নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মুফতি মাসুদ
  • নুর নবী দুলাল
  • আবীর নীল
  • নরসুন্দর মানুষ

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

বুদ্ধিবৃত্তির শ্রীবৃদ্ধি



স্পিনোজার পরের বই খুলে সূচনাতেই আমরা দেখতে পাই দার্শনিক সাহিত্যের অজানা খনির নতুন মনি। স্পিনোজা 'দ্য থিকস' বইয়ের মুখবন্ধে বলেছেন কেন তিনি শুধু দর্শন চর্চার জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করছেন।

অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে অহরহ ঘটে যাচ্ছে যেসব ঘটনা সেগুলো নিতান্তই বৃথা এবং নিষ্ফলা। আমি যখন দেখতাম সেইসব জিনিস যা দেখে ভয় পেতাম এবং তারা ভয় দেখানোর চেষ্টা করত তাদের মাঝে ভালো বা মন্দ থাক বা না থাক কিন্তু তাদের দ্বারা আমার মনোজগত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়ে গেছে। অবশেষে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে খুঁজতে গেলাম এমন কিছু কি আসলেই আছে যা সত্যিই কল্যাণকর এবং তার কল্যাণময়তা স্পর্শ করে যেতে পারে আমার মন এবং মনের উপর এমন প্রভাব পড়তে পারে যাতে আমি সবকিছু ছেড়ে বিবাগী হয়ে যেতে পারি। আবারও বলছি, আমি স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম, অন্বেষণ করে বেড়াবো কোথায় গেলে পাবো তারে, যারে পেলে অনন্ত অসীম সর্বোচ্চ সুখ মেলে। আমি দেখতাম, সম্মান আর বিত্ত থাকলে অনেক বৈভব দেখানো যায়, ভোগ করা অধিক সামাজিক সুবিধা। কিন্তু যদি আমি সত্যিই নতুন কিছুর অনুসন্ধান করতে চাই তাহলে আমাকে অর্থ ও প্রতিপত্তি অর্জন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থবিত্ত যতই বাড়তে থাকে ততই বিলাস ও বিনোদন বাড়তে থাকে এবং ফলাফল হিসেবে মানুষ অর্থ বাড়াতে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু কখনো যদি আমাদের আশা হতাশায় পরিণত হয় তখন মনে জন্ম নেয় গভীর বেদনা। খ্যাতিরও বিশাল বিড়ম্বনা আছে। যখন আমরা খ্যাতি অর্জনের পিছনে ধাবিত হই তখন সুকৌশলে এড়িয়ে চলি অন্যের অপছন্দ আর খুঁজে ফিরি কিসে তাদের সুখ। অন্যের কল্পনামাফিক চাহিদা মেটাতে পারলেই খ্যাতি। কিন্তু চিরন্তন এবং অন্তহীনের প্রতি প্রেম মানুষের মনকে সমস্ত দুঃখকষ্টের বিপরীতে স্বস্তি দেয়। যে মন ধারণ করেছে সমস্ত প্রকৃতির ঐক্য সেখানেই মহৎ জ্ঞানের আধার। যে মন যতবেশি জানে ও চিন্তাশীল সে মন ততবেশি বুঝতে পারে প্রকৃতির শক্তি এবং প্রকৃতির বিন্যাস। মানুষের মন যতবেশি প্রকৃতির শক্তিমত্তা এবং তেজ বুঝতে পারে ততবেশি মন নিজেকে পরিচালিত করতে পারবে। মন নিয়মের পাতা ফাঁদ এড়িয়ে যেতে পারবে। মন যতবেশি প্রকৃতির শৃঙ্খলা বুঝতে পারবে তত দ্রুত এবং সহজে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে মুক্ত করতে পারবে। এটাই হলো মোহমুক্তির উপায়।

জ্ঞানই শক্তি এবং জ্ঞানেই মুক্তি। একমাত্র চিরন্তন সুখ হচ্ছে জ্ঞানের অন্বেষণ এবং জ্ঞানকে অনুধাবন করা। কিন্তু সত্যানুসন্ধানের সময় একজন মানুষ এবং একটি দেশের নাগরিক হিসেবে একজন দার্শনিকের জীবনযাপন প্রণালী কেমন হবে? আমরা যতদূর জানি, বরাবর আদ্যোপান্ত প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়া স্পিনোজার সহজাত আচরণ। স্পিনোজা সহজ কিছু উপায় উল্লেখ করেছেন। মানুষের সাথে এমনভাবে কথা বলতে হবে যেন তারা সহজেই বুঝতে পারে। মানুষের জন্য সবকিছু করা আমাদের তরফ থেকে কোন বাধা যেন না আসে। শরীর সংরক্ষণ এবং নিরোগ রাখার জন্য যা দরকার তাই শুধু গ্রহণ করেই আনন্দ লাভ করা উচিৎ। শেষপর্যন্ত ততটুকু অর্থ আয় করতে হবে যতটুকু জীবন ও জীবিকানির্বাহ করতে এবং অসুস্থতাকালীন চিকিৎসার জন্য দরকার পড়ে। আমাদের জ্ঞান অন্বেষণে কোন সাংক্ষর্ষিক কিছু না হলে মানুষের ইচ্ছাপূরণে সামিল হওয়া। জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য পূরণের অন্তরায় না হলে সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলা।

জ্ঞান অন্বেষণের শুরুতেই একজন অকৃত্রিম এবং পরিষ্কার চিন্তার দার্শনিক তৎক্ষণাৎ সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারেন। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যেতে পারে আমার ইন্দ্রিয়কে বস্তু দ্বারা বিশ্বাস বা পরীক্ষা করা যায়। যখন কেউ আমার জন্য কিছু নিয়ে আসে এবং সেই কারণকে এই উপসংহার দিয়ে মেনে নেয়া যে, বস্তুগত সুখ, সুবিধা আমার মনে কী প্রভাব বিস্তার করেছে এবং কোন পথে ধাবিত করছে। তখনই জানতে পারব আমার জ্ঞানই সত্য জ্ঞান। আমাদের কি উচিৎ নয়, আমাদের বহন করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার আগে ভালভাবে গাড়িটি পরীক্ষা করে দেখা? আমাদের কি উচিৎ নয়, চালানোর আগে গাড়িটিকে সবদিক দিয়ে নিখুত করা? সবকিছুর আগে, স্পিনোজা ফ্রান্সিস বেকনের সুরে বলেন, কৌশলকে কার্যকরভাবে উন্নত করতে হবে শুদ্ধ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। আমাদেরকে অবশ্যই সতর্কভাবে চিহ্নিত করতে হবে জ্ঞানের বিভিন্ন প্রকারভেদ এবং সর্বোত্তম জ্ঞানকে অর্জন করতে হবে।

প্রথমত আমাদের সামনে আছে জ্ঞানের অতীত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি যার মাধ্যমে আমি জেনেছি কবে আমার জন্মদিন। দ্বিতীয়ত বলা যেতে পারে, গবেষণালব্ধ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে একজন চিকিৎসক মনে করেন কোন রোগের উপশম বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর নির্ভর করে না বরং মানুষ যখন প্রচলিত ধ্যান ধারণার উপর নির্ভর করে ছদ্ম বিজ্ঞান গবেষণার আনুমানিক ভাসা ভাসা অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করে তখন সেটা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তৃতীয় ব্যাপার হলো কার্যকরণের সমীকরণে অর্জিত জ্ঞানে আমরা যেকোন মুহূর্তে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি। যেমন আমি বলতে পারি, সূর্য থেকে কোন বস্তুর দূরত্ব কমালে সেই সময় দৃষ্টি সীমানায় সূর্যের বিশালতা কমে যায়।

এই অর্জিত জ্ঞান পূর্বের দুইটা অনুসিদ্ধান্ত থেকে উন্নততর জ্ঞান কিন্তু তবুও অভিজ্ঞতার হঠাৎ অভিঘাতে শ্রেষ্ঠতর জ্ঞান খণ্ডন হয়ে যেতে পারে। শত বছরের পুরনো কত কত বৈজ্ঞানিক ধারণা আধুনিক নতুন ব্যাখ্যার কাছে হেরে গিয়ে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। সেটা এখন অতীত অধ্যয়নের বিষয়। আধুনিক পদার্থবিদগণের কাছে এখন সেই পুরনো তত্ত্বীয় জ্ঞান, ধ্যান ধারণা যুক্তির কাছে ধোপে টেকে না। সুতরাং সর্বোচ্চ জ্ঞান হলো চতুর্থ স্তরের চিন্তা যা আমরা অর্জন করি পূর্বতন চিন্তা বাতিল করে এবং সরাসরি প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে। যখন আমরা দেখি ৬ সংখ্যাটি ২ অনুপাত ৪ এবং তিন অনুপাতে অনুপস্থিত অথবা যখন আমরা ধরে নিই খণ্ডাংশ থেকে পূর্ণতা বড়। স্পিনোজা মনে করতেন, মানুষ সহজাতভাবেই গাণিতিক ভাষায় কবিতা লিখেছিল এবং তারা ইউক্লিডের গণিত ও জ্যামিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত হতাশাপূর্ণভাবে মেনে নিয়েছেন জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে তিনি যে বস্তুজগৎ জানতে সক্ষম হয়েছিলেন তার পরিমাণ ছিল যৎসামান্য।

এথিকস বইতে স্পিনোজা জ্ঞানার্জনের প্রথম দুইটা ধাপকে একত্রিত করেন এবং তার নাম দেন সহজাত জ্ঞান। যে জ্ঞানের সাথে অনন্ত মহাবিশ্বের নিবিড় সম্পর্ক আছে। মহাবিশ্বের সাথে অনন্ত সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিত আমাদের সামনে একবাক্যে দর্শনের সংজ্ঞা উপস্থাপন করে। সুতরাং স্পিনোজার scientia intutiva বা সহজিয়া বিজ্ঞানে বস্তু ও ঘটনার অন্তর্নিহিত নিয়ম শৃঙ্খলা এবং বস্তুজগতের সাথে অনন্ত সম্পর্কের কারণ খুঁজতে চেষ্টা করেন। পুরো চিন্তা কাঠামোর উপর ভিত্তি করে স্পিনোজা বস্তু ও ঘটনাবহুল জগতের সাথে সময়ের শৃঙ্খলা বিশ্বের গঠন এবং নিয়মের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। আসুন আমরা পার্থক্যগুলো মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করি।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ব্যক্তিমানুষের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল সত্ত্বা এবং তাদের একের পর এক পরিবর্তনের কারণ আমি জানি না। কিন্তু চিরন্তন ঘটনাপ্রবাহ আমি বুঝতে পারি। প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল অবস্থা যথাযথ অনুসরণ করা সীমাবদ্ধ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সংখ্যার গণনায় তাদের বিশাল পরিমাণ বলেই নয় বরং তাদের পরিবর্তনের পারিপার্শ্বিক কারণ এবং অবস্থা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপাত দৃষ্টিতে এক মনে হলেও সমগোত্রীয় প্রতিটি জিনিসের আলাদা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে। কোন নির্দিষ্ট বস্তুর উপস্থিতির সাথে তার সারমর্মের আপাতত কোন সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। কারণ বস্তুর অবস্থান কখনো চিরন্তন সত্য নয়। যাইহোক, প্রতিটি স্বতন্ত্র বস্তুর নিয়মিত পরিবর্তন বুঝতে পারা আমাদের জন্য অত্যাবশকীয় প্রয়োজন নেই।

বস্তুর সারমর্ম পাওয়া যাবে নির্দিষ্ট এবং চিরন্তন নিয়মে। প্রতিটি বস্তুর মধ্যে অন্তর্লিখিত থাকে সেই বস্তুর সাংকেতিক সত্য আভাস। এভাবে আমাদের চারিপাশের প্রতিটি স্বতন্ত্র বস্তুজগত ঘঠিত এবং সাজানো। বস্তুত, প্রতিটি স্বতন্ত্র এবং পরিবর্তনশীল বস্তু একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং মূলত বস্তু জগতের সাথে সম্পর্ক ব্যতীত তাদের কোন অস্তিত্ব নেই এবং তাদেরকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বুঝতে পারাও সম্ভব নয়।

যদি আমরা স্পিনোজার বিশাল দার্শনিক সৃষ্টিকর্ম স্মরণে রেখে স্পিনোজার 'দ্য এথিকস' বইটা পড়ি তাহলে দেখতে পাবো বইটা নিজেই নিজের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে। 'দ্য এথিকস' বেশিরভাগ লেখা এত জটিল যে স্বাভাবিকভাবে পাঠক নিরুৎসাহিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই দার্শনিক জটিলতার রহস্য উন্মোচিত হতে শুরু করলে আমরা দেখতে পাবো সরল এবং সহজবোধ্য দর্শনের হাতছানি।

[ উইল ডুরান্টের 'স্টোরি অফ ফিলোসফি' বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো "বুদ্ধিবৃত্তির শ্রীবৃদ্ধি" ]

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

লুসিফেরাস কাফের
লুসিফেরাস কাফের এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 2 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, জুন 27, 2016 - 9:59অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর