নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মুফতি মাসুদ
  • নুর নবী দুলাল
  • আবীর নীল

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

এক আদিবাসী পরিবারের গল্প: পাহাড়ে চলছে কলম্বাস-নীতির রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন!



আমরা বাঙালিরা পাহাড়ে যায় ঘন সবুজ বনের অনাবিল সৌন্দর্য দেখতে। সেখানকার প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখতে। কিন্তু পাহাড়ের ভূমিপুত্রদের জীবনযাপন কেমন তা নিয়ে আমরা মোটেও ভাবিনা। আমরা সাজেকে গিয়ে উঁচু পাহাড়ের অকৃত্রিম শীতল ঝর্ণার সেল্ফি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করি। নীলগিরিতে ঘুরে এসে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দির্য্যের কথা বন্ধুদেরকে খুব গর্ব করে বলি। ডিএসএলার ক্যামরা দিয়ে আনমনে ঘুরে প্রকৃতির অপরুপ রুপ গিরিশ্রেণীর সৌন্দর্যকে স্মৃতিবন্দী করে নিয়ে আসি। নিজের মধ্যে একটু ফটোগ্রাফার ফটোগ্রাফার ভাব আনার চেষ্টা করি। কিন্তু একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে দেখি না পার্বত্য আদিবাসীদের জীবনগুলো কেমন চলছে? একটু আন্তরিক হয়ে দেখিনা রাষ্ট্রীয় নীতির অধিকার বঞ্চিত পাহাড়ের ভুমিপুত্রদের দারিদ্রতা কতো রকম ভাবে গ্রাস করছে! গতকাল খাগড়াছড়ির এক আদিবাসী পরিবারের ঘরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখেছি সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। আদিবাসীদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একটুও উন্নতি করেনি আমাদের সরকার। সেখানকার আদিবাসী শিশুরা স্কুলে পড়তে যায় প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার অসমতল পথ পায়ে হেঁটে। যেখানে প্রতি দুই কিলোমিটারের মধ্যে একটি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় থাকার কথা, সেখানে ১০-১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়েও একটি উচ্চ বিদ্যালয়ও খুঁজে পাওয়া যায়না। আমাদের সরকার তাদের ভূমি দখলের বেলায় খুব দায়িত্বশীল হলেও তাদের উন্নতির বেলায় আমাদের সরকার মোটে দায়িত্বশীল নয়। দেখেছি সেখানকার আদিবাসীদের ৮-৭ কিলোমিটার, দুরের কেউ কেউ ১০-১৫ কিলোমিটার দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে বাজারে আসে। যেখানে বাজার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, কলেজ, বিদ্যালয়.... এসব সুবিধাজনক স্থানগুলো বাঙালী সেটেলারদের দখলে। বেশির ভাগ উন্নয়নশীল জায়গাগুলোতে বাঙালীদের আবাস স্থল।

দিনদিন পাহাড়ের আদিবাসী মানুষদের নগর সভ্যতার আলো থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে আমাদের বাঙালী শাসকরা। তাদেরকে চলে যেতে বাধ্য করছে গভীর থেকে গভীর জঙ্গল ঘণ পাহাড়ে। যেখানে মানুষের জীবন যাত্রা দুঃসহ। আর এদিকে দিনে দিনে বাজারের আশেপাশের উন্নয়নশীল জমিগুলোর মালিক হচ্ছে সেটেলার বাঙালীরা। এই যেন আমেরিকার আদি নিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতি স্বৈরাচার ও দখলদার কলম্বাসের আগ্রাসনের প্রতিচ্ছবি! ভুমিপুত্র আদিবাসীদের জায়গায় থেকেই, তাদের জায়গা ব্যবহার করে রাষ্ট্রের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করে আমাদের রাজস্ব বোর্ড। কিন্তু তাদেরকেই অধিকার বঞ্চিত রেখে আমরা ও আমাদের সরকার তাদের প্রতি কি নিষ্ঠুর প্রতিদান দিচ্ছি! বাহ অসাধারণ প্রতিদান! সবচেয়ে যেটা শুনে অবাক হয়েছি, একজন সন্তান সম্ভবা জননীর সন্তান জম্ম দিতে গিয়ে গভীর পাহাড়ের ভিতর আদিবাসী পরিবারগুলোকে কতোটা ঝুঁকি নিতে হয়। যেখানে রাস্তা করার উপযুক্ত পথ থাকার পরও পাকা রাস্তাঘাট করার কোনো পরিকল্পনা নেই এই বাঙালি মুসলমান সরকারের। তারা তো নাক চ্যাপ্টা উপজাতি, ক্ষুদ্র (!) নৃগোষ্ঠী। তারা আবার মানুষ নাকি? ভাবখানা এমনই আমাদের। এক সন্তান সম্ভবা জননীর প্রসব বেদনা উঠলেও তাকে পরিবারের মানুষের সাহায্যে হাতে হাত ধরে ৮-১০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে বাজারের হাসপাতালে আসতে হয় পেটের সন্তান প্রসব করার জন্য।

আমাদের শহরগুলোতে (বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম শহর) লোক দেখানো দৃশ্যমান উন্নয়নের নামে যে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা সরকার অপচয় ( রাস্তার উপর অর্থহীন কালভার্ট, ফ্লাইওভার, ব্রীজগুলো আমাদের কোনো কাজেই আসেনা। এর চেয়ে শহরে মেট্রোট্রেন যোগাযোগ করে দিলে জনগনের অনেক বেশি সুবিধা হয়। জনগনও সঠিক সময়ে কাজে উপস্থিত যোগ দিতে পারবে। কিন্তু আমাদের সরকার তা করবে কেন? মেট্রোরেল তো আর দৃশ্যমান না। এসব দৃশ্যমান ফ্লাইওভার দিয়ে তো জনগনকে উন্নয়নের নামে বোকা বানানো যাবে!) করছে, তার শত ভাগের ১ ভাগ দিয়েই পাহাড়ী আদিবাসীদের জনপথ উন্নতি করা যায়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র চালকদের সেই সদিচ্ছাটকু নেই। রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই সামান্য যোগাযোগের সুবিধা পাবার অধিকারও কি তাঁদের থাকতে নেই? আমাদের সাথে শান্তি চুক্তি করে, তাদের জমিতে আমাদের বসবাসের সুযোগ দিয়ে তাঁরা খুব অপরাধ করেছিল? ইতিহাসে অনেক নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকদের গল্প পড়েছি। এখানেও পাহাড়ের আদিবাসীদের সাথে আমাদের রাষ্ট-চালকরা যা করছেন, তা হল নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতা! ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনা সরকার শান্তিবাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র জমা নিয়ে পাহাড়ের আদিবাসীদের সাথে যে "শান্তি চুক্তি"টা করেছিল, তা আজ আদিবাসীদের কাছে নির্মম প্রহসন! তাদের অধিকারের কিছুই বাস্তবায়িত করেনি আমাদের সরকার। শান্তিবাহিনীর আমলে আগে পাহাড়ের মানুষের যে ঐক্য ছিল, সেটাই নষ্ট দিয়েছে আমাদের সরকার। উলটো তাদের মধ্যে দলে দলে বিভক্ত করে দিয়েছে। তাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে সংঘাত সৃষ্টি করে দিয়েছে। যাতে তারা আর কখনো ঐক্য হতে না পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বাহিনীর প্রধান নেতা সন্তু লারমা, সাংসদ দিপঙ্কর তালুকদার, সাংসদ বীর বাহাদুর এরা আজ বর্তমান সরকারের একেকটা পেইড দালাল। তারা ক্ষমতার মোহে ভুলে গেছে নিজেদের মানুষগুলোর জাতিস্বত্তার অধিকার। তারা এখন নিজেদের জাতিকে পিছিয়ে রেখে বাঙালীদের সেটেলারদের কদমবুসি করে। যাতে ৯০% মুসলমানের দিওয়ানা সরকারের দৃষ্টি তাদের প্রতি আকর্ষিত হয়।

মাননীয় শেখ হাসিনা সরকার, জানি আপনি উনন্নয়ের চাপে এখন খুবই ব্যস্ত আছেন। তবুও বলছি, পাহাড়ের এই অধিকার বঞ্চিত আদিবাসী মানুষগুলোর দিকে একটু সুদৃষ্টি দিন। আমি এখনো আশাবাদী, আপনার মনুষ্যত্ব এখনো মরে যায়নি। আমি এখনো আশাবাদী, এখনো আপনার মানবিক স্বত্তা পুরোপুরি পতিত হয়নি। আপনি তাদের জীবন যাত্রার মান উন্নতি করার জন্য একটু ভাবুন। এটা একজন রাষ্ট চালক হিসেবে আপনার নৈতিক দায়িত্ব। আমরা বাঙালীরা যদি আপনার সরকারের নাগরিক হই, এঁরাও আপনার সরকারের নাগরিক। তাদেরও আমাদের মতো শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ পাবার অধিকার আছে। যে ভুমিপুত্রদের ভুমি নিয়ে আপনার সরকার সরকারী রিসোর্ট, বাসভবন, হোটেল, মোটেল, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র বানাচ্ছেন, তাদের প্রতি একটু কৃতজ্ঞ হোন। তাদের জায়গা জমি বন জঙ্গল ব্যবহার করে আপনাদের সরকার যে হাজার হাজার কোটি টাকা বাৎসরিক রাজস্ব আয় করে তাদের প্রতি একটু কর্তব্যপরায়ন হোন। না হলে ইতিহাস আপনাকে ঘৃণা ছাড়া কিছুই করবে না। তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির করুন। তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক নীতি অবলম্বন বন্ধ করুন। আমি একদিন আদিবাসীদের কাছে থেকে বুঝেছি, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হওয়ায় তাদের মনে আমাদের প্রতি কতোটা ঘৃণা আর ক্ষোভ জমে আছে। যেমনটা ক্ষোভ আর ঘৃণা ৭১-এর আগে পাকিস্তানি শাসকদের প্রতি আমাদের জমতো। দেখেন এই ক্ষোভ না আবার একদিন বারুদ হয়ে উঠে! বাঙালীরা যদি রাষ্টের শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক আলোর সব রকম সুযোগ সুবিধা পায়, তাহলে পাহাড়ের আদিবাসীরা কেন এই সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন? তাদেরকে যদি শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহারের সুযোগ নাইবা দেন, তাহলে ঠিক কোন অধিকারে তাদের ভুমিতে সেনাক্যাম্প ও রাষ্ট্রের সরকারী কর্তৃত্ব গড়ে তোলেন? ঠিক কোন অধিকার বলে? আমি মাত্র একদিন ওদের সাথে থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আমাদের রাষ্ট ব্যবস্থা তাঁদের প্রতি কি পরিমান বৈষম্যমূলক আচরণ করে। কি পরিমান তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও চিকিৎসার আলো থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এই অবস্থা দেখে আমি একজন বাঙালী ও বাংলাদেশী হয়ে খুবই লজ্জিত হয়েছি। ওদের প্রতি আমাদের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা দেখে আমাকে যেন এক বিব্রতবোধের গ্লানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে।

আমি যখন সকালে (গতকাল) চট্টগ্রাম শহরের উদ্দেশ্যে ওদের ঘর থেকে বের হলাম, তখন সকাল ১০ টা কি সাড়ে দশটা হবে। আঁকা বাঁকা, উঁচু নিচু দুর্গম পথ পেরিয়েই একটি ছোট্ট পাহাড়ের চুড়ায় ঐ আদিবাসী পরিবারটির ঘর। যেখানে থাকেন জীবিকার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করা বাবা-মা, ছেলে, ছেলের বউ, আর তাদের মাধ্যমিক পড়ুয়া কিশোরী মেয়ে। নাম তার জিচি। যে জিচি কিশোরীটি ৭-৮ মাইল দুর্গম পথ পেরিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়ত করে। কিছুদিন আগে তাদের ছেলের বউয়ের মেয়ে সন্তানের জম্ম হয়েছে। সেই সুত্রেই জানতে পেরেছি প্রসব-বেদনার্ত তাদের ছেলের বউকে বাজারের হাসপাতালে আনতে তাদের কতোটা ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। এতো প্রতিকুলতার মধ্যেও ওখানে আমাকে ঘিরে ওদের আতিথেয়তার একটুও কমতি ছিলনা। পুরো একদিন (২৪ ঘন্টা) ছিলাম ওখানে। ওখানে যেদিন ছিলাম, সেদিন রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি হওয়া মানে বাজারে (বাস স্টেশনে) যাতায়ত করা আরো কষ্টসাধ্য। পাহাড়ের আঁকা বাঁকা উঁচু নিচু পথ আরো পিচ্ছিল হয়ে যায়। তখন আর মোটর বাইকে যাতায়ত করা যায় না। ৭-৮ মাইল দুর্গম পথ পায়ে হেঁটেই বাজারে আসতে হয়। আমি এর আগেরদিন যখন ওখানে গিয়েছিলাম, তখন ছিল জৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা রোদ। বাইকে করেই গিয়েছিলাম। আসার সময় রাতের বৃষ্টিতে সিক্ত হয়ে পাহাড়ের মেটো পথ কাদায় পিচ্ছিল হয়েছিল। তাই বাইকে করে আসা সম্ভব হয়নি। এখানে যে কজন আদিবাসী তরুনরা বাইক চালিয়ে রুজি রোজগার চালায়, বর্ষাঋতু আসলে যেন তাদের রুজি রোজগারে দানবের মতো আঘাত হানে! বর্ষার কারণে উঁচু নিচু পাহাড়ের পথ অতিরিক্ত কাদায় পিচ্ছিল থাকে, তাই বাইক চালানো অসম্ভব হয়ে যায়। বর্ষাকাল আসলে এই বাইক চালক আদিবাসী তরুনরা চিন্তায় পড়ে কিভাবে জীবন-জীবিকা চালাবেন?

এর আগেরদিন থেকে পরদিন সকালে আমি আর হিমু (ওদের ছেলে) বের হলাম বাজারে আসার জন্য। উদ্দেশ্য আবার চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়া। হিমুর কাঁধে দুটো ব্যাগ। একটা বাঁশের কঞ্চি বাম কাঁধের মাঝ বরাবর রেখে হিমু ব্যাগ দুটো সামনে-পেছনের দুই পাশে ঝুলিয়ে নিয়েছে। আমাকে একটিও নিতে দিলো না। যে ব্যাগ দুটোতে আছে, আন্টি আর আনকেলের (ঐ আদিবাসী পরিবারের পিতা-মাতার) দেয়া এ গ্রীষ্মকালের মৌসুমি ফল। আম, লিচু, জাম, বিনি চাউল, দুধ, শাকের মতো রান্না করে খাওয়ার পাহাড়ী টক পাতা। বড় দুটো কাঁঠাল দিতে চেয়েছিল, বহন করতে কষ্ট হবে বলে আমি নিইনি। এই ফলগুলি তাঁদের নিজের হাতে গাছ লাগানো বাগানের ফসল। যেহেতু রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, তাই পাহাড়ের ভেজা মেটো পথ ধরে আমি আর হিমু বাজারে আসার উদ্দেশে হাঁটতে থাকলাম। আজ আমাকে অসমতল পথ ধরে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। অথচ এই পাহাড়ের এই আদিবাসী মানুষগুলো রোজ ১০-২০ কিলোমিটার অনায়াসে হাঁটে। যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুন্নতির কারণে তাঁদের প্রতিদিন ২০-২৫ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। আমি আর হিমুকে দুজন এগিয়ে দিতে আসে। তাদের পরিবারের কিশোরী মেয়ে জিচি, আর তার কাকাতো বোনের ছেলে মিঠুন। মিঠুন চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু। আমার দিকে লাজুক চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। চোখমুখ বুদ্ধিদীপ্ত মনে হয়। মিঠুনকে দেখলে মায়া হয়। আগামী বছরে মিঠুন হয়তো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। একটু স্বাক্ষরতার আলোর মুখ দেখার জন্য তারও রোজ ১৫-১৬ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে হবে। তবু কিছুই যে করার নেই পাহাড়ের আদিবাসী শিশু মিঠুনদের।

আমি হেঁটে বাজারে আসার সময় পাহাড়ের খালের উপর কয়েকটি বাঁশের সাঁকো দেখেছি। টলমলে অবস্থায় এই অস্থির সাঁকোগুলো নিজেও পার হয়েছি। যেগুলি আদিবাসীরা তাদের জীবন যাত্রার স্বার্থেই বানিয়েছে। এখানে আমাদের রাষ্ট্র নীতি তাদের প্রতি কোনো দায়িত্বই পালন করেনি। অথচ সেটেলার এলাকায় খালে উপর ব্রীজ-সেতু সব করা হয়েছে ইপি চেয়ারম্যানের সহয়তায়। কিন্তু আদিবাসী ভুমিপুত্রদের প্রতি বৈষম্যে ভরা নীতি ছাড়া আমাদের রাষ্ট্রের আর কোনো সুনীতি দেখিনি। আমি আর হিমু অনেকক্ষন হেঁটে অবশেষে বাজারে আসলাম। জিচি আর মিঠুন আমাদের কিছু পথ এগিয়ে দিয়ে অনেক আগেই বাড়ি ফিরে গেছে। কিশোরী জিচির জন্য মনটা খুব খারাপ লাগছে। কাল এসেই তার সাথে অনেকটা সময় কাটিয়েছি। তার সাথে মিশে গাছ থেকে আম পেড়েছি, লিচু গাছ থেকে হাত দিয়ে লিচু ছিঁড়েছি। জিচি, যেমন চমৎকার মিশুক মানুষ, তেমন সেই এক আনন্দদাতা (যার হেসে খেলে আনন্দ দিতে একটুও কৃপণতা নেই) অপুর্ব কিশোরী। আমরা বাজারে আসার পরপরই ঝম ঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। একটা দোকানে আমি আর হিমু ঢুকে ঠান্ডা পানীয় পান করলাম। এর কিছুক্ষন পর দেখলাম বাস আসছে। বৃষ্টির মধ্যেই দৌঁড়ে বাসে উঠে গেলাম। হিমু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার ব্যাগ দুটো বাসে তুলে দিল। গাড়িটা ছেড়ে দিল। আবার পেছনে ফিরে হিমুকে আরেকবার দেখে নিলাম। সেই আমাকে দেখে হেসে হেসে হাত নাড়ছে। আমিও নাড়লাম। ঘন বৃষ্টির মধ্যে উঁচু নিচু পাহাড়ের সড়ক দিয়ে গাড়ি খুব দ্রুত গতিতে চলছে চট্টগ্রামের উদ্দেশে। একে একে সব কিছু পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে। ফেলে আসছি জিচি, হিমু, হিমুর বউ, সদ্য কয়েকদিন আগে জম্ম নেয়া হিমুর মেয়ে সন্তান প্রেরণা। ফেলে আসছি আনকেল-আন্টি, ছোট্ট শিশু সেই লাজুক মিঠুনকে। পেছনে ফেলে আসছি খাগড়াছড়ির বন জঙ্গল, সুন্দর সুন্দর সবুজের পর্বতমালা। শুধু মনের মধ্যে গেঁথে আছে রাষ্ট্রের শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া পাহাড়ী আদিবাসীদের করুণ জীবনগুলো। আর গেঁথে আছে অধিকার না পাওয়ার অদৃশ্য অব্যক্ত তাদের মনের কষ্টগুলো......

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

অপ্রিয় কথা
অপ্রিয় কথা এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 4 দিন ago
Joined: শনিবার, ডিসেম্বর 24, 2016 - 2:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর