নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

বনসাই হৃদয়ের মানুষের শহর


গলিটার দু-পাশ মিলিয়ে অন্তত বিশটা বাড়ি, অধিকাংশই চার থেকে সাত তলা, অন্তত দুইশো ফ্ল্যাট, ফ্ল্যাটগুলোতে বারোশ থেকে পনেরশো মানুষ বাস; অথচ গলিতে গাছ মোটে একটা, তারও নারকেল গাছ! নারকেল গাছের বিস্তার কম, ছায়া প্রায় নেই বললেই চলে। নারকেল গাছটির বাইরে এ গলিতে গাছ বলতে কয়েকটা বাসার বারান্দার টবে লাগানো ছোট ছোট গাছ। এই গলির মানুষের অক্সিজেনের যোগান আসে অন্যত্র থেকে। এশহরের অধিকাংশ গলির অবস্থাই এখন এই রকম। যেহেতু গলিতে গাছ নেই, সঙ্গত কারণেই পাখি নেই। পাখির ডাক এ গলিতে শোনা যায় না বললেই চলে। ব্যতিক্রম কেবল দুটি কাক। নারকেল গাছটি নিশ্চয় এতো মানুষের অক্সিজেনের যোগান দিতে পারে না, ছায়া দিতে পারে না, এমন কি ফলও দিতে পারে না। খুব অল্প সংখ্যক নারিকেল গুটি আসে আর একটু বড় হয়েই ঝরে পড়ে। অর্থাৎ নারকেল গাছটি সুস্থ নয়। তবু ওই কাক দুটিকে আশ্রয় দিয়েছে নারকেল গাছটি। কাক দুটি খড়-কুটো কুড়িয়ে নারকেল গাছে বাসা বেঁধেছে। আশপাশের ডাস্টবিন কিংবা কোথাও জমা করা ময়লার স্তুপ ঘেঁটে হাঁস-মুরগির নাড়ি-ভুঁড়ি কিংবা পাখনাসহ একটু মাংস নিয়ে এসে নারকেল বাগড়োর ওপর বসে কাক দুটি খায় আর খুনসুটি করে, একে অন্যকে ভালবেসে আদরও করে। অনেকে কাককে ব্যঙ্গ করে বলে যে কাক হচ্ছে পাখির জাতের মধ্যে কলঙ্ক! কাকের গায়ের কালো রং আর কণ্ঠটা একটু কর্কশ বলেই মানুষ এমন বলে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে কাককে কি পাখি বলা যায়? নিশ্চয় যায়, কাকও পাখি। আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গরা কালো বলে কি মানুষ নয়, কেবল শেতাঙ্গরাই মানুষ? শেতাঙ্গদের মতো কৃষ্ণাঙ্গদেরও শরীর আছে, প্রাণ আছে, কথা বলতে পারে, হাঁটতে পারে, দৌড়তে পারে। বোবাদের কণ্ঠস্বর কর্কশ-অস্পষ্ট, তাই বলে কি বোবারা মানুষ নয়? নিশ্চয় মানুষ। তেমনি রাজধনেশ, মাছরাঙা, চন্দনা, লালমাথা কুচকুচি, বাংলা নীলকান্ত, শ্যামপাপিয়া, তোতা, টিয়া, সুইচোরার মতো কাকও পাখি।

এ গলির বারশো-পনেরোশো মানুষের মধ্যে নানান পেশার, নানান স্বভাবের মানুষ আছে। তাদের নানান কাজ, নানান ব্যস্ততার মাঝে গলিতে গাছ আর পাখির অভাব হয়তো তারা অনুভব করে না। তবে একজন করেন, এগলির একজন মধ্যবয়সী মানুষ, ইসহাক আলী। তিনি সবেধন নীলমনির মতো নারকেল গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকেন আর ভাবেন মানুষ বড় লোভী, নিষ্ঠুর আর আত্মঘাতী প্রাণি; নইলে গলিটাকে এভাবে গাছশূন্য করে কেউ! পরম মমতায় তিনি নারকেল গাছটি আর কাক দুটির দিকে তাকিয়ে থাকেন মাঝে মাঝেই। তার মতো আরো একজন তাকায়, সে নিতান্তই ছোট্ট শিশু। ইসহাক আলী যে ফ্যাটে ভাড়া থাকেন, তার উল্টোদিকের বাসার বারান্দার গ্রিল ধরে শিশুটি কাক দুটিকে দ্যাখে আর কী মনে করে একা একাই খিলখিলিয়ে হাসে। লোকটি ওই শিশুটির দিকে তাকিয়ে ভাবেন, আহা, এই গলিতে যদি আরো অনেক গাছ আর পাখি থাকতো, তাহলে শিশুটি আরো সমৃদ্ধ হতো। ছোট থেকেই অনেক গাছ আর পাখির সঙ্গে ওর পরিচয় হতো, শিশুটি প্রকৃতি থেকে আপনা-আপনিই অনেক কিছু শিখতে পারতো, ওর অভিজ্ঞতা বাড়তো। অথচ এই শিশুকে বড় হয়ে গাছ আর পাখি চিনতে হবে বই পড়ে অথবা ইন্টারনেট ঘেঁটে! ওরা বড় হতভাগ্য প্রজন্ম। অপরিকল্পিত নগরায়ন আর কলকারখানা স্থাপনে কতো নদী-খাল মরে গেছে এবং এখনো মরছে। এমনিতেই বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এন্টার্কটিকায় বরফ গলছে আর এর ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে গেলে পৃথিবীর অনেক স্থলভাগ তলিয়ে যাবে, হুমকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল।

ইসহাক আলী জানেন এই ঢাকা শহর চারটি নদী দ্বারা বেষ্টিত-বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী। আগে ঢাকা শহরে অসংখ্য খাল ছিল, যেগুলো মিশেছিল নদীগুলোতে, শহরের বৃষ্টির জল খালগুলো দিয়ে বয়ে যেতো নদীতে। দু-একটি বাদে সব খাল ভরাট করে বহুতল ভবন, মসজিদ, মার্কেট ইত্যাদি গড়ে তোলা হয়েছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে জল থৈ থৈ করে! মানুষের দোকানে-ঘরে জল ঢুকে যায়। খালগুলো তো ভরাট করেছেই, এখন নদী ভরাটে মেতেছে লোভী মানুষেরা, মরতে বসেছে নদীগুলো। ইসহাক আলী সামনের বারান্দার শিশুটির দিকে তাকিয়ে ভাবেন, আমরা আর আমাদের পূর্বের প্রজন্মই প্রকৃতি ধ্বংস করে ওই উত্তর প্রজন্মকে প্রতিকূল পরিবেশে রেখে যাচ্ছি।

এবার গ্রীষ্মের শুরুতেই আষাঢ়ের আমেজ। প্রকৃতিও এখন খামখেয়ালি পাগলির মতো আচরণ করছে। অসময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে, আবার বর্ষাকালে বৃষ্টির দেখা নেই। টানা বৃষ্টি পর শুরু হয়েছে গ্রীষ্মের দাবদাহ। গরমে তিষ্ঠোনো দায়! ইসহাক আলী একদিন দেখলেন একটি কাক বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে, আর আরেকটি পাশের ভবনের ছাদে জলের ট্যাঙ্কির পাইপের ওপর বসে পাইপের মুখে বারবার মুখ দিচ্ছে, কিন্তু পাইপ থেকে একফোঁটা জল বের হচ্ছে না। ইসহাক আলী ভাবলেন, আহা, এই খরতাপে কাকটি তৃষ্ণায় বড় কষ্ট পাচ্ছে।
ইসহাক আলী সেদিনই দুটো ছোট ছোট মাটির পাত্র কিনে আনলেন। একটাতে জল ভরে আরেকটায় কিছু ভাত রেখে বারান্দায় রাখলেন। তার বারান্দা থেকে নারকেল গাছের কাকের বাসার দূরত্ব হাত বিশেক। কাক দুটো কী করে যেন টের পেয়ে গেল যে বারান্দার পাত্রে ভাত আর জল আছে, সেদিনই উড়ে এসে বারান্দায় বসে কাক দুটো ভাত খেলো এবং পানি পান করলো।

এরপর থেকে তৃষ্ণা পেলেই ওরা এসে জল পান করে। ইসহাক আলী ওদের জল পান করা দেখে ভীষণ আনন্দ পান, তৃপ্তি পান। জলের পাত্র কখনো খালি রাখেন না তিনি, কিন্তু ভাতের পাত্র খালি হয়ে যায়। ভাত না পেলে কাক দুটো বারান্দায় এসে বসে ঘরের দিকে তাকিয়ে কা কা করে ডাকতে থাকে, অর্থাৎ ইসহাক আলীকে ডাকে ওরা, ওদের ভাষায় ভাত চায়। ইসহাক আলী না থাকলে তার স্ত্রী ভাতের পাত্রে ভাত রেখে দেন।

ইসহাক আলী বারান্দার টবে কিছু গাছ লাগিয়েছেন-তুলসী, আদা, গোলাপসহ আরো কয়েকটি গাছ। তিনি নিয়মিত গাছগুলিকে পরিচর্যা করেন। অবসরে তিনি বারান্দার চেয়ারে বসে থাকেন, টবের গাছগুলির দিকে তাকিয়ে থাকেন, নারকেলগাছ আর কাক দুটির দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাকিয়ে থাকেন সামনের বাসার শিশুটির দিকেও। কাক দুটি এখন আর তাকে ভয় পায় না। তিনি বারান্দায় বসে থাকলেও ওরা ওদের মতো এসে ভাত খায়, জল পান করে। দারুণ উপভোগ করেন তিনি, আর অভাববোধ করেন আরো গাছ এবং আরো পাখির।

সেদিন তার বাসায় এক আত্মীয় এসেছিল। বারান্দার টবে তুলসীগাছ দেখে বললো, ‘হায় আল্লাহ, ভাইজান আপনি এ কী করছেন!’
আত্মীয়ের অবাক হবার কারণ বুঝতে না পেরে তিনি বললেন, ‘কী করেছি?’
‘বাসায় তুলসীগাছ লাগিয়েছেন কেন? তুলসীগাছ তো হিন্দুরা লাগায়, হিন্দুরা তুলসীগাছ পূজাও করে! মুসলমানের তুলসীগাছ লাগানো উচিত নয়।’
‘তাই!’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে তো মুসলমানদের ধান লাগানোও উচিত নয়।’
‘কেন?’
‘হিন্দুরা তো ধানও পূজা করে। ছেলেবেলায় বন্ধুদের বাড়িতে দেখেছি, ওদের মায়েরা একটা টুলের ওপর এক আধলা ধান রাখে, তার মধ্যে একটা পাটকাঠি গুঁজে দেয়, তারপর সেটাকে কাপড় পরিয়ে লক্ষ্মী বানায়। ধানসহ ওই লক্ষ্মী পূজা করে। তাহলে কী আমাদের ধান লাগানো কিংবা ভাত খাওয়া উচিত?’

আত্মীয় আমতা আমতা বললো, ‘তুলসীগাছ আর ধান তো এক নয়।’

‘কেন এক হবে না? দুটোই তো হিন্দুরা পূজা করে? তারপর মনে করো হিন্দুরা বটগাছ, অশ^থগাছ পূজা করে। তাহলে তো মুসলমানদের বট আর অশ^থগাছে ছায়ায় যাওয়া উচিত নয়। তারপর ধরো নারকেল, হরিতকী, আমের পল্লব এসবও হিন্দুদের পূজায় লাগে।’
ইসহাক আলী কয়েক মুহূর্তের জন্য থামলেন, তারপর আবার বললেন, ‘ধর্ম ধর্ম করে মনটাকে এতোটাই ক্ষুদ্র করে ফেলেছো যে তোমরা গাছেরও ধর্ম দেখতে পাও! এই তুলসী পাতার কতো উপকারিতা জানো? তুলসীপাতা মাথা ব্যথা দূর করে, তুলসীপাতায় ফাংজিসাইডাল ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান আছে, যা দেহের অভ্যন্তরীন ইনফেকশন দূর করতে সাহায্য করে। তুলসীপাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, মিথাইল, ইউজিনল উপাদান আছে; যা রক্তের সুগারের পরিমাণ কমিয়ে রাখে। আর কে না জানে যে তুলসী পাতার রস কাশি দূর করে। এমন আরো কতো ভেষজগুণ আছে তুলসী পাতার। সেই প্রাচীনকাল থেকে বৈদ্যরা নানা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তুলসীপাতা ব্যবহার করে আসছে। হিন্দুরা পূজা করে বলে আমি তুলসীপাতার এই উপকারীতা ভুলে থাকবো! কোথায় আছো তোমরা? সেই কবে মানুষ চাঁদে গেছে, বাংলাদেশের মতো ধর্মান্ধ দেশও মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে, আর তোমরা এখনো মেরাজের গল্পে বিভোর হয়ে তুলসীগাছে হিন্দুত্ব খোঁজো!’

সেই আত্মীয়য়ের মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হয়নি। পরে হয়তোবা অন্যদের কাছে গিয়ে জাল বুনতে পারে, তা বুনুক, তাতে ইসহাক আলীর কিছু আসে যায় না। তিনি নিজের বিশ্বাসে, নিজের মতে অটল থাকেন সর্বদা। তার অনুশোচনা হয় এ জন্য যে শহরটায় আজকাল এইসব মানুষের সংখ্যাই বেশি!

ইসহাক আলী বারান্দার গাছের পরিচর্যা করতে করতে ভাবেন, ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে যদি এই শহরকে নিয়ে সুন্দর পরিকল্পনা করা যেতো, যদি নিয়ম করা হতো যে বাড়ি করতে হলে মোট জমির পঁচাত্তর ভাগে করতে হবে আর পঁচিশ ভাগে গাছ লাগাতে হবে, তাহলে প্রত্যেক বাড়িতে আজ গাছ থাকতো, এই শহরের আবহাওয়া আজ এমন রুক্ষ হতো না।

সেসব তো করা হয়ইনি উপরন্তু এখনো এই শহরের প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে। তিনি সেদিন উত্তরা যাচ্ছিলেন হঠাৎ-ই দেখলেন শ্যাওড়া রেলগেটের পাশের অশ্বথ গাছটি নেই। বুকের মধ্যে খাঁ খাঁ করে উঠলো তার। রেলগেটের একপাশে বটগাছ, আরেকপাশে অশ্বথগাছটি ছিল। কী সুন্দর ছায়া দিতো গাছ দুটি! এখন বটাগাছটি থাকলেও অশ্বথ গাছটি নেই। কে জানে কবে হয়তো বটগাছটিও হয়তো কেটে ফেলবে। শহর উন্নয়নের নামে এসব গাছ কাটা হয়। অথচ তিনি তার বন্ধু স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আকরামের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন যে এসব গাছ রেখেই উন্নয়ন করা যায় এবং সেটাই করা উচিত, কিন্তু একটি সরকারের স্বার্থান্বেষী মহল উন্নয়নের নামে এসব গাছ কেটে নিজেরদের পকেট ভারী করে।

এই বিমানবন্দর সড়কেই আগে অনেক গাছ ছিল। সেসব কেটে ফেলা হয়েছে। গত বছর সৌন্ধর্য বর্ধনের নামে চীন এবং তাইওয়ান থেকে আমদানি করে ফাইকাস জাতীয় বনসাই গাছ এনে লাগানো হয়েছে। একেকটি গাছের পিছনে খরচ হয়েছে গড়ে সোয়া লাখ টাকা। নব্বুইটি গাছ লাগানোর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে তুমুল সমালোচনা ওঠে, তীব্র সমালোচনার মুখে সওজ কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাতিল করতে বাধ্য হয়। এই প্রকল্পের আওতায় পাঁচশো গাছ লাগানোর কথা ছিল। ফাইকাস জাতীয় বনসাইগুলো না দেখতে সুন্দর, আর না দেয় ছায়া। সৌন্ধর্যের কথাই যদি ওঠে সওজ কর্তৃপক্ষের চোখে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, পলাশের কথা মনে পড়লো না, মনে পড়লো ভিনদেশী বনসাইয়ের কথা! ইসহাক আলীর মনে হয় মানুষের হৃদয় ক্রমশ ছোট হতে হতে বনসাইয়ে রূপান্তরিত হয়েছে!

ইসহাক আলী ঠিক করেছেন তিনি এই বনসাই হৃদয়ের মানুষের শহরে আর বেশিদিন থাকবেন না। রুটি-রুজির জন্য বাধ্য হয়ে তাকে এখানে থাকতে হচ্ছে। ছেলেটা সবে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করেছে আর মেয়েটা অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছে। ওরা দু-জন পাশ করে বের হয়ে চাকরিতে ঢুকলেই নিজের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এই শহর ত্যাগ করবেন তিনি। নিজের গ্রামেও তিনি যেতে চান না, ওখানকার মারাত্মক ভিলেজ পলিটিক্সে তিনি টিকতে পারবেন না। ইসহাক আলীর মতো মানুষদের এই হয়েছে এক জ্বালা, এরা না মানিয়ে নিতে পারছেন ঢাকা শহরের সঙ্গে, আর না মানিয়ে নিতে পারবেন গ্রামের পরিবেশে। তিনি জেলা শহরের প্রান্তে নদীর ধারে যে বাড়ি কিনেছেন সেখানেই চলে যাবেন। স্বামী-স্ত্রীতে মিলে নিজেদের মতো থাকবেন, গাছপালা আর পশু-পাখির সঙ্গে সময় কাটাবেন। অনেক রকম গাছ লাগিয়েছেন তিনি সেখানে, গাছে গাছে মাটির কলসি বেঁধে দিয়েছেন পাখিদের থাকবার জন্য। ঝড়-বাদলে পাখিরা বড় কষ্ট পায়, শিলাবৃষ্টি হলে শিলার আঘাতে অনেক পাখি মারা যায়। তাই তিনি গাছে গাছে কলসি বেঁধে দিয়েছেন। ছুটি পেলেই তিনি সেখানে চলে যান। ওখানে গেলে তার মনে হয়, মিথ্যেই মানুষ স্বর্গের গল্প ফাঁদে, আসলে যার মন যেখানটায় শান্তি পায়, সেখানটাই তার স্বর্গ।

ইসহাক আলী বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করলেন কাকের ডিম দুটো ফুটে বাচ্চা বেরিয়েছে কিনা। না, এখনো বাচ্চা বের হয়নি। বারান্দার শিশুটি গ্রিলের ওপরে উঠে পড়েছে, তাকিয়ে আছে কাকের বাসার দিকে আর মুখে অদ্ভুত শব্দ করছে। ইসহাক আলী শিশুটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন এবং সফলও হলেন তিনি। হাত নাড়লেন, কথা বললেন, শিশুটি খিলখিলিয়ে হাসলো। একটু পর ওর মা এসে ওকে ঘরে নিয়ে গেল।

আজ ছুটির দিন। তাই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠার তাড়া নেই ইসহাক আলীর। রোজকার চেয়ে একটু বেশি সময় গড়িয়ে নিচ্ছেন। হঠাৎ কাক দুটোর অস্বাভাবিক ডাকাডাকিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। কাক দুটো এতো সকালে এভাবে ডাকছে কেন? ওদের কি খুব ক্ষিধে পেয়েছে? বিছানা ছেড়ে উঠলেন তিনি। তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর আগেই দুম করে শব্দ হলো, বারান্দায় এসে দেখলেন নারকেল গাছটি মাটিতে পড়ে আছে। করাতিরা গাছটি কেটে ফেলেছে। কাক দুটো সেদিকে তাকিয়ে একবার এ বাসার বারান্দার গ্রিলে এসে বসছে তো আবার সামনের বাসার ছাদের রেলিংয়ে বসছে আর কা-কা করছে। নিশ্চয় ডিম দুটোর শোকে তীব্র বেদনায় কা-কা করছে কাক দুটো। দৃশ্যটি দেখে ইসহাক আলীর বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠলো, চোখে প্রায় জল এসে গেল।

তিনি উচ্চস্বরে করতিদের বললেন, ‘গাছটা কাটলে কেন?’
একজন বললো, ‘রাস্তা কেটে রিং বসাবে তাই।’

আবার সেই উন্নয়নের ধোঁকাবাজি! নারকেল গাছটি ছিল রাস্তার একপাশে, গাছটি বাঁচিয়ে রেখেই রাস্তা খুঁড়ে রিং বসানো যেতো। এখন সারা শহরের রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, কতো গাছ যে এভাবে বিনা কারণে ধ্বংস করা হয়েছে তার ঠিক নেই।

কাক দুটোর কা-কা আর্তধ্বনি ইসহাক আলীর বুকে বিঁধছে সুচের মতো! নিচে নিচে নেমে গেলেন, যদি কাকের বাসা আর ডিম দুটো অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়, তবে তিনি ডিমসহ বাসাটা বারান্দায় রেখে দেবেন, তাহলে কাক দুটো তার বারান্দাতেই থাকবে। একটু খুঁজতেই তিনি কাকের দুমড়ানো-মুচড়ানো বাসাটা দেখতে পেলেন, তারপর তার দৃষ্টি পড়লো রাস্তায় থেতলানো ডিম দুটো, ডিমের মধ্যে কাকের ভ্রূণ অনেকটাই বড় হয়েছিল। তার চোখে জল এসে গেল, তিনি নিজেকে সংযত রেখে বাসায় ফিরে এলেন। তার মনে হলো, হত্যা করা হলো দুটো প্রাণ। এর দায় কে নেবে? তারপর নিজেকে প্রবোধ দিলেন এই বলে যে, যে বনসাই হৃদয়ের মানুষের শহরে মানব-ভ্রূণ নষ্ট করা হয় অসংখ্য, রাস্তাঘাটে পরিত্যক্ত নবজাতক পড়ে থাকে, সেই শহরের মানুষের কাছে কাকের ভ্রূণ নষ্ট করা অত্যন্ত মামুলি ব্যাপার।
কাক দুটো কা-কা করেই চলেছে। ইসহাক আলীর মনে হলো তিনি যদি এখন একটা দৌড় দিতে পারতেন, এক দৌড়ে এই শহর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারতেন তবে শান্তি পেতেন।

বিকেলেই কাকদুটোকে আর দেখতে পেলেন না ইসহাক আলী। ভাবলেন ওরা আশে পাশেই কোথাও আছে। তাই তিনি মাটির পাত্র দুটিতে ভাত আর জল রেখে দিলেন। কিন্তু কাক দুটি আর এলো না। পরদিনও এলো না, তারপরদিনও না। রোদের তাপে ভাতগুলো চাল হয়ে গেল পুনরায়, আর জল শুকিয়ে যেতে লাগলো। কাক দুটো কি এই শহর ছেড়ে চলে গেছে? যাক, এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ায়ই ভাল, এখানে ওরা নিরাপদ নয়।

ইসহাক আলী ভাবলেন দিনে দিনে এই শহরে গাছ কমে যাচ্ছে, পাখিরা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আগে কতো বানর ছিল, এখন অল্প কিছু বানর পুরনো ঢাকায় ধুঁকে ধুঁকে কোনোরকমে টিকে আছে। প্রাচীন নগর আর সভ্যতাগুলো হয়তো মানুষের অত্যাচারে এভাবেই ধ্বংস হয়েছিল।

যেখানে পর্যাপ্ত গাছ নেই, পশু নেই, নানান রকম পাখির কলতান নেই, বিচিত্র প্রাণের স্পন্দন নেই, সেখানে জীবন পূর্ণতা পায় না। যে মানুষের জন্য এই উন্নয়ন সেই মানুষের জন্যও এখানে পর্যাপ্ত পার্ক নেই, খেলার মাঠ নেই, চিত্তের ক্ষুধা মিটানোর জন্য পর্যাপ্ত গ্রন্থাগার নেই; কেবল নেই আর নেই! এই শহরে তো সংস্কৃতি এবং সভ্যতা বিধ্বংসী বনসাই হৃদয়ের মানুষই গড়ে উঠবে। এই বনসাই হৃদয়ের মানুষের শহর ছেড়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব ইসহাক আলী চলে যেতে চান প্রাণ ও প্রকৃতির কাছে।

ঢাকা
মে, ২০১৮।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Offline
Last seen: 9 ঘন্টা 4 min ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর