নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

দলিত মানুষের কুঁড়ে ও হজ্জের টাকা!



ঢাকা ভার্সিটিতে যখন শিক্ষার্থী আমি! ঐ সময় আমার প্রবাসি প্রকৌশলী ভাই দু'লাখ টাকা পাঠালো আমার কাছে। মাকে নিয়ে যেন হজ্জে যাই আমি। এ কারণে মুলত টাকাটা পাঠানো। মায়ের শর্ত আমাকে ছাড়া সে হজ্জে যাবেনা! তাই তাকে নিলে তার ছোট ছেলেকেও নিতে হবে সাথে। মার অনুগত ছেলে হিসেবে তাই আমাকেও 'আলহাজ্ব' বানাতে মনস্থির করলো আমার আপন ভাই। আমাদের আর কিছুই করতে হবেনা কেবল 'টিআর' ফরম পুরণ করে রোজার মাসে 'ওমরা ভিসা' লাগিয়ে জেদ্দা পৌঁছবো। সৌদি সরকারের উচ্চপদে কর্মরত ভাই তখন আমাদের রেখে দেবে নিজ বাসায়। আর মেডিকেলসহ নানা উপায়ে ভিসার মেয়াদ কবার বাড়িয়ে হজ্জ পর্যন্ত টেনে নেবে। এই ফাঁকে আমরা ঘুরে দেখবো ইসলামি দেশ সৌদি আরবে নবী-রাসুলদের সব ঐতিহাসিক স্থান। আর হজ্জ শেষে ফিরে আসবো দেশে। ভ্রমণপিয়াসি আমার কাছে প্রস্তাবটা পছন্দ হলো খুব। তাই মা আর আমার পাসপোর্ট বানাতে ঢাকা ছেড়ে চলে এলাম একদম গাঁয়ে মায়ের কাছে টাকাগুলো নিয়ে।
:
যখন পা দিলাম গাঁয়ে, পুরো দ্বীপগাঁ তখন বন্যার পানিতে জলমগ্ন। নিজেদের উঁচু ভিটির পুরণো বাড়ির উঠোন শুকনো থাকলেও, আশপাশের প্রায় সব বাড়িঘরই তখন অথৈ পানিতে থই-থই। দুপুরে কৈশোরিক বন্ধুদের ডেকে নৌকো ভাসালাম পাশের চরগুলোতো যেতে। যেখানের অধিকাংশ মানুষই জলে আটকা পড়েছে নিজ ঘরে ৩/৪ দিন থেকে। জলমগ্নতার কারণে ঐ বিচ্ছিন্ন জনপথগুলোর কোনটাতেই নামতে পারলাম না আমরা। কেবল নৌকো বেয়ে-বেয়ে ঐসব ঘরের ডুবন্ত উঠোন বা দরজায় নৌকো থেকেই কথা বললাম, আমার গাঁয়ের প্রাক্তন প্রতিবেশি জুলেখা, সাইফুল, মরিয়াম, নিরঞ্জন, সফিকুল্লাহ আর নবীনদের সাথে। সরকারি কোন সাহায্যহীন ওরা নিজ দরজায় আমাদের দেখে মিনতি ভরা চোখে চাইলো! আমরা কোন খাবার বা সাহায্য নিয়ে এসেছি কিনা এ প্রত্যাশায়! ঘরে জল ঢোকার কারণে প্রায় সবার চুলো আর রান্নার স্থান পানিতে ভরা। অনেকের সব কিছু ভিজে গেছে! তাই রান্না হয়নি ২/৩ দিন থেকেই। কেউ-কেউ নৌকোযোগে কিংবা সাঁতরে মূল উঁচু দ্বীপের বাজারে এসে রুটি, চিড়া বা এ জাতীয় খাবার কিছু কিনে নিয়েছে অভুক্ত সন্তান আর নারীদের জন্যে। পানিতে পুরো এলাকা একাকার হওয়াতে মাছধরা কিংবা কৃষি কাজও আপাতত বন্ধ। অনেকের ঘরেই সাপের আনাগোনা রাতে। তাই সারারাত কেবল কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে উপরে মাচায় বসে-বসে রাত কাটায় ওরা এক অমোঘ আতঙ্কে। কখন আবার সাপ উঠে আসে এ জলসড়ক বেয়ে ওদের ঘরে কিংবা টং ঘরের মাচায়!
:
সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব দেখে-দেখে মনটা দারুণ খারাপ হলো আমার। ঘরে ফিরে হজ্জের সব টাকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম বাজারের দিকে। রাত নটা পর্যন্ত বাজারের ছোট-ছোট সব দোকান ঘুরে-ঘুরে ম্যাচ, ক্যানডেল, আটার-রুটি, বিস্কুটের প্যাকেট, গ্রামীণ বেকারির বান, লাঠি-বিস্কুট, চিড়া, মুড়ি যা-যা পেলাম, কিনলাম যার দোকানে যা ছিল সবটুকুই। সাকুল্যে ৪৮,০০০ হাজার জিনিসপত্র কিনে এক দোকানে স্তুপ করে রেখে দিলাম তা। চারদিকে বর্ষাস্নাত এ রাতে সাপের কামড়ে মরি কিনা আমি! সে চিন্তনে মা উদগ্রীব হয়ে হ্যারিকেন নিয়ে খুঁজতে বের হয় আমায় আমাদের গরু-মহিষের রাখালদের নিয়ে। মাকে কিছু জানাই না আমি! কেবল বাজারে আড্ডার মিথ্যে কথা বলে যাই শুকনো মুখে। ঘরে ফিরে অনেকদিন পরও মায়ের হাতের মাছ-তরকারি রান্না ভাল লাগেনা আমার। কেবল দুধ আর বিচি-কলা মেখে সামান্য ভাত মুখে দিয়ে ঘুমুতো যাই আমি আমার দোতলা কাঠের ঘরের অনেক পুরণো নিজ গন্ধমাখা বিছানায়। অনেক রাত অবধি এপাশ-ওপাশ করতে থাকি নির্ঘুম চোখে! ভোর হওয়ার প্রত্যাশায়!
:
বিকেলে সব খবর কানে আসে মায়ের। বলে - "কত টাকা খরচ করেছিস হজ্জের টাকা থেকে"?
মাথা নিচু করে চোরের মত বলি - "পঞ্চাশ হাজারের মত, এখনো দেড়-লাখ আছে। মা তুমি একাই যাও। দাদাতো ওখানে আছেই। আমি বরং আমার ভাগের বাকি পঞ্চাশ হাজারের জিনিসপত্র কিনে আনি শহর থেকে ওদের জন্যে! আমি হজ্জে যাবোনা মা! ভাল লাগেনা এসব পরিচিত স্বজনদের না খেয়ে থাকা দেখে"!
মা জানতো আমায় আণুবীক্ষণিক যন্ত্রের মত! তাই কিছুই বললো না সে। অনেকক্ষণ করুণ চোখে তাকিয়ে থেকে বললেন - "টাকাটা দে আমার কাছে! না হলে বাকি টাকাটাও তুই ভেঙে ফেলবি"! ঐ বছর আর হজ্জে যাওয়া হলোনা আমাদের মা-ছেলের। প্রবাসি ভাইকে পত্র দিয়ে জানালাম - "মা কি কারণে যেন এ বছর যেতে চায়না! আগামি বছর যাবে ইনশাল্লাহ"! ভাই মন খারাপ করে বসে রইলো জেদ্দা শহরে মা আর আমাকে না দেখে!
:
ছদিন পর ঢাকাগামি লঞ্চে ফিরতে নদীর ঘাটে দাঁড়ালাম আবার মা-ছেলে। লঞ্চে ওঠার পূর্বক্ষণে মাকে জড়িয়ে বললাম
- "তোমার হজ্জে যাওয়া নষ্ট করেছি বলে রাগ করেছো মা"? চোখ ভিজিয়ে মা বললো
- "তোর সব কাজই ভালত্বে ভরপুর থাকে! তাই কখনো রাগ করিনা আমি। আমার আরেক ধার্মিক ছেলের টাকা না হলে, পুরো টাকাটাই দিয়ে দিতাম তোকে ঐ পূণ্য কাজে"!
আঙুল দিয়ে মাকে নদীর ওপারের জলমগ্ন চরে দেখাই জুলেখা, খালেক, মরিয়াম, কাজেম, নিরঞ্জন আর হারেসদের জল-থই-থই ডুবে যাওয়া বাড়িগুলোর একটু জেগে থাকা খড়ের চালা!
:
এ জলমগ্ন পথ চলার অনাদিকালের হৃদয়ঘন উৎস ভেঙে মা স্নেহাকুল শপথের ধ্বনিকে তুচ্ছ করে তাকায় আমার দিকে! আর ঐ ডুবে যাওয়া ঘরগুলোর দিকে! এ দলিত মানুষগুলোর বিপদপ্রাজ্ঞ বন্ধুরতার পিচ্ছিল পঙ্গিল পথের কষ্টধুলোরা আচ্ছন্ন করে আমাকে আর আমার মাকে! স্বর্ণাভ মেঘের পিঁড়িতে বসে উড়ে-উড়ে টাইটান গ্রহের জলপথ ভেঙে এবার লঞ্চ ভেড়ে আমাদের ঘাটে। প্রাক-পৌরাণিক মানবিক বোধের কষ্টরা উড়ে চলে মা, আমার, আর ঐ চরের জলমগ্ন মানুষগুলোর মাঝে। আচম্বিতে অযুত জীবনের ভাঁজে-ভাঁজে দ্রোহরা হাহাকার করার আগে লঞ্চের সিঁড়িতে পা রাখার আগেই মা বলে - "তুই যা ঢাকাতে। আজই বিকেলে যাবো আমি ঐ চরে ঐ মানুষদের পাশে"! এবার লঞ্চের সিঁড়ি উঠিয়ে ফেলে খালাসিরা। ঘাটে দাঁড়িয়ে মা তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। দোতলা ডেকে তখনো দু:খাতুর চাকার ঘূর্ণনের ভাঁজ-ফাঁকে কেঁদে মরা বহতা বাতাসগুলো বয়ে যায় অনাবিলতায়! আমার আর মার চুল ছুঁয়ে মেঘনার জলবাতাসে! যে বাতাসরা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে জুলেখা, খালেক, মরিয়াম, কাজেম, নিরঞ্জন, হারেস আর কতসব দলিত ভাসমান মানুষদের জীবনের গন্ধ !
:
চিৎকার করে বলি, "মা আমার ঢাকা যেতে ইচ্ছে করছে না! নেমে যাই? বিকেলে চরে যাবো তোমাকে নিয়ে"! মা আর সন্তানের জীবন বনের বিলুপ্ত বনস্পতি বৃক্ষের স্নিগ্ধ ছায়ায় হেঁটে যায় মা যেন! বলে, "তুই চলে যা বাবা তো ভার্সিটি জীবনে! ঠিকই তোর কাজ শেষ করবো আমি"! মার কথা কোনদিন নিষ্ফল হয়নি! তাই সুচিশুভ্র আগ্নেয় অনলে শুদ্ধ হয়ে পারিজাত প্রেমের মায়াবি কপাট খুলে চলে যাই আমি ঢাকার দিকে! আমি জানি মা ঠিকই যাবে ঐ চরে, ঐসব দরিদ্র মানুষের মাঝে! মার ভালবাসাপূর্ণ মননের সপ্তবর্ণা অন্তর্গত হৃদয়ের প্রেমঘাট ছেড়ে আমার লঞ্চ এগিয়ে যায় অনেক দূরে! তারপরো বহুক্ষণ আমি জলে ডোবা মৃত মানুষের খুলির ভেতরে যাপিত জীবনের মাছেদের মত চেয়ে থাকি, মা আর ডুবে যাওয়া ঐসব বাড়িগুলোর দিকে!

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 4 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর