নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

ধর্ম এবং রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা


আসুন আমরা স্পিনোজার চারটা বইকে ক্রমানুসারে পড়ি ঠিক যেমনভাবে তিনি লিখে গেছেন। তার ' The Tractatus Theologico-Politicus' আজকের দিনের বিচারে হয়ত কম আকর্ষণীয় পাঠ্য কারণ যে বিষয়ে চাঁছাছোলা সমালোচনার আন্দোলন শুরু করে স্পিনোজা নিজের জীবন হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিলেন সেটা এখন মামুলি বিবৃতি হয়ে গেছে। একজন লেখকের জন্য তার লিখিত বইয়ের যুক্তিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে যাওয়া বোকামি। তার লেখার সারাংশ শিক্ষিতজনের মনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। যে লেখা পাঠকে ব্যাকুল করে টেনে এনেছিল তখন সেই লেখায় আর রহস্য থাকে না। এই কারণেই হয়ত ভলতেয়ার এবং স্পিনোজা দুজনে 'রিলিজিয়ন এবং রাষ্ট্র' নিয়ে প্রবন্ধ লেখেন।

বাইবেল থেকে উদারভাবে গৃহীত কল্পনা আর রূপকই হলো The Tractatus Theologico-Politicus বইটার অতিপ্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। শুধু প্রাচ্য দেশীয় প্রবণতানুযায়ী উচ্চমান সাহিত্যের রং-রূপ-রস-গন্ধ এবং অলংকারের যথেচ্ছ ব্যবহার আর ভাবের অতিরঞ্জনের কারণেই নয় বরং ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষ ও তার সাথীদের কঠোর নিয়মকানুন কল্পনার মাধ্যমে অন্যদের মাঝে জাগ্রত করে দেয়াও রূপকের অন্যতম কাজ। মানুষের অন্তরে ঠাঁই পেতে এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থান এবং তাদের চিন্তার সামর্থ্য বা সীমাবদ্ধতা মানিয়ে নিতে ঈশ্বরের মনোনীতজন বাধ্য ছিলেন। সব ধর্মগ্রন্থই প্রাথমিকভাবে চারিপাশের সীমাবদ্ধ গণ্ডীর মানুষের জন্য লেখা হয়েছিল যা পরবর্তীতে সমগ্র মানবজাতির জন্য নাজিল হয়েছে বলে চাপিয়ে দেয়া হয়। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, ধর্মগ্রন্থের বিষয়বস্তুও সব মানুষের কাছে অবশ্যই গৃহীত হতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে সাধারণ মানুষ যেন সেটা পড়ে বুঝতে পারে। ধর্মগ্রন্থ কোন কিছুই ঈশ্বর ব্যতীত কোন দ্বিতীয় কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করে না। কিন্তু এমনভাবে বর্ণনা করে যেন ঈশ্বর তার অমিত শক্তি বলে মানুষকে আকর্ষণ করে ধরে রাখে। বিশেষকরে নিরক্ষর এবং নিবেদিতপ্রাণ মানুষদেরকে। ধর্মগ্রন্থের উদ্দেশ্য কারণকে ব্যাখ্যা করা নয় কিন্তু কল্পনা দিয়ে মানুষকে জিম্মি করতে সে সিদ্ধহস্ত। ঠিক এই কারণেই ধর্মগ্রন্থে অফুরন্ত দৈবশক্তি আর বারংবার ঈশ্বরের উপস্থিতি দেখতে পাই। গণমানুষ মনে করে অনন্য সাধারণ ঘটনার মধ্যে ঈশ্বরের দৃষ্টান্তমূলক শক্তি প্রদর্শন পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। কিন্তু তাদের কাছে প্রকৃতির যে ধারণা সেখানে ঈশ্বর ভীষণভাবে সাংঘর্ষিক। প্রকৃতপক্ষে মানুষ জানে ঈশ্বর ততক্ষণই কর্মক্ষম প্রকৃতি যতক্ষণ তার সঠিক নিয়মে চলে এবং একইভাবে প্রকৃতির শক্তি এবং প্রাকৃতিক কারণ অর্থহীন হয়ে পড়ে যখন ঈশ্বর নিজেই কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েন। মানুষ ভিন্ন চরিত্রের দুটি ঐশ্বরিক শক্তি কল্পনা করে নেয়, যথা; ঈশ্বরের শক্তি এবং প্রাকৃতিক শক্তি। ঠিক এখান থেকেই আমরা স্পিনোজার দর্শন জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। স্পিনোজা বলেন যে, ঈশ্বর এবং প্রকৃতির কার্যপ্রণালী মূলত এক এবং অভিন্ন। মানুষ বিশ্বাস করতে পছন্দ করে মানুষের কারণেই ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়মভঙ্গ করেছেন। মানুষকে মুগ্ধ করতে (সম্ভবত নিজেদেরকেই মুগ্ধ করতে) তাদের বিশ্বাসকে দৈবিক ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করত যে, সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর আবর্তনকালীন দীর্ঘদিন ইহুদিজাতির জন্য। কারণ ইহুদিজাতি ঈশ্বরের প্রিয় পাত্র। ধর্ম প্রচলনের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে দেখা যায় সব ধর্মের মানুষেরই মনে হয়েছিল একমাত্র তারাই ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র।ভদ্র বিনয়োচিত এবং আক্ষরিকভাবে লিখিত বিবৃতিমূলক বক্তব্য মানুষের মনে আকর্ষণ জাগায় না এবং তাদের হৃদয়কেও নাড়া দিতে পারে না। যদি মোজেস যেনতেনভাবে বলতেন বায়ু বহে পূর্ব সমুদ্র হতে (যেমন আমরা ভিন্ন পথ থেকে এখানে একত্রিত হয়েছি) আর লোহিত সাগরের মাঝ বরাবর জন্য পায়ে চলার পথ তৈরি হয়ে গেছে তখন আমরা বিশ্বাস করতাম না। সাধারণ মানুষের মনে হয়ত খুব সামান্যই প্রভাব বিস্তার করতে পারতো। এই কারণেই এবং ঘটনায় মোজেসের শিষ্যগণ রূপকাশ্রয়ী দৈবিক গল্পের মিথ সৃষ্টি করে। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করতে রূপক গল্প তৈরি করা খুব প্রয়োজনীয়। অতিশয় প্রভাবশালী এইসব মানুষেরা প্রায়ই দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীদের সাথে একই তুলাদণ্ডে তুলনীয় হন। তারা প্রাণবন্ত রূপকের মিশ্রিত কথামালার ইন্দ্রজাল আরোপ করে ধর্মের আবির্ভাব ঘটায়। তাদের উদ্দেশ্যের প্রকৃতি এবং তাদের আবেগ অনুভূতির তীব্রতা তাদেরকে চলমান প্রথাকে গ্রহণ করার দিকে ধাবিত করে।

বাইবেলের মূলতত্ত্বের ব্যাখ্যানুসারে স্পিনোজা বলেন, বাইবেলের মধ্যে এমন কিছুই নেই যা কার্যকারণের সাথে সাংঘর্ষিক। কিন্তু যেমনভাবে পাঁচখণ্ডে লেখা মোজেসের পেনটাটিউক আক্ষরিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে দেখা যাবে সবই ভুলে ভরা, সংঘাতময় এবং অবশ্যই অসম্ভব আষাঢ়ে গল্পের সমষ্টি। কবিতা আর উপমার অস্পষ্ট মিশেলে যতই বাইবেলের অপদার্শনিক ব্যাখ্যা প্রকাশিত হতে লাগল ততই আমাদের মহান চিন্তাশীল আর প্রাগ্রসরদের কাছে প্রকট হতে লাগল বাইবেলের অসাড় যুক্তি এবংআমরা বুঝতে পারলাম মানুষের উপর বাইবেলের অপরিমিত প্রভাব ও প্রতিপত্তি। ধর্মগ্রন্থের উভয় ব্যাখ্যারই সঠিক স্থান, উদ্দেশ্য এবং ক্ষেত্র আছে। মানুষ সব সময় দাবী করবে ধর্ম যেন কল্পিত বাক্য সমষ্টি হয় এবং তার চারপাশে যেন মহাপুরুষের জ্যোতির্বলয় থাকে। যখন একটা বিশ্বাস ভেঙে পড়ে বালির বাঁধের মত তখন মানুষ সঙ্গে সঙ্গে নতুন আরেকটা বিশ্বাসের জন্ম দেয়। কিন্তু একজন দার্শনিক জানেন, ঈশ্বর এবং প্রকৃতি এক এবং অভিন্ন অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব। দার্শনিকগণ প্রকৃতির অমোঘ বিধান দ্বারা পরিচালিত হন। এবং প্রকৃতিই হলো সর্বোচ্চ এবং একমাত্র রাজসিক বিধিবিধান যা তারা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করেন এবং মেনে চলেন। তিনি জানতেন যে ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরকে বর্ণনা করা হয়েছে একজন সর্বজনীন আইন প্রণেতা বা সুখী রাজকুমারের বেশে। এমনভাবে চিত্রিত হয়েছেন যেন অসীম ক্ষমাশীল। মানুষকে বুঝতে পারার একক ক্ষমতা তার এবং মানুষের স্বল্প অপরিপক্ব জ্ঞানও তার অজানা নয়। এভাবেই বাস্তবে সত্যি সত্যি ঈশ্বরের অস্তিত্ব তৈরি হয়। ঈশ্বর চরিত্রের প্রকৃতির প্রয়োজন অনুসারেই এবং তার জারিকৃত বিধান সবই চিরন্তন সত্য।

স্পিনোজা পুরাতন টেস্টামেন্ট (নিয়ম) এবং নতুন টেস্টামেন্টের (নিয়ম) মধ্যে বিভাজন রেখা আঁকেননি। যখন দার্শনিক ব্যাখ্যায় খুঁজে পাওয়া যায় দুটি শত্রুভাবাপন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে বিভেদের লুকায়িত নিগূঢ় কারণ এবং বহুল প্রচলিত ঘৃণা আর ভুল বোঝাবুঝি পাশে সরিয়ে রাখলে ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মকে অভিন্ন বিবেচনা করা যায়। স্পিনোজার কাছে ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মকে একই রকম মনে হয়েছে। আমি প্রায়ই বিস্মিত হই যে, লোকেরা খ্রিস্টান ধর্মের নামে সব মানুষের প্রতি প্রেম, আনন্দ, শান্তি, সংযম, দয়া ও দানশীলতা উচ্চরবে প্রচার করে। কিন্তু বাস্তবে মনে হয় ধ্বংসাত্মক শত্রুতা এবং প্রতিদিন পরস্পরের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের মাধ্যমে কাল্যাণের বাণী প্রচারেই তাদের বিশ্বাসের জন্য নির্ভরযোগ্য যোগ্যতা। ইহুদিরা কোনরকমভাবে বেঁচে ছিল খ্রিস্টানদের ঘৃণার ছায়াতলে। অত্যাচার নিপীড়ন ইহুদিদের দিয়েছিল একতা ও সাম্য। যার ফলে সম্ভব হয়েছিল ইহুদি জাতির পরবর্তী বংশবিস্তার এবং অস্তিত্বের টিকে থাকা। অত্যাচার নিপীড়ন না থাকলেও হয়ত তারা একত্রে মিলেমিশে বাস করত এবং হয়ত ইউরোপের মানুষের সাথে পারস্পারিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো এবং বিলীন হয়ে যেতে পারত চারপাশে জালের মত সর্বত্র বিস্তৃত সংখ্যাগুরু খ্রিস্টানদের ভীড়ে।

যখন এইসব অনর্থক বাগাড়ম্বর বাতিল হয়ে গেছে তখন নিজেদের ধর্মাচরণ ও বিশ্বাস নিজেদের মধ্যে বজায় রেখে একসাথে শান্তি ও পারস্পারিক সহযোগিতায় বসত না করতে রাজি না হওয়ার পিছনে ইহুদি এবং খ্রিস্টান দার্শনিকদের কোন কারণ নেই।
ধর্মীয় সম্প্রীতি পথে উত্তরণের লক্ষ্যে স্পিনোজা চিন্তা করলেন যিশু খ্রিস্ট সম্পর্কে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের যৌথ বোঝাপড়া থাকা অত্যন্ত জরুরী। এরজন্য সমাজে প্রচলিত চিন্তারও অযোগ্য কুসংস্কারগুলো তুলে দিতে হবে। ইহুদিদের উচিৎ অতিদ্রুত যিশু খ্রিস্টকে অন্যতম মহত্তম নবি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা। স্পিনোজা যিশুর দেবত্ব স্বীকার করেন নি কিন্তু তিনি যিশুকে বসিয়েছেন মানবজাতির সর্বাগ্রে। ঈশ্বরের আদি অন্তহীন প্রজ্ঞা নিজেই স্বমহিমায় উদ্ভাসিত সবকিছুতে। কিন্তু ঈশ্বরের বাস্তব অস্তিত্ব শুধুই মানুষের মনে এবং ঈশ্বর কেন্দ্রিক প্রায় সবকিছুই যিশুকে ঘিরে আবর্তিত। যিশুকে শুধু ইহুদি বা খ্রিস্টানদের শিক্ষা দিতেই পৃথিবীতে পাঠানো হয়নি বরং সমস্ত মানবজাতির জন্যই পাঠানো হয়েছিল। এভাবেই যিশু মানুষের চিন্তা এবং বোধের জগতে অবস্থান তৈরি করে নিলেন। বেশিরভাগ সময় রূপকের মাধ্যমে গল্পোচ্ছলে যিশুর শিক্ষা পাওয়া যায়। স্পিনোজা মনে করতেন যে, যিশুর নৈতিক শিক্ষা এবং প্রজ্ঞা আসলে সমার্থক। যিশুকে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমেই একজন বুঝতে পারে জ্ঞানের প্রতি ঈশ্বরের ভালবাসা। সুতরাং যিশুর মতো মহান ব্যক্তি শুধু ভালবাসাতেই ঈশ্বর সম্পর্কিত কুসংস্কার থেকে মুক্ত হবেন এবং যে কুসংস্কারের কারণে মানুষে মানুষে এত বিভাজন, এত এত হানাহানি আর বিবাদের হাতছানি। যিশুকে নিয়ে গোঁড়ামির কারণেই তার নামে সারা পৃথিবী আত্মঘাতী যুদ্ধে লিপ্ত, পারস্পারিক হিংসাত্মক বাক্যবানে জর্জরিত এবং তরোয়ালের জোরেই একটা বিশ্বাস পেয়ে যায় বিশাল মানুষের ঐক্য, এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে জেগে ওঠে ভ্রাতৃত্ববোধ।

[ উইল ডুরান্টের 'স্টোরি অফ ফিলোসফি' বইয়ের স্পিনোজা অধ্যায়ের ধারাবাহিক অনুবাদ। আজ প্রকাশিত হলো "ধর্ম এবং রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা" ]

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

লুসিফেরাস কাফের
লুসিফেরাস কাফের এর ছবি
Offline
Last seen: 3 দিন 3 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, জুন 27, 2016 - 9:59অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর