নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • কৌশিক মজুমদার শুভ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

এক সাগর রক্ত পেরিয়ে ১:


১০ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৫০ | পূর্ব পাকিস্তানের ১২ টা জেলায় ছড়িয়ে পরলো হিন্দুবিরোধী দাঙ্গা | জুম্মার নমাজ সেরেই আল্লাহর নামে কোতল শুরু ! ভাবি কি ভয়ানক দিনের প্রেক্ষাপটে ঠাকুমা দাদুকে আর বাবাদের নিয়ে হাঁটা লাগিয়েছিল এপারে |

'জনৈক অতুলানন্দবাবু সাবধান করলেন: নমাজের পরেই দাঙ্গা শুরু হবে | শুনে ধীরাজবাবু বেশ ঘাবড়ে উঠলেন, কেননা তার বাড়ি গেন্ডারিয়া, সম্পূর্ণ মুসলমান বসতি | অরুনবাবু তাকে মোটরে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলেন | পূর্ববঙ্গ সচিবালয়ের অফিসেই প্রথম দাঙ্গার সূত্রপাত হলো | ইতিমধ্যে খবর এলো অতুলানন্দবাবুর বাড়িতে হামলা হয়েছে | গেন্ডারিয়ার কাঠের পুল পেরিয়ে মুসলমান বসতিতে তার বাড়ি ছিল | অতুলানন্দবাবুর বাড়িতে ঢুকে মুসলমান দাঙ্গাকারীরা প্রথমেই সামনে পায় তার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে, এবং উদ্ধত হয় ছুরিকাঘাত করতে | অতুলানন্দবাবু ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন বাঁচাতে | এলোপাথারি ছুরি, ভোজালির আঘাত পরতে থাকে তার পিঠে | লুটিয়ে পরেন তিনি | জীবনটা তখনও ছিল, এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে | ১৫/১৬ বছরের নিতান্ত মুসলমান ছোকড়ারা মহল্লায় অবাধে দাঙ্গা আর লুঠপাট করতে থাকে |

দাঙ্গার মূল উত্সস্থল পূর্ববঙ্গ সরকারের সচিবালয়:পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব শ্রী সুকুমার সেন গেছিলেন পূর্ববঙ্গের মুখ্যসচিব আজিজ আহমেদের সাথে বৈঠক সারতে | বৈঠক শেষ হলো, জুম্মার নমাজের জন্য সেদিনের মত সচিবালয়ে ছুটি হলো | সচিবালয়ের কর্মীরা ভারত বিরোধী, হিন্দু বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে ঘিরে ধরলো শ্রী সেনকে| লাঞ্চিত হলেন সেন | তারপর কর্মীরা আম দাঙ্গাকারীদের সাথে মিছিল করে নবাবপুরের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললো | পূর্ব চিন্হিত দোকানগুলো একে একে জ্বালাতে জ্বালাতে | যারা দোকান বন্ধ করে আগেই পালিয়েছিল, সে সকল হিন্দু সে যাত্রা প্রাণে বাঁচলো, কিন্তু দোকানগুলো বাঁচলো না আর যারা কালবিলম্ব করেছিল তারা রক্তের ঋণ দিয়ে খেসারত চোকালো ! দোকানগুলো তো গেলই সাথে | মহল্লায় মহল্লায় চলতে থাকলো অবাধে হিন্দু হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ ! ওয়ারী অঞ্চলের মানুষজন আতঙ্কে গিয়ে জড়ো হলো ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের প্রাঙ্গনে !

কি পাঠক আরো শুনবেন নাকি? সেই ভয়াল দিনের কথা, যেদিনের প্রেক্ষাপটে আমার ঠাকুমা, প্রায়অন্ধ দাদু আর তার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনিশ্চিতের পথে পা বাড়িয়েছিলেন ?
১৯৫০ এর যেদিনে ঠাকুমা সকলকে সাথে করে দেশ ছেড়েছিল, তার প্রেক্ষাপট:

১.৫–৮–১৯৪৬ তারিখে কলকাতার মেয়র মহঃউসমান উর্দুতে একটি প্রচার পত্র বিলি করে যার বক্তব্য ছিল 'আশা ছেড়োনা তলোয়ার তুলে নাও। ওহে কাফের তোমাদের ধ্বংসের দিন আর বেশীদূরে নয়।' প্রচার পত্রে ছাপা হয়েছিল তলোয়ার হাতে জিন্নাহ্‌র ছবি।

২.১৫ই আগষ্ট মাঝরাত থেকে চিৎপুরের বড়মসজিদ জেগে উঠল,ট্রাক বোঝাই হয়ে হয়ে মানুষ আসতে লাগলো ছোরা তলোয়ার লাঠি নিয়ে, ট্রাক থেকে মাঝে মাঝে পাকিস্তান জিন্দবাদ লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান ধ্বনিতে আকাশ বাতাশ মুখোরিত হচ্ছিল। এমনকি লেডি ব্রেবোন কলেজের মুসলমান ছাত্রীরা বোরখা পরিহিত অবস্থায় লীগের পতাকা হাতে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিল।রাজাবাজারে গোশতের দোকানে হিন্দু মহিলাদের হাত পা কাটা উলঙ্গ ধড় মাংস ঝোলাবার হুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তদানিন্তন ইংরেজ পুলিস কমিসনার হার্ডউউক যে রিপোর্ট দেন তাতে কলকাতার দাঙ্গার ভয়াবহতার সংবাদ অবগত হবার পর ভাইসরয় ওয়াভেল লেখে: 'পলাসীর যুদ্ধে যত লোক নিহত হয়েছে তার থেকে অনেক বেশী লোক নিহত হয়েছে কলকাতায় মুসলীম লীগের তান্ডবে।'

৩. ঐ সময় কলকাতা পুলিসের D.C. HQ. ছিলেন সামসোদোহা । কলকাতায় হিন্দু গনহত্যায় সুরাবর্দ্দির দোসর পুলিসের D.C. HQ. সামসুদ্দোহাকে পাক সরকার কলকাতায় পাকিস্তানের প্রথম ডেপুটি হাই কমিশনার নিযুক্ত করে। এই সংবাদ পেয়ে তৎকালীন পুলিস কমিসনার হীরেন সরকার সামসুদ্দোহাকে একটা অত্যন্ত গোপনীয় চিঠি লেখে। লেখা হয় “খবর পেলাম পাক সরকার তোমাকে কলকাতার ডিপুটি হাইকমিশনার নিযুক্ত করেছেন। আমার কাছে সংবাদ আছে কলকাতার হিন্দু যুবকরা ডাইরেক্ট এ্যাকসন ডেতে তোমার কার্য্যকলাপের উপর এতই উতপ্ত হয়ে আছে যে কলকাতা পুলিসের সমস্ত সদস্যদেরকে তোমার সিকিউরিটিতে নিয়োগ করলেও তোমাকে রক্ষা করতে পারবে কিনা সন্দেহ।এই পরিস্থিতিতে তুমি কলকাতায় কাজে যোগ দেবে কিনা সেটা তোমার বিবেচ্য।” চিঠি পাওয়ার পর সামসুদ্দোহা আর কাজে যোগ দেননি।

৪.এই ভাবে ১৬,১৭,১৮ই আগষ্ট অবধি একতরফা হিন্দু নিধনের পর যখন হিন্দু,শিখ এবং বিহারী গোয়ালারা মিলিতভাবে দাঙ্গাপ্রতিরোধ আরম্ভ করল তখন মুজিব বাধ্য হয়ে হিন্দু প্রতিরোধ কমিটির কর্ণধার গোপাল মুখার্জীর মলঙ্গা লেনের বাড়িতে কড়জোরে অনুরোধ জানাল রক্তপাত বন্ধ করার জন্য !

পাঠক ১৯৫০ সালে আমার ঠাকুমা যখন প্রায় অন্ধ দাদুকে নিয়ে বাবা, জেঠু মেজ জেঠু পিসিদের নিয়ে মাদারীপুর থেকে হাটা শুরু করল, এপার বাংলায় তখন স্বেচ্ছায় হাঁটেনি তারা আর অভিজ্ঞতাটাা খুব একটা সুখকর ছিল না | আমার ঠাকুমার কিছুটা দূরদৃষ্টি ছিল, ঠাকুমা বুঝেছিল আগামীটা সুখকর হতে যাচ্ছে না | কতটা অসুখকর হয়েছিল, আসুন সেটা খুঁজে নি:

নোয়াখালীর এম এল এ ছিল শ্রী হারানচন্দ্র ঘোষ চৌধুরী | উনার বাড়ি ছিল ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বিল্ডিংএর তিন তলাতে | ওই তিনতলা থেকে তিনি অঞ্চলের হত্যাকাণ্ডগুলো প্রত্যক্ষ করেছিলেন | সেগুলো শুনলে পাঠক আপনারাও আতকে উঠবেন ! পার্কের অপর কোনে একটা কমার্শিয়াল স্কুল ছিল | স্কুলের মালিক বাঙালি হিন্দু মুখার্জীবাবু | হারান বাবুর কথায় : কুড়াল দিয়ে যেভাবে কাঠ চ্যালা করা হয়, দুর্বৃত্তরা ঠিক সেভাবেই আঘাত করেছিল মুখার্জিবাবুকে এবং অনেক চিৎকার করলেও কেউ বাঁচাতে যায়নি ! আসলে ১৯৫০ সালে দাঙ্গা হয়নি যেটা হয়েছিল সেটা হল একতরফা হত্যাযজ্ঞ | তার সাথে ছিল লুণ্ঠন আর ধর্ষণ !

গেন্ডারিয়া অঞ্চলে প্রখ্যাত নেতা শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন | তার বাড়িও আক্রান্ত হয়েছিল | ভদ্রলোক কংগ্রেসে যোগদান করলেও গান্ধীজিকে কখনো মহাত্মা বলেনি | আসলে ১৯৫০ সালের দাঙ্গা সুপরিকল্পিত এবং পূর্বনির্দিষ্ট ছিল | ঠাকুমা কি এটা বুঝতে পেরেছিলেন ? মহিলাদের তো তখন খুব একটা বাড়ির বাইরে পা পরত না | হয়তবা আশপাশের খবর গুলো শুনে বুঝতে পেরেছিলেন আগামীতে কি ভয়ানক দিন আসতে চলেছে | অতএব হাঁটা দিলেন | কাহিনী এখানেই শেষ নয় পাঠক | মুসলিম লীগের তাবেদারি করা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকেও দেখা গেছিল অনেক হিন্দুকে সেই সময় রক্ষা করতে, আসলে 'devils must be given their due shares' ! আগে ঢাকা শহরের কথা শেষ করেনি তারপরে দেখব বাকি জায়গাr কান্ড | হিন্দুদের শ্রমে অর্থে করা ঢাকা শহর | তৈমুর লং আর নাদির শাহের দিল্লী বিজয়ের কথা পড়েছেন তো ? ১৯৫০ ফেব্রুয়ারি মাসে সেই তিনদিনের রায়টের ঢাকার ঐ একই অবস্থা হয়েছিল !
১৯৫০ এ যখন ঠাকুমারা বাংলাদেশের মাদারীপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল তখন বাবার বয়স বেশ অল্প | বাড়ির পিছনে হোগলা বনে বাবারা খেলতে যেত | বাবার মুখে শোনা ঘটনা | শুকনো ডাবের খোলা নিয়ে পা দিয়ে ফুটবল খেলতে খেলতে হঠাৎ ওই প্রাকৃতিক ফুটবলে বাবা পা দিয়ে বাবা পায়ে ব্যথা পেল | ঝুঁকে দেখল ওটা একটা মানুষের মাথার খুলি | কৌতুহল জাগল খানিকটা এগিয়ে দেখল একটা কুঁয়া টাইপের গর্ত করা | গর্তের উপর থেকে পাতার জঙ্গল সরিয়ে দেখল গর্ত ভর্তি মানুষের পচা-গলা দেহ আর এরকম শক্ত কিছু কঙ্কালের খুলি | বাবার ভয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল | পাঠক এটাকে গল্প মনে হচ্ছে ? তাহলে সত্যটা নাহয় একটু খুলে দেখি ?

অশ্বিনী দত্তের বরিশাল দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার পূণ্যভূমি | জনসাধারণের তখন শতকরা ৮৫ জন মুসলমান | বরিশালে ১১ই ফেব্রুয়ারি এক ঘরোয়া সভা ডাকা হলো জেলা মুসলিম লীগের সম্পাদক মইনুদ্দিন হিন্দুদের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষা ব্যবহার করল | ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হাসান আলী মির একই কথা বলল | রাত্রি নটায় চারিদিকে গগনভেদী আল্লাহু আকবর ধ্বনি ! চিৎকার বাচাও বাচাও ! আলকান্দার মসজিদে পিছনে সুরেন দত্তের বাড়ি প্রথমে আক্রান্ত হল | দশ বারোটা টিনের ঘরে আগুন জ্বললো | মেয়েরা সব আশ্রয় নিল জগদিস থিয়েটারের মালিক উপেন গুপ্তর বাড়িতে | অনেকেই পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিল | ১৫ ই ফেব্রুয়ারী শোনা গেল কাশিপুর লুঠ হবে ! রাজেন্দ্র আচার্য কে হত্যা করে তার মাথাটা টাঙানো হলো একটা ফুলগাছে | চললো ব্যাপক নারী হরণ অগ্নিকাণ্ড ও ধর্মান্তকরণ আর ধর্ষণ | কাশিপুর যেন নরক হয়ে উঠলো !

(চলবে...................)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রাজর্ষি ব্যনার্জী
রাজর্ষি ব্যনার্জী এর ছবি
Offline
Last seen: 5 ঘন্টা 25 min ago
Joined: সোমবার, অক্টোবর 17, 2016 - 1:03অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর