নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

শিডিউল

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মারুফুর রহমান খান
  • নরসুন্দর মানুষ
  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ
  • শহিদুল নাঈম

আপনি এখানে

বিষাক্ত রাজনীতি:- দশম পর্ব-



মুম্বাই বিস্ফোরণের এই তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে থাকে দাউদ ইব্রাহিম, টাইগার মেমন ও ডি কোম্পানির সঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়ায় আর একটি নাম উঠে আসে; আর এই নামটি নিয়েই পরবর্তীকালে দেশ জোড়া বিতর্ক শুরু হয়। বিতর্ক শুরু হয় আদেও এই মানুষটি মুম্বাই বিস্ফোরণে যুক্ত ছিলেন কি না? মুম্বাই বিস্ফোরণের অন্যতম বহু চর্চিত সেই ব্যাক্তিত্বটি হলেন- ইয়াকুব মেমন।

ক্রিকেটার পিতা আব্দুল রাজ্জাক মেমনের তৃতীয় সন্তান ছিলেন ইয়াকুব মেমন। ইয়াকুব নিজের পাঁচ ভাইবোনের সঙ্গে বড় হয়। মেমন পরিবারের সবচেয়ে উচ্চ শিক্ষিত সদস্য ছিলেন ইয়াকুব মেমন। ইয়াকুব মেমনের ছেলেবেলা থেকেই অঙ্ক ভালো লাগত। শেষ পর্যন্ত 1990 সালে ইয়াকুব মেমন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হয়ে যান। 1991 সালে বাল্যবন্ধু চেতন মেহেতার সঙ্গে 'মেমন অ্যান্ড মেহতা অ্যাসোসিয়েটস' নামে এক ফার্ম খোলেন, তবে এই ফার্ম বেশিদিন চলেনি 1992 সালে এই ফার্ম বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় আর একটি ফার্ম খোলা হয় 'এ আর অ্যান্ড সান্স'; ঠিক এই সময় ভাই আয়ুব মেমনের সঙ্গে 'তিজারাত ইন্টারন্যাশনাল' নামে এক ফার্ম খোলেন এই ফার্মের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মাংস রপ্তানি করা হত। যদিও এই ব্যবসাটি পরবর্তীকালে পারিবারিক ব্যবসায় রূপান্তরিত হয় এবং পরে টাইগার মেমন ও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়। আস্তে আস্তে ইয়াকুব মেমনের ব্যবসায় শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। ঠিক এই সময় বাবরি কান্ড সংঘটিত হয়, এরপর মুম্বাইয়ে দাঙ্গা শুরু হয় এবং মেমন পরিবারের অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। যার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুম্বাই বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করা হয়।

ইয়াকুব মেমনের প্রতি অভিযোগ ছিল, তিনি মুম্বাই বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের লেনদেন করেন। ইয়াকুব মেমন যেহেতু চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন তাই পরিবারের সমস্ত আর্থিক লেনদেন ও ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট ইয়াকুব মেমনই দেখাশোনা করত। অভিযোগ আসে পরিবারের বিভিন্ন এনআরআই (NRI) অ্যাকাউন্টে বিদেশ থেকে প্রচুর অর্থ আসে যা ইয়াকুব মেমন বিস্ফোরণে কাজে লাগায়। এছাড়া বিস্ফোরণে ব্যবহৃত গাড়ি গুলি কেনার ক্ষেত্রেও ইয়াকুবের হাত আছে। ইয়াকুব মেমনের প্রতি আরও অভিযোগ- 'যে পনেরো জন ছেলে মুম্বাই থেকে দুবাই হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিল বিস্ফোরণের ট্রেনিং নিতে, তাদের টিকিটের ব্যবস্থা ও ইয়াকুব মেমন করে'। আর 12ই মার্চ 1993 মুম্বাইয়ে বম বিস্ফোরণ হয়; তার আগেই ইয়াকুব মেমন ও তার পরিবার পাকিস্তানে চলে যায় এবং বেশকিছু দিন সেখানেই থাকে।

কিন্তু পরবর্তীকালে ইয়াকুব মেমনের মনে হয় নির্দোষ মানুষদের হত্যা খুবই দুঃখজনক ঘটনা এবং এটা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না। তাঁর আরও মনে হয় এটি দেশের সঙ্গে প্রতারণা এবং মেমন পরিবারের জন্য কলঙ্ক। তাই 1994 সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে ইয়াকুব মেমন আত্মসমর্পণ করেন। যদিও ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থাগুলি দাবি করে ইয়াকুব মেমনকে তারা গ্রেপ্তার করেছে। পরবর্তীকালে ইয়াকুব মেমন তদন্ত প্রক্রিয়ায় পরিপূর্ণ সহযোগিতা করেন। ইয়াকুব মেমনের কাছ থেকেই জানা যায় এই বিস্ফোরণে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এর হাত আছে। আইএসআই এর প্রত্যক্ষ মদতেই এই বিস্ফোরণ সম্ভব হয়। প্রকৃতপক্ষে ইয়াকুব মেমন না সহযোগিতা করলে এটা কখনোই প্রমাণিত করা যেত না এই বিস্ফোরণের পেছনে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর মদত আছে। ইয়াকুব মেমন তদন্তকারী আধিকারিকের জানান- 'এই বিস্ফোরণে পাকিস্তানি ডন তৈফিক জালিওয়ালা, টাইগার মেমন, দাউদ ইব্রাহিম এরা যুক্ত ছিল কিন্তু তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না'। বিস্ফোরণের পরই তিনি সব জানতে পেরেছিলেন। ইয়াকুব মেমন এতটা সহযোগিতা করেছিল যে তার ইন্টারভিউ সংবাদ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি এভাবে সংবাদ মাধ্যমে ইন্টারভিউয়ের আকারে নিজের কথা প্রকাশিত করেছে কি না সঠিক জানা নেই; তবে এথেকেই বোঝা যায় ইয়াকুব মেমনের কথায় ভারত সরকারের কতটা সুবিধা হয়েছিল এবং জনগণ ইয়াকুবের কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছিল।

ইয়াকুব মেমনকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- আপনি ও টাইগার দুই ভাই একই ছাদের তলায় থাকেন এবং এত বড় একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে, অথচ আপনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এটা কি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়? ইয়াকুব মেমন প্রত্যুত্তরে বলেন- "সত্য কথাটি বলা আমি নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি; এবার দেশের মানুষ আমার কথায় বিশ্বাস করবে কি অবিশ্বাস করবে সেটা তাদের ব্যাপার"। ইয়াকুব মেমনের কথাতেই পাকিস্তান থেকে মেমন পরিবারের আটজন সদস্য দেশে ফিরে আসে। মেমন পরিবারের দাবি ছিল তিনি যদি মনে করতেন তাহলে পাকিস্তানেই সারাজীবন থেকে যেতে পারতেন। বস্তুত তিনি পাকিস্তানকে কোনদিনই নিজের দেশ বলে মনে করেন নি এবং টাইগারের কথায় তিনি পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। কোন দিন কোন দোষী নিজে থেকে কি আত্মসমর্পণ করে? ইয়াকুব মেমনের এই মামলার সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছিল না; তাই তিনি এই সৎসাহস দেখাতে পেরেছিলেন।

তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক দেখা যায় যখন ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সাজা কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেশের একশো জনের ও অধিক প্রথিতযশা ব্যাক্তিত্বরা ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সাজা মুকুব করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন জানায়। তাঁদের যুক্তি ছিল-
1. ইয়াকুব মেমন কুড়ি বছরের ও অধিক সময় জেলে বন্দি তাই তার ফাঁসির সাজা কোন মতেই যুক্তিযুক্ত নয়। ফাঁসির সাজা কার্যকর হওয়া মনে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া যা কোন মতেই কাম্য নয়।
2. ইয়াকুব মেমন মানসিক দিক থেকে অসুস্থ।
3. ইয়াকুব মেমন মুম্বাই বিস্ফোরণের অন্যতম রাজসাক্ষী।
4. ইয়াকুব মেমন মুখ্য ষড়যন্ত্রকারী নয়।
5. ফাঁসি রোকা উচিত কারণ ইয়াকুব মেমন ক্ষমার যোগ্য।
সেই সঙ্গে ইয়াকুব মেমনের পরিবারের আবেদন ছিল; শেষ পর্যন্ত ইয়াকুবকে আমৃত্যু কারাদন্ডে দন্ডিত করা হোক কিন্তু ফাঁসি কোন মতেই যুক্তিযুক্ত নয়।

ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি মুকুবের আবেদন কারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম ছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি- জাস্টিস হারজিৎ সিং বেদী। জাস্টিস বেদী এক ইংরেজি দৈনিকে বলেন 'র' (RAW) এর পূর্ব আধিকারিক বি রমনের লেখাতে যে তথ্য পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টকে নিজে থেকেই তদন্ত করা উচিত। জাস্টিস বেদী আরও বলেন- "সুপ্রিম কোর্ট সহ পৃথিবীর সমস্ত আদালত এই বিষয়ে একমত যে, কোন বাদী কে ফাঁসি দেওয়ার আগে সেই কেস সম্বন্ধে সমস্ত তথ্য খুটিয়ে দেখা হয়। ইয়াকুব ও তার পরিবারের মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগকারী পক্ষ সব তথ্য সঠিক ভাবে আদালতের সামনে রাখেন নি। সরকারি উকিল ইয়াকুবকে ফাঁসি দিতে এত বেশি উৎসুক ছিল যে; সরকারি উকিল কোর্টকে একথা বলেন নি, তার সাজা দেওয়ার আগে এই তথ্যগুলির উপর নজর দেওয়া হোক। এই মামলায় এটা মনে হয় যে সরকার বা তার এজেন্সি হয়ত কোন কথা দিয়েছিল; যার ফলে ইয়াকুব গ্রেফতারের পর তদন্তকারী সংস্থা গুলিকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছে। আমি এটাকে এমনভাবে দেখতে চাই, এই প্রতিশ্রুতির আলোকে এই মামলার রায় দেওয়া উচিত"।

এছাড়া 'র' এর পূর্ব আধিকারিক বি রমন ইয়াকুবের ফাঁসির উপর প্রশ্ন তোলেন। বি রমন সেই টিমের সদস্য ছিলেন যারা নেপাল থেকে ইয়াকুব মেমনকে নিয়ে আসেন। বি রমন এর মৃত্যুর পর তাঁর লেখা rediff.com এ প্রকাশিত হয়। তিনি তাঁর লেখায় বলেন- "জুলাই 1994 সালে নেপাল পুলিশের সহযোগিতায় ইয়াকুব মেমনকে কাঠমান্ডু থেকে গ্রেফতার করা হয়। দেখানোর জন্য এটা বলা হয় যে মেমনের গ্রেফতারি দিল্লি থেকে হয়। আমি এটা জেনে খুব চিন্তিত ছিলাম যে অভিযোগকারী পক্ষ ইয়াকুব মেমন ও তার পরিবারকে করাচি থেকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কি পরিস্থিতির উপর দিয়ে চলেছিল সে বিষয়ে আদালতে কিছুই বলে নি। যা সাজা দেওয়ার সময় এই বিষয় গুলির গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে- ইয়াকুব মেমন মুম্বাই বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল; জুলাই 1994 সালের পূর্ব পর্যন্ত সে যা কিছু করেছিল তার জন্য তার ফাঁসি হওয়াই উচিত। তবে কাঠমান্ডু থেকে ধরার পর এবং পরবর্তিকালে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তার ফাঁসির সাজা নিয়ে পুনরায় চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। ইয়াকুব মেমন মুম্বাই বিস্ফোরণ মামলায় তদন্তকারী সংস্থা গুলিকে অনেক সহযোগিতা করে। সে মেমন পরিবারের অন্য সদস্যদের পাকিস্তান থেকে ভারতে ফিরিয়ে আনতে রাজি করে। ইয়াকুব মেমনের সহযোগিতার ফলে এটা জানা সম্ভব হয় যে এই মামলায় পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত"।

ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির সাজা মুকুব করার জন্য যে সমস্ত বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিলেন তাঁরা হলেন- সিপিএম নেতা প্রকাশ কারাট ও বৃন্দা কারাট, বিশিষ্ট আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, বিশিষ্ট সাংবাদিক পূণ্যপ্রশুন বাজপেয়ী, অভিনেতা সালমান খান সমেত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও প্রথিতযশা ব্যাক্তিত্বরা ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি রোখার আর্জি নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন জানায়। মামলার গুরুত্ব বিচার করে মধ্যরাত্রে সুপ্রিম কোর্টের অধিবেশন বসে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে মোট তিনবার মধ্য রাত্রে সুপ্রিম কোর্টের এজলাস বসে।

প্রথমবার:- কুখ্যাত ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিঠারি কান্ডের বিচার প্রক্রিয়ায়, 2014।

দ্বিতীয় বার:- ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির বিচারের জন্য 30 শে জুলাই 2015।

তৃতীয়বার:- হল সদ্যসমাপ্ত কর্ণাটক নির্বাচনে রাজ্যপাল বাজুভাই বালা বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী বিএস ইয়েদুরপ্পাকে সংখ্যা গরিষ্ঠতা প্রমাণ করার জন্য পনেরো দিন সময় দেওয়ার প্রতিবাদে কংগ্রেস ও ডেডিএসের আদালতে আবেদন;16 ই মে 2018। যদিও শেষ পর্যন্ত বিজেপি সংখ্যা গরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারেন নি এবং এইচ ডি কুমারস্বামীর নেতৃত্বে জেডিএস- কংগ্রেস জোট সরকার গঠন করেছে।

তাই সবদিক থেকে ইয়াকুব মেমনের মামলাটি ঐতিহাসিক মামলা বলা যেতে পারে। ভারতবর্ষের বিচার ব্যবস্থাকে এইজন্যই শ্রদ্ধা জানায় বিচারব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত মানুষের কথা বলার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করে। এই মামলাটি এই ঘটনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে। নির্ধারিত ফাঁসির দিন 30 শে জুলাই 2015, ওই দিন রাত্রি দুটোর সময় ইয়াকুব মেমনের আইনজীবী সুপ্রিমকোর্টে পৌঁছান শেষ চেষ্টাটি করার জন্য। প্রধান বিচারপতির বাসভবনে 4 নং কোর্টে শুনানি শুরু হয়। রাত 3:20 থেকে ভোর 4:50 পর্যন্ত প্রায় 90 মিনিট এই শুনানি চলে। উভয় পক্ষ নিজেদের আত্তপক্ষ সমর্থন করেন; শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট ইয়াকুব মেমনকে দোষী মনে করে ও ফাঁসির উপর স্থগিতাদেশ খারিজ করে দেয়। তার কিছুক্ষণ পর ওই দিন ভোরেই নাগপুর জেলে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি হয়।

ভারতীয় বিচারব্যবস্থাকে এই জন্য স্যালুট জানায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অভিযুক্তকে আত্তপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছিল। তবে বলাই বাহুল্য ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির পরেও তার ফাঁসি ঠিক ছিল কি না? এই বিতর্ক শেষ হয়ে যায় নি! ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির পর মুহূর্তেই মুম্বাই দাঙ্গা বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান জাস্টিস শ্রীকৃষ্ণা বলেন- "1993 এর বম বিস্ফোরণের তদন্ত করার জন্য পুলিশ যতটা সচেষ্ট হয় তা নিয়ে কোন সন্দেহ হতে পারে না; যদি একই তৎপরতা দাঙ্গায় দায়ী ব্যক্তিদের সাজা দিতে করা হত তাহলে ভালো হত। দুটিই অপরাধ এবং একটি অপরাধের জন্য অন্য অপরাধটি সংগঠিত হয়েছিল"।

ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির পর দেশজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একপক্ষ মুম্বাই বিস্ফোরণ মামলায় দোষীর শাস্তি হয়েছে এই মর্মে খুশি হয়েছিল। অন্যদিকে দেশের অপর এক বৃহৎ অংশ মনে করে ইয়াকুব যদি দোষী হয়েও থাকে, তাহলেও সে যেরকম সহযোগিতা ও ভাল ব্যবহার করেছিল এবং কুড়ি বছরের অধিক জেলে সাজা পাওয়ার পর তাঁর ফাঁসি কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়, সেক্ষেত্রে আসামীকে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়া হবে যা মোটেই কাম্য নয়।

তারই বর্হিপ্রকাশ দেখা যায় রোহিত ভেমুলার মৃত্যুতে। এই দলিত ছাত্রটি ও এদের ছাত্র সংগঠন ইয়াকুব মেমনের ফাঁসির বিরোধীতা করেছিল। হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রটি এবিভিপির নজরে পড়ে যায়। এবিভিপির কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোহিত ভেমুলা সহ তাঁর পাঁচ জন বন্ধুকে সাসপেন্ড করে ও মাসিক ফেলোশিপের পঁচিশ হাজার টাকা বন্ধ করে দেয়। নিম্নবিত্ত পরিবারের এই মেধাবী ছাত্রটির কাছে এই টাকাটি ছিল বড় সম্বল, স্বপ্নছিল পিএইডি সম্পন্ন করে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোঁটাবে। এবিভিপির চক্রান্তে তার কেরিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে আসে, মানসিক দিক থেকে ক্রমাগত তাঁকে বিধ্বস্ত করা হয়। যার ফল স্বরূপ 17 ই জানুয়ারী 2016 সালে রোহিত ভেমুলা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। যদিও পরিবার ও বন্ধুদের অনুমান এটা খুন ও হতে পারে তবে তা তদন্ত সাপেক্ষ বিষয়! এই ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধ হয়। দলিত নির্যাতন, সহিষ্ণুতা ও অসহিষ্ণুতা বিতর্ক আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। যতদূর মনে পড়ে পরবর্তীকালে রহিত ভেমুলার পরিবার এই হত্যার প্রতিবাদে হিন্দু ধর্ম থেকে বের হয়ে বৌদ্ব ধর্ম গ্রহণ করে।

তাই আজও বহু ভারতবাসী ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি ঠিক ভাবে মেনে নিতে পারেননি। এই ঘটনাটি অনেকটা তুলনীয় আর একটি বহু চর্চিত ফাঁসির মামলার সঙ্গে, সেই ফাঁসি হয়েছিল ধনঞ্জয়ের ফাঁসির সময়। ধনঞ্জয় এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিল; সে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে নিরাপত্তা রক্ষীর কাজ করত। তার উপর হেতাল পারেক নামে চোদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরীকে খুন ও ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। দীর্ঘ চোদ্দ বছর জেল খাটার পর 14 ই আগস্ট 2004 সালে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ধনঞ্জয়ের ফাঁসি হয়। ধনঞ্জয়ের ফাঁসির পর দীর্ঘ বারো বছর অনুসন্ধান চালিয়ে দেবাশিস সেনগুপ্ত ও প্রবাল মুখার্জি- 'আদালত, মিডিয়া, সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি' নামে এক বই লেখেন। এই বইয়ে লেখকদ্বয় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। যেমন- পুলিশের কাছে চার পাতার ইংরাজিতে লেখা ধনঞ্জয়ের স্বীকারোক্তি যেখানে ধনঞ্জয় লিখেছেন- " সোনালি লেডিস রিকো হাত ঘড়িটি যাহা আমি আনন্দ অ্যাপার্টমেন্টের 3A ফ্ল্যাট হইতে 5/3/1990 তারিখে চুরি করিয়া ছিলাম তাহা আমি আমাদের বাড়ির তাকে রাখিয়াছি। আমার জামা কাপড় যাহা পরিয়া আমি হেতাল পারেক কে খুন ও ধর্ষণ করিয়া ছিলাম, আমি বাড়ির আর একটি তাকে রাখিয়াছি। আমি সেই তাক দুটি ও জিনিসপত্র দেখাইয়া দেব"। তাহলে পাঠক বুঝতে পারছেন কি পুলিশের কি রকম অনুসন্ধান?

যে ধনঞ্জয় খুব অল্প শিক্ষিত ছিল সে ইংরাজিতে চিঠি লিখে এই ঘটনাটি বিবরণ দেবে তা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়? তাই লেখকদ্বয় তীর্যক মন্তব্য করে বলেন- "খুন আর রোজ রোজ হয় তাই ধনঞ্জয় খুনের ঘড়ি আর জামা কাপড় তাকে রেখেছিল"। লেখকদ্বয় আরও বলেন- "ধনঞ্জয় নিরাপরাধ এটা নিশ্চিত পুলিশ ভুল তথ্য দিয়ে ধনঞ্জয়ের ফাঁসি দেয়। এই ঘটনাটি অনার কিলিং ও হতে পারে। আশ্চর্য হল এই ঘটনায় বাড়ির কাউকে সন্দেহ করা হয়নি, তবে বাড়ি কারোর হাত থাকা অসম্ভব কিছু নয়। যে হেতাল পারেকের মা সর্বদা তার সঙ্গে ছিল তাকে পুলিশ ঠিকমতো জিজ্ঞাসাবাদ না করেই মুম্বাই চলে যাওয়ার অনুমতি দেয় কেন?" লেখকদ্বয়ের আবেদন ধনঞ্জয়ের মামলাটি যেন আবার পুনঃতদন্ত হোক।

তাই ধনঞ্জয় দোষী না নির্দোষ সে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে এটা মনে আছে এই ফাঁসি কার্যকর করার সময়ও তীব্র বিতর্ক হয়ে ছিল। একপক্ষ এই রায়কে স্বাগত জানালে ও সমাজের অন্য পক্ষ মনে করে দীর্ঘ চোদ্দ বছর কারাদন্ডের পর ফাঁসি দেওয়া চরম অন্যায়। যদিও বাসে, ট্রেনে, পথে ঘাটে বহু শ্রমজীবী মানুষ আজও মনে করে ধনঞ্জয়কে অন্যায় ভাবে ফাঁসানো হয়েছিল। বস্তুত অর্থবান মানুষদের কুকর্মের বোঝা ধনঞ্জয় বয়েছিল। তাই মাঠে ঘাটে এখনও একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে- "ধরলেই ধনঞ্জয়"। আসলে শ্রমজীবী মানুষদের সহানুভূতি এখনও ধনঞ্জয়ের প্রতি আছে। আর কুড়ি বছরের অধিক কারাদন্ডের পর ফাঁসির কারণে জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের মনে ইয়াকুব মেমনের প্রতিও সহানুভূতির ছাপ লক্ষ্য করা যায়।

সমাজ ব্যবস্থা বড়ই বিচিত্র বিষয় একটির সঙ্গে অপরটির যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়। নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র মতে- 'প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত মুখি প্রতিক্রিয়া আছে'। তাই বলা যায় একটি ক্রিয়া অপর একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাই রাজীব গান্ধী গান্ধীর নোংরা ধর্ম রাজনীতির ফলে পরবর্তী কালে সাহাবানু মামলা থেকে রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্কের নতুন করে সূত্রপাত হয়। আর এই সমস্যা বেড়ে বাবরি ধুলিষ্যাৎ হয়, এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুম্বাই সহ পুরো দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। ঠিক এই সময় মুম্বাইয়ের দাঙ্গা রোখার উদ্দেশ্যে অভিনেতা ও কংগ্রেস সাংসদ সুনীল দত্ত রাস্তায় নামেন। সুনীল দত্ত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে অনুরোধ করেন দাঙ্গা বন্ধ কারার জন্য। স্বভাবতই সুনীল দত্তের এই কাজ কট্টরপন্থীদের ভালো লাগেনি; কট্টরপন্থীরা সুনীল দত্তের ছেলে অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে ফোন করে এই মর্মে হুমকি দিতে থাকে যে তার বাবা ও পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়া হবে!

সঞ্জয় দত্ত যখন পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন এবং এই নিয়ে কি করা উচিত ভেবে পাচ্ছিল না, তখন তার বন্ধু ম্যাগনাম ভিডিও কোম্পানির মালিক সমির হিঙ্গোরা ও হানিফ কাড়াওয়ালাকে এই সমস্যা খুলে বলেন। এই সমির হিঙ্গোরা ও হানিফ কাড়াওয়ালার সম্পর্ক আগে থেকেই আন্ডারওয়াল্ডের সঙ্গে ছিল তা সঞ্জয় দত্ত জানতেন না। তারা উভয়ে পরামর্শ দেন পরিবারের আত্তরক্ষার্থে সঞ্জয়ের কাছে অস্ত্র রাখা প্রয়োজন, তাই এরা সঞ্জয় দত্তকে Ak- 56 ও অন্যান্য কিছু গোলাবারুদ দেয়। এই অস্ত্র ও গোলাবারুদ ডি কোম্পানি মুম্বাই বিস্ফোরণের জন্য এনেছিল যা সঞ্জয় দত্ত জানতো না। পরবর্তী কালে মুম্বাই বিস্ফোরণের পর এই অস্ত্র মামলায় সঞ্জয় দত্তের জীবনে বহু উত্থান পতন দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত টাডা মামলা থেকে সঞ্জয় দত্ত রেহাই পেলেও অস্ত্র মামলায় পাঁচ বছর জেল খেটে সঞ্জয় দত্ত এখন মুক্ত। তাই অজ্ঞানতা বশত হলেও মুম্বাই বিস্ফোরণ মামলার সঙ্গে সঞ্জয় দত্ত ও যুক্ত হয়ে যায়। তাই মনে হয় সাহাবানু মামলা, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, দাঙ্গা, বিস্ফোরণ সব একই সূত্রে গাঁথা; একটি ক্রিয়া অপরটির উদ্ভবের কারণ। তাবে বিষাক্ত রাজনীতির ছোবল এখনও শেষ হয়ে যায় নি! এই বিষাক্ত রাজনীতির বিষ ফল বাবরি মসজিদ ধুলিষ্যাৎ এর প্রভাব আজও আমাদের সমাজে বেশ ভালো ভাবেই অনুভূত হয়। যার সর্বশেষ তীব্র বিষাক্ত ছোবল দেখা যায় গুজরাটে!

চলবে...

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এবিপি নিউজ।
3. ইন্ডিয়া টিভি।
4. আজতক নিউজ।
5. এই সময়।
6. হেডলাইনস টুডে যা বর্তমানে ইন্ডিয়া টুডে।
7. ফাস্ট ট্রাক নিউজ।
8. তারা নিউজ।
9. নিউজ 24।
10. আদালত, মিডিয়া, সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি বই।
11. বিভিন্ন ধরণের ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্যসূত্র।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রক্তিম বিপ্লবী
রক্তিম বিপ্লবী এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 5 ঘন্টা ago
Joined: মঙ্গলবার, আগস্ট 29, 2017 - 3:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর