নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • নুর নবী দুলাল
  • প্রত্যয় প্রকাশ
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

বিষাক্ত রাজনীতি:- ষষ্ঠ পর্ব-



রাজনৈতিক লাভ লোকসানের বলি হয়ে চন্দ্রশেখর সরকার পড়ে যায়, সেই সঙ্গে রামজন্মভূমি বাবরি মসজিদ বিতর্কের সুষ্ঠ সমাধানের প্রয়াস ও সমাধিস্থ হয়। এমত অবস্থায় কংগ্রেস মনে করে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করা উচিত হবে না তাই তারা নির্বাচনের দিকে যায়, একই সঙ্গে 1991 সালের দশম লোকসভা নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠে। এই নির্বাচন দুটি আবহে লড়া হয় প্রথমত- মন্ডল কমিশনের সুপারিশ গুলি বাস্তবায়নের ফলে ওবিসি দের 27% সংরক্ষণ দেওয়া হয়, যার ফলে উচ্চবর্ণের মানুষদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। দেশের বহু জায়গায় এই নিয়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এর যথার্থ মূল্য দিতে হয় বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর জনতা পার্টিকে। যে জনতা পার্টি 1989 এর লোকসভা নির্বাচনে 143 টি আসন পেয়েছিল তারা সঙ্কুচিত হয়ে মাত্র 69 টি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এই নির্বাচনের অন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইসু ছিল- রাম মন্দির আন্দোলন। এই রাম রথে সাওয়ার হয়ে বিজেপি অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে ছিল। মাত্র নয় বছর আগে স্থাপিত, যে বিজেপি 1984 সালে লোকসভায় মাত্র 2 সদস্যের পার্টি ছিল সেটি 1989 সালে- 85 টি আসন বিশিষ্ট বৃহৎ দলে পরিণত হয় এবং 1991 সালে সেটি বর্ধিত হয়ে 120 টি আসন লাভ করে ভারতের দ্বিতীয় সর্ব বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসাবে উঠে আসে।

1991 সালের লোকসভা নির্বাচন ছিল অনেক ক্ষেত্রেই ঐতিহাসিক। এই নির্বাচনেই বিজেপির রাম মন্দির আন্দোলনের ফলে হিন্দু ভোট একত্রিত হয় এবং মেরুকরণের সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এই নির্বাচনের প্রথম পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয় 20 মে, 1991 সালে। প্রথম পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর 21 শে মে, 1991 সালে তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের কাছে শ্রীপেরামবুদুর এ রাজীব গান্ধীকে মানববোমার সহায়তায় হত্যা করা হয়! এই হত্যাকান্ডের পিছনে এলটিটিই ও প্রভাকরণের হাত পাওয়া যায়। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর দেশের জনসাধারণের কংগ্রেসের প্রতি সহানুভূতি দেখা যায়। কংগ্রেস খুব সুপরিকল্পিত ভাবে মন্ডল কমিশন ও রাম জন্মভূমি আন্দোলনকে কাটিয়ে উঠে সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে আসে। 545 আসন বিশিষ্ট লোকসভায় সংখ্যা গরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ছিল 273 টি আসন। কংগ্রেস-244 টি, বিজেপি-120 টি, জনতা পার্টি-69 টি, সিপিএম-35 টি ও সিপিআই- 14 টি আসন লাভ করে ও বাকি আসন গুলি অন্যান্য দল পায়। (1991 সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল। তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া) কংগ্রেস সবচেয়ে বড় দল হিসাবে উঠে আসে কিন্তু পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তাই নিয়ে মিডিয়াতে তীব্র বিতর্ক দেখা যেত। যে চারজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার ছিলেন তার হলেন।
1. প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র ও বিদেশমন্ত্রী পিভি নরসিমহা রাও।
2. তৎকালীন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী শরদ পাওয়ার।
3. মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিং।
4. প্রাক্তন অর্থ ও বিদেশমন্ত্রী এন ডি তিওয়ারি।

তবে শেষ পর্যন্ত বামপন্থীদের সমর্থনে সর্বসম্মত ভাবে পিভি নরসিমহা রাও এর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠন করতে সমর্থ হয়। তিনি রাজনৈতিক সন্ন্যাস থেকে ফিরে এসে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি নেহেরু গান্ধী পরিবারের বাইরে দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি প্রধানমন্ত্রী পদ অলংকৃত করেন। তার সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল আর্থিক উদারীকরণ নীতির সূচনা। তাঁর নেতৃত্বে ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং এর সহায়তায় আর্থিক উদারীকরণের শুরু হয়। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই সময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। তবে তাঁর সময়ের বহু চর্চিত বিষয় হল- 'রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্ক' যা তাঁকে অগ্রজদের থেকে উপহার স্বরূপ মেলে।

দেশের রাজনীতির পাশাপাশি এই সময় উত্তরপ্রদেশের অভ্যন্তরীণ রাজ্য রাজনীতি ও যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল সেদিকে ও লক্ষ্য দেওয়া ভীষণ প্রয়োজন। সেইসঙ্গে ঐতিহাসিক দিক থেকে দেখলে বলতে হয় রাম মন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্ক বহু পুরানো ব্রিটিশ সরকার ও এই সমস্যার সম্মুখীন হয়। তবে তারা সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যায়। তারা উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ওই স্থানে বিভিন্ন সময় সূচি তৈরী করে; যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন সময়ে হিন্দুরা পূজাপাঠ ও মুসলমানরা ওই স্থানে একই সঙ্গে নামাজ আদায় করত। তৎকালীন সময়ে মানুষের মধ্যে কট্টরপন্থা এতটা ছিল না যার জন্য এটা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের ফলে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে আসে এবং রামজন্মভূমি ও বাবরি মসজিদ বিতর্ক বড় হতে দেখা যায়। স্বাধীন ভারতে এই বিতর্ক প্রথম বড় হয়ে দেখা দেয়, 21-22 শে অক্টোবর 1949 সালে ওই দিন শীতার্ত গভীর রাত্রে রামের মূর্তি হঠাৎ করে প্রকট হয়, হিন্দুরা দাবি করে এটা এক চমৎকার। যদিও পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী মূর্তি চুরি করে ওখানে রাখা হয়। পুলিশ চুরির মূর্তি অসৎ উদ্দেশ্যে রাখার অপরাধে সন্ত অভিরাম দাস, সন্ত রামসকল দাস ও সন্ত সুদর্শন দাসের উপর অপরাধ মূলক মামলা শুরু করে। এরপর ফৌজাবাদে দাঙ্গা দেখা যায়। প্রশাসন রাম মন্দির বাবরি মসজিদের গেটে তালা মেরে দেয় এবং সমস্ত পার্থনা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করে। এভাবে এই সমস্যার সাময়িক সমাধান করা হয়।

সরযূ নদীর তীরে অবস্থিত অযোধ্যা এক শান্ত নগর কিন্তু রাজনৈতিক কারণের জন্যই এই শান্ত জনপদ বারবার অশান্ত হয়ে ওঠে। রামমন্দির বাবরি মসজিদ বিতর্ক আবার নতুন করে দেখা যায় 1984 সালে। 1984 সালের এপ্রিল মাসে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ধর্ম সংসদের বৈঠক হয়। হঠাৎ করে এই ধর্ম সংসদের বৈঠক ডাকা হল কেন? আসলে 1981 সালে তামিলনাড়ুর মিনাক্ষীপুরমে একসঙ্গে 200 টি দলিত পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং মিনাক্ষীপুরমের নাম পরিবর্তন করে রহমত নগর রাখা হয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এই ঘটনার জন্য সরকারকে তীব্র ভাবে আক্রমণ করতে থাকে। এই ধর্ম সংসদের বৈঠকে ধর্ম রক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের ও শপথ নেওয়া হয়। এই সময় মন্দির নির্মাণের সপক্ষে অযোধ্যায় খুব বড় বাইক মিছিল হয়। একই সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাম জন্মভূমি মুক্তিযজ্ঞ সমিতি গঠন করে। 8 ই অক্টোবর 1984 ওই দিন বিশ্বহিন্দু পরিষদ মন্দিরের গেটের তালা খুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করে এবং অযোধ্যা থেকে লক্ষৌ পর্যন্ত প্রায় 150 কিমি দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করে। সেই সঙ্গে 31শে অক্টোবর 1984 ওই দিন কার সেবা শুরু করার পরিকল্পনা করে কিন্তু ওই দিনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার ফলে সমস্ত পরিকল্পনা ব্যার্থ হয়।

পরবর্তী কালে এক উকিল ফৈজাবাদ আদালতে মন্দিরের তালা খোলার অবেদন জানায়। ফেব্রুয়ারি 1986 সালে ফৈজাবাদ আদালত মন্দিরের গেটের তালা খুলে দেওয়ার আদেশ দেয়। দীর্ঘ 37 বছর পর মন্দিরের গেটের তালা খুলে দেওয়া হয় এবং সেই সঙ্গে দেশে তীব্র সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় ভারতীয় জনতা পার্টি এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। লালকৃষ্ণ আডবাণী রাম রথ যাত্রা শুরু করেন, যার গন্তব্য স্থল ছিল অযোধ্যা। 30 শে অক্টোবর 1990 ওই দিন বিশ্বহিন্দু পরিষদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি ছিল ওই দিন অযোধ্যায় কার সেবা শুরু হবে এবং আডবাণী এতে অংশগ্রহণ করার জন্য যাত্রা শুরু করে। অযোধ্যায় যাওয়ার পূর্বেই বিহারের সমস্তিপুরে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব আডবাণীকে গ্রেফতার করেন, 23 অক্টোবর 1990। যদিও অনেকেই মনে করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর ইশারাতেই লালু প্রসাদ যাদব এই কাজটি করেন। যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ভিপি সিং সরকারকে, বিজেপির সমর্থন প্রত্যাহারের ফলে ভিপি সিং সরকার পড়ে যায়। এই সময় আডবাণীকে গ্রেফতারের প্রসঙ্গে লালুপ্রসাদ যাদব এক সংবাদিককে বলেন- " কৌন সা হোতা হে হিন্দু? কিয়া হোতা হে হিন্দু? হাম ভি হিন্দু হে, ইয়ে জাত অওর বিরা দারিকা দেশ হে"।

এই ঘটনার পর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী 30 শে অক্টোবর 1990 সালে কার সেবা শুরু করে। ওই দিন লক্ষ লক্ষ কার সেবকরা অযোধ্যা পৌঁছয়। একই সঙ্গে বজরং দল, বিশ্বহিন্দু পরিষদ, বিজেপি প্রভৃতি দলের নেতারা ও অযোধ্যা এসে পৌঁছয়। ফৌজাবাদ জেলাতে প্রচুর ব্যরিকেট ও সেনা নামিয়ে দেওয়া হয়, মনে হতে থাকে পুরো জেলা যেন সেনা ছাউনিতে পরিণত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব আগেই বলে রেখেছিলেন- "কোয়ি পারিন্দা ভি পার নেহি মার সাকতা"। কারসেবা শুরু হলে সাধারণ মানুষ ও কারসেবকদের সাহায্য করছিল। এমন সময় এক সাধু এক বাস অপহরণ করে ব্যরিকেট ভেঙে বিতর্কিত স্থানের কাছে চলে যায়। পিছু পিছু কারসেবকরা ও পৌঁছয়। দু এক জন অতি উৎসাহি যুবকরা গুম্বজের উপর চড়ে বসে। ঠিক সেই সময় পুলিশ গুলি চালায়, এই গুলিতে মোট 5 জন কার সেবক নিহত হয়। এই ঘটনাটি দেশ বিদেশের বহু মিডিয়াতে পুলিশি অত্যাচার বলে প্রচারিত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি তীব্র বিরোধ প্রদর্শন করে। এরপর 2 রা নভেম্বর 1990 ওই দিন বিশ্বহিন্দু পরিষদ প্রতিবাদ মিছিল করে। উমা ভারতির মত নেত্রী কেশ মুন্ডন করে আন্দোলনে যোগদান করে (তখন অবশ্য উমা ভারতি সাধু ছিল)। অন্যদিকে বজরং দলের তরুণ নেতা বিনয় কাটিয়াল, বিশ্বহিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘল প্রভৃতি উপস্থিত হয়। এই সময় সাধ্বী রিতম্বরা এক ভাষণে জনতাদের আর উত্তেজিত করে ছড়ার ছন্দে বলেন- "সার পে কাফান বাঁধ কে দেখ, বাজরাঙ্গি কি ফৌজ চালি। গালি গালি মে মাত ভবানী কা গুঞ্জা জায়কারা হ্যে, কাঁহো গর্ব সে হাম হিন্দু হে, হিন্দোস্তা হামারা হ্যে"। এভাবে উত্তপ্ত ভাষণ চলতে থাকে এইসময় আবার লক্ষ লক্ষ কার সেবকরা অযোধ্যায় পৌঁছাতে থাকে এবং বিবাদিত স্থানের কাছে গিয়ে পৌঁছয়, আবার মনে হতে থাকে 30 তারিখের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এই সংবাদ যখন মুলায়ম সিং যাদবের কানে এসে পৌঁছয় তখন মুলায়ম সিং সরকার খুব কড়া সিদ্ধান্ত নেয়। মুলায়ম সিং কার সেবকদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। পুলিশ কার সেবকদের উপর গুলি চালায়। সরকারি তথ্য থেকে জানা যায় এই গুলিতে 15-20 জনের মৃত্যু হয় কিন্তু বিশ্ব হিন্দু পরিষদ প্রচার করতে থাকে মুলায়ম সিং 15000 জনের অধিক মানুষকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেয়। এই ঘটনার পর থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা মুলায়ম সিং যাদবকে, মৌলানা মুলায়ম সিং বলে অভিহিত করতে শুরু করে। এরপর উত্তরপ্রদেশে বেশকিছু জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় তবে মুলায়ম সরকার সেগুলিকে কঠোর হাতে দমন করে।

কেন্দ্রে বিজেপির সমর্থন প্রত্যাহারের পর বিশ্ব নাথ প্রতাপ সিং এর সরকার পড়ে যায় এরপর চন্দ্রশেখরের সরকার আসে। যখন মনে হতে থাকে চন্দ্রশেখর এই সমস্যার স্থায়ী এক সমাধান করে দেবেন তখন কংগ্রেস সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় যার ফলে চন্দ্রশেখর সরকার ও পড়ে যায়। এরপর দেশের পরবর্তী লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনে প্রচার করতে গিয়ে রাজীব গান্ধীর হত্যা হয়। এই নির্বাচনে কেন্দ্রে পিভি নরসিমহা রাও এর নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার গঠন করে কিন্তু রাম রথযাত্রার উপর সাওয়ার হয়ে বিজেপি- রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ সহ বেশ কিছু রাজ্যে ক্ষমতা দখল করে। তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ক্ষমতা লাভ। রাম মন্দির আন্দোলনের ফলস্বরূপ উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র 12 টি আসনের বিজেপি 221 টি আসন পেয়ে সর্ব বৃহৎ পার্টি হিসাবে উঠে আসে। 24 জুন 1991 সালে কল্যাণ সিং এর মুখ্যমন্ত্রীত্বে এই প্রথম বিজেপি উত্তরপ্রদেশে সরকার গঠন করে। কল্যাণ সিং মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ক্যাবিনেট সমেত তৎকালীন বিজেপির বড় নেতা মুরলি মনোহর যোশীর সঙ্গে প্রস্তাবিত রাম মন্দির স্থানে যায় এবং শপথ নেয়- "রাম লালা হাম আয়ে হে মন্দির এহি বানায়েঙ্গে"। এর ঠিক 15 দিন পর কল্যাণ সিং সরকার এক বড় সিদ্ধান্ত নেয়। বিবাদিত মন্দির পরিসরের কাছে 2.77 একর জমি অধিগ্রহণ করেন এবং রাম মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে গঠিত রাম জন্মভূমি ন্য়্যাস ট্রাস্টকে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে এই জমি দেওয়া হয়, শুধু তাই নয় সরকারি ট্রাক্টরের সাহায্যে ওই স্থানকে সমতল ও করা হয়; যদিও ইউ পি সরকার এটা পর্যটনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে বলে দাবি করে। এই মন্দির নির্মাণের নকশা অনুযায়ী প্রস্তাবিত মন্দিরটির গর্ভগৃহ বিবাদিত স্থানের উপর এসে পড়ে যার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মুসলিম সংগঠনগুলি কোর্টে যায়, এলাহাবাদ হাইকোর্ট তার রায়ে জমির মালিকানা রাজ্য সরকারকে দেয় কিন্তু কোন স্থায়ী নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং রাম জন্মভূমি স্থানে যায় এবং সাধু সন্তদের সঙ্গে মন্দির বানানোর শপথ নেয় যা অনেক কিছু এমনিতেই প্রকাশ করছিল, একই সঙ্গে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলির মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়। এই সময় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিশ্বহিন্দু পরিষদের নেতা অশোক সিংঘল, বজরং দলের তরুণ নেতা বিনয় কাটিয়াল প্রমুখ মুখ্যমন্ত্রীকে এই মর্মে চাপ দিতে থাকে যে রাম মন্দির বাবরি মসজিদের নিরাপত্তায় যাতে একটু ঢিলে দেওয়া হয়, 2 রা আগস্ট 1991। এতে কার সেবকদের যাতায়াতে একটু সুবিধা হবে এই ছিল যুক্তি। যাইহোক খুব শীঘ্রই এর ফলাফল দেখা যায় 31 শে অক্টোবর 1991 সালে কিছু কার সেবক বিবাদিত সৌধের উপর উঠে পড়ে এবং সেখানে গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করে, এদের কেউ রোকার ছিল না। এরপর 2 রা নভেম্বর 1991 সালে রাষ্ট্রীয় একতা পরিষদের মিটিং এ কল্যাণ সিং বলেন- "আমরা সৌধের সুরক্ষা আরও বাড়িয়ে দিয়েছি এবং এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। আমরা আদালতে নির্দেশ মানতে বাধ্য"। এলাহাবাদ হাইকোর্টে কোর্ট কোন পাকা নির্মাণে উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, রাম জন্মভূমি ন্য়্যাস ট্রাস্ট এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। সুপ্রিম কোর্ট বলেন- "এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় সঠিক এবং রাম জন্মভূমি বাবরি মসজিদকে সুরক্ষিত রাখার পুরো দায়িত্ব উত্তরপ্রদেশের কল্যাণ সিং সরকারের। কোর্ট একই সঙ্গে বলেন ইউ পি সরকার যেন হাইকোর্টের নির্দেশের পালন করে"।

রাজ্যের অবস্থা ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যার ফলে রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও রামমন্দির বাবরি মসজিদের সুরক্ষা কল্পে নরসিমহা রাও সরকার কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠাতে চাই কিন্তু কল্যাণ সিং সরকার একে রাজ্যের উপর কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের অজুহাতে এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। এরপর নরসিমহা রাও উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলবে বলে ঠিক করে কিন্তু তার আগেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ 9 জুলাই 1992 সালে কারসেবার দিন ঠিক করে। ওইদিন 50-60 হাজার মানুষ অযোধ্যায় এসে যোগ দেয়। সেদিন ইউ পি সরকারের অধিগৃহীত জমিতে এক সৌধ নির্মাণ করা হয় যা হাইকোর্টের নির্দেশের অবমাননা। কল্যাণ সিং কে এবিষয়ে প্রশ্ন করলে উনি প্রথমে এটা কারা করেছে জানি না বলে এড়িয়ে যেতে চাইলে ও পরবর্তীকালে এটা বলেন কাজ রুখলে দাঙ্গা হতে পারে। এদিকে বিজেপি ও সঙ্ঘপরিবার এটা বলতে থাকে যে কার সেবার সঙ্গে তাদের কোন যোগাযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও 23 শে জুলাই 1992 সালে সাধু সন্তদের এক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে সাধু সন্তরা আপাতত কার সেবা বন্ধের বিষয়ে সম্মতি জানায় ও এই সমস্যা মেটানোর জন্য তিন মাসের সময় দেন। নরসিমহা রাও এর কাছে বিবাদ মিটিয়ে নেওয়ায় জন্য তিন মাসের সময় ছিল। এই সময় তিনি আবার বিবাদি দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেন।

রাম জন্মভূমি আন্দোলনের নেতারা দাবি করেন-মন্দিরে কালো পাথর ও অনেক হিন্দু স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায়; এছাড়া বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক রিপোর্ট ও ব্রিটিশ সরকারের বেশ কিছু রিপোর্ট পেশ করে, যার থেকে প্রমাণিত হয় এটা এক হিন্দু মন্দির। অন্যদিকে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি যুক্তি দেখায়- বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে 1570 এর কাছাকাছি সময়ে তুলসীদাস রামচরিত মানস রচনা করেন; যদি এইরকম কোন ঘটনা ঘটত তাহলে সেখানে এই বিষয়ে কোন উল্লেখ নেই কেন? এছাড়া মন্দিরের অন্যান্য অনুষঙ্গ হিসেবে গাদা, শঙ্খ এগুলি পাওয়া যায় নি কেন? এছাড়া বেশ কিছু রিপোর্ট পেশ করে এটা প্রমাণিত করার চেষ্টা করা হয় এখানে কোন মন্দির ছিল না। উভয় পক্ষই নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে একদম অনড় মনোভাব পোষণ করে সামান্যতম আপস করতে ও কোন পক্ষ রাজি ছিল না। সকল দাবী দাওয়া নিয়ে পরবর্তী বৈঠক 8 ই নভেম্বর হওয়ার কথা ছিল। মনে হতে থাকে আলোচনার মাধ্যমে ও এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। দেশ গভীর আগ্রহে 8 তারিখের অপেক্ষা করছিল। ঠিক সেই সময় এক বড় ঘটনা ঘটে হঠাৎ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ 30 শে অক্টোবর ধর্ম সংসদের বৈঠক ডাকে এবং সেখানে আলোচনা বিফল হওয়ার একতরফা ঘোষণা করে এবং সেই সঙ্গে 6 ডিসেম্বর 1992 সালে কারসেবা শুরু করার আহ্বান জানানো হয়। এদিকে 8 ই নভেম্বর আলোচনা শুরু হলে বাবরি পক্ষ বলেন আপনারা যখন কার সেবা শুরুর ঘোষণা করে দিয়েছেন তখন আলোচনা করার আর কোন অর্থই হয় না; আগে আপনারা কার সেবা বন্ধ করুন তখনই আলোচনা সম্ভব। অন্যদিকে মন্দির পক্ষ বলেন এটা ধর্ম সংসদের সিদ্ধান্ত এতে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারব না। এভাবে দুই পক্ষের অনড় মনোভাবের জন্য আলোচনা ভেস্তে যায়।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য নানা পরিকল্পনা করতে থাকে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব মাধব গোডবোলে প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও কে পরামর্শ দেন কুড়ি হাজার সেন্ট্রাল ফোর্স অযোধ্যায় পাঠানো হবে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসন পরিস্থিতি খারাপ এই যুক্তি দেখিয়ে রাজ্যপালের রিপোর্টের ভিত্তিতে সংবিধানের 355 নম্বর ধারা অনুসারে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী তাকে এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে বলেন এবং বলেন প্রয়োজন পড়লে এটা করতে হবে, তবে তিনি তখনও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষপাতি ছিলেন। তিনি আলোচনার জন্য 18-19 শে নভেম্বর কল্যাণ সিং কে ডাকেন। কল্যাণ সিং বলেন- "সরকারের অধিগৃহীত 2.77 একর জমিতে কোন বিবাদ নেই তাই পুরো জমি হিন্দুদের দেওয়া হোক এবং মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকার অন্য জায়গায় জমির ব্যবস্থা করবে"। নরসিমহা রাও বলেন- "আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে আমরা কি করে সিদ্ধান্ত নেব? তবু আপনার কথা আলোচনার জন্য ক্যাবিনেট কমিটিতে পাঠানো হবে"। ক্যাবিনেট কমিটিতে কল্যাণ সিং এর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে কল্যাণ সিং এর প্রস্তাবটি রাখা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়- "সরকারের অধিগৃহীত জমিতে প্রস্তাবিত কার সেবা হবে যেটি মূল সৌধ থেকে আলাদা রাখা হবে এবং সেখানে কার সেবার অনুমতি দেওয়া হোক" 20 নভেম্বর,1992। ক্যাবিনেটে এই কথাটি উঠে আসে কল্যাণ সিং এর এই প্রস্তাবটি সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গঠিত সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় একতা পরিষদে আলোচনা করা হোক। সেই উদ্দেশ্যে নরসিমহা রাও 23 শে নভেম্বর 1992 সালে রাষ্ট্রীয় একতা পরিষদের বৈঠক ডাকেন কিন্তু বিজেপি ওই বৈঠকে উপস্থিত হয়নি। এদিকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বলে নরসিমহা রাও এই বৈঠক মুসলিমদের তোষণ করার উদ্দেশ্যে ডাকে যা কল্যাণ সিং বুঝতে পারে তাই বিজেপি আলোচনায় যায় নি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে এই মর্মে হুমকি দিতে থাকে উত্তরপ্রদেশ সরকার বরখাস্ত হলে বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কোন নেতার উপর কোন ব্যবস্থা নিলে ফল ভাল হবে না। আন্দোলন আরও হিংস্র হয়ে যাবে এবং কার সেবকরা অযোধ্যার দিকে যাত্রা শুরু করে দেবে।

এখন প্রশ্ন হল নরসিমহা রাও কি করছিলেন? তৎকালীন গৃহসচিব মাধব গোডবোলে তার আত্মজীবনী unfinished innings এ লেখেন 25 শে অক্টোবর রাও রাজ্যপালের রিপোর্টকে হাতিয়ার করে উত্তরপ্রদেশে 356 ধারা জারি করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে চেয়েছিল। তৎকালীন রাজ্যপাল সত্যনারায়ণ রেড্ডি 26 শে নভেম্বর দিল্লি এসে রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু ওই দিনই সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য সরকার হলফনামা দিয়ে জানায় বিবাদিত সৌধের সুরক্ষার দায়িত্ব উত্তরপ্রদেশ সরকার নিচ্ছে। তাই রাজ্যপালের মনে হয় এই অবস্থায় রিপোর্ট দেওয়া ঠিক হবে না, আদালতে মামলা হতে পারে; কেন্দ্র সরকারের উপর সাংবিধানিক অধিকারের দুঃপ্রয়োগের অভিযোগ উঠতে পারে যা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য ভালো হবে না। প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও রাজ্যপালের কথা মেনে নেয় এবং রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। যদিও মাধব গোডবোলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্ট এটা ও বলেছিল- বিচার আলাদা এবং শাসন আলাদা তাই, শাসনের প্রয়োজনে সরকার জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু নরসিমহা রাও সমস্ত কিছু বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত রাজ্যপালের পরামর্শই মেনে নেন।

রাম মন্দির ও বাবরি পক্ষের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ফলে এখন উপায় ছিল শুধুমাত্র হাইকোর্টের রায়। কোর্টের রায় দেওয়ার কথা ছিল 30 শে নভেম্বর, কিন্তু পরে তারিখ দেয় 4 ই ডিসেম্বর এবং এটিও পরিবর্তন করে কোর্ট রায় দেওয়ার তারিখ ঘোষণা করে 11 ই ডিসেম্বর 1992। যেহেতু 6 ই ডিসেম্বর কারসেবা শুরুর ঘোষণা আগে থেকেই ছিল সেহেতু প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও সুপ্রিম কোর্টকে অনুরোধ করেন তারা যেন হাইকোর্টকে এই মর্মে নির্দেশ দেয় যেন রায় 6 তারিখের আগে দেওয়া হয় কিন্তু এলাহাবাদ হাইকোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলে বিভিন্ন নথিপত্র দেখার জন্য 11 ই ডিসেম্বরের আগে রায় দেওয়া সম্ভব নয়। 5 ই ডিসেম্বর অর্থাৎ বাবরি ধ্বংসের আগের দিন অযোধ্যাতে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবাণী বড় সভা করেন। এখানেই বাজপেয়ী নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে জমি সমতল করার কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে নরসিমহা রাও দ্বিবিধ চাপে ছিলেন কংগ্রেসের এক বড় অংশ মনে করত কোন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না; এতে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। অন্যদিকে সরকারি আমলাতন্ত্র ও কংগ্রেসের অন্য একটি অংশ চাইছিল সরকার কঠোর সিদ্ধান্ত নিক। অনেকের মতে নরসিমহা রাও ভেবেছিলেন সমস্যাটি রাজনৈতিক ভাবে সমাধান করে নেবেন কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ভিড় যে বাজপেয়ী ও আডবাণীর ও আয়ত্তের বাইরে ছিল তা তিনি ঠিক বুঝতে পারেন নি।

দেখতে দেখতে 6 ই ডিসেম্বর 1992 দিনটি চলেই এল। ওইদিন গোটা দেশে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, মনে হতে থাকে আজ কিছু একটা হবে! পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এটা ঠিক ছিল যে রাজ্য সরকারের অধিগৃহীত জমিতে প্রথমে রাম লালার পূজা হবে এবং পরে বেলা 12.30 এর সময় প্রতীকি কার সেবা শুরু করা হবে। ওই দিন দুপুর 12 টার সময় প্রতীকি কার সেবা স্থল থেকে ব্যরিকেট টপকে এক তরুণ কার সেবক গম্বুজে উঠৈ পড়ে এবং দেখতে দখতে মসজিদের গুম্বজে বহু কার সেবকরা উঠে পড়ে এবং মসজিদ ভাঙ্গতে শুরু করে। নরসিমহা রাও সরকার 195 কোম্পানির কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠিয়েছিল এবং এমন কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল যে কয়েক লক্ষ মানুষকে কয়েক ঘন্টার মধ্যে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী আইন শৃঙ্খলা রক্ষা রাজ্যের বিষয় কেন্দ্রীয় সরকার বাহিনী পাঠাতে পারে কিন্তু বাহিনী মোতায়েন এবং তার উপর নিয়ন্ত্রণ করে রাজ্য সরকার। বাবরি ধ্বংস সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন লিবরাহান কমিশন তার রিপোর্টে জানায় কল্যাণ সিং সরকার ইচ্ছা করে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করেন নি; তাদের নির্লিপ্ত করে রাখে। এদিকে ইউ পির মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে প্রচার করে ছিলেন যে তিনি কার সেবকদের উপর গুলি চালাবেন না। তাই কারসেবকরা আর ও উন্মত্ত হয়ে নির্ভয়ে কারসেবা সম্পন্ন করেন।

কারসেবকরা একের পর এক গম্বুজে চড়ে বসে এবং গম্বুজ ভাঙতে শুরু করে। সরকারের এই সময় উচিত ছিল কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু ইউ পির মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং এর পুলিশকে লিখিত নির্দেশ ছিল কেউ গুলি চালাবে না। তাই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণ পুলিশের ও আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। গুলি চালানোই একমাত্র উপায় ছিল কিন্তু লক্ষ মানুষের উপর গুলি চালানোও সরকারের জন্য সমস্যার হয়ে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে তিনটি গম্বুজ ও বাবরি মসজিদ ধুলিষ্যাৎ হয়। এটি ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক কালো দিন। কারণ এটা শুধু কোন মসজিদ বা মন্দিরই ধ্বংস হয়নি ভারতের সমন্নয়বাদী চিন্তা চেতনা ও ধুলিষ্যাৎ হয়। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ এক গভীর সংকটে পড়ে যায় এবং বর্হিবিশ্বের কাছে ভারতের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়। এখন প্রশ্ন হল বাবরি ধ্বংসের দিন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমহা রাও কি করছিলেন? এর উত্তরে বিভিন্ন ধরণের মতামত পাওয়া যায়। নরসিমহা রাও এর ক্যাবিনেট মন্ত্রী অর্জুন সিং দাবি করেন- "ওই দিন নরসিমহা রাও আদেশ দেন তিনি কারোর সঙ্গে দেখা করবেন না, কারোর কোন ফোন ধরবেন না এবং তাঁকে যেন কেউ বিরক্ত না করে"। কিন্তু তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব ও অন্যান্য আধিকারিকরা ভিন্ন কথা বলেন- তারা জানান প্রতি মূহুর্তে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করা হচ্ছিল এবং তিনি সমস্ত কিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন হল পিভি নরসিমহা রাও কিছু করেন নি কেন? এর উত্তরে 1999 এক পত্রিকার সাংবাদিক শেখর গুপ্তকে নরসিমহা রাও বলেন- "যারা মসজিদ ধ্বংস করতে আসছিল তারা মুখে রাম নাম নিচ্ছিল অন্যদিকে যে পুলিশ গুলি চালাত তারাও মুখে রাম নাম নিত তাই তারা এক হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আরও বলেন আমি কল্যাণ সিং সরকারকে বরখাস্ত করে দিতাম কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সরকার গঠন হয় না, তাহলে 24-36 ঘন্টা ইউ পি তে রাজ্য বা কেন্দ্র কোন সরকারেরই কোন নিয়ন্ত্রণ থাকত না যার ফল আরও ভয়ংকর হতে পারত"।

6 ই ডিসেম্বর 1992 সালে সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ধুলিষ্যাৎ সম্পর্কিত বিষয়টি তদন্ত শুরু করে। কোর্ট ঐতিহাসিক সৌধটি ভেঙে ফেলায় একই সঙ্গে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে। এরপর বাবরি মসজিদ ধ্বংস সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি লিবরাহান কমিশন গঠন করা হয়। অনেক সময় বাবরি ধ্বংসের কারণে অনেকে পূর্বপ্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও কে অন্যায় ভাবে দায়ী করে কিন্তু তা সঠিক নয়। তবে এটাও ঠিক তার শাসন কালে এই ঐতিহাসিক সৌধটিকে রক্ষা করতে না পারার জন্য, অবশ্যই এটি তাঁর শাসনকালকে কালিমা লিপ্ত করে। লিবরাহান কমিশনের রিপোর্টে নরসিমহা রাও কে পুরোপুরি নির্দোষ বলা হয়। কিন্তু বাবরি ধ্বংসের জন্য অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলীমনোহর যোশী, কল্যাণ সিং, উমা ভারতি, অশোক সিংঘল, সমেত 64 জন কে দোষী সাব্যস্ত করা হয় যারা এখন ও আদালতের বিচারাধীন। কবে আদালত দোষী দের শাস্তি দেয় সেটাই দেখার। তবে কমিশন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং কে বড় দোষী বলে মনে করে। তাঁর উপর অভিযোগ তিনি প্রকাশ্যে গুলি না চালানোর কথা ঘোষণা করে কার সেবকদের সুবিধা করে দেন এবং পুলিশের কাজে বাধা দেন। এই বাবরি ধ্বংসের পর গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। যাইহোক স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস যখন লেখা হবে এই ঘটনার উল্লেখ ছাড়া তা সম্ভব নয়। পরবর্তী কালে 30 শে সেপ্টেম্বর 2010 সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট এক রায়ে বাবরি মসজিদ অঞ্চলের জমিকে সমান তিনটি ভাগে ভাগ করে একভাগ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, একভাগ নির্মোহি আখড়া ও একভাগ রামলালা মূর্তি কে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। বলাই বাহুল্য কোন পক্ষই এই রায়ে সন্তুষ্ট হয়নি সকলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। তাই বাবরি ধ্বংসের দোষীদের সাজা ও এই সমস্যার সুষ্ঠ সমাধানের জন্য আপামর জনসাধারণ অধীর আগ্রহে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উপর শোন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছেন। তাই এই সমস্যার কি সমঝোতা বের হয় তার উত্তর একমাত্র সময়ের গর্ভেই নিহিত আছে।

চলবে...

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. এবিপি নিউজ।
3. আজতাক নিউজ।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রক্তিম বিপ্লবী
রক্তিম বিপ্লবী এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 1 দিন ago
Joined: মঙ্গলবার, আগস্ট 29, 2017 - 3:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর