নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • উদয় খান

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে ৪:


পুঁথিগত বিদ্যায় বহু পিছিয়ে থাকা আমার ঠাকুমা, ১৯৫০ এ পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানে তার নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে জান বাঁচানোর জন্য সকলকে নিয়ে এপার বাংলার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল | কিন্তু অনেক বিদ্বানরাই, তখনো নিজের জন্মভুমিতে তাদের চরম পরিণতির কথা আঁচ করতে পারেনি আর তাই তারা নিজ জন্মভূমি আঁকড়ে পরেছিল | হায়রে! তারা যদি তখন স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারত কি দিন তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তাহলে হয়ত আমার ঠাকুমার মত, তারাও নিজ দেশ ত্যাগী হত | এরকমই একজন বিদ্বান মহিলা বরিশালের এক কলেজ অধ্যক্ষা শান্তিসুধা ঘোষ ১৯৫০ এ, নিজ জন্মভূমিতে প্রায় মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিল | চলুন পাঠক ওনার সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কিছুটা জেনে নি:

১৯৫০ সালের ১০ই, ফেব্রুয়ারি | শান্তিসুধা দেবীর বাড়ির পশ্চিমাংশের ভাড়াটের ছেলে কালিপদ, বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে ওনাকে বলল: পিসীমা আজ কিন্তু আশপাশের হাওয়া গরম ! শান্তিসুধা দেবী ব্যাপারটা ইয়ার্কি করে উড়িয়ে দিলেন, বললেন: পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে তো হাওয়া সবসময় গরম | শান্তিসুধা দেবীর বাড়িতে তখন থাকে বৃদ্ধা মা , উনি নিজে এবং একজন ছাত্র সুখরঞ্জন | রাত্রি সাড়ে নটা নাগাদ খাওয়া শেষ করে সকলে হাত ধুতে গেলে দেখা গেল আকাশের একটা দিকে লাল রং | তবে কি আগুন লাগল ? সকলের মনে আশঙ্কা | রংটা দেখা যাচ্ছে দালানের ছাদের ঠিক পিছন দিকটাতে, বাড়িটা থেকে বেশ কিছু দূরে | হঠাৎ বাড়ির বিপরীত কোনের দিক থেকে 'আল্লাহু আকবার' শব্দ ভেসে এলো, আর সঙ্গে সঙ্গে আগুনের শিখা লকলক করে উঠলো ! এবার আর কারো মনে সন্দেহ রইল না যে আগুন লেগেছে অতুলনগরের নলিন, চিন্তাহরণ বাবুদের বাড়ির দিকটায় | শান্তিসুধা দেবী এতক্ষণে বুঝতে পারলেন কালিপদ গরম হাওয়া বুঝাতে কি বলেছিল ! শান্তিসুধা দেবীর বাড়ীর গা দিয়ে যে গলিটা পশ্চিম দিকে চলে গেছে সেখানে সাড়ি দিয়ে হিন্দুদের বাড়ি | মুহূর্তের মধ্যে সেখানে আগুনের শিখা দেখা গেল | শান্তিসুধা দেবীর পাশের বাড়িটি ছিল তার পিসেমশাইয়ের | প্রমাদ গুনে, আর দেরি না করে শান্তিসুধা দেবী আর সুখরঞ্জন কোনরকমে শান্তিসুধা দেবীর অসুস্থ মাকে ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে সেই বাড়িতে আশ্রয় নিল কারণ বাড়িটিতে ভাড়া থাকতো এক মুসলমান পুলিশকর্মী | বাঙালি মুসলমানদের সেই গর্বের জিহাদের দিনে এর থেকে নিরাপদ আশ্রয় আর কি হতে পারে ! চারিদিকে তখন আগুন আর আকাশ মন্থন করা চিৎকার আল্লাহু আকবার ! অজানা ভবিষ্যতের আশায় শান্তিসুধা দেবীদের সাথে যারা ঐ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল সকলেই উদ্ভ্রান্ত, শূন্য দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছে পরবর্তী পরিণতির জন্য | আগুন তো আর হিন্দু মুসলমানের বিভেদ জানেনা ! নানা জনের মুখে তখন নানা উত্তেজিত গুজব চর্চা হচ্ছে যেমন কলকাতায় নাকি ফজলুল হককে হিন্দুরা হত্যা করেছে, আর তারই বদলা নিতে বরিশালের বাঙালি মুসলমান রাস্তায় নেমেছে ! অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়, ইসলামে তাকিয়ার প্রয়োগ না হলে তো ইসলামই টিঁকতো না ! কলকাতা ফজলুল হককে হত্যাটা ঠিক এরকমই একটি ইসলামি তাকিয়া ছিল | কলকাতায় কোথায় কী ঘটেছে সেটা শান্তিসুধা দেবীর পক্ষে বরিশালে বসে অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না, তবে তিনি এবং তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মানুষজন যে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি এটা তিনি সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন | রাত্রি ১২ টার দিকে ঘটনাবলীর প্রাবল্য থিতিয়ে এল | শান্তিসুধা দেবীরা নিজের বাসায় ফেরত গিয়ে বাকি রাত্রিটা কাটালেন | পরদিন ভোর হতেই শান্তিসুধা দেবীর ২ জন প্রজা অমর সিং আর হেমচন্দ্র আর কাছে পরামর্শ চাইতে এল যে তারা গতকালের রাত্রির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আজকে কাজে যাবে কিনা | দুজনেই কাজ করত বরিশাল R S N কোম্পানির ডকে | শান্তিসুধা দেবী তাদেরকে কাজে যেতে মানা করলেন | সকালের বাড়ির কাজগুলো সেরে শান্তিসুধা দেবী বড়ি দিতে বসলেন | ব্যস ওই পর্যন্তই ! পুলিশ হাসপাতালের কম্পাউন্ডার সুরেশ বাবুর লোক তার কাছে ছুটে এল | লোকটি খবর দিল যে গতকাল রাতে অতুলনগরের বাসিন্দা শান্তিসুধা দেবীর ভাইপো নলিন ও তার স্ত্রীকে গুরুতরভাবে মুসলমান দাঙ্গাকারীরা আহত করেছে ! তাদেরকে সত্ত্বর সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে | শান্তিসুধা দেবী তড়িঘড়ি করে বড়ি দেওয়া হাত ধুয়ে, তাদের দেখতে ছুটলেন | গিয়ে যা দেখলেন, ওনার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল ! নলিন ও তার স্ত্রী, অম্বিকাবাবুর বৃদ্ধা স্ত্রী, বড় ছেলে, নাতি নাতনি এরকম আট-দশজন একটা ঘরে শুয়ে আছে | ময়লার রক্তাক্ত কাপড়ে দেহগুলো আবৃত | চাপ চাপ রক্ত জমাট বেঁধে শুকিয়ে কাপড়ের জায়গায় জায়গায় চিট বেঁধে গেছে ! কারো মাথায়, কারো পিঠে, কারোর বা গলায় গুরুতর ছুরির আঘাত | কোনরকমে ব্যান্ডেজ করা | শান্তিসুধা দেবীর কথা হারিয়ে গেল ! অল্প কিছু কথা বলে উনি যা জানতে পারলেন, তা হল, অতুলনগর ও আশপাশের জায়গাগুলোতে গতকাল রাতে মুসলমান দাঙ্গাকারীরা আগুন লাগায় | লোকজন ছুটে রাস্তায় পালালে তাদেরকে রাস্তায় ছুরিকাঘাত করা হয় ও গুরুতরভাবে জখম করা হয় |
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর শান্তিসুধা দেবীর সাথে দেখা করতে আসেন, বাণীপীঠ স্কুলের হেড মাস্টার মশাই প্রেমাংশু সেনগুপ্ত | ওনার আলোচনার বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের বরিশালের বাঙালি হিন্দু এভাবেই পরে পরে মার খেয়ে মরবে না কোনো প্রতিরোধ করবে | প্রেমাংশু বাবু বললেন অগ্নিকাণ্ড আর হত্যালীলার এইতো শুরু ! এদিকে তখন লাখুটিয়া,মাধবপাশা ইত্যাদি জায়গাগুলোতে বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা লোকের মুখে মুখে শান্তিসুধা দেবীর কানে পৌঁছেছে | তিনি নিজেও ভারী উদ্বিগ্ন | বাস্তুহারা হয়ে দলে দলে হিন্দু নারী,পুরুষ, বালক, বালিকা শহরের দিকে ধেয়ে আসছে | ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বি এম স্কুলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন | আরো যে কি কি ঘটবে সকলেই আশঙ্কায় ! শান্তিসুধা দেবী ভাবলেন, সত্যিই তো পাকিস্তানবাসী বাঙালি হিন্দুর কি কিছুই করণীয় নেই ? কেবল বেঘোরে প্রাণ দেবে ? শান্তিসুধা দেবী মুহূর্তে বুঝতে পেরেছিলেন, আগাগোড়া পাকিস্তানের জন্মরহস্য জেনেও পাকিস্থানে বাস করা অনেকটা গজদন্ত মিনারে বাস করার মতো ! নলিন আর অম্বিকাবাবুদের রক্তাক্ত চেহারা দেখে এসেও শান্তি সুধা দেবী কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যেন কিছুই হয়নি ! সেই মুহূর্তে তার ভুল ভেঙে গেল | তিনি ঠিক করলেন এখন কলেজ যাওয়া নয়, সময়ের দরকার নিপীড়িত, অত্যাচারিত হিন্দুদের বাঁচানোর কাজে লাগা | সম্পূর্ণ ঘটনাবলীর পিছনে যে একটা গভীর চক্রান্ত কাজ করছে, সেটা শান্তিসুধা দেবী উপলব্ধি করলেন | প্রেমাংশু বাবুদের মত কিছু বিশিষ্ট মানুষকে নিয়ে, সাহায্যকার্যে নামাটা তখন শান্তিসুধা দেবীর কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল | আলোচনা করে ঠিক করা হল, প্রতি পাড়ায় দুটি করে বড় বাড়িতে সকল হিন্দুদের জড় করে পুলিশি পাহারায় রাখা হবে | প্রেমাংশু বাবু চলে যাবার পর আলোচনার সিধান্তের প্রনয়ন ঠিক করবার জন্য আর ফেরত এলেন না | কারণটা শান্তিসুধা দেবী পরে টেড় পেয়েছিলেন |
দুপুর আড়াইটে নাগাদ শান্তিসুধা দেবী ঠিক করলেন, বি এম স্কুলে গিয়ে একবার শরণার্থীদের সাথে দেখা করে আসা যাক | রিকশা চড়ে বেরিয়ে পরলেন, কিন্তু বি এম স্কুলে ঢুকতে গিয়ে, পুলিশের বাধা প্রাপ্ত হলেন | পুলিশ জানালো ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের লিখিত অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না | ব্রজমোহন স্কুলে শান্তিসুধা দেবীর অবারিত যাতায়াত ছিল, আজ সেখানেই তিনি ঢুকতে বাধা পেলেন ! অশ্বিনীকুমার দত্তের বাড়ির খুব কাছেই ছিল, এবং তার ভাইয়ের ছেলে সরল বাবু শান্তিসুধা দেবীর কলেজের গভর্নিং বডির সভ্য ছিলেন | এই সরল বাবুর সাথে ম্যাজিস্ট্রেটের সখ্যতা ছিল | সরল বাবু ম্যাজিস্ট্রেটকে একটি অনুরোধ করে চিঠি লিখে শান্তিসুধা দেবীর হাতে দিয়ে বললেন ম্যাজিস্ট্রেট কে দিন আশা করি শরনার্থীদের সাথে দেখা করতে পারবেন| ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়িতে পৌঁছাতে, বাড়ির দারোয়ান জানালো, সাহেব অল্প সময় আগেই বেরিয়ে গেছেন | অতএব শান্তিসুধা দেবীকে বিফল মনোরথে ফেরত আসতে হলো ! বিকেল. বিকেল পুলিশ হাসপাতাল থেকে সুরেশবাবু খবর পাঠালেন, শান্তিসুধা দেবীরা যেন সেদিন রাতে কোনমতেই, নিজের বাড়িতে রাত্রি না কাটান | সন্ধ্যার দিকে কারফিউ জারি হল | শান্তিসুধা দেবীরা বাড়ির কুকুর, বিড়াল সকলকে খাইয়ে পুলিশ হাসপাতালের কম্পাউন্ডে সুরেশবাবুর কোয়ার্টারে গিয়ে উঠলেন | শান্তিসুধা দেবীর বাড়িতে কাজ করতেন বাঙালি খ্রিস্টান তুলির মা | বাঙালি হিন্দুর সাথে যাতে তাকেও মরতে না হয়, সেই ভয়ে তুলির মা আগেভাগেই বিকেল. বিকেল কাজ শেষ করে পালিয়েছিল | কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা গেল ইতিমধ্যেই সেখানে বিপুল সংখ্যক লোক জড়ো হয়েছে | লোকে লোকারণ্য | কোনক্রমে রাত্তির টুকু কাটিয়ে শান্তিসুধা দেবীরা নিজেদের বাসায় ফেরত এলেন আর আর শুনলেন, শরণার্থীদের সাথে দেখা করতে যাওয়ার অপরাধে, গতকালকে প্রেমাংশু বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে | এতক্ষণে শান্তিসুধা দেবী বুঝলেন গতকাল আলোচনার চূড়ান্ত রূপরেখা ঠিক করতে কেন প্রেমাংশু বাবু আর ফেরত আসেননি ! ভাগ্যিস শান্তিসুধা দেবীর সাথে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের দেখা হয়নি, নয়তো তাকেও হাজতবাস করতে হত !!

এভাবেই সেদিনের বাঙালি মুসলমানের গর্বের জিহাদে, কেটে গেল শান্তিসুধা দেবীর দুই রাত্রি | ল্যাপটপে এই ইতিহাস লেখাটা যতটা নিরাপদ, ঠিক ততটাই ভয়ঙ্কর ছিল শান্তিসুধা দেবীর সেইসব দিনরাত্রি | ভাবলে শিউরে উঠতে হয়, কেবলমাত্র বাঙালি হিন্দু হওয়ার জন্য আর নিজ জন্মভূমি পূর্বপাকিস্তানে বাস করার জন্য,কত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে | যে মানুষগুলোর দেশভাগের পিছনে কোন হাতই ছিলনা ! সেদিনের বাঙালি মুসলমানের গৌরবগাথায় এটাই ছিল বাস্তব সত্য | আরো অনেক বলার আছে পাঠক...................!

(চলবে..........................)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রাজর্ষি ব্যনার্জী
রাজর্ষি ব্যনার্জী এর ছবি
Offline
Last seen: 15 ঘন্টা 30 min ago
Joined: সোমবার, অক্টোবর 17, 2016 - 1:03অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর