নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • মুফতি মাসুদ
  • নুর নবী দুলাল
  • আবীর নীল
  • নরসুন্দর মানুষ

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

নিরপরাধ ঘুম | সুমন রহমান



[র‍্যাব/পুলিশ কর্তৃক ক্রসফায়ারের মাধ্যমে বিচারবহির্ভুত হত্যাকাণ্ড দিন দিন বেড়েই চলছে। রাষ্ট্রিয় এমন হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ। দেশ-বিদেশের মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠনগুলো ক্রসফায়ারের মাধ্যমে এমন অমানবিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। তারপরও সরকার এমন ধরনের হত্যাকাণ্ডগুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসাবে ক্রসফায়ারকে সরকার ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে আবার ক্রসফায়ার। গল্পকার সুমন রহমান এর ক্রসফায়ার নিয়ে চমৎকার একটি গল্প " নিরপরাধ ঘুম"। ইস্টিশনের পাঠকদের জন্য শেয়ার করা হল।]

– রাশেদ নাকি রে?
– কেমন আছ, মা?

সন্ধ্যার আবছা আলোয় এসব প্রশ্নের কোনোটাই প্রশ্নকারীদের মাঝে উত্তর না-পাওয়ার যাতনা তৈরি করে না। আমি পিছন ফিরা গেইট বন্ধ করি, আর মা করিডোর বরাবর হাঁটা শুরু করে। লম্বা, চলটা-ওঠা করিডোর। বামপাশের প্রথম ঘরটা আমার, পরেরটা শাহেদের। তারপরে ডানদিকে রান্নাঘর, পরেরটা খাবারঘর। করিডোরের শেষ মাথায় বাবা-মার ঘর। এইরকমই তো আছিল, নাকি? আগে ঘরগুলোতে ঝমাঝম আলো জ্বলত, এখন অন্ধকার। শুধু মা-র ঘরটা খোলা। আমি মা’র পিছন পিছন হাঁটা দিই।

– আজকেই ছাড়ল। র্যাবের অফিসার বলল, রাশেদ সাহেব বাড়ি যান। উই আর স্যরি, আপনি সেই লোক নন। তারপর হাসপাতালে অ্যাডমিশন করাইল। তিনদিন পর আজকে রিলিজ নিয়া আসলাম।

– ঘরে গিয়া ফ্যান ছাইড়া বস। যা গরম পড়ছে। শরবত নিয়া আসি।

মা’র ভাবান্তর হয় না। আমি ঘরে না গিয়া রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াই।

– তুমি নিশ্চয় ভয় পাইছো আমারে ক্রসফায়ার-টায়ার কৈরা দেয় কিনা!

মা শরবত বানায়। কিছু বলে না।

– আরে বোকা বেটি, অ্যাত্ত সহজ! দেশে আইনকানুন আছে, মিডিয়া আছে। খামাখাই ধৈরা নিয়া মাইরা ফালাইব? র্য্যাবের অফিসার তো বলল ওরা অন্য এক রাশেদরে খুঁজতে গিয়া ভুল কৈরা আমারে ধরছিল। ঐ ব্যাটা হৈল অস্ত্রের চোরাচালানী! কও দেখি কী সাংঘাতিক! নামে নামে যমে টানে।

আমি খামাখাই হাসি।

– নে। শরবত খা।

গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ঘরবাড়ি দেখি। এই কয়দিনেই ঝুলকালি জমছে অনেক, চলটা চলটা আস্তর নাই ছাদের এইখানে ওইখানে। নাকি আগেই এমন ছিল, হয়তো খেয়াল করি নাই। বাড়ি যখন বানানো হৈল, সবাই বাবারে বলল, কী মিয়ার বেটা হাসপাতালের মতো সিস্টেম কৈরা বাড়ি বানাইলেন? বাবা হাইসা ক’ন, এবার দেখমু কোন পোলায় কয়টায় বাড়ি আসে? সেসময় আমি সারাদিন ঘুমায়া সন্ধ্যাবেলা বাইর হৈতাম আর মাঝরাত পর্যন্ত ক্লাবে তাস খেলতাম। শাহেদ আরো এক দান উপরে। ক্লাশ নাইন থিকাই ওরে পাড়ার লোকে ‘ডাইলখোর’ শাহেদ ডাকত। পাড়ার মাস্তান রাজুর বগলদাবা হৈয়া ঘুরত, বাড়ি ফিরত দুই-তিনদিন পরপর। ফিরা সারাদিন ঘুমাইত। দরজা ঝাঁকাইলেও খুলত না।

– কারেন্ট গেল কতক্ষণ?

– লাইন কাইটা দিছে গত মাসে। বিল জমছে অনেকগুলা।

– দেখি কাল সকালবেলা বিলটিল দিয়া লাইন লাগায়া আনব।

মা হারিক্যান জ্বালায়। আমি দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া দেখি। এখান থিকা বাবার চেয়ারটা আবছা দেখা যায়। নতুন বাড়িতে ওঠার পর থিকা বাবার নতুন রুটিন। এই চেয়ারে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা। কিন্তু তার রাত দশটায় তার পোলাপাইনের তো খালি সন্ধ্যা! তখন গজগজ করতে করতে দরজায় তালা দিতেন। বাইরে কলাপসিবল গেইটেও।

বছরখানেক এইরকম হালুয়াটাইট অবস্থা ছিল। ছাদের এক জায়গা দিয়া গ্রিল ভাইঙ্গা নিছিল শাহেদ। সেইপথ দিয়া দুই ভাই বাড়িতে ঢুকতাম কখনো মাঝরাতে, কখনো ভোরবেলা। তারপর একদিন তো বাবা নিজেই কলাপস করলেন। একখান হার্ট অ্যাটাক, তাতেই পগার পার। তখন আমাদের পায় কে? আমি যদি ফিরি রাত তিনটায়, শাহেদ ফিরবে পাঁচটায়। শেষরাতে মা’র আর ঘুমই হৈত না। কলবেলের শব্দ পাইয়া ঘর থিকাই গলা চড়ায়া ডাকত, রাশেদ নাকি রে? আমি বলতাম, খোলো। শাহেদ তাও বলত না। ফ্লোরে জুতা ঘষত জোরে জোরে। আর মা বলত, আইছে বোবা ডাকাইত। সেই ভোররাতে আবার খাবার গরম করত মা। যতক্ষণ খাইতাম, টেবিলে বৈসা থাকত। আর বলত, এত রাইত পর্যন্ত বাইরে কী করিস? আরো লোক থাকে? আমি হু হা করতাম।

বয়াম ঝাইড়া মা চিনি বাইর করার চেষ্টা করে। আমার দিকে তাকায় না একবারও। আমি মা’র মুখটা দেখি ভালো কৈরা।

– চিনি ফুরায়া গেছে। আনা হয় নাই।

– বাজারসদাই কে করে? কাটাকুটি?

– একটা ছুটা বুয়া আছে। ওর পোলাটা বাজার কৈরা দেয়।

– ওদের বাড়িতে থাকতে কৈতে পার নাই? একা একা থাকছ!

ছাদের ভাঙা গ্রিলের দিকে তাকায়া বলি। কাল এইটার জন্য মিস্ত্রি আনা লাগবে। মা কিছু বলে না। চশমার ভিতরে মা’র কুয়ার মতো গহিন একজোড়া চোখ। অচেনা লাগে।

মুন্না মার্ডারের চার্জশিটে যখন শাহেদের নাম ঢুকাইল, ওরে রাতারাতি মালয়েশিয়া পাঠায়া দেওয়া-ছাড়া উপায় কী ছিল? বাবা নাই, সংসারে চরম বিশৃঙ্খলা। চাচারাও বিট্রে করছে জমিজমার হিশাব লৈয়া। ভাগে যতটুকু পাইছি, বেইচা দিয়া শাহেদরে বিদেশ পাঠাইলাম। কিন্তু পোড়া কপাল, শাহেদের কোম্পানি পড়ল দুই-নম্বর। যাওয়ার পরপরই মালিক পাসপোর্ট সিজ করল, আর ওরে-সহ আরো তিরিশজনারে এক গুদামঘরে আটকায়া রাখল দিনের পর দিন। কাম নাই, বেতন নাই, দুতিনদিন পরপর কিছু বাসি রুটি আর বিস্কুট দিয়া যাইত। একদিন শাহেদ-সহ আরো পাঁচজন পালায় সেই ঘর থিকা, জানালা ভাইঙ্গা। পাসপোর্ট নাই, দিনের বেলায় থাকত জঙ্গলে, পালায়া পালায়া ছুটা কাম করত আর মসজিদে ঘুমাইত রাতের বেলায়।

মাঝে মাঝে ফোন করত। আমারে বলত, ভাইজান তুমি একটু থানায় গিয়া দেখো না ফাইনাল রিপোর্টে আমার নামটা কাটায়া দেওয়া যায় কিনা। মুন্নারে তো আমি মারি নাই। রাজু ভাই নিজে ওর মাথার মধ্যে গুলি করছে। আমি খাড়ায়া ছিলাম, মুন্না আমার পায়ে ধৈরা কী কান্দনটাই না কানছে! শেষে রাজুভাইরে আমি না-মারার জন্য রিকোয়েস্ট কৈরা চটকানাও খাইছি। এইজন্যই পরে হালায় আমারে হুদাহুদি ফাঁসাইছে। রাজুর নাম তো পয়সা খাইয়া চার্জশিট থিকা কবে কাইটা দিছে সাব-ইন্সপেক্টর! তুমি একটু দেখ না ভাইজান!

আমি বলতাম, দেখুম নে। বিদেশ পাঠাইছি, থাক কিছুদিন।

শাহেদ কাঁদো কাঁদো গলায় বলত, ভাইজান খুব খারাপ জায়গা। পাসপোর্ট নাই, পুলিশ ধরলে সোজা ডিটেনশন সেন্টারে নিয়া পিটায়া মাইরা ফালাইব। আর পকেটে দুইচাইর টাকা যদি জমে, তামিল বদমাইশরা আইসা মাইরা-পিট্যা নিয়া যায়। খুব মারে ভাইজান, টাকা দিলেও মারে। দেশে আইসা ব্যবসা করুম, অনেক শাইন করুম দেইখো তুমি! তুমি আমার মায়ের পেটের ভাই, কিছু করবা না?

ওর বলার ভঙ্গিতে হাসি লাগত। বলতাম, ঠিক আছে, এত ঘন ঘন ফোন করনের দরকার নাই। দেখি কী করা যায়।

এর মাত্র মাসখানেক পরই শাহেদের লাশ আসে। এয়ারপোর্ট থিকা যেদিন ওর লাশ নিয়া আসি, বেদম বৃষ্টি! পুবাইল রেলক্রসিং-এ লরি উল্টায়া যাওয়ায় লম্বা জ্যাম, পাঁচ ঘণ্টা বৈসা থাকলাম লাশের গাড়িতে। চিনার উপায় ছিল না ওরে। মাইরা জঙ্গলে ফালাইয়া রাখছিল, চেহারাছবি পুরা ভচকায়া গেছে। শুধু কাপড়চোপড় দেইখা চিনছে সাথের লোকেরা। কে মারছে কেন মারছে কেউ বলতে পারে না। রেলা পুলিশ হৈতে পারে, এজেন্টের লোকেরা হৈতে পারে, তামিল হাইজ্যাকারও হৈতে পারে। শাহেদের সঙ্গীসাথিরা ফোনে বলল, ভাই লাশ পাঠাইয়া দিতেছি চান্দা তুইলা। ইল্লিগ্যাল শ্রমিকের ডেথ বেনিফিট নাই। তাও কপাল ভালো যে লাশটা পাইছেন। আমাগো লাশ দেশে ফেরত যাইব কিনা খোদাতালা জানে।

– চিনি কম হৈয়া গেছে বাপ। খাইয়া ফালা।

এই প্রথম আমার দিকে তাকায় মা। হাসে একটু যেন। মা’র দুই চোখের জায়গায় দুইটা কুয়া। আমার চোখ যেন কোথায় অতলে চলে যায়! আমি দৃষ্টি ফিরাই। লেবুর গন্ধ নাকে লাগে।

– দেখি, কাল সকালে একবার কবরস্থানে যামু। এখন একটু ঘুমাই, যা ধকল গেছে।

– থানায় নিয়া তোরে খুব মারছে নাকি রে?

মা’র নিষ্করুণ গলা।

– হ। পরে যখন র্যাবের ক্যাম্পে নিল, আর বেশি মারে নাই।

– ঠিকাছে, ঘুমা বাপ। আমি রান্না বসাই গিয়া।

ঘরের দরজা ঠেলা দিতেই ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগে। জানলা খুইলা দিই, সন্ধ্যার লালিমা তখনো মিলায় নাই। ঠান্ডা বিছানা, আলগোছে শুই। আলোআঁধারির মাঝে আমার নিজ ঘরে আমি চোখ বন্ধ কৈরা ঘুমাই। আমি ঘুমাই, আবার আমি যে ঘুমাইতেছি সেইটা আবছা-আবছা টের পাই ঘুমের মধ্যে। দূরে, বাবা-মা’র ঘরে, দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং কৈরা সাতটা বাজে। একটা ধাড়ি ইঁদুর ঘরের মেঝেতে, টেবিলের কাগজপত্রের মাঝ দিয়া সড়সড় কৈরা দৌড়ায়, শুনি ঠিক ঠিক। আমার সিঁথানে বৈসা আমার এই নিরপরাধ ঘুমটারে যেন আমিই পাহারা দিই।

এইরকমই ঘুমাইতেছিলাম, শাদা পোশাকে পুলিশের লোক যখন আমারে ধরতে আসে। সেইটা শাহেদের মৃত্যুর কয়েকমাস পর। প্রথমে তো বুঝিই নাই, ভাবছিলাম ডাকাইত। ধৈরাই চোখ বাইন্ধা ফেলে আর পিছমোড়া দিয়া হ্যান্ডকাফ লাগায়। মা’র গলা শুনি, ফিসফিস কৈরা জিগাইতেছিল, আপনারা কারা, কী করছে আমার পোলায়, ওরে কৈ নিয়া যান? কেউ জবাব দেয় না। সারা বাসায় ওলটপালটের শব্দ, এইটা সেইটা ভাঙার শব্দ। ট্রাংক-ড্রয়ার সব ভাইঙ্গা সাফা কৈরা ফেলে। আমার চোখ বান্ধা, কিছুই দেখি না।

– লেখেন, হ্যান্ড-গ্রেনেড চাইরটা, অটোম্যাটিক একটা, বিচি দুই ডজন।

– জেহাদি বই?

– ফাইজলামি করেন? এইটা কি জেহাদি বইয়ের কেইস নাকি?

এরা নিজেরা নিজেরা নানান কথাবার্তা বলে। তারপর গাড়িতে তোলে আমারে, গাড়ি স্টার্ট দেয়। থানায় যাওয়ার পর চোখ খুইলা দিলে দেখি, সেকেন্ড অফিসারের হাতে কাগজ-কলম।

– নাম?

– আমার নাম রাশেদ, স্যার। স্যার, আমারে ধৈরা আনছে কেন?

– মুসলমানি করাইতে। হুমম…রাশেদুর রহমান ওরফে কাটা রাশেদ ওরফে মুনীর। সেকেন্ড অফিসার খসখস কৈরা লেখে।

– কী কৈতেছেন এইসব?

– আপনিও কৈবেন একটু পরে র্যাবের দাওয়াতে গিয়া। ভুল কৈতেছি নাকি, খানকির পোলা? তোর ছোট ভাইয়ের নাম কী?

কোমর-বরাবর একটা রুলের বাড়ি পড়ে। আমি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খায়া জোরে চিৎকার দিই, তারপর ফোঁপাইতে থাকি।

– শাহেদ।

– মরহুম টেরর ডাইলখোর শাহেদুর রহমান। শুদ্ধ কৈরা বল? বল?

– মরহুম টেরর ডাইলখোর শাহেদুর রহমান।

– মানিকরতন! ভাই আছিল টেরর আর তুই আর্মস ডিলার! তোর বাপে কী করত রে?

– কাঠের ব্যবসা।

– বাপে করত কাঠের ব্যবসা আর পোলায় করে লোহার ব্যবসা! বাপকা বেটা!

ননস্টপ চলতে থাকে রুল।

– ভাই আপনাগো ভুল হৈতেছে। আমি লেখাপড়া করি, সামনের বার ডিগ্রি পরীক্ষা দিমু। সবাইরে জিগায়া দেখেন।

– এমন ভদ্রলোকের বাসায় এক হালি গ্রেনেড আইল কেমনে রে, শুওরের বাচ্চা! তুই কি মুরগি, ডিম পাড়ছস?

– আমি জানি না। জীবনেও গ্রেনেড দেখি নাই। খোদার কসম ভাই, আমি কিচ্ছু জানি না।

– ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে। ধরলাম আমরা, ওয়ান সিক্সটি-ফোর দিবি না। তারপর র্য্যাব আইসা যখন থানা থিকা নিয়া যাইব, তখন সুড় সুড় কৈরা দিবি। তারপর সংবাদ সম্মেলনে যাবি, তাগো মাঝখানে খাড়ায়া কাটা-হাতে পোজ দিবি, রাতের বেলায় তোরে নিয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে যাবে। তখন কী হবে, বল তো হারাধন! এখনো বলি, ওয়ান সিক্সটি-ফোর দিয়া হাজতে ঢুক বাঁচতে চাইলে।

ততক্ষণে, মাত্র দশমিনিটের মাইরে আমার ঠোঁট আলু, এক চোখ বুইজা গেছে পুরাপুরি। সারা শরীরে পিটাইছে ইঞ্চি ইঞ্চি মাইপা। প্যান্ট ভিজা গেছে পেশাবে। ঘড়ঘড় কৈরা তবু বলার চেষ্টা করি।

– ভাই ভুল হৈতেছে আপনাদের। আল্লা আমারে বাঁচাও!

মুখ দিয়া কোনো শব্দ বাইর হয় না। স্বপ্নে যেমন মানুষের জবান আটকায়া যায়।

দিন যে কিভাবে কাটে! রাতের পর রাত নির্ঘুম হাজত, রিমান্ড, মশা, ঘিনঘিনা গরম, গুয়ের গন্ধ, বমি, তারপর একদিন সকালবেলার শান্ত নদীর পাড়। র্য্যাবের সার্জেন্টরে মিনতি কৈরা বললাম, ভাই হ্যান্ডকাফটা খুইলা দিবেন, একটু হাঁটব! আমার হ্যান্ডকাফ খুইলা দিল সে। কী যে আরাম লাগতেছিল! মনে হৈতেছিল দোযখ থিকা মুক্তি পাইছি। সার্জেন্ট বলল, সিগারেট খাইবা একটা? কী একটা স্বপ্নের মধ্যে যেন হাঁটতেছিলাম, আর আমি স্বপ্নের মধ্যেই যেন জানতাম যে এইটা স্বপ্ন, তাই ভয়ডর লাগতেছিল না একদম।

ছিঁড়া ছিঁড়া ঘুম, কই থিকা কৈ লৈয়া যায়! একবার দেখি ক্লাবে তাস খেলতেছি, একবার দেখি মাঠে ফুটবল খেলতেছি, একবার দেখি জেলখানায় পিটাইতেছে, একবার দেখি শাহেদের লাশ কবরে নামাইতেছি। আবার মা’র ঘরে দেয়ালঘড়ি ঢং ঢং করতে শুরু করে, ঘুমের মধ্যেও পরিষ্কার গুনি, আটটা বাজে। বাইরে এখন পুরাপুরিই অন্ধকার। সারা শরীরে ব্যথা, ঘরের মধ্যে ইঁদুরের বোঁটকা গন্ধ। আহা, কতদিন পর নিজের ঘরে ঘুমাইলাম! স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় ঘুমায়া পড়তাম। আব্বা আইসা জাগাইত। বলত, সন্ধ্যাবেলা ঘুমাইতে নাই, উঠ বাবা। উঠ। আর আমি ঘুমের ঘোরে বলতাম, ধুর কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান কৈরেন না তো! এখন তো বাবা নাই, অন্ধকারে কানের কাছে মশা ভন ভন করে। দরজায় কলবেল বাজে।

– কে যেন আসছে, মা।

ঘুমলাগা গলায় মা’রে ডাকি। গেইটের ফ্লোরে জুতার ঘষটানি। পরিচিত ভঙ্গি।

– শাহেদ আসছে রে বাপ। তোর ঘুম হৈয়া গেল?

দরজা খুলতে খুলতে মা বলে।

– শাহেদ?

এবার আমি ধড়ফড় কৈরা উঠি। দেখি, সত্যি-সত্যিই বাসায় ঢুকতেছে আমার ছোট ভাই শাহেদ। আমার পিঠাপিঠি ভাই, একসাথে ইস্কুল-পালানো নদী-সাঁতরানো ভাই। পাড়ার উঠতি টেরর রাজু-র অ্যাসিস্টেন্ট, মুন্না মার্ডারের আসামি, মালয়েশিয়ায় খুন হয়ে-যাওয়া শাহেদ। মা’র হাতে ধরা হারিক্যানের আলোয় ওর চেহারা আবছা আবছা দেখি। আব্বা মারা যাওয়ার পরে জমিজমা বেইচা ওরে আমি বিদেশ পাঠাইছিলাম। সাথে সাথে বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে হয়, তাইলে শাহেদ নিশ্চয়ই মরে নাই! নিশ্চয়ই ভুল হৈয়া গেছিল! হয়তো আরেকজনরে শাহেদ সাব্যস্ত কৈরা আমাদের ঠিকানায় পাঠাইছিল। চেহারা দেইখা হয়তো চিনার উপায় ছিল না। হয়তো লাশের গায়ে একটা পোলো গেঞ্জি ছিল, শাহেদও সেইরকম একটা গেঞ্জি পরতো। এই ঘটনার কিছুদিন পর শাহেদ কি ফোন করছিল? শাহেদ কি বলে নাই যে, ভালো চাকরি পাইছে? অভারটাইম আছে? বেতন ভালো? ভালো আছে? আস্তে আস্তে আমার স্মৃতি থিকা শাহেদের কবর ঝাপসা হৈয়া যায়। শান্তি লাগে।

আমি আবার বিছানায় শুই। মা আইসা মাথার কাছে দাঁড়ায়।

– টেবিলে খাবার দিছি। ওঠ। হাতমুখ ধুইয়া খাইতে আয়।

– আসি, মা।

– কী যে ধান্দার মধ্যে থাকস তুই!

নিষ্করুণ, শান্ত গলায় বলে মা। শাহেদ আইসা হেলান দিয়া দাঁড়ায় দরজায়। পরিচিত ভঙ্গি। দুই হাত আড়াআড়ি বুকে ভাঁজ করা।

– কী যে চক্করে পড়ছ ভাইজান! সন্ধ্যাবেলা না-ঘুমাইলে পারো না?

সমাহিত সুখী চেহারা শাহেদের। আমি উইঠা বসি। অপ্রস্তুত লাগে। দরজায় আবার বেল বাজে। এবার অবশ্য ভড়কাই না। কে আসছে, বুঝতেই পারি।

– তোর আব্বায় আসছে। তাড়াতাড়ি উঠ, হাতমুখ ধুইয়া খাবার টেবিলে আয়।

হ্যারিকেন-হাতে গেইট খুলতে যায় মা।

বিভাগ: 

Comments

মনির হোসাইন এর ছবি
 

গল্পকার সুমন রহমানের ভালো গল্পের মধ্যে অসম্ভব ভালো একটি গল্প এটি। তাঁর এই গল্প এই গল্পের প্লট, রাজনীতি, থেকে আজকের সময়কে একদম ঠিকঠাক তুলে ধরেছেন। আবার তা সংবাদ পাঠ নয় পুরোদস্তুর একটি গল্পই করেছেন। স্রেফ গল্পের জন্য গল্প নয় এই 'নিরপরাধ ঘুম'। গল্পের এই আকালে আস্ত এক উপন্যাস বলে যান যেনো গল্পকার। সমাজের পচাগলা রূপ থেকে বাসার ছাদ কার্নিশ কিছুই বাদ যায় নি! অসম্ভব ভালো একটি কাজ এই গল্পটি। আর এই ঠাণ্ডা মাথার ভয়াল খুনেদের গণ-খুনোখুনির সময়ে র‍্যাবের যে খুন সন্ত্রাস তা দৈনিকের কলাম ছাপিয়ে কেমন করে সাহিত্যে জায়গা করে নিচ্ছে তারও নজির থাকল। আহ্বান থাকল সময় নিয়ে সবাই পড়ুক এই গল্পটি।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মেইল ট্রেন
মেইল ট্রেন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 year 4 months ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 26, 2014 - 5:56অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর