নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • নুর নবী দুলাল
  • প্রত্যয় প্রকাশ
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে ২:


১৯৫০ সালে কোন একদিনে নিজের দেশের ভিটেমাটি মাদারীপুর ছেড়ে এপার বাংলার পথে পা বাড়িয়েছিল আমার ঠাকুমা | এপারে এসে অতি দরিদ্র অবস্থায় পায়ে চালানো সেলাই মেশিনে মহিলাদের পেটিকোট, ব্লাউজ, সেমিজ, সেলাই করে আমার বাবাদেরকে বড় করে তোলেন | কিন্তু কোনদিন ঠাকুরমা তার সেই নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আসার আক্ষেপের কথা আমাদেরকে মুখ ফুটে বলেনি | বড় হয় এর অনেকটাই বাবা, পিসিদের, এবং জ্যাঠাদের মুখে শুনেছি | যে পরিপ্রেক্ষিতে ঠাকুমা দাদুকে নিয়ে আর ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে তার নিজের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতের কথা খুঁটিয়ে জানতে নিজেই পড়াশোনা করেছি এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য জোগাড় করেছি | সেই তথ্যের সূত্র ধরেই এর আগে ১৯৫০ এর বরিশালের মাধবপাশার নাড়কীয় হিন্দু হত্যা যজ্ঞের কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম | পাঠক বুকে পাথর রেখে আজকে না হয় প্রগতিশীলতার মোড়কে বাঙালি মুসলমানের সেই সময়কার গৌরবগাথার আরেকটু জানুন:

মাধবপাশার জনৈক বৈদ্যনাথ বাবুর বাড়ির ছাদ থেকে হিন্দুরা আত্মরক্ষা করছে | সদর দরজা ভেঙে মুসলিম সন্ত্রাসীরা কম্পাউন্ডে ঢুকে পরলো | উপর থেকে ক্রমাগত তাদের উপর ইট ছোড়া হচ্ছে | ইট থেকে মাথা বাঁচাতে সদর দরজাটা ভেঙে তারা মাথার উপরে ঢাকনা হিসেবে ব্যবহার করল | এই দেখে দলে দলে হিন্দু পুরুষরা ছাদ থেকে নিচে নামতে থাকলো | চারিদিকের মেয়েদের কান্নার রব পড়ে গেছে | অন্য গ্রামের একজন বৃদ্ধ যিনি নিচের তলায় ছিলেন, মুসলিম দুর্বৃত্তরা প্রথমে তার মাথাটা ধর থেকে ছিন্ন করে ফেলল ফেলে নাচা শুরু করল | সুরেন রায় নিচে নেমে দু হাত তুলে বললো ভাই বাঁচাও, এক কোপে তার মাথা ধর থেকে আলাদা করা হল , ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল | এরপরে দোতলা ও ছাদে উঠে রামদা দিয়ে একে একে উমাচরণ শীল, ফটিক চক্রবর্তী, নারায়ণ চক্রবর্তী, কুশল শীল, কালিচরন বসাক অনেককেই একইভাবে কল্লা কাটা হলো | একদল কল্লা কাটছে, আরেকদল জমিদার বাড়ির মাল লুট করছে | ছোট ছোট শিশুগুলোকে আকাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে, আর নিচে পড়ার সময় বল্লম উচিঁয়ে ধরেছে, বাচ্চাগুলো টুকরো হয়ে কাটা পরছে | পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পরছে মুসলিম দাঙ্গাকারী দল ! লুটপাটের সাথে সাথে ৩০০ জন মহিলাকে নামিয়ে আনা হলো, বৃদ্ধা আর প্রবীনাদের গালাগাল দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল, বাকিদের গনিমতের মাল হিসেবে বন্টন করা হল |

সকলকে উলঙ্গ করে সারিবদ্ধ ভাবে মাটিতে বসানো হলো | পাজামা লুঙ্গি পরে হাতে রামদা নিয়ে চলল একে একে কল্লাকাটা | প্রথম কল্লা গেছিল হরকুমার রায়ের | নারায়ণ বনিক দশম শ্রেণীর ছাত্রেরও কল্লা বাঁচেনি ! নিজেরই মেয়েদের চোখের সামনেই কাটা হলো গোপালকৃষ্ণ রায়, অমৃত লাল রায়, গোবিন্দ সাহা, কৃষ্ণ সাহা এবং আরো অনেকেই ! বৈদ্যনাথ বাবুর দালানের মধ্যেই পড়ে রইলো ৩০০ টা মৃতদেহ আর প্রায় ১০০ জন আহত মানুষ | সন্ধ্যায় দুজন পুলিশ আর আনসার এসে ঘোষণা দিল :' ডাকাতরা সব চলে গেছে, রহমতপুর ক্যাম্পে চল, কারুর কোনো ভয় নেই !' মৃতদেহগুলো স্তূপে স্তূপে বহুদিন পর্যন্ত পরেছিল | পরে সেগুলোকে জমিদার বাড়িতেই গর্ত করে গণকবর দেয়া হয় | সংখ্যালঘু নেতা যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল সেখানে গিয়ে কি দেখেছিলো সেটা তার নিজের কথাতেই প্রমাণ আছে | যে নারীরা গনিমতের মাল হয়ে সেদিন হাতে হাতে বিলিয়ে ছিল তারা আজকের বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানের কারোর নানী বা দাদী ! এই হলো ফরহাদ মজহার, আহমেদ ছফাদের বাঙালি মুসলমান সত্ত্বা !!

আমার যে বয়স পর্যন্ত আমার ঠাকুমা বেঁচেছিলেন, আমার সেই বয়সে যদি উনি আমাকে উনার নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করার নির্মম পারিপার্শ্বিকতার কথা ব্যাখ্যা করেও বলতেন, তাও হয়ত আমি, আমার সেই বয়সে ঘটনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারতাম না | দেশভাগের পর ১৯৫০ এ আমার দাদু, বাবা,জ্যাঠা, পিসি সকলকে নিয়ে ঠাকুমা কোন আতঙ্কে, কোন নির্মমতার আশঙ্কায় নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করেছিল সেটা আমি উপলব্ধি করেছি পরবর্তীতে আরেকটু বেশি বয়সে বাবা জ্যাঠা পিসিদের মুখ থেকে তখনকার পারিপার্শ্বিকতার কথা জেনে আর সেই কৌতূহল থেকে পড়ে আর তথ্য জোগাড় করে | গতকালকে মাধবপাশার পাশবিকতার কথা তুলে ধরেছিলাম আপনাদের সামনে | আজকে বলবো বরিশালের মুলাদীর নারকীয়তার কথা | হাঁটতে হাঁটতে এপার বাংলায় পৌঁছে আমার ঠাকুমাদের কানেও পৌঁছেছিল সেই কথা, হয়ত তারা ভেবেছিল তারা কি বাঁচা বেঁচে গেছে ! এ হলো বাঙালি মুসলমানের না বলা গৌরবগাঁথা | পাঠক বুকে পাথর চেপে জানতে থাকুন:

১৪ ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫০, প্রেসক্লাবে জিন্নাহ প্রতিশ্রুতি দিল: 'হিন্দুদের রক্ষা করা হবে|' ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ঠিক পরদিন কাজিরচর আর খাসেরহাট আক্রান্ত হল | ১৬ তারিখ গভীর রাতে সতানী গ্রামে হত্যা আর অগ্নিসংযোগ হলো | আশপাশের হিন্দুরা সকলে ভয়ে কাঁপছে | দুই ধনী বারুই মদন নন্দী আর তার ভাই লালু বাড়ির মেয়েদের সরিয়ে দিয়ে বাড়িতে ছিল | দু'জনকেই তাদের বাড়িতেই কোপানো হল ! গ্রামবাসী হত্যার খবর দারোগাকে জানালে, দারোগা বলল পুড়িয়ে দে , লোকে জিজ্ঞাসা করলে বলবি অসুখে মরেছে | এতে করে গ্রামবাসী আরো আতঙ্কিত হয়ে পরল | দারোগার মনোভাব তো মোটেও সুবিধার ঠেকলনা ! ১৬ ই ফেব্রুয়ারী রাত্রিতে দূর থেকে কেবল তুমুল ধ্বনি শোনা যেতে লাগলো :" আল্লাহু আকবার, মার হিন্দু মার" ! ১৭ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০ মানবতার ইতিহাসে একটা বিশ্রী কালো দিন | দলে দলে আতঙ্কিত লোক খানা দিকে ছুটছে, বেলা তিনটার দিকে ৩ থেকে ৪ হাজার মুসলমান মুলাদী বন্দর আক্রমণ করলো চলতে থাকলো অবাধে লুটপাট | সীতানাথ পাল ছিল ধনী ব্যবসায়ী তার একটা বন্দুক ছিল | মুসলমানরা তাকে অবিলম্বে বন্দুকটা থানায় জমা দিতে বলল আর হুমকি দিতে থাকলো | সীতানাথ কুড়ি হাজার টাকা আর ৮০ তোলা সোনা কোমরে বেঁধে বেলা তিনটার দিকে থানা থেকে বেরিয়ে নিজেকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে রওনা হল | অবশ্য বেশি দূর যেতে হলো না তাকে ! পথেই উন্মত্ত মুসলিম দাঙ্গাকারীদের সম্মুখীন হতে হলো | সীতানাথ একটা ডোবায় লাফিয়ে পড়ে কচুরীর আড়ালে লুকোলো | লুকিয়ে থেকে সীতানাথ যা দেখলো, তার জঘন্যতম স্বপ্নেও সে কোনদিন কল্পনাও করেনি ! হিন্দু নারীরা দলে দলে চারিদিকে দৌড়ে পালাচ্ছে আর মুসলিম হামলাকারীরা প্রকাশ্য দিবালোকে তাদের রাস্তার উপরে পেরে ফেলে, লোকসম্মুখেই ধর্ষণ করছে | সে এক পাশবিক অত্যাচারের দৃশ্য, অথচ ঘটনাগুলো কিন্তু ঘটছিল থানার অনতিদূরেই | আইনের কুটোটিও নড়েনি ! সারাটা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা লুঠ, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করে মুসলিম হামলাকারীরা লুটের মাল আর গনিমতের মাল নিয়ে চলে গেল | ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫০, রাস্তাঘাট চারিদিক শুনশান | মুলাদীর পথে-ঘাটে গুদামে নদীর পাড়ে শুধু শতশত স্তব্ধ মৃতদেহ, বিবস্ত্র ধর্ষিতা নারীর পাশবিক অত্যাচারে নিথর দেহ ! ১১৭ বছর বয়স্ক বৃদ্ধ মহেশ চন্দ্র পাল যিনি সকলের অনুরোধেও পাকিস্তান ত্যাগ করেননি, তাকেও ঘুমন্ত অবস্থায় খুন করেছিল ঘৃণ্য নর্দমার কীটরা ! মুলাদীর গ্রামে. বন্দরে, পথে, ঘরে ঘরে কেবল কান্নার রোল ! কত লোক যে মারা গিয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই, জনৈক্য় ব্যানার্জির সুপারি বাগানেই তিনশটার বেশি মৃতদেহ ছিল | দলে দলে লোক থানায় গিয়ে আশ্রয় চাইছে আর দারোগা আশ্রয় দিতে অস্বীকার করছে , লোকে পালিয়ে জঙ্গলে লুকোচ্ছে. আবারও আক্রমণ হচ্ছে |জঙ্গলেও রেহাই নেই সেখানেও মুসলিম হানাদাররা ঢুকে পরছে | সে এক দুর্বিষহ দিনরাত্রি ! দারোগাকে যারা সোনা ও টাকা কড়ি দিতে পারছে, তাদের আশ্রয় থানায় মিলছে, যারা পারছে না তাদের জীবনের নিশ্চয়তা তারাই বুঝে নিচ্ছে | সীতানাথের পরিবার গোপনে থানায় আশ্রয় নিয়েছিল, বদলে সর্বস্ব দিতে হয়েছিল | পাঠক আজকে যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথা শুনে আপনারা আতঙ্কিত হন বা শিহরিত হন, বাঙালি মুসলমানের মাঝে তার জন্ম সেই সময়েই হয়ে গেছিল | মুলাদীর আনসাররা লাউডস্পিকারে সকলকে থানায় আসতে ঘোষণা দিল, নিরাপত্তা দেওয়া হবে | মানুষজন থানায় এলে, হিন্দু পুরুষদের হত্যা করে নারীদের দুর্বৃত্তদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হলো | যুবতী তরুণীদের উপরে চলল পাশবিক যৌন অত্যাচার | প্রত্যক্ষদর্শীরা যারা খুব অল্পই বেঁচে আছেন তারা বলেন স্বয়ং থানার দারোগা হুকুম দিয়ে শত শত মানুষকে থানাতেই হত্যা করিয়েছিল | জনৈক নারায়ণ ভাদুরী ছিল টিবি রোগী | স্ত্রীর কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে, তাকেও হত্যা করা হয়, এবং তার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে নিজে আত্মহত্যা করে | মুলাদীর এক বিখ্যাত ডাক্তার কুমুদ বিহারী ব্যানার্জি থানায় আশ্রয় চেয়েছিলেন, বিনিময়ে তাকে থানাতেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় | আর বেচারা যশোদালাল কুন্ডুকে ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো করে কেটে তার দেহের কাটা টুকরোগুলো সযত্নে থানায় নিয়ে আসা হয় |

পাঠক আজ এটুকুই থাক ! সেদিনের বাঙালি মুসলমানের এই গৌরবগাঁথা সবটা একেবারে নিতে পারবেন না | ভাগ্যিস ঠাকুমারা সেদিন পায়ে হেঁটে এপার বাংলায় চলে এসেছিল !

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রাজর্ষি ব্যনার্জী
রাজর্ষি ব্যনার্জী এর ছবি
Offline
Last seen: 8 ঘন্টা 8 min ago
Joined: সোমবার, অক্টোবর 17, 2016 - 1:03অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর