নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সুখ নাই
  • লুসিফেরাস কাফের
  • কাঠমোল্লা
  • মিশু মিলন
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী

নতুন যাত্রী

  • সামসুল আলম
  • এস. এম. মাহবুব হোসেন
  • ইকরামুজ্জামান
  • রবিউল আলম ডিলার
  • জহুরুল হক
  • নীল দীপ
  • ইব্রাহীম
  • তারেক মোরশেদ
  • বাঙলা ভাষা
  • সন্দীপন বিশ্বাস জিতু

আপনি এখানে

১৪ গুষ্টির উপাধির পদবি এবং বৈষম্য!


নাপিতের ছেলে নাপিত না-হয়ে কোনো রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকের ম্যানেজার হলেও ব্রাহ্মণের পুত্রকন্যারা আবার নাপিতের পেশা বেছে নিচ্ছেন, যার আধুনিক নাম বিউটিপার্লার। ধোপার পুত্রকন্যাদের ধোপার পেশা না-করে বি সি এস অফিসার হতে বাধা নেই যেমন, তেমনই উচ্চবংশীয় পুত্রকন্যারা লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হচ্ছেন। ইত্যাদি।

নামের পাশে বি এ, এম এ, বি এড লিখতেন এখন ও লিখে থাকেন । যিনি লেখেন তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন যে তিনি কত বড় শিক্ষিত ! আসলে কি তাই ? তেমনই তারও বহু আগে যাঁরা একটা বেদ পাঠ করতেন, তাঁদের বলা হত পণ্ডিত। বাংলার বাইরে যা হয়ে যায় পাণ্ডে। যাঁরা দুটো বেদ পাঠ করতেন, তাঁদের বলা হত দ্বিবেদী। বাংলার বাইরে যাঁরা দুবে হিসাবে পরিচিত। তিনটে বেদ পাঠ করতেন যাঁরা, তাঁদের বলা হত ত্রিবেদী। বাংলার বাইরে এঁরাই হয়ে যান তেওয়ারি। চারটে বেদ যাঁরা পড়তেন, তাঁদের বলা হত চতুর্বেদী। বাংলার বাইরে তাঁরাই চৌবে। তবে হ্যাঁ, বংশের কোনো একজন পণ্ডিত হলে, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কেউ তিনটে বেদ পড়লেও তিনি কিন্তু আর ত্রিবেদী বা তেওয়ারি হয়ে উঠতে পারতেন না। তাঁকে পণ্ডিত পদবি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হত। তেমনই দুটি বা তিনটি বা চারটে বেদ পড়া কারও বংশধর যদি একটিও বেদ না পড়তেন, তাঁরাও শুধুমাত্র উত্তরাধিকার সূত্রেই ওই পূর্বের পদবিই ব্যবহার করবেন। তৎকালীন ওড়িশা, বর্তমানে মেদিনীপুরের পদবি “পাঁজা” এসেছে পাঞ্জা থেকে। মোঘল আমলে পাঞ্জা ছাপ দেওয়া কোনো বাদশাহি সনদপ্রাপ্তি বা ভূমি দানের স্মৃতিকেই বংশ গৌরব হিসাবে ধরে রাখার জন্য পাঞ্জা ছাপ থেকে পাঞ্জা এবং তা থেকে পাঁজা পদবির সৃষ্টি। পায়রা মানে কিন্তু কবুতর নয়। শীতের প্রথমে খেজুর গাছের রস থেকে গুড় বানাতে হলে গাছটির গুঁড়ি খানিকটা কেটে কলসি ঝুলিয়ে দিতে হয়। নিয়ম হল, পর পর তিন দিন গুঁড়ি কাটা যাবে ও রস গ্রহণ করা যাবে। তার পর তিন দিন বিশ্রাম। এই বিশ্রামের পর প্রথম যে দিন আবার গুঁড়ি কাটা হবে, তার রস থেকে যে গুড় তৈরি হয়, তাকে বলা হয় পায়রা। অর্থাৎ পহেলা বা পয়লা শব্দ থেকেই পয়রা, পয়ড়্যা ও পায়রা। “মান্না” এসেছে হয়তো মান্য থেকে। ধনবান বা ধনাঢ্য থেকে এসেছে আঢ্য। পরে আড্ডি। ভুঁইয়া হল ভৌমিকের অপভ্রংশ রূপ। শা এসেছে সাধু বা সাউ থেকে। “সাধু”-র সঙ্গে খাঁ উপাধি যুক্ত হয়ে সাধুখাঁ হয়েছে। ‘তা’ এসেছে হোতা থেকে। হোমক্রিয়ার পুরোহিত, যার আদি রূপ হোত্রী। যেমন অগ্নিহোত্রী। ভড় শব্দের অর্থ মালবাহী বড় নৌকো বা বার্জ। আবার ভড় হচ্ছে প্রাচীন গৌড়ের একটি অঞ্চলের নাম। কারও কারও মতে, “ভড়” এসেছে ভদ্র থেকে। ঢোল পদবিধারীরা ছিলেন আসলে সান্যাল। এঁদের যৌথ পরিবারটি ছিল বিশাল। প্রায় দুশো জনের মতো। খাবারের সময় ঢোল বাজিয়ে সবাইকে ডাকা হত। অন্য পরিবার থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার জন্যই এঁদের নামকরণ হয় ঢোল-সান্যাল। পরে সান্যাল উঠে শুধু ঢোল হয়ে যায়। কোনো কোনো পরিবার পরম্পরায় ঢোল উঠে গিয়ে সান্যালও রয়ে গেল। ‘লাহা’ এসেছে সুবর্ণরেখার নিকটবর্তী অঞ্চলে লাক্ষা চাষ করা থেকে। ‘রাহা’ বোধ হয় এরই অপভ্রংশ রূপ। ‘নাহা’ও তাই। তবে নাহার আর-এক অর্থ ছোটো নদী বা খাল। তা থেকেও নাহা এসে থাকতে পারে। ১৫১০ সালে আনন্দভট্ট রচিত ও ১৯০৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া কর্তৃক প্রকাশিত “বল্লাল চরিত” নামক বইয়ে হিন্দু সমাজে পদবি প্রচলন সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে (তথ্যসূত্র : সমাজদর্পণ ১৫ বর্ষ, সংখ্যা ১২ ; জুন ১৯৯৯)। ওই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, গৌড়ের বৈদ্যবংশীয় রাজা বল্লালসেন(১১৫৮-১১৭৯ সাল) নিজ সহধর্মিণী থাকা অবস্থায় অধিক বয়সে পদ্মিনী নাম্নী এক সুন্দরী ডোম নর্তকীকে বিয়ে করেন। এতে দেশজুড়ে রাজার সুনাম বিনষ্ট হয় এবং এ কুকীর্তি নিয়ে প্রজারা সমালোচনা শুরু করে দেন। রাজা এই কলঙ্ক থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য সকল সম্প্রদায়ের প্রজাদের এক সম্মিলিত ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। কিন্তু, সকল সম্প্রদায়ের লোকেরা উপস্থিত থাকলেও নমশূদ্র বিপ্রগণ এই ভোজ অনুষ্ঠানে যোগদানে বিরত থাকেন, অথাৎ রাজার এই কুকীর্তিকে সমর্থন করে তারা ভোজসভায় অংশ নেয়নি। রাজা তাদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হন এবং নমশূদ্র লোকদের চাকরিচ্যূত করেন। শুধু তাই নয়, রাজা তাদের চণ্ডাল বলে গালাগাল করে নগর-বন্দর থেকে উৎখাতও করে দেন। অন্যদিকে ভোজসভায় অংশগ্রহণকারী সম্প্রদায়ভুক্তরা রাজার সকল কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে রাজার অনুগ্রহ লাভ করতে যত্নবান হন। রাজাও এসব সম্প্রদায়কে সাহায্য করেন এবং অনেক সম্প্রদায়কে কৌলীন্য বা পদবি দান করেন। এভাবেই বল্লালসেন পদবি বৈষম্য সৃষ্টি করে হিন্দুসমাজে বিষাক্ত বীজ বপন করেছিল যা বর্ণভেদকে আরও শক্তিশালী করে। বল্লালসেনের পরবর্তী বংশধর লক্ষ্মণসেনের ভূমিকাও ছিল লজ্জাকর। এই বর্ণভেদ আজও আমাদেরকে দুর্বল করে রেখেছে। সেনরাজারা বাঙালি ছিলেন না। তবুও, পদবি-বৈষম্য সৃষ্টি করে বাঙালিদের শাসন করাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। অষ্টম শতকে বাংলাদেশে চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার পর গ্রাম সভা ও বিশিষ্ট নাগরিকরা সাধারণ একজনকে সম্রাট পদে বসিয়ে দিয়েছিলেন, যার নাম ‘গোপাল’। কিন্তু এই গোপালের নামের শেষাংশ ধরে রাখবার প্রচেষ্টায় উত্তরাধিকাররা ক্রমান্বয়ে সকলেই নামের শেষে গোপাল এর ‘পাল’ অংশকে পদবি হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন, পরে তাই ঐতিহাসিক “পাল” বংশের সূত্রপাত ঘটে। বল্লালসেনের আমলে ছত্রিশটি জাত সৃষ্টি করে ছত্রিশটি আলাদা মর্যাদা তৈরি করা হয়েছিল। সমাজে এভাবে ছত্রিশটি প্রধান পদবিরও সৃষ্টি হয় পেশাগুণে। এর পর ৩৬টি জাতে আরও হাজার রকম বিভাজন ঘটে এবং হাজার হাজার পদবির সৃষ্টি হয় বাংলার সমাজে। এই সব হাজার হাজার পদবির উত্তরাধিকারত্ব লাভ করেছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল বাঙালি বৌদ্ধ, বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান। তাই দেখি চৌধুরী, তালুকদার, বিশ্বাস, মজুমদার, খান, মলি, মুন্সি, সরকার, সরদার প্রভৃতি প্রায় সকল পেশাগত সামাজিক পদবি রয়েছে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ে প্রায় সমানভাবে।বাঙালি হিন্দু বা মুসলমান কিংবা খ্রিস্টান অথবা বৌদ্ধসমাজে পদবি এসেছে বিচিত্রভাবে। মুসলিমদের আরও কয়েকটি পদবি বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। চলুন। “মির” বা “মীর” শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবি শব্দ ‘আমীর’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে মীর। সেই অর্থে “মীর” অর্থ দলপতি বা নেতা, প্রধান ব্যক্তি, সরদার ইত্যাদি। জিতে নেয়া বা জয়ী হওয়া অর্থে মীর শব্দের ব্যবহার হত। তবে মীরবংশীয় লোককে সম্ভ্রান্ত এবং সৈয়দ বংশীয় পদবিধারীর একটি শাখা বলে গবেষকগণ মনে করেন। “মিঞা” মুসলিম উচ্চপদস্থ সামাজিক ব্যক্তিকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত সম্ভ্রমসূচক শব্দ। এক অর্থে সকল মুসলমানের পদবিই হচ্ছে মিঞা । অনুরূপ, বাঙালি হিন্দুর ‘মহাশয়’-এর পরিবর্তে বাঙালি মুসলমান “মিয়া” শব্দ ব্যবহার করে থাকে। “সৈয়দ” পদবি মূলত এসেছে নবি-নন্দিনী হজরত ফাতেমা ও হজরত আলির বংশধর থেকে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই বংশের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র না থাকলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান পরিবার সৈয়দ বংশ পদবি ব্যবহার করে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ও কুলীন (খানদান ?) মুসলমান বলে দাবি করে থাকেন। “শেখ” আরবি থেকে আসা পদবি। সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্মানসূচক বংশ পদবি শেখ। যিনি সম্মানিত বৃদ্ধ অথবা যিনি গোত্রপ্রধান, তাকেই বলা হত শেখ। হজরত মোহাম্মদ (সঃ) সরাসরি যাকে বা যাঁদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তিনি বা তার বংশধরও “শেখ” হিসাবে অভিষিক্ত হতেন অথবা শেখ পদবি লাভ করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে যারা শেখ পদবি ধারণ করেন, তারা এ রকম ধারণা পোষণ করেন না যে, তারা বা তাদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন সৌদি আরব থেকে। “মোল্লা” শব্দের অর্থ করা হয়েছে মুসলমান পুরোহিত। বস্তুত এভাবে মসজিদে নামাজ পরিচালনার কারণেও অনেকে মোল্লা উপাধি পেয়েছিল এবং তার পর থেকেই মোল্লা পদবির ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মোল্লা হচ্ছে তুর্কি ও আরবি ভাষার “মোল্লা” থেকে আসা একটি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ জ্ঞানবিশিষ্ট মহাপণ্ডিত ব্যক্তি। অন্য অর্থে মুসলিম পণ্ডিত বা ব্যবস্থাপক বা অধ্যাপক হলেন মোল্লা। পরবর্তীকালে মসজিদে নামাজ পরিচালনাকারী মাত্রই “মোল্লা” নামে অভিহিত হতে থাকে। এখান থেকেই সাধারণত বংশ-পদবি হিসাবে তা ব্যবস্থার হওয়া শুরু হয়। তাঁরা সকল জ্ঞানের জ্ঞানী না-হওয়া সত্ত্বেও মোল্লা পদবি ধারণ করে। সেইজন্য বোধহয় ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ প্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের পদবি ব্যবহারের উদ্যোগ খুব বেশি প্রাচীন না হলেও, তাতে কম করে হলেও হাজার বছরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাঙালির বংশ-পদবিগুলির মধ্যে রয়েছে কিছু আঞ্চলিক পদবি, শুধু অঞ্চল থেকেই তার জন্ম ও ব্যবহার। কিছু পদবি আছে একেবারে বাঙালির জাতীয়। সারা বঙ্গ জুড়েই তার প্রসার। কয়েকটি অবশ্য ধর্মীয় পদবি আছে, যা হিন্দু-মুসলমানদের একান্ত নিজস্ব। তবে জনপ্রিয় পদবিগুলির বেশিরভাগই ধর্মনিরপেক্ষ এবং একান্তভাবে বাঙালির সম্পদ। সেই কারণেই সব পদবিধারী মানুষকে সব অঞ্চলে দেখা যায় না। উদাহরণ দিতে পারি – “বেরা”, “মাইতি” পদবিধারীগণ সাধারণত মেদিনীপুরে বাসিন্দাদের ভেতর পাওয়া যায়। আবার “পায়রা” “পট্টনায়ক” পদবিধারীরা ওড়িশায়। হিন্দু হল, মুসলিম হল – এবার বৌদ্ধদের পদবি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করে এই আলোচনায় ইতি টানব। বাঙালি বৌদ্ধরা বড়ুয়া (এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ), রাজবংশী, সিকদা, মুৎসুদ্দি, তালুকদার, চৌধুরী ও সিংহ পদবি করে থাকে। আরাকানি শাসনামলে আরাকানি পদবিও ব্যবহার করত। বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি বৌদ্ধদের মধ্যে ব্যবহৃত বড়ুয়া পদবিটা শুধু চট্টগ্রামের ও আসাম-ত্রিপুরায় যথাক্রমে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণরা ব্যবহার করে না, বিশ্বের অনেক অঞ্চলের অনেক সম্প্রদায়ে এ শব্দটা ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে উপরোক্ত পদবিগুলি বৌদ্ধরা ব্যবহার করতে থাকে মূলত ব্রিটিশ শাসনামল থেকে। বৌদ্ধধর্মে কোনো ধরনের বর্ণপ্রথা না-থাকার কারণে বিভিন্ন শাসকের শাসনামলে শাসনকার্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শাসকের কাছ থেকে সুযোগসুবিধা নিয়ে বা সুযোগসুবিধা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন পদবি গ্রহণ করেছে, এখনও স্বেচ্ছায় অনেকে পদবি পরিবর্তন করছে। অন্যদিকে মেয়েরা যেন পদ্মপাত্রে জল, সর্বদাই করছে টলমল। প্রাক-বিবাহে এক পদবি, বিয়ের পরে অন্য পদবি, বিবাহ বিচ্ছিন্ন হলে ফের পিতার পদবি, পুনর্বিবাহে আবার আর-এক নতুন পদবি । যখন নারী যে পাত্রে থাকে, তখন সে সেইরূপ ধারণ করে। এজন্যই কি বিবাহের “পাত্র” চাই ? অথচ একদা এমন সময় তো ছিল যখন পুরুষরা পদবিধারী হলেও মেয়েরা নয়। বিবাহিত স্ত্রীলোকের নামকে স্বামীর পরিচয়যুক্ত করা সারা ভারতবর্ষে কোথাও কোনোকালেই ছিল না। কে বা কারা যে এসব প্রচলন করল কে জানে ! মেয়েদের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হত দাসি, অথবা দেবী। সরলা দাসি, ভগবতী দেবী ইত্যাদি। পরিশেষে বিনীত নিবেদন, মানুষের সৃষ্ট এ জাত ও পদবি একজন মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের অনেক দূরত্ব সৃষ্টি করেছে । এতে হিন্দুসমাজের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে । অসংখ্য নিম্নশ্রেণি ও বর্ণের হিন্দুরা ধর্ম ত্যাগ করেছে । একজন মানুষ তার কর্মগুণে স্বীকৃতি লাভ করুক, এটা আজ সকলের প্রত্যাশা হোক। সূর্য ও চাঁদ যেমন ধনী-গরিব-বর্ণ-জাত-নির্বিশেষে সমান আলো বিতরণ করে, তেমনই সকলকে সমান সামাজিক মর্যাদা যেন আমরা দিতে পারি ।যেমন ইসকনের দীক্ষা অনুষ্ঠানে দীক্ষাপ্রাপ্ত ভক্তরা তাদের সবাই সামাজিক পদবি বিসর্জন দিয়ে ‘দাস’ পদবি গ্রহণ করছেন । সকলপ্রকার ভেদাভেদ ও অস্পৃশ্যতা ভুলে একে অন্যের আপনজনে পরিণত হয়েছে । সমাজ সামান্য সামান্য করে হলেও বদলাচ্ছে। এখন আর নাপিতের ছেলে নাপিত হয় না, তাঁতির ছেলে তাঁতি হয় না। তারাও এখন উপযুক্ত শিক্ষাদীক্ষা লাভ করে তথকথিত উচ্চবর্ণের একচেটিয়া পেশায় থাবা বসিয়েছে। নাপিতের ছেলে নাপিত না-হয়ে কোনো রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকের ম্যানেজার হলেও ব্রাহ্মণের পুত্রকন্যারা আবার নাপিতের পেশা বেছে নিচ্ছেন, যার আধুনিক নাম বিউটিপার্লার। ধোপার পুত্রকন্যাদের ধোপার পেশা না-করে বি সি এস অফিসার হতে বাধা নেই যেমন, তেমনই উচ্চবংশীয় পুত্রকন্যারা লন্ড্রি ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হচ্ছেন। ইত্যাদি। এইভাবে সামাজিক মর্যাদার কিছুটা করে পরিবর্তন হচ্ছে বইকি। পেশাভিত্তিক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে সামাজিক মর্যাদা একসময় নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, যাবেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর “নামের পদবী” (১৯৩১) প্রবন্ধে বলেছেন – “……মেয়েরই হোক, পুরষদেরই হোক পদবী মাত্রই বর্জন করবার আমি পক্ষপাতী। ভারতবর্ষে অন্য প্রদেশে তার নজীর আছে…”। বিবেকানন্দ এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন – “জাতপাতের কুসংস্কারের সঙ্গে ধর্মপালনের কোনো সম্পর্ক নেই। জাতপাত হল সামাজিক ক্ষমতার অপববহার সৃষ্টি”। আচ্ছা, আমরা যারা বাংলাদেশী তাদের পদবি এমন হলে কেমন হত –- এই ধরুন আমার #### বাংলাদেশী, আপনার নাম মামুন বাংলাদেশী, ওর নাম কোয়েল বাংলাদেশী, তার নাম আয়েসা বাংলাদেশী। আমার পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীর নাম উম্মে ফাতেমা বাংলাদেশী, রাজ্জাক বাংলাদেশী । দেশের পরিচয়ে আমাদের সকলের পরিচয় হোক। থাকবে না বনেদি কিংবা কুলীনপনার দম্ভ, থাকবে না অন্ত্যজদের কুঁকড়ে যাওয়া, ন্যূব্জ হওয়া। মানুষের পরিচয় শুধুই মানুষ। ভেবে দেখুন সকলেরই ধর্মহীন, জাতপাতহীন একটা পদবি হলে মন্দ হবে না।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

বিকাশ দাস বাপ্পী
বিকাশ দাস বাপ্পী এর ছবি
Offline
Last seen: 2 দিন 3 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, মার্চ 17, 2017 - 1:00পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর