাই রিতা, গুড বাই! এতোক্ষণ মৃত্তিকা বলছিলাম, এবার রিতা বলাতে সম্ভবত আঘাত পেলো সে। বললো, রিতা ডেকেই গেলে শেষ পর্যন্ত আমায়? চোখ অশ্রুসজল হলো তার। মনে মনে বললাল, মৃত্তিতা কেন তবে রিতা হলে তুমি? কিন্তু মুখে তা আনতে পারলাম না আমি! দীর্ঘ মানুষের কিউতে চলে আসতে হলো আমায় ইমিগ্রেশন কাউন্টারে।
:
সন্ধ্যা সাতটায় লালনীল স্বর্ণোজ্জ্বল দীপামালার রঙিন স্বপ্নময় ম্যাকাও ছাড়ে আমাদের টার্বোজেটে। এ ভোগবাদি জীবন পরিত্যক্ত পোতাশ্রয়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রান্ত বিভ্রমে রিতারূপী মৃত্তিকাকে দেখতে পাই আমি! যার বুকের গভীরে বাজে ব্যথার নীলসমুদ্র হয়তো। সময়ের পেন্ডুলামে যে ঝুলে পড়েছে ভোগবাদি এক অনন্তের জীবনে। জলকেটে বোট যতই এগুতে থাকে রিতার দেশ থেকে দূরে, মৃত্তিকার ক্রণিক বাণিজ্যিক রাতের ব্যথাতুর মুখটা ততই ভেসে ওঠে আমার চোখে। ভোগ্য জীবনের স্রোতে বৃত্তবন্দী মৃত্তিকা কি বুঝতে পারে, কি এক পৌরাণিক হাতকড়া পরেছে অপেক্ষাতুর সময়ে রিতা! যে চিনেছে ভোগবাদ আর অর্থকে!
:
অন্ধকার জলকেটে মৃতকল্প মাছের মত এগুতে থাকে টার্বোজেট জীবনের গতিময়তা নিয়ে। মহাকাশের পারিজাত মেঘেরাও ভেসে চলে আকাশসমুদ্রে আমাদের সাথে একই জীবনচক্রে। ধবল আকাশ লীনতায় আমি ম্যাকাও দ্বীপে ফেলে আসা পাথরের প্রাণমাঝে জীবনবৃক্ষের বল্কল পরা মৃত্তিকাকে দেখি, যে একদিন ফিরে আসবে তার দেশের সোমত্ত স্বপ্নময় আকাশমাটিতে! বিবসন ত্বকে! আর সবুজ ঘাসফড়িং মাঝে! কাউলুনের স্বর্গোজ্জ্বল আলোমালা দৃষ্টিবিভ্রমে পরে আমার কিন্তু কবে শোনা কোন এক কাব্যিকতা রাঙিয়ে দেয় আমার মন মৃ্ত্তিকার জন্যে কি এক দুখযন্ত্রণায় - “কবে পাবো? কবে পাবো আল্-হীন একখণ্ড মানবজমিন? পরবাস থাকবে না, থাকবে না দূরত্বের এই রীতিনীতি! মহুয়ার মদ খেয়ে মত্ত হয়ে থাকা সেই পার্বনের তিথি! কবে পাবো! কবে পাবো শর্তহীন আবাদের নির্বিরোধ ভালবাসাময় দিনগুলো? কবে পাবো আদিনিবাসে শিশিরভেজা হিজলবনের ভেজা মৃত্তিকা!

Comments

মাহের ইসলাম এর ছবি
 

গল্প ভালো লেগেছে, তবে মৃত্তিকার জন্যে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

জি ভাই, সত্যি ঘটনা তাই আমারো খারাপ লেগেছে আপনার মত। মানবিক মানুষ আপনি তাই ধন্যবাদ ভাই!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 4 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর