নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • নুর নবী দুলাল
  • প্রত্যয় প্রকাশ
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে ৩:


আমার বাবারা তিন ভাই এবং তিন বোন | আসলে বাবার ঠিক পরেই বাবার এক ভাই ছিলেন, যিনি পূর্ববঙ্গ থেকে হেঁটে এবাংলায় আসার ধকল সহ্য করতে পারেননি | আসার ঠিক পরে পরেই,ম্যানেন্জাইটিস এ আক্রান্ত হয়ে মারা যান | বাবার খুব কাছের এবং প্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি | আজও বাবার মধ্যে সেই মৃত্যুর দুঃখ মাঝে মাঝে ফুটে বেরোয় | নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাকুমা দাদু আর এই এতগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে যখন এপার বাংলায় এলো, দিন গুজরান প্রবল কঠিন হয়ে দাঁড়ালো | দাদু তখন প্রায় অন্ধ, বেকার আর ঠাকুমা সেলাই করে সংসার চালাচ্ছেন | বাবাদের মুখে শুনেছি মুখে শুনেছি, বাবারা একবেলা ফ্যানভাত খেত আর অপর বেলায় খাওয়া জুটতো না | কিন্তু ঠাকুমা বাবাদের এই শিক্ষা দিয়েছিল যে পাশের বাড়ির লোক যেন না না জানতে পারে এই ঘটনা | আচ্ছা পাঠক নিজের জন্মভূমিতে নিজের ভিটে-মাটিতে থাকলে এই কষ্ট কি বাবাদের সহ্য করতে হত? কিন্তু উপায় ছিল না যে, নিজের ভিটেমাটিতে থাকলে বলা যায় না হয়তো বেঘরে প্রাণটাই দিতে হতো ! আস্তে আস্তে সেই ঘটনাই তো আপনাদের সামনে তুলে ধরছি | আমার দুই জমজ পিসির একজন হলেন শিলু পিসি| ওনার এক বন্ধু প্রায়ই আসতেন আমাদের বাড়িতে ওনার সাথে | আমরা ওনাকে নির্মলা পিসি বলে চিনতাম | নির্মলা পিসির মুখ থেকে মুলাদীর ঘটনার অনেকটাই জেনেছিলাম এবং পরে নিজের পড়া তথ্যের সাথে তা মিলিয়ে দেখেছি | জানি পাঠক এই জঘন্য নৃশংস ইতিহাস অনেক কষ্ট করে আপনারা পড়ছেন এবং জানছেন | আজকে চলুন আপনাদের সামনে আরো একটু তুলে ধরি:

কালকে, মুলাদীর যে দারোগার কথা বলছিলাম সেই দারোগাটি খানাতে, বিবাহিত হিন্দু মহিলাদের শাঁখা সিঁদুর হীন করে দুর্বৃত্তদের দিয়ে কলেমা পড়িয়ে প্রথমে মুসলমান বানিয়ে ছিল এবং পরে তাদেরকে দুর্বৃত্তদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিল | ২০শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০, মানব ইতিহাসের আরও একটা কালো দিন | সমবেত নারী-পুরুষদের মুলাদীর দারোগা বললো বন্দরে রিলিফ ক্যাম্প খোলা হয়েছে, তোমরা সেখানে চলে যাও | ভীত মানুষজন সরল বিশ্বাসে সেখানে গেল | এরা যাওয়ার আগে দারোগা এদের টাকা-পয়সা ও গয়নাগুলো রেখে দিল | বন্দরে তিনটে গুদাম | মাধবলাল কুন্ডু ও সুখময় কুন্ডুর গুদামে শত শত নর-নারীকে ভাগাভাগি করে বসিয়ে রাখা হলো | পাহারায় রইল মাত্র দুজন চৌকিদার | দারোগা কলকাঠি নাড়লো | তার নির্দেশে বেলা বারোটা নাগাদ তিন হাজার সশস্ত্র মুসলমান গুদাম আক্রমণ করলো | হিন্দু পুরুষদের আলাদা করে চলল নির্বিচারে কোপানো | কারোর কাকুতি-মিনতি শোনা হলোনা | প্রায় ৭০০ পুরুষ, কেউ কেউ বলে বেশি, কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো ! এরপরে মুক্তেশ্বর সাহার টিনের চালের ঘরে মেয়েদের নিয়ে গিয়ে নামাজ কলেমা পড়ানো হল | প্রায় ৫০ জন মহিলাকে দুর্বৃত্তদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে দেওয়া হলো | তিনটে গুদামঘর তখন রক্তে ভাসছে ! তিন নম্বর গুদামটার নাম ছিল পাঁচ তহবিলের গুদাম | প্রাণবল্লব ঘোষ সেখানে স্ত্রী আর ভাইয়ের বউ এর মাঝে লুকিয়ে ছিল | মুসলমান দুর্বৃত্তরা তাকে টেনে হিঁচড়ে বার করে মহিলাদের সামনেই জবাই করল | একে একে কাটলো গঙ্গাচরণ সরকার, নিত্যানন্দ পাল, মাখনলাল, সুখময়,রাধেশ্যাম, বিপিন, আর নগেন কুণ্ডুকে ! Regional controller of procurement সিরাজুল হক ভাগ্যক্রমে, সেদিন বিকেলে লঞ্চ আর সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং মুসলমান দাঙ্গাকারীরা তার ফলে পালায় |

মুলাদীর বাঙালি মুসলমানের, এ এক বিশাল গৌরবময় ইতিহাস যার ফলে মুলাদী হিন্দু শূন্য হয়েছিল | পাঠক এই বর্ণনা পড়ে অনেক মডারেট মুসলমানের ছাতি গর্বে ৭২ ইঞ্চি হয়ে যাচ্ছে ! আসলে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়, এটাতো একটা অঘটন মাত্র ! না না পাঠক মুলাদী শেষ নয় ! আরো আছে এই বাঙালি মুসলমানের গৌরবগাঁথা ! ফেসবুকে একটা ভারি সুন্দর লেখা পড়লাম | মানুষ কেন জঙ্গি হয় | মুসলমানেরা নাকি তাদের উপরে চলে আসা বছরের পর বছর অত্যাচার ,পশ্চিমাদের নিপীড়ন, ইহুদিদের ধরিবাজি, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কারণে জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে ! কি উদ্ভট লজিক !! তাহলে তো আমার বাবা জ্যাঠা কাকা, আরো বিপুলসংখ্যক মানুষ যারা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের অত্যাচারের নিপীড়নে নিজেদের দেশ মাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল তাদের সকলের জঙ্গি হওয়ার কথা,
তাই না ? এবং যে পরিমাণ নৃশংসতা তাদের উপর চলেছিল,তাদের তো যেমন-তেমন জঙ্গি না, ভয়াবহ জঙ্গি হওয়া উচিত ছিল ! জানা মতে পূর্ববঙ্গ থেকে খেঁদানো বাঙালরা সেরকমটা হয়নি | তার একটা প্রধান কারণ ,তাদের আইডল, চৌদ্দশ বছর আগে জন্মানো মহামানব নয় ! যাকগে, কালকে যেখানে শেষ করেছিলাম, সেই রক্ত খচিত ইতিহাসের কাল কাহিনীর আরো একটু শোনাই আপনাদের :

রাজাপুর একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিল | ১৯৫০ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারি, রাজাপুরের বাসিন্দা অতুলনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং অন্যান্য লোকের বাড়িতে রাজাপুর থানার দুজন কনস্টেবল এসে বললো আজকে কারফিউ আপনারা সন্ধ্যার পর থেকেই ঘর থেকে বের হবেন না, গুলি করতে বাধ্য হব ! এটা দারোগা সাহেবের হুকুম | হুকুম মতো সকলেই সন্ধ্যেবেলার মধ্যে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘরের মধ্যে আটক রইলো | সন্ধ্যার ঠিক পরে পরেই চারদিক থেকে রব শোনা গেল: ' আল্লাহু আকবার! পাকিস্তান জিন্দাবাদ! গ্রামের দক্ষিণ দিকে ৬০/৭০ টি, হিন্দুদের বাড়ি মুসলিম দুর্বৃত্তরা আক্রমণ করলো | প্রথম আক্রমণ হলো তালুকদার রাজিতরাম তিওয়ারির বাড়ি | দালানে আগুন দেয়া হলো, লুঠ শুরু হলো, যেদিকে পারল ছুটে পালাল, কেবল রাজিতরামের ছেলেটা মুসলিম হামলাকারীদের সামনে পরে গেল | ফল যা হওয়ার তাই হল, বেঘোরে প্রাণ দিতে হলো তাকে | চারিদিকে চিৎকার শুনে আর আগুনের লেলিহান শিখা দেখে মানুষ জঙ্গল খাল-নালা ইত্যাদির মধ্যে লুকোলো | পশ্চিম পাড়াতেও চললো নৃশংস আক্রমণ | সবকটা সাহা ও যোগী বাড়িগুলোতে প্রথমে লুট করে, পরে আগুন দেওয়া হল | অসুস্থ এবং বৃদ্ধ যারা পালাতে পারলো না তারা অবধারিতভাবে হত্যা হল ! গোপাল সাহার বৃদ্ধা মাকে লেপ কাঁথা মুড়িয়ে, কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারা হলো | কুমার আর নাপিত বাড়িগুলো লুট করে, প্রতিটাতে আগুন দেওয়া হল | অতুলনারায়ন ছিলেন অবস্থাপন্ন মানুষ | রাত্রি ১২টার দিকে তার বাড়ি আক্রমণ হলো, তিন হাজার মুসলমান লাঠি, বল্লম, সড়কি, রামদা হাতে আক্রমন করল | আক্রমণের নেতৃত্বে, লীগ প্রেসিডেন্ট মোকামাল হোসেন, সভ্য নুরুল হক প্রভৃতি চেনা মুসলমান মুখ | ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট আসমত আলি খান বন্দুক হাতে সবার আগে ! পাঠক, বাঙালি মুসলমানের সেদিনের কি গৌরব, রন্ধ্রে-রন্ধ্রে উপলব্ধি করুন | এরাই তো ছিল আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহারদের পূর্বসূরী ! হামলাকারীরা অনেকেই বাড়ির উঠোনে স্লোগান দিচ্ছে , বাকিরা সুপুরি গাছ কেটে মই বানিয়ে ছাদে উঠে হিন্দু জবাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে | মহিলারা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পালাচ্ছে, আর পিছনে উন্মত্ত মুসলিম হামলাকারী দল ধাওয়া করছে গনিমতের মাল কব্জায় আনার জন্য | অতুল কিন্তু ছাড়বার পাত্র ছিলনা, যথেষ্ট সাহসী ছিল | সে একা ৬/৭ জনকে ঘায়েল করে, শেষে আর না পেরে জখম হয়ে ইটের পাজায় পরে যায় | নরকের কীটরা ভাবল অতুল বোধহয় মারা গেছে | তারা অন্যত্র চলে গেল | সন্ধ্যে সাতটার দিকে অতুল কোনরকমে উঠে থানার দারোগার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে তার বাড়ির লোকেদের রক্ষা করার জন্য, দারোগা এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বার করে দেয় ! রেজিস্ট্রি অফিসের বারান্দায়, অতুল সারারাত্রি ছটফট করছিল | পরদিন সকালে, অতুল বাড়িতে গিয়ে দেখলো বাড়ি ভষ্মিভূত, তখনো আগুন পুরোপুরি নেভেনি, সামনের বারান্দায় তার বাবা শশীভূষণ অর্ধদগ্ধ, মৃত পরে আছে | দেয়ালে ঝোলানো নটা কাটা মুন্ড | ঠাকুরদা আশুতোষ, শিশুকন্যা আরতি, প্রতিবেশী সত্যচরণ দে সরকার, তার স্ত্রী সরজুবালা,ছেলে সন্তোষ, ছেলে গান্ধী, ছেলে সুভাষ, মেয়ে কালিদাসী এবং ঢাকা লোহা জংএর ব্যবসায়ী কিশোরীমোহন কুন্ডুর কাটা মাথা ! মুসলিম হামলাকারীরা ফেরত যাওয়ার সময় কৈবর্তখালি গ্রামের ৭০ জন হিন্দুর মধ্যে ৪৩ জনকে খুন করে | ১৬ ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ এ, একই কান্ড চলতে থাকলে, স্থানীয় স্কুলে আর থানায় ২-৩ হাজার হিন্দু আশ্রয় নেয় |

পাঠক আপনাদের খেয়াল থাকবে, আমি আরো একটি লেখা ভাগে ভাগে লিখছি: ' ফিরে দেখা দ্বিজাতি তত্ত্ব দাঙ্গা আর দেশভাগ' | এই সত্যগুলো তাই ওই লেখাটিকে কয়েক দিন স্থগিত রেখে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি যাতে করে আপনারা ইতিহাসকে মেলাতে পারেন | বাঙালি মুসলমানের এই লুক্কায়িত গর্বের ইতিহাসের সাথে দ্বিজাতিতত্ত্ব দাঙ্গা আর দেশভাগের হিসেবের মিল খুঁজে পাবেন | আগামীতে আপনাদের বলব পূর্ব-পাকিস্তানের তত্কালীন এক মাননীয়ার সেইসব দিনরাত্রি |

(চলবে.................)

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রাজর্ষি ব্যনার্জী
রাজর্ষি ব্যনার্জী এর ছবি
Offline
Last seen: 8 ঘন্টা 7 min ago
Joined: সোমবার, অক্টোবর 17, 2016 - 1:03অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর