নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

হিন্দু জগদীশ কাকা ও কুরবানী !


বিগত কুরবানীর ঈদের কদিন আগে আকস্মিক আমার ঢাকার ফ্লাটে উপস্থিত আমার গাঁয়ের সবচেয়ে বয়বৃদ্ধ দরিদ্র হিন্দু 'জগদীশ চন্দ্র নাথ'। তাকে হঠাৎ ঢাকাতে আমার ফ্লাটের সামনে দেখে বেশ বিস্মিত হয়ে বললাম -
-"কাকা, আ্পনি এখানে? কিভাবে, কেন এলেন"?
- "বাবা, তোমার কাছে একটু জরুরি মিনতি নিয়ে এসেছি। হয়তো তুমিই পারবে আমার জন্য এ কাজটি"!
- "কিন্তু কি কাজ কাকা, বুঝতে পারছিনা"!
কাকাকে হাত ধরে লিফটে উঠলাম ১০-তলা ফ্লাটে যেতে। প্রায় ৮০-বছরের কাকার ঘোলাটে চোখের দিকে চেয়ে খুব ভয় পেলাম আমি, সাথে মনটাও আকস্মিক খারাপ হলো। জানতে চাইলাম - "কাকা কোন বিপদ আপনার"? একটু জল গলায় ঢেলে কাকা বললো,
- "তোমার মামাতো ভাইকে একটু বলতে হবে, সে যেন আমার গরুটা এ ঈদে কুরবানী না দেয়। ওটা আমার মায়ের মত। অনেক যত্ন লালন করেছি আমি"।
নানা ভনিতায় বিরক্ত হয়ে আসল ঘটনা জানতে চাইলাম জগদীশ কাকার কাছে। প্রায় ঘন্টা ধরে অনেক কথা বললো সে, যার মর্মার্থ হচ্ছে -
প্রায় ১-মাস আগে সে তার দুধেল গরুটি বাছুরসহ বিক্রির জন্যে হাঁটে তুলেছিল মেয়ের বিয়ের ঋণ শোধ দিতে। বিক্রির এটাই একমাত্র শর্ত ছিলো 'এ গরুটাকে ক্রেতা জবাই বা কুরবানী করতে পারবেনা। কেবল দুধেল গাই হিসেবেই লালন পালন করবে আমৃত্যু'। এ শর্তে প্রকৃত দাম থেকে ৫-হাজার টাকাও কম নিয়েছিল বুড়ো জগদীশ। মামাতো ভাই আলমগীর দফাদার এ শর্ত মেনেই দুধ, বাছুরসহ কিনেছিল গরুটি। কিন্তু আসন্ন ঈদে সে কুরবানী করতে চায় মায়ের দৃষ্টিতে লালিত এ গরুটি। কারণ হিসেবে আলমগীর বলছে, জগদীশ প্রতারণা করেছে তার সাথে। প্রত্যহ সকাল বিকেল ৪-কেজি দুধ দেয়ার কথা থাকলেও, এখন ২-কেজির বেশি দুধ দেয়না গরুটি। তাই কুরবানী করে জগদীশকে শাস্তি দিতে চায় আলমগীর।
:
আমি সব শুনে করুণকণ্ঠে বললাম, "কাকা, আলমগীরকে তো চেনেন আপনি! সে কি আমার কথা শুনবে? আর তার কেনা গরু সে কুরবানী দিলে আমি কি করতে পারি"? অনেক দুর থেকে নানা পথ পাড়ি দিয়ে ৮০-বছরের বৃদ্ধ এসেছে আমার ঢাকার বাড়িতে এমন একটা মানবিক অনুরোধ নিয়ে। তাই নাস্তিকতা আর মুক্তচিন্তকের ধনুর্ভঙ্গ-পণে বসে থাকা চিরন্তন সময়কে পিছু ফেলে একটা ফোন করি আলমগীরকে তখনই। নদীভাঙন, দেশের রাজনীতি, জেলেদের ইলিশ আকাল, স্ত্রীর কোমড়ব্যথা জাতাীয় তার সপ্তপদি কথার পর গরুটার প্রসঙ্গ তুলি আমি। শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে নিজ মামার ছেলে আলমগীর। তুচ্ছ ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে, "ও মালাউন বুড়াডা গেছে তোর ওখানে? তোর সব কথা শুনতে রাজি আছি, তো এ কথাডা মানুম না। ঐ গাইটা কুরবানি দিমুই আমি। বুড়াডারে উচিত শিক্ষা দিমু"!
:
আলমগীরকে হাড়ে-হাড়ে চিনি আমি। অনেক কাজে অনেকবার সে ঠকিয়েছে আমায়। কোন মানুষের উপকার করেনা কোনদিন এ বদমাশ। বরং মানুষকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায় সে। এমন এক নবতর আনন্দ পেতেই সে খামোখা কষ্ট দিতে চায় ঈর্ষাকাতর সব অনিন্দিত পুরুষের জননাঙ্গের মত দৃঢ়তায়! ফোন শেষ হলে আশি বছরের পৌরাণিক হিন্দু কাকার প্রান্তিক মানবিক বোধগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে একবুক কষ্ট আঁকড়ে ধরে আমায়। তার শুকনো ঘোলাটে চোখ বেয়ে যখন নোনতা জল টুপ করে পড়ে আমার ড্রয়িং রুমের চকচকে গ্রানাইট টাইলসে, তখন বুকের ভেতরের সুপ্ত পাথরেরা ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে জেগে ওঠে এক দু:খবাতাসে! হাত ধরে কাকাকে বলি, "আপনি চলে যান কাকা। ঈদের আগে বাড়ি আসবো আমি। ওকে একটা বড় ষাঁড় বা মহিষ দিয়ে ওটা ফেরত আনতে পারবো। ও লোভী মানুষ ২০-হাজার টাকার এ গাইয়ের বদলে ৪০-হাজার টাকার জিনিস পেলে অবশ্যই আপনার গাই ফেরত দেবে সে"। ভালবাসায় দলিত সুতীব্র আর্তিতে ভরা মায়াবী চোখ মুছে বিদায় নেয় গাঁয়ের একমাত্র বুড়ো হিন্দু মানুষটি, যাকে কৈশোর থেকেই কাকা বলে ডাকি আমি।
:
কুরবানীর ছুটিতে কোলকাতা আর ভুটান ভ্রমণের ঘোরা বাদ দিয়ে ঈদের দুদিন আগে উপস্থিত হই দ্বীপগাঁয়ে। ৩/৪ বছর থেকে ঈদের ছুটিতে বিদেশ চলে যাই আমি, কারণ কুরবানীর পশুহত্যা আর রক্ত ভাললাগেনা আমার। কিন্তু এবার যেতে হলো গাঁয়ে জগদীশ কাকা আর আলমগীরের ঘটনা মিমাংসায়। কৈশোরিক বন্ধু জলিলকে নিয়ে ভোলার পাশের 'মনসার চরে' যাই আলমগীরের জন্যে ষাঁড় কিনতে। ঘাসপূর্ণ এ চারণভূমিতে অন্তত ১০/২০ হাজার টাকা কমে কেনা যায় গরু মহিষ। জলিল অনেক দরকষাকষি করে ৩৮,৫০০ টাকায় কিনতে পারলো এক বুনো ষাঁড়। দঁড়ি ধরার জন্যে রাখালকে দিতে হলো ৫০০ টাকা নগদ, আর একটা নতুন গামছা। ঢাকার বাজারের ৬০/৭০ হাজার টাকার ষাঁড় মনসার চরে ৩৮,৫০০ টাকায় কিনে বেশ খুশী মনে ট্রলারে উঠলাম আমরা ষাঁড়সহ। আমার সাথের জলিল বললো, "আপনের মামাতো ভাই এ তেল-তেইলা ষাঁড় দেখলে এখনই ঐ বুড়ার মরা গাই দিয়া দিবো বাছুর শুদ্ধা"।
:
কিন্তু আলমগীর কিছুতেই ঐ গাই দিতে রাজি হলোনা বাছুর ছাড়াও। ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত সে। কোন দরবেশ নাকি তাকে স্বপ্নে দেখিয়েছে, 'হিন্দুদের এ গোমাতা প্রথা ভাঙতে অবশ্যই ঐ গরুটাকে কুরবানী দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে সমাজে। না হলে 'কবিরাহ গুণাহ' হবে তার'। তাই ঐ ঘাটের মরা হিন্দু বুড়োর কাছে সমর্পণ না করে আল্লাহকে খুশী করতে চায় সে। এ ক্ষেত্রে নানাবাড়ির পরিচিত মসজিদের ইমাম বোঝালেন আমায় যে, "আলমগীর যা করছে তার পূর্ণ নির্দেশ আছে ইসলামে। বড়ই নেক আপনার মামাতো ভাইটা"। ঈদের দিন কুরবানীর আগে বাজারের পুলের উপর দেখা হলো আলমগীরের সাথে। হলুদ না মাজা দাঁত বের করে হেসে বললো, "তোর কেনা ষাঁড়টা জবরদস্ত হয়েছে রে বাই। তুইতো নাকি আর গরুর মাংস খাবিনা। তাই কুরবানী করে মাংসটা আমিই নিয়া যামু বাড়িতে কি কস? ফুফাতে ভাইর গরু"!
:
কুরবানী ! েই গোটা কুড়ি গরু, মহিষের সাথে জগদীশ কাকার গরুটাও কুরবানী হলো। এসব হত্যাদৃশ্য ভাল লাগেনা আমার। তাই মার কবর ছুঁয়ে বাতাসে মায়ের ঘ্রাণ নিয়ে একদম নদীর পাশে বসে রইলাম একাকি চুপচাপ। ঈদের দিন দুপুরে গাঁয়ের সব পুরুষ এখন ব্যস্ত রাস্তায় গরু-মহিষ কাটতে, আর ঘরের নারীরা চালের গুড়োর রুটি বানাতে। দুরের পালতোলা নৌকার সাথে ঢেউ গোনার প্রাক্কালে হঠাৎ দৌঁড়ে এলো জগদীশ কাকার নাতনি কাকনবালা। বললো আমাকে ডাকছে তাদের বাড়িতে। জগদীশের গরুটা কুরবানী করে ফেলেছে আলমগীর। কি বলবো তাকে গিয়ে! তাই বললাম তুমি যাও, আমি আসছি একটু পরে। কিন্তু গেলাম না আর কাছের জগদীশের হিন্দু বাড়িতে। ঠায় কাঠের গুড়ির মত বসে রইলাম জলঘেসে। একটু পর যখন ঐ বাড়ি থেকেই নারীদের কান্নার কোরাস ধ্বনি আসতে থাকলে, তখন না গিয়ে পারলাম না জগদীশের উঠোনে। সব শুনে দৌঁড়ে গেলাম জগদীশের বাড়ির একটু পশ্চিম দিকের বিলে। আরে কুরবানীর মাঠের পাশেই পড়ে রয়েছে জগদীশ কাকার নিথর দেহ। কুরবানীর কথা শুনে সবার নিষেধের পরও উনি এসেছিলেন নিজ গরুটির শেষ মৃত্যু দৃশ্যে দেখতে। কিন্তু ইমাম সাহেব যখন ছুড়ি চালালো 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনিতে, আকস্মিক পুরাণপুরুষের মত দৈবচয়নে নিজ শবাকুল দেহ আঁকড়ে ওখানেই পড়ে গেলো ক্ষীণকায় হাড়-জিরজিরে বুড়ো জগদীশ। আর চোখ খুললো না সে।এমন খুশীর দিনে এ অপয়া বিধর্মী বৃদ্ধের মৃত্যুতে অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করে স্থান ত্যাগ করলো দ্রুত।
:
এ গাঁয়ের ভুলে যাওয় ধুসরিত অনাদি বিষাদগাঁথার মত এক নিদাগ করুণতায় আমি চেয়ে থাকি বুড়ো জগদীশের দিকে। যেখানে হিমানী-বিজন কণ্টকে ভরা দু:খরা বয়ে যায় বৃক্ষবনের অমোঘ আতঙ্কে! আজ মা থাকলে হয়তো স্বয়ংবরা নারীর বোধির বীজ থেকে জেগে ওঠা চারায় মিমাংসিত হতো এ রক্তনদীর কান্না। মাহীন এ বাতাসে মানুষের বর্বর বোধ, অশুচি নারীর চিতার আগুনের মত কাঁদাতে থাকে আমায়! মানবিক বোধ আর ধৈর্যের ধূসরিমা জ্বলজ্বলে রোদ্দুরে পুড়ে-পুড়ে হেঁটে যাই আমি আবার নদীর কাছে। নদী ছাড়া কেউ আমার দু:খকে লীন করতে পারবেনা এখন আর! জীবনবিনাশী বাতাসের শো-শো ক্রন্দন ধ্বনিতে একবুক জলে নেমে ডুবে থাকি আমি আবক্ষ চাঁদ, জোৎস্না আর স্বাতি তারাভরা রাত অবধি। রাত গভীর হতে থাকলে জয় পরাজয়ের অতনু নারী কিংবা পাখিরা উড়ে যায় অন্ধকারে। তারপরো হারাণো মানুষের কণ্টকাবৃত বৃক্ষবনের কষ্টবাতাস বইতে থাকে জলনদীর এ অন্ধকার রাতে, আমার বোধ আর মননে !

Comments

পথচারী এর ছবি
 

সব হিন্দু দের বাংলাদেশ থেকে তাড়িয়ে দিন। এইসব গল্প পড়তেও খারাপ লাগে।

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 4 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর