নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মুফতি মাসুদ
  • নুর নবী দুলাল
  • আবীর নীল
  • নরসুন্দর মানুষ

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

এক নাস্তিকের জবানবন্দী, পর্ব-৭


থানা-আদালতের কথা---৭
----------

দেখলাম ওসি সাহেবের রুমে তিনজন বসে আছেন। সেকেন্ড অফিসার মিজান, থানার ওসি হাফেজ, আর বড় কর্মকর্তা। তিনি সম্ভবত পুলিশ উপকমিশনার হবেন। আমাকে ওসির রুমে নিয়ে যাবার সাথে সাথে তিনজনেই আমার দিকে আড় চোখে তাকালেন। দুইজন কনস্টেবল আমাকে ওসির রুমে নিয়ে গিয়ে তাদের সামনে বসিয়ে দিয়ে একজন বললেন, -স্যার এর নাম অপ্রিয়। এই শুয়োরের বাচ্ছা আমাদের নবীকে....

বড় কর্মকর্তা কন্সটেবলের কথা শেষ না হতেই সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ইশারায় হাত নেড়ে বললেন, -আচ্ছা তোমরা যাও।

ওরা ওসির রুম থেকে চলে যান। তারপর তিনজন আমাকে ঘিরে খুব কাছাকাছি হয়ে বসলেন। বড় কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, -এই নাম কি?
আমি বললাম, - স্যার আমি অপ্রিয়।
- কি করেন?
- ব্যবসা করি?
-কিসের ব্যবসা করেন?
- স্বর্ণের।
মাঝখান থেকে ওসি হাফেজ আমার মাথার উপর হাত বুলাতে বুলাতে বড় কর্মকর্তার দিকে চেয়ে বললেন, -স্যার এই ছেলেটা একটা মাল! এর ফেসবুক ওয়ালের লেখাগুলো আমি কাল সারারাত ঘেঁটে ঘেঁটে পড়েছি। আপনি স্যার এই ছেলেটার একটা লেখার যুক্তিও খন্ডাতে পারবেন না। তার প্রতিটি লেখায় যুক্তিযুক্ত।

বড় কর্মকর্তা আমার দিকে চেয়ে বললেন, -আপনি একজন ব্যবসায়ী হয়ে কেন এসবে জড়ালেন? এসব তো আপনার কাজ না।
আমি চুপ।

তিনি আবার বললেন, -এটা বাংলাদেশ, মুসলিম দেশ। একটা ৯০% মুসলিম দেশে থেকে আপনি এসব লিখতে পারেন না। আপনি যা খুশি বলতে পারেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, -আচ্ছা অপ্রিয় আপনি পড়াশোনা কতটুকু করেছেন?
আমি বললাম, -মাধ্যমিক পরীক্ষা দিইনি।
শুনে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন, -কি!
আমি খুব নির্লিপ্ত ভাবে বললাম, -হ্যাঁ স্যার।
- সত্যি করে বলুন তো আপনি পড়াশোনা কতটুকু করেছেন?
- যা সত্যি তাইতো বললাম।

সেকেন্ড অফিসার মিজান গর্জে উঠে বলল,-এই খানকির পুত সত্যি করে ক লেখাপড়া কতটুক করছস?

আমি মিজানের এই রুঢ় আচরণ শুনে বললাম, -স্যার আমি বিনীত ভাবে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?
- হ্যাঁ করুন।
- কাল রাতে এস আই মিজান সাহেব আমার মা বোন চৌদ্দ গুষ্টি কে যেভাবে গালাগাল করে করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, আমি কি জানতে পারি পুলিশকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের সময় এই গালাগালি গুলোও শেখানো হয়?

আমার কথা শুনে মিজান সাহেব আমার দিকে তেড়ে আসলেন। বললেন, -শালা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করিস? সাহস কত তোর!

আমি তার দিকে চেয়ে চুপ করে রইলাম।

বড় কর্মকর্তা মিজানের দিকে চেয়ে তাকে অনেকটা ধমক দিয়ে বললেন, -কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় আপনারা সেটা জানেন না? এইটুকু কমনসেন্স আপনাদের নেই?

এসআই মিজান বড় কর্মকর্তার কথা শুনে মাথা নিচু করে চুপ করে রইলেন।

আবার বড় কর্মকর্তা আমাকে বললেন, -আচ্ছা অপ্রিয় আপনি কি জানেন আপনি ধর্ম অবমাননা ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে আপনি 295 ধারায় অপরাধ করেছেন।

আমি বললাম, -স্যার আমি তো আমার বাক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে সমালোচনা করেছি। আর 295 ধারা আইনটি ব্রিটিশরা আজ থেকে দেড়শ বছর আগেই পাস করেছিল। যা বর্তমান ব্রিটিশে এই আইনের প্রয়োগ নেই। সেই সময় ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থেই এই আইনটি উপমহাদেশে পাস করেছিল।

- অপ্রিয়, এই আইনের সাথে ব্রিটিশের স্বার্থ কি দেখলেন?

- স্যার আমার মনে হয় মানুষের মধ্যে ধর্মানুভূতি যত প্রবল হবে তত ব্রিটিশের ভারতবর্ষ শোষণ ও শাসন করতে সুবিধা হবে। কেননা ধর্মানুভূতি দিয়ে হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন তৈরি করা যাবে। হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যকে খন্ডিত করা যাবে। আর এই অনৈক্যের কারণে হিন্দু-মুসলিমরা এক হয়ে উপনৈবেশিক ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। দেশ ভাগের আগেও এই উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিমরা ছিল এমনিতেই ধর্মপ্রাণ, তার উপর ধর্মীয় অনুভুতির উপর আঘাতের বিষয় নিয়ে ২৯৫ ক ধারার আইন করলে, ভারতবর্ষের ধর্মপ্রাণ মানুষ কিছুটা হলে ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে। ব্রিটিশের স্বার্থটা স্যার এখানেই থাকতে পারে।

কথাগুলো ওসি হাফেজ সাহেব খুব মনযোগ দিয়ে শুনছেন আমার কথা শেষ হবার পর তিনি খুব আশ্চর্য হয়ে বললেন, - যাঃ শালা এটা তো আমাদের মাথায় কখনোই আসেনি! তিনি আবার বললেন, -দেখেছেন স্যার, এই মালটা কি গভীরে চিন্তা করে!

বড় কর্মকর্তা মাথা নেড়ে বলল, -হুম।

বড় কর্মকর্তা আবার আমার দিকে চেয়ে খুব তাচ্ছিল্যভাবে বললেন, -সুখে থাকলে আপনাদের ভুতে কিলায়। তাই না? কেন আপনি এসব নিয়ে লিখতে গেলেন? যান এবার জেল খেটে আসুন!

আমি বললাম, -স্যার সব মানুষ তো আর এক না। অনেকে সমাজের অসঙ্গতি দেখে নিরব থাকতে পারে। আমি পারিনা। আমি এগুলির বিরুদ্ধে না লিখে স্বস্তিবোধ করিনা স্যার।
তিনি আবার বললেন, -যান তাইলে জেলে স্বস্তিতে থাকেন! স্বস্তিতে কাটান বলে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে যান।
আমি চুপ।

পরে তিনি টয়লেট সেরে আসেন। পরে এই তিনজন অফিসারের সাথে আরো অনেক বিষয় নিয়ে আমার কথা হয়েছিল। যেগুলি পরেও বলা যাবে। ওসির রুমে প্রায় ঘন্টা দেড়েক আলাপ হওয়ার পর আমাকে দুই কনস্টেবল এসে আবার থানার হাজতে ঢুকিয়ে দেয়। তখন সময় সকাল সাড়ে সাতটা কি আটটা বাজে। হাজতের ভিতর এতো অপরিস্কার ও অপরিছন্ন যে, একটা কুকুরও বোধকরি সেখানে থাকতে অস্বস্তিবোধ করবে। এখানে থানায় আসামিদের যে খাবার দেয়া হয় তাতে কোনো বাড়ির কুকুর বেড়ালও এই খাবারে মুখ দেবেনা। আমি অপেক্ষা করছিলাম আমাকে কবে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে। কারণ এই থানা হাজতের নোংরা পরিবেশ আমার খুব অসহ্য লাগছিল। মনে হয় গৃহপালিত গরু-ছাগলরা ও এতো নোংরা পরিবেশে থাকেনা। কিছুক্ষন পর ছোটভাই সজীব এসে পাউরুটি, কলা, বিস্কুট আর পানি দিয়ে যায়। সাথে এক প্যাকেট সিগারেটও। গতকাল রাতে অল্প খাবার খেয়েছিলাম, তাই খুবই ক্ষুধার্থ আমি। খাবার পেয়ে আমি ঐ নোংরা পরিবেশেই গপাগপ খাইতে থাকি। পেটের খিদে তো, যেন কতকাল অভুক্ত আমি! ক্ষুধার তাড়নায় পৃথিবীর অনেক গরীব মানুষ ও পথশিশুরা ডাস্টবিনের খাবার কুঁড়িয়ে খায়, আমি তো এর চেয়েও ভালো পরিবেশে আছি। কথাটা মনে মনে বললাম। শুনেছি আমাকে দুপুর ১২ টার দিকে নাকি কোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে। তাই আমি দুই কনস্টেবলকে ঘড়ির সময় বার বার জিজ্ঞেস করে তাদের বিরক্ত করছিলাম। তারা মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলেছে, -শালা তোকে এখানেই রেখে দেব। কোর্টে আর নেয়া হবেনা, এখানে পঁচে মরবি!

বেলা তখনো সাড়ে ১২টা পেরিয়ে ১টার সময়ের কাছাকাছি চলে গেছে। সেকেন্ড অফিসার মিজান আমাকে ডেকে পাঠায়। ডেকে নিয়ে সেই আমার অনেক ছবি তুলে। অনেকটা ফটোগ্রাফার স্টাইলে। আমিও ছবি পোজ দিতে কোনো কার্পণ্য করিনি। মনে মনে বললাম, তুলে শালা যত ইচ্ছে তত। তারপর আমার দশ আঙ্গুল সহ দুই হাতের পাঞ্জার ছাপ নিল। তারপর বলল, -এই ছাপগুলো কেন নিচ্ছি জানিস?
আমি বললাম, -না জানিনা। কেন?

মিজান বলল, -তুই আর কোনোদিন যদি ফেসবুকে লেখালেখি করিস তাহলে অটোমেটিকলি আমরা তা জেনে যাব। তুই কোথায় আছিস আমাদের কাছে খবর চলে আসবে। তারপর হাতদুটোকে হাতুড়ি পেটা করে থেতলে দেব!

-যে পুলিশ প্রশাসন দায়িত্বজ্ঞাণের অভাবে এদেশের অপরাধী ধর্ষক, খুনি ও হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনা, সেই আবার আমার ফেইসবুক চালানোয় নজর রাখবে! কি এক্টিভিটি! পুলিশের এতো কার্যকারীতা থাকলে আমাদের দেশের আজ এই হাল হতোনা। কথাটা আমি মনে মনে বললাম।

মিজান আবার জোর দিয়ে বলল, -কি বুঝেছিস?

আমি বললাম,- হুম।

তারপর আমার দোকানে কি কি মালামাল আছে তা জানতে চাইলো। বলল, -তোর দোকানে কি কি স্টক আছে?
-আপনি যেটা বলছেন সেটা তো এই অপরাধের সাথে সম্পর্কিত নয়। আর তাছাড়া এগুলি আপনাকে বলতে আমি বাধ্য নই! কথাটা খুব শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম।

আমি আমার মোবাইলটা কিনে ছিলাম ১১ সালের লাস্টে। এবং মোবাইলটা একটু দামি দেখে মিজান বলেছিল, যেন মোবাইলটা তাকে দিয়ে দিই। আর সেই আমাকে কেসটা হালকা করে দেবে বলেছিল।

আমি বললাম, স্যরি স্যার। আমি আমার পার্সোনাল জিনিস কাউকে দিইনা।

মিজান রেগে গিয়ে বলল, -তাহলে শালা যাহ! তোকে ১৪ বছরের জেল খাটাবো।

আমি চুপ।

বেলা তখন আড়াইটা বাজে। আমাকে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য থানার আঙ্গিনায় পাজারোর মতো পুলিশের গাড়ি আসলো। গাড়ির সামনে ড্রাইভার আর সেকেন্ড অফিসার মিজান বসেছে। পেছনে দুই কনস্টেবল। ঐ দুইজনের মাঝেই চেপে ধরে আমাকে বসিয়েছে। দুইজনই আমার বগলে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ধরে আছে। আমার হাত পেছনে রেখেই হাত কড়া পরিয়েছে। যেন ওরা একজন খুনি গডফাদারকে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি কোর্টের উদ্দেশে ছাড়বে.... এমন সময় থানা ভিতর থেকে ওসি এসে আমাকে অবস্থা দেখে ওদের ধমক দিয়ে বললেন, - ওনাকে এভাবে হাতকড়া পরিয়েছেন কেন? উনি কি মাফিয়ার গড ফাদার নাকি? তাড়াতাড়ি উনার হাতকড়া খুলুন!

দুই কনস্টেবল তড়িঘড়ি করে আমার হাতকড়া খুলে দিলেন। তারপর ওসি বললেন, -ওনাকে হাতকড়া পড়াতে হবেনা, এভাবেই নিয়ে যান।

গাড়ি যখন কোর্টের ভিতর ঢুকলো, তখন দেখলাম মামা, ছোট ভাই সজীব, পিসিত ভাই অচল, আমার মোছ ওয়ালা উকিল ও জেঠাতো ভাই সঞ্জয় দা আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছেন। জেটাতো ভাই সঞ্জয় দা উকিলের সাথে কি কি যেন কথা বলছেন। পুলিশ আমাকে গাড়ি থেকে নামার আগে হাতকড়া পরিয়ে দেয়। আমাদের গাড়িটা কোর্টের সামনে এসে থামে। এরপর পুলিশ আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে সোজা কোর্টের সেলের ভিতর নিয়ে যায়। কোর্টের সম্মুখিন হতে হলে যেখানে নতুন আসামীদের সাময়িক সময়ের জন্য এই সেলগুলোতে রাখা হয়।

ওখানে গিয়ে দেখি অসহ্য রকম চিৎকার চেঁচামেচি। সেলের ভিতর আসামীদের সাথে বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের আত্নীয় স্বজ্জনরা কথা বলছেন। সবাই একযোগে চিৎকার করে করে কথা বলছেন। যেন মৃত শবদেহের পাশে শোকাহত মানুষের কান্নার রোল বইছে সেলের ভিতরে আর বাইরে! পুলিশ নিয়ে গিয়ে আমাকেও ঐ আসামীদের সেলের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। কোর্টের সেলের ভিতর এতো আসামী গিজগিজ করছে যে, একটু বসারও জায়গা নেই। আমি তো ঘেমে নেয়ে পুরো একাকার। সেখানে লক্ষ্য করেছি এক সুন্দরী তরুনীও সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে তার প্রেমিকের সাথে কান্না করে করে কথা বলছে। এবং বলছেন, -আমি তোমাকে যে কোনো মূল্যে ছাড়িয়ে নেব সোনা। আমার বাবার কোনো শক্তি নেই যে তোমাকে জেলে আটকে রাখবে। তরুনীটি রাগে ফুঁসলে ফুঁসলে কাঁদছে। সেলের ভিতর যুবকটিও কান্না করছে। দুজনে দুজনের চোখের জল মুছে দিচ্ছে। আবার কখনো গারদের শিকের ফাঁক গলে একজন একজনের গাল অবলীলায় স্পর্ষ করছে। এতোগুলো মানুষের সামনে এই দুজনের কোনো রকম জড়তা দেখিনি। একজন একজনের প্রতি সেই কি টান! সেই কি যত্নশীল ভালোবাসা। সেলের বাইরে তরুনীটির সাথে ছিল ছেলেটির বাবা, মা ও ছোট ভাই। এই দৃশ্য আমার কাছে সবচেয়ে করুণ মনে হল। দুজন তরুন তরুণীর ভালোবাসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোহার শিকের প্রাচীর!

আমি এখানে আসছি প্রায় আধা ঘন্টা হয়ে গেল। কেউ আমার সাথে দেখা করতেও আসছে না। আমি একটু একটু করে হতাশ হচ্ছি। আবার মনে মনে এইও ভাবছি ওরা হয়তো আমার জামিনের জন্য কোর্টে দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় দা একটা প্যাকেটে করে একটা বিরানী ও একটা পানির বোতল নিয়ে এসে বলল, -ধর এটা নে।

আমি প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বললাম, -দাদা জামিনের কি হলো?
সঞ্জয় দা বলল, এখনো কোর্ট বসেনি। লাঞ্চের পর বসবে। আর ২৯৫ ক ধারার মামলাটি করার জন্য ওরা (পুলিশ) অপশন রেখে দিয়েছে।

আমি বললাম, -মামলাটি করতে স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন লাগে। আর এর মধ্যেই তুমি আমাকে জামিন করার ব্যবস্থা করো।

সঞ্জয় দা বলল, -স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে যে কি করে বুঝলি?

-এটা তসলিমা নাসরিনের 'ক' বই পড়ে জেনেছিলাম। এই মামলাটা জামিন অযোগ্য মামলা। আর এই মামলা কোনো ব্যক্তি চায়লেও করতে পারে না। এই মামলা করতে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে।

আচ্ছা দেখছি বলে সঞ্জয় দা আবার চলে যায়।

আমার অপেক্ষার আর শেষ হয় না। বিকেল চারটে পেরিয়ে গেলো। মনে মনে বললাম, -কোর্ট তো এতক্ষন খোলা থাকার কথা না। ওরা তাহলে কি করছে এতোক্ষন?

যারা পুরোনো আসামী, তাদেরকে পুলিশ একে একে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তাদেরকে জেলে নিয়ে যাওয়া হবে। এমন সময় সঞ্জয় দা, ছোট ভাই সজীব ও পিসিত ভাই অচল আসছে। তারা আমাকে হতাশ হয়ে জানায়, - ভাই আজ জামিন হয়নি।

ওদের কথা শুনে আমি উপর নিচে করে মাথা নাড়লাম।

আমি জানতাম জামিন হবেনা। অন্তত ১৫ দিনের আগে এই জামিন হবেনা। পুলিশও আমাকে সন্দেহভাজন দেখিয়ে ৫৪ ধারায় মামলা করে কোর্টে পাঠিয়েছে মাত্র। পুলিশও জানে যে এই ৫৪ ধারা মামলাটি ১৫ দিনের আগে জামিন হবেনা। তাই তারা ৫৪ ধারার নিচে পরবর্তী ২৯৫ ক ধারা মামলা করবে এই আর্জি জানিয়ে মাননীয় আদালতকে আমাকে জেলে রাখার আবেদন করে। যাতে পরবর্তী স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে তাদের মামলাটা রজু করার সুযোগ থাকে। আর সেটার ভয় দেখিয়ে পরবর্তী আমার কাছ থেকে টাকাও (ঘুষ) চায়তে পারে।

আমি সঞ্জয় দাকে বললাম, -দাদা এখন জামিন হবে না। আমার জামিন হবে ১৫ দিন পর।

সঞ্জয় দা বলল, - চিন্তা করিস না। আগামী দুইদিনের মধ্যেই আদালতে পুটাপ দিয়ে আমরা জামিন নিয়ে নেব।
আমি বললাম, দাদা দেবেনা। ওরা নিয়ম মেনেই জামিন দেবে।
সঞ্জয় দা বলল, আচ্ছা দেখা যাক কি হয়। এখানে তোর আর কিছু লাগবে?
আমি বললাম, -কিছু শুকনো খাবার আর পানি দিয়ে যেও।
এরপর ওরা চলে যায়।

অনেকক্ষন হয়ে গেল সেলে ভিতর। মনে হচ্ছিল আর কেউ আসবে না দেখতে। ওরা বোধহয় ভুলে গেছে খাবার দিতে। তখন ঘড়িতে সন্ধ্যার সময় ৬ টা পেরিয়ে গেল। সবাইকে একে একে কারাগারের গাড়ি এসে নিয়ে যাচ্ছে। কোর্টের আসামীর সেল এখন অনেকটা ফাঁকা। আমরা যে কয়জন নতুন আসামী সেলের ভিতর পড়ে আছি, আমাদের নিয়ে গেলে আজকের জন্য কোর্টের সেল (হাজত) একেবারে শূন্য হবে। কিছু সময় পর আমাদেরও নিতে আসলো। আমরা ১০-১২ জনকে হাত-কড়ার সাথে সারিবদ্ধভাবে দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে ভেড়ার পালের মতো সেল থেকে বের করল। তারপর আমাদের ভেড়ার পালের মতো ধীরে ধীরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আদালতে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা কারা বাসের কাছে। কারা-বাসটি আদালত প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে ছিল। তখন গৌধুলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। গাড়িতে উঠার আগে দেখি বাবাকে! বাবা কলা, পানি, বিস্কুট, আপেল ও চিড়ার একটা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার অসহায়ের মতো করুণ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে দেখে এক অজানা কষ্টে আমার বুকটা হুহু করে উঠল। বাবাকে এমন ভেঙ্গে পড়া অবস্থায় কখনো দেখিনি। তিনি হয়তো কখনোই ভাবেননি তার এই স্বশিক্ষিত যুক্তিবাদী ছেলেটির কখনো জেলে যেতে হবে।

বাবা চোখ মুছতে মুছতে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার হাতে খাবারের ব্যাগটা দিয়ে বলল, -বাবা ভালো থাকিস।

বাবার কান্না দেখে কখন যে আমার দুচোখ বেয়ে অনর্গল অশ্রু নামছে আমি টেরই পায়নি। চোখ মুছে বাবাকে বললাম, -তুমিও বাসায় চলে যাও। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। মা বাসায় একা।

দায়িত্বরত পুলিশ বলছে তাড়াতাড়ি উঠেন গাড়িতে।

আমি চার দেয়ালের কারাগারের মতো জেলের বাসে উঠে গেলাম। কারাগার-বাসের উপরের অংশে শিকের ফাঁক দিয়ে আবছা অন্ধকারে বাবাকে দেখার চেষ্টা করছি। বাবা আমার দিকে করুণ মুখে করে চেয়ে। আর আমি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলছি, -বাবা চলে যাও। চলে যাও......

সবাই উঠে যাবার পর কারা-বাসটি তখন জেলখানার উদ্দেশে ছেড়ে দিয়েছে। বাবা ওখানেই নিথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।

(চলবে)

Comments

অপ্রিয় কথা এর ছবি
 

যারা আগের পর্ব গুলো পড়েননি, তারা "এক নাস্তিকের জবানবন্দী" গুগলে লিখে সার্চ দিলে পেয়ে যাবেন। ধন্যবাদ

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অপ্রিয় কথা
অপ্রিয় কথা এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 4 দিন ago
Joined: শনিবার, ডিসেম্বর 24, 2016 - 2:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর