নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

নেফারপ্রীতি পর্ব-১০ : বোন, সুতপা ও মায়ের সাথে নেফারপ্রীতি


জেলে নৌকো থেকে নেমে নেফারপ্রীতিসহ বাড়িতে যেতে কাঁচা সড়ক ধরতে হাঁটতে থাকি আমরা দুজনে! পথে খাল পার হতে সাঁকোর পরিবর্তে পাকা ব্রিজ বানাতে দেখলাম আমার বাড়ির একদম কাছেই! যে খালে কৈশোরে গলদা চিংড়ি আর বড় বেলে মাছ ধরতাম ডুব দিয়ে আমি! একদম কাছে যেতেই নেফারপ্রীতি বললো, আরে সিমেন্টের পরিবর্তেতো কেবল মাটি দিয়ে বানানো হচ্ছে। আর রড না দিয়ে ভেতরে বাঁশের কঞ্চি!
বললাম, কিছু করো নেফারপ্রীতি! একদম কাছে দাঁড়ালো সে "পুরুষ চিফ ইঞ্জিনিয়ার" পরিচয়ে। কর্মরত লোকজন আর কন্ট্রাটরকে বললো, একদম ব্রিজের নিচে যান আপনারা। আমি ব্রিজের উপর উঠে দেখবো! জরুরি! সবাই খালের পারে ব্রিজের নিচে নামলে, চোখ টিপলো প্রকৌশলীরূপি নেফারপ্রীতি। ক্রমে ব্রিজের নিম্নমানের খোয়া, রডরুপি বাঁশের কঞ্চি, আর মসলাপাতি সব ধুলোময় হয়ে নিচে পড়তে থাকলো দাঁড়ানো সবার গায়ে। সবাই ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উপরের রাস্তায় উঠলে নেফারপ্রীতি বললো, ঠিক করে ব্রিজ বানান। আমি আবার কাল আসবো। আবার এমন করে বানালে, সবাইকে ভেড়া বানাবো বলে দিলাম! ঐ ভেড়া কুরবানী হবে আগামি ঈদে! মনে থাকে যেন!
:
এবার বাড়িতে ঢোকার আগে বিলের ধারে বৃদ্ধা করিমন্নেছাকে কাঁদতে দেখে জানতে চাই - "কি হয়েছে চাচি"? ছেলে আর বৌ তাকে বের করে দিয়েছে ঘর থেকে। ভাত দেয়না তাকে এ অভিযোগে কাঁদছে রবিউলের মা করিমন্নেছা! অথছ ছেলে রবিউলকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছে সে জলোচ্ছ্বাসে জেলে স্বামীর মৃত্যুর পর। এমনকি আমার কাছে বছর পনের আগে এসেছিল একদিন টাকা চাইতে! যে টাকাতে ছেলে রবিউলকে বিয়ে করাবে পাশের বাড়ির লাইলিকে। কিন্তু নিজের পছন্দ করা লাইলি বেগম এখন শাশিড়কে থাকতে দেবেনা, তারই ছেলের ঘরে!
মা করিমন্নেছাসহ দরিদ্র জেলেপল্লীর শনপাতার ঘরে গিয়ে খুঁজে পাইনা ছেলে রবিউলকে। নদীর ঘাটে গিয়ে জাল মেরামতরত অবস্থায় ধরি তাকে। স্ত্রী আর মার ঝগড়াবিবাদের করুণ কথা শোনায় ছেলে রবিউল। অভাব অনটন আর নিজের ৫-সন্তানের অভুক্তির ব্যথাতুর গল্প কথা বলতে বলতে তার চোখেও জল আসে। ভাগে মাছধরা, আর নদীতে মাছের আকালের কথা বলে যায় এ জলযোদ্ধা জীবনে পরাভূত রবিউল। তার পুরণো মেরামত অযোগ্য ভাঙা নৌকো দেখায় আঙুল দিয়ে, যা টাকার অভাবে মেরামত করতে পারেনি সে। নৌকো থেকে ৫/৬ দিন আগে চুরি হয়েছে সব জাল তার। তাই মেরামত করছে এখন এ ছেঁড়া ঘরে রাখা পুরনো জালগুলো। নদীতে নামতে পারেনি ৫/৬ দিন থেকে জালের অভাবে! শিশুরা অভুক্ত সবাই চালের অভাবে!
:
কি করে যেন যাদুকন্যা এবার! চোখের পলকে নেফারপ্রীতি আর আমি চলে আসি সেই তরমুজ ক্ষেতের পাশে। যেখানে নদীতীরে নতুন নৌকাতে ঝকঝকে সাদা নাইলনের জাল চোখে পড়লো। নেফারপ্রীতি বলে, এ জাল রবিউলের চুরি যাওয়া। নৌকোর গলুইয়ে আধশোয়া জয়নাল বয়াতিকে ডেকে তুলে বলে "ওপার চল"! কিন্তু ঘুমের ভান করে গামছা মুখে দিয়ে চোখ বুঝে থাকে জয়নাল। জয়নালের নৌকোতে দুজনে ওঠার পর আঙুলের ইশারা দেয় নেফারপ্রীতি! প্রচন্ড গতিতে নৌকোটি চলছে অনুভব করে, মুখের গামছা খোলার আগেই পুরো নৌকা তখন রবিউলের একদম বাহুলগ্ন! রবিউল প্লুট, জালের প্লাস্টিক রশি সব দেখে চিহ্নিত করে তার চুরি যাওয়া জাল। জয়নালকে রবিউলের ছেঁড়া জালে পুরো জড়িয়ে এবার নেফারপ্রীতি বলে "সত্য কথা বল, না হলে তোকে নদীতে ফেলে দেব! ডুবে মরবি এখনই"। ভয়ে জয়নাল স্বীকার করে রবিউলের জাল চুরির কথা। উপস্থিত শ-তিনেক জেলে কৃষকের সামনে বিচার হয় তার! চুরির কারণে জয়নালের নুতন নৌকাসহ জাল পাবে রবিউল। ক্ষতিপুরণ হিসেবে নৌকো! হাত ধরে জলভেজা চোখে নেফারপ্রীতি অনুরোধ করে রবিউলকে - "মাকে নৌকোয় তুলে নদীতে জাল ফেলো রবিউল"! এও কথা দেয় সে, "যতদিন তোমার নৌকোতে মা থাকবে, ততদিন নৌকো ভরে মাছ পাবে তুমি"!
:
আমরা বাড়ির একদম কাছাকাছি যাওয়ার একটু আগেই বিলের মধ্যে প্রচন্ড শব্দ করে বজ্রপাত হলো। নেফারপ্রীতি বললো, "বজ্রপাতে বিলে কাজ করা ১২ বছরের রিপন নামে একটা ছেলে মারা গেছে"। বললাম, ওখানে আগে যাই নেফারপ্রীতি? দেখি কোন রিপন? আমি আর নেফারপ্রীতি পৌঁছার আগেই নদীভাঙা রিপনদের বিলের ধারের বাঁধে তোলা কুঁড়েঘর থেকে দৌঁড়ে আসে ওর মা! সদ্যমৃত ছেলের জন্য বিলাপ শুরু করেছে মা করুণ কোরাসে। চারদিক থেকে হাল আর জাল ফেলে কৃষাণ-জেলেরা ছুটে আসছে দাঁড়ানো মৃত রিপনের দিকে। নেফারপ্রীতিকে বললাম, কিছু কি করা যায়? এ বিধবার একমাত্র সন্তান রিপন। সেই মাকে আগলে রাখে সারাক্ষণ। স্কুলে যায় সকালে, তারপর মাঠেঘাটে কাজ করে ছেলেটি। নদী গ্রাস করেছে ওদের ঘরবাড়ি। এখন বিলের পাশে সরকারি বাঁধে মাঁচার মত ঘরে থাকে মা ছেলে! খু্বই দরিদ্র এরা!
:
পাট ক্ষেত্রের আড়ালে গিয়ে এক ফিমেল ডাক্তারের পোশাকে ফিরে এসে বুকে "স্টেটিস্কোপ" লাগায় ডা: নেফারপ্রীতি! মূহূর্তে সোল্লাসে বলে ওঠে, "প্রাণ আছে ছেলেটির। ওকে ঘরে নিন। ঠিক হবে সে"! আমরা ৪-জনে ধরাধরি করে হোগলাপাতার চাটাইয়ে ওদের মাটির ফ্লোরে শোয়াই রিপনকে। মুখের ফেনা নিজ হাতে মুছে ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে মুখে ফুঁ দেয় নেফারপ্রীতি। বুকে ২/৩ বার চাপ দিলে আকস্মিক প্রচন্ড শ্বাস নিয়ে অনেকটা লাফিয়ে ওঠে মৃত রিপন। খবর পেয়ে রিপনদের কুঁড়ে সন্নিহিত বাঁধে ভেঙে পড়ে এলাকার হাজারো জেলে কৃষক নারী পুরুষ! কিন্তু দুকান দিয়ে তখনো তাজা গরম রক্ত ঝড়ছিল রিপনের। নেফারপ্রীতি সান্ত্বনা দেয়ে মাকে "কানের পর্দা ফেটে গেছে ওর প্রচন্ড শব্দে, তা ক্রমে ঠিক হবে। কিন্তু বেঁচে গেছে সে। একটা ডাবের পানি পান করান তাকে। বুকটা শুকিয়ে গেছে তার ত্রাস আর ভয়ে"! গ্রামের নারী পুরুষরা সমবেত স্লোগানের মত "আল্লাহু আকবর" বলে ধ্বনি জলবাতাস কাঁপিয়ে! তারা বুঝতে পারেনা, কে এই ডাক্তার নেফারপ্রীতি! কে বাঁচিয়েছে মৃত কিশোর রিপনকে!
:
খবর পেয়ে হেডটিচার বোন বিলের আল ধরে হেঁটে আসে আমাদের কাছে। সাথে বই আর স্কুলব্যাগ কাধে মৃত সুমিকন্যা মানুসপুত্রী সুতপা। নেফারপ্রীতির হাত ধরে বোন কাঁচা আল-পথে এগোয় আমাদের পুকুরের দিকে। আমি ধরি কন্যা সুতপার হাত! পুকুর পাড় ধরে আমরা মায়ের নিজ হাতে শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসি মার লাগানো নারকেল ছায়ায়। অব্যবহৃত ঘাট মানুষের অভাবে সবুজ শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল অনেকটা। সপ্তরঙা মাছ ঘাটের কাছে এসে জড়াজড়ি করে ভীড় করেছে। হয়তো ওরা আমার পরিচিত শারীরি ঘ্রাণ পেয়েছে! যারা পুকুরে নামলে আমার গায়ের সাথে গা লাগিয়ে সাঁতরে যেত। আর ফিরে আসতো বারবার আমাকে ভলাবাসার ছলে গুতো দিতে! সুতপাকে বলি, নারকেল গাছে উঠে ডাব পারতে বেটি! কিন্তু লাজুক মেয়ে সুতপা মুখ লুকায় বোনের শাড়ির আঁচলে! গ্লাসে না ঢেলে সরাসরি চুমুক দিয়ে ডাব খেতে পারছিলনা নেফারপ্রীতি। ডাবজলে ভিজে যাচ্ছিল ওর বুক, বাহু, কাপড়চোপড় সব। কিন্তু এর মধ্যে দৌঁড়ে একদম কাছে আসে সলেমানের ছেলে কাছেম। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, অর্ধেক জাল টাইনা তুলছি আমরা ১০/১২ জনের সাহায্যে। তাতে ইলিশ উঠছে চৌদ্দ হালি! আর বড় পাঙ্গাশ ৪-টা। বাকি জাল আর টাইনা তুলতে পারতাছিনা কাকা! বাবায় কইছে আপনাগোরে যাইতে। সে নৌকা বাইন্দা বইয়া রইছে গাছের লগে! বললাম, "অনেক হয়েছে নেফারপ্রীতি। এবার তুলে দাও ওদের জাল"!
:
দুপুরে বোনের বাড়ি খাবো! তাই হেঁটে যাচ্ছি মায়ের কবরের পাশ দিয়ে। ৪-জনেই দাঁড়ালাম বুনো ঘাস, বৃক্ষপাতা আর আমার লাগানো জবাগাছগুলোতে ঢেকে যাওয়া মার কবরের পাশে। নেফারপ্রীতিকে বলি, তুমি কি দেখে আসতে পারবে আমার মাকে কিংবা কোন কথা মার সাথে! নেফারপ্রীতিকে না দেখে বোনটা বললো, "কই গেল তোর সাথের গেস্ট মেয়েটা"? বললাম, "কথা বলিস না, চল মৃত মার জন্যে মনে মনে দোয়া করতে থাকি আমরা"! আমার আলহাজ্ব ধার্মিক বোন আমার দোয়া বিষয়ক এমন কথাতে দারুণ খুশি হয়ে বলে, "তবে সুরা ফাতিহা ৩-বার ও ইখলাস ৩-বার পড়ে মার জান্নাতের জন্যে দোয়া করতে থাক আমার সাথে"! তাই করতে থাকি মৃত মায়ের অনাথ দুসন্তান ভাইবোন মিলে। আমাদের সাথে আকস্মিক যোগ দেয় নেফারপ্রীতি। মুখে নদীঘন বয়ে চলা আনন্দবাতাসের স্নিগ্ধতা এনে বলে, "আরে তোমার মার চেহারাতো দেখছি মিসরিয় প্রাগৈতিহাসিক "মেম্পিসাস" মায়ের মত একদম! যে তার ৮-সন্তান রক্ষার জন্যে মিসরীর থর, রা, নেপ, ইলিচসহ নরকের সব দেবতাদের সাথে যুদ্ধ করেছিল বহুদিন! পাড়ি দিয়েছিল মরু মরুচিকার দুর্গম সব কণ্টক পথ! এবং রক্ষা করে ফিরিয়ে এনেছিল মৃতদের জগত থেকে তার সকল সন্তানকে নির্বিঘ্নে! পরের জীবনে তার সকল ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠা করেছিল "মেম্পিসে" তার মায়ের মন্দির। এবং ঐ শহরের পত্তন করেছিল তারা তাদের মায়ের নামে! যা আমার সময়েও "মেম্পিস" নামে পরিচিত ছিল।
:
নেফারপ্রীতির বলা "মেম্পিস" মায়ের কবরের খুব কাছে আমি! যাকে দেখে এসেছে দেবকন্যা এইমাত্র তার নিজ চোখে! অথচ সন্তান হয়েও কত দূরে আমি! নিজের অদক্ষতা আর অক্ষমতার জন্যে অভিমানে ফানুসনাভি ব্যাঙ হয়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার! এবার মার কবর বেয়ে বেড়ে ওঠা বৃক্ষদের প্রেমময় জীবনের বুনো বাতাসের ঢেউ যেন লাগে আমাদের শরীরে! মনে হয় মা ভালবাসার একবাটি সূর্যালোক হাতে বুহকাল পরে চলে এসেছে একদম বুকের কাছে! এ সূর্যস্নাত বাতাসে গেঁও বনভূমির প্রান্তরের বুনো ঘাসেরা হাসে যেন মা কিংবা আমাদের সাথে! সবুজাভ প্রেমিকার ঠোঁটের চিকন রৌদ্রবিন্দুর মত আনন্দহাসি এনে নেফারপ্রীতি বলে, চলো এবার যাই! আমার একদম নড়তে ইচ্ছে করেনা মার ঘ্রাণময়তা থেকে! তারপরো শুকিয়ে মরা পোলকাফোঁটা পুঁইফুলের রক্তলাল তেতো বীজের মত রক্তাভ নাভিতে হেঁটে চলি আমি, আমার বোন, সুতপা আর নেফারপ্রীতি! আমার সাথে হাঁটতে থাকে মার ভ্রুণসৃষ্ট দুসন্তানের হিমায়িত কষ্টেরা হাত ধরাধরি করে বহুক্ষণ!
:
(এরপর পর্ব ১১ আগামিকাল)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 4 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর