নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

ইহুদিদের দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা



ইহুদিদের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ার কাহিনীই ইউরোপের মহাকাব্যিক ইতিহাস। ৭০ সালে রোমান সাম্রাজ্য জেরুজালেম দখল করে নেয়। তখন থেকেই ইহুদিদের কপাল পোড়া শুরু। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে ইহুদিরা নিজেরদের বাসস্থান থেকে বিতাড়িত হয় এবং তারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ব্যবসায়ী হিসেবে পৃথিবীর সবগুলো মহাদেশের সব জাতীর সাথে তাদের পদচারণা শুরু হয়। খ্রিস্টান এবং মুসলিমরা তাদের ধর্মগ্রন্থানুসারে এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী ইহুদিদেরকে নিধন করেছে, ধ্বংস করেছে। তৎকালীন সামন্তব্যবস্থা ইহুদিদেরকে জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করতো, পৌরসভা তাদেরকে কোন কলকারখানায় কাজ করতে অনুমতি দিতো না। ইহুদিদের বন্দী করে রাখতো শহরের বাইরে বস্তিতে, রোমান কর্তৃপক্ষ সীমিতি করে দিয়েছিল তাদের গতিবিধি। এই ইহুদিরা ছিল জনতার পিটুনি আর রাজার লুণ্ঠনের শিকার। ইহুদির টাকা আর ব্যবসায়ে নির্মিত শহর নগরের নিয়তিই ছিল সভ্যতা আর সেই সভ্যতায় ইহুদিরা হয়ে পড়ল অস্পৃশ্য সমাজচ্যুত। ইহুদিরা রাষ্ট্রের কোন রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে যুক্ত না থাকলেও তাদের উপর শারীরিক যন্ত্রণা এবং অপমানের কোন শেষ ছিল না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরেও এই আশ্চর্য মেধাবী জনগোষ্ঠী মনে প্রাণে নিজেদের জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অত্যন্ত একাগ্রতার সাথে সংরক্ষণ করেছিল। বিভিন্ন স্থানে বসবাসের কারনে তাদের মাঝে ভাষাগত ঐক্য ছিল না তবুও গর্বিত ভালবাসার মত সবচেয়ে পুরনো সামাজিক রীতিনীতি এবং ঐতিহ্য মেনে চলত। অধীর আগ্রহে ধৈর্য এবং অটলভাবে তারা অপেক্ষা করত সেদিনের যেদিন তারা এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। এই সময়ে ইহুদি জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং সভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে থাকে। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, প্রায় দুই হাজার বছর পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর পর ইহুদিরা তাদের প্রাচীন এবং চির স্মরণীয় নিজেদের বাসভূমি ফিরে পায়। এত দুঃখ দুর্দশার বিপরীতে আর কী কাহিনী থাকতে পারে? এত ব্যপক যন্ত্রণার সমাপ্তি হতে পারে গৌরব আর ন্যায়বিচার দিয়ে? কোন কল্পকাহিনী কল্পনা বিলাসের সাথে এই বাস্তবতার মিলন ঘটাতে পারে?

পবিত্র নগরীর পতনের বহু শতাব্দী আগেই ইহুদিরা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। টায়ার, সিডোন এবং অন্যান্য সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে ইহুদিরা ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিটি দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এথেন্স থেকে এন্টিওক, আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে কার্থেজ, রোম থেকে মার্সেই এমনকি দুরবর্তী স্পেনেও তারা বসতি গড়ে তোলে। রোমান আক্রমণে পবিত্র নগরী জেরুজালেমের সিনেগগ ধ্বংস হয়ে গেলে শুরু গণহারে ইহুদি দেশান্তর। শেষ পর্যন্ত ইহুদি জনস্রোত দুইটি ধারায় চলতে থাকে। একদল চলতে লাগল দানিয়ুব আর রাইন নদীর তীর ঘেঁষে এবং তারা পোল্যান্ড এবং রাশিয়াতে বসবাস শুরু করে। আরেক দল স্পেন এবং পর্তুগালের মূর সম্প্রদায়কে পরাজিত করে সেখানেই আস্তানা গড়ে তোলে। মধ্য ইউরোপে ইহুদিরা নিজেদেরকে সফল ব্যবসায়ী এবং অর্থ লগ্নীকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। এই উপদ্বীপাঞ্চলে ইহুদিরা আরবদের থেকে গণিত, চিকিৎসা এবং দর্শনচর্চা শিখে নেয় এবং কর্ডোভা, বার্সেলোনা, সেভিয়ার বিখ্যাত বিদ্যাচর্চাকেন্দ্রে ইহুদিরা তাদের সংস্কৃতির প্রচার, প্রসার ও বিকাশ ঘটাতে থাকে। দ্বাদশ এবং ত্রেয়োদশ শতকে প্রাচীন এবং প্রাচ্য সংস্কৃতিকে পশ্চিম ইউরোপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ইহুদিরা গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে। কর্ডোভাতে মোজেস মাইমোনাইডস (১১৩৫-১২০৪)যিনি ছিলেন তার সময়ের খ্যাতিমান চিকিৎসক তিনি রচনা করে গেলেন বাইবেলের ব্যাখ্যা “Guide to the Perplexed”। বার্সেলোনাতে বসে হাসদাই ক্রেসকাস (১৩৭০-১৪৩০) লিখে ফেললেন ধর্মদ্রোহিতার প্রস্তাবনা। এই দুই বইয়ের রচনা পুরো ইহুদি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

১৪৯২ সালে ফার্ডিনান্ড গ্রানাডা বিজয়ের মূরদের বহিষ্কারের আগ পর্যন্ত ইহুদিরা স্পেনে উন্নতির চরম শিখরে ফুলে ফলে পল্লবিত হয়ে ওঠে। ফার্ডিনান্ডের রাজত্বে ইহুদিরা তাদের স্বাধীনতা হারায় যে স্বাধীনতা তারা উদারপন্থী ইসলামের রাজবংশে ভোগ করে আসছিল। তাদের সামনে খোলা রইল দুটি পথ; হয় ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টধর্মের চর্চা করো অথবা অথবা সহায় সম্পত্তি ফেলে দেশানরি হয়ে যাও। এটা এমন নয় যে চার্চ ইহুদিদের প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষ পরায়ণ হয়ে ওঠে বরং পোপ বারবার এই পাশবিক অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু স্পেনের রাজা ভাবলেন বহিরাগত ইহুদিজাতির দীর্ঘদিনের শ্রমে সঞ্চিত শস্যভাণ্ডার আর সম্পত্তি দখল করে তার রাজকোষ ভারী করতে। ঠিক একই বছর কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করে আর ফার্ডিনান্ড আবিষ্কার করলো ইহুদি।

প্রায় সব ইহুদি বেছে নিল কঠিন বিকল্প, তাদেরকে আবার পথে নামতে হলো আশ্রয়ের খোঁজে। কেউ জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে নেমে গেল এবং জেনোয়াতে আশ্রয় প্রার্থনা করল। অন্য একটা অংশ ইটালির সমুদ্রবন্দর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ভয়ানক দারিদ্র এবং অসুখ নিয়ে আফ্রিকার উপকূলে পৌছালে সেখানে স্থানীয়রা ধন সম্পদের লোভে অনেক ইহুদিদের খুন করে। খুব সামান্য সংখ্যক ইহুদি ভেনিসে আশ্রয় পায় এবং ভেনিসের নাবিক বংশধর অতীতের ইহুদিদের কাছে ঋণী। ইহুদিরা নিজের জাতির সন্তান কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রায় সম্ভাব্য সব খরচের যোগান দেয়। তাদের মনে বড় আশা, এই খ্যাতিমান নাবিক তাদের জন্য নতুন আশ্রয়ের খোঁজ এনে দেবে। সেইদিন বিপুল সংখ্যক ইহুদি কলম্বাসের ভাঙা জাহাজে হুড়োহুড়ি করে উঠে বসল। কলম্বাস দুই চিরশত্রু ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যকার আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসিয়ে দিলো তার পালতোলা জাহাজ। অবশেষে তারা মহৎ হৃদয় হল্যান্ডে আশ্রয় খুঁজে পেল। হল্যান্ডে আশ্রয় পাওয়া ইহুদিদের মধ্যে একটা পর্তুগীজ ইহুদি পরিবারের নাম ছিল এস্পিনোজা।
এরপরের কাহিনী স্পেনের পতন আর হল্যান্ডের উত্থান। ১৫৯৮ সালে ইহুদিরা আমস্টারডামে তাদের প্রথম সিনেগগ প্রতিষ্ঠা করে এবং ৭৫ বছর পরে তারা ইউরোপে অসামান্য স্থাপত্য শৈলীর আরেকটা সিনেগগ নির্মান করে। এই সিনেগগ নির্মানে ইহুদিদের প্রতিবেশি খ্রিস্টান সম্প্রদায় আর্থিকভাবে সাহায্য করেছিল। আমস্টারডামে ইহুদিরা বেশ শান্তিতে বসবাস করছিল এবং একটু খেয়াল করে দেখলেই বুঝতে পারবো এদের মধ্যে ধনী ব্যবসায়ী এবং ইহুদি পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও শিল্পী রেমব্রান্ট আমস্টারডাম শহরকে শিল্পকলায় অমরত্বে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু সতের শতকের মাঝামাঝি সিনেগগের মধ্যে কিছু সদস্যের তিক্ত বিতর্কিত চিন্তা ও কার্যক্রম উৎকর্ষতাকে মর্মপীড়ায় পরিণত করে। রেনেসাঁ দ্বারা প্রভাবিত কিছু ইহুদি ইতিমধ্যে অগ্রসর চিন্তায় চেতনায়। এর মধ্যে যুবক ইউরিয়েল একোস্টা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসকে তীব্র সমালোচনা করে একটা প্রবন্ধ লিখে ফেললেন। যদিও ধর্মের প্রতি এই নেতিবাচক আচরণ ইহুদিদের পুরনো নিয়ম অনুযায়ী কখনই চূড়ান্তরকম বিরোধী ছিল না কিন্তু সিনেগগ ইউরিয়েল একোস্টাকে তার প্রবন্ধ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য করে। যে সমাজ ইহুদিদের উদারভাবে গ্রহণ করেছিল তাদেরই মতবাদের বিরুদ্ধে চলে গেল প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। অস্বস্তিকরভাবে এই ধর্মদ্রোহী যুবকের লেখা খ্রিস্টধর্মের মর্মমূলে কুঠারাঘাত করে ফেলল। খ্রিস্টধর্মানুভূতিতে আঘাত করার দায়ে খ্রিস্টানদের আবেগ সংবরণ করতে এবং অনুশোচনা থেকে সিনেগগ বিধান দিলো এই উদ্ধত যুবককে উপুড় করে মাটিতে ফেলে দিয়ে তার শরীরের উপর দিয়ে সিনেগগের সদস্যরা হেঁটে যাবে। শারীরিক যন্ত্রণা থেকেও ইউরিয়েল মানসিকভাবে অধিক আঘাতপ্রাপ্ত হলেন। ইউরিয়েল বাড়িতে ফিরে তার আঘাতকারীদেরকে জোরালো ভাষায় নিন্দা ও প্রতিবাদ করে আত্মহত্যা করলেন।
১৬৪০ সালের সেই সময়ে আধুনিককালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইহুদি এবং আধুনিক দর্শন চর্চার পুরোধা বারুখ ডি স্পিনোজার বয়স ছিল মাত্র আট বছর এবং তিনি ছিলেন সিনেগগের সবথেকে প্রিয় শিক্ষানবীশ।

[ উইল ডুরান্টের 'স্টোরি অফ ফিলোসফি' বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো "ইহুদিদের দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা" ]

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

লুসিফেরাস কাফের
লুসিফেরাস কাফের এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 3 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, জুন 27, 2016 - 9:59অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর