নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • লুসিফেরাস কাফের
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সুখ নাই
  • কাঠমোল্লা
  • মিশু মিলন
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী

নতুন যাত্রী

  • সামসুল আলম
  • এস. এম. মাহবুব হোসেন
  • ইকরামুজ্জামান
  • রবিউল আলম ডিলার
  • জহুরুল হক
  • নীল দীপ
  • ইব্রাহীম
  • তারেক মোরশেদ
  • বাঙলা ভাষা
  • সন্দীপন বিশ্বাস জিতু

আপনি এখানে

একটি মোবাইল এবং এক শেফালি



গত বছর আমার গাঁয়ের পাশের অন্য একটা চরদ্বীপের এক অপরিচিত মাঝবয়সি কৃষক শ্রেণির মানুষ হঠাৎ এক সন্ধ্যায় আমার ফ্লাটের সামনে হাজির। ইন্টারকমে আমার মায়ের সাথে তার দুরসম্পর্কের পরিচয়ের কথা শুনে ঘরে আসতে বলি তাকে। 'আবুল কাসেম' নামের এ গরিব কৃষাণ গাঁ থেকে "খেসারি ডালের ছড়া, কাচা বাংগি আর ঢেকির শাক" নিয়ে এসেছে কষ্ট করে আমার জন্য। এ তিনিট জিনিসই কৈশোরে খুব প্রিয় ছিল আমার। কাসেম নামের এ অপরিচিত মাঝ-বয়সি লোকটি এতো কষ্ট করে ঢাকাতে আমার জন্যে এসব আনাতে, অনেকদিন পর মনটা বেশ ভাল লাগলো। "মাকে চিনতেন এবং তার হাতে অনেক সাহায্য পেয়েছেন" এ কথা বলাতে একদম গলে গেলাম এ গরিব লোকটার প্রতি। রাতে ডাইনিং টেবিলে নিজে হালকা খাবার খেলেও, তাকে অনেক "রিচ-ফুড" খাওয়ালাম নিজের ডানপাশে বসিয়ে। খুব সকালে সে চলে যাবে এমন কথা শো্নালে, গ্রামে ফিরতে রাতেই তার হাতে এক-হাজার টাকা দিলাম যাতায়াত খরচ কিংবা তার ছেলেমেয়েদের কিছু কিনে নিতে।
:
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানলাম, আমার ওঠার আগেই আবুল কাসেম চলে গেছে তার ব্যাগ-পত্র নিয়ে। অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে অনেক খুঁজেও বিদেশ থেকে আনা আমার সখের "হলুদ-সবুজ" মেশানো রঙের দামি মোবাইলটা আর পেলাম না। মন খারাপ হয়ে গেল যতটা না মোবা্ইলের জন্যে, তারচেয়েও বেশি ঐ মোবাইলটার ভেতরে রক্ষিত বিদেশে প্রশিক্ষণের সব তথ্য-উপাত্ত হারিয়ে যাওয়ার কারণে। একদিন কথা প্রসঙ্গে গাঁয়ে অবস্থানরত বোনটাকেও জানালাম আমার মোবাইলটা হারাণোর কথাটা। কিন্তু একবারো মনে করতে পারলাম না যে, যাকে রাতে টেবিলে পাশে বসিয়ে অনেক যত্নে খাওয়ালাম, ড্রয়িং রুমের ফ্লোরে নিজ হাতে বিছানা করে ঘুমুতে দিলাম, সেই লোকটি আমার মোবাইলটি নিয়ে যেতে পারে।
:
মাস খানেক পর বোনটা একদিন মোবাইলে জানালো, আমার ফোনটার মতই একটা ফোন চরের আবুল কাসেমের বৌর হাতে দেখেছে আমাদের গাঁয়ের পরিচিত কজনে। শুনে এক ছুটির দিনে লঞ্চ থেকে নেমেই সোজা চলে গেলাম সরাসরি আবুল কাসেমের বাড়ি; যাতে আমার আগমন টের পেয়ে মোবাইলটা লুকিয়ে ফেলতে না পারে। আকস্মিক চরের কুঁড়ে-ঘরে আবুল কাসেমকে না পেলেও, তার স্ত্রী কুলসুম এবং ৫-টা ছেলে-মেয়ে পেলাম একাকি বিচ্ছিন্ন কুঁড়েতে। এবং ছেঁড়া জামা পরা মেয়েটিকে দেখলাম দৌঁড়ে যাচ্ছে বিলের দিকে মোবাইলটি হাতে। আমি যখন দৌঁড়ে ঝাপটে ধরলাম মেয়েটিকে মোবাইলসহ, তখন পনেরো বছরের মেয়ে এবং তার মা কুলসুম প্রথমে চরের অশ্লীল ভাষায় বাক-বিতন্ডা শুরু করলো আমার সাথে যে, "এমন মোবাইল কি পৃথিবীতে একটাই? এটা তারা দোকান থেকে কিনে আনতে পারেনা"? কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে চরের অনেক নারী, শিশু জড়ো হলো ওখানে। কিনতু বিস্ময়করভাবে কুলসুম পাল্টে দিলো তার ভাষা মূহূর্তে। সে ও তার মেয়ে সবাইকে বলতে থাকলো, "আমি নাকি আকস্মিক কুলসুমের ঘরে ঢুকে তার মেয়েকে ঝাঁপটে ধরেছি। মেয়ে ভয়ে পালাতে দৌঁড় দিলে, সেখানেও আমি মেয়েটাকে ঝাপটে ধরি। যার প্রমাণ বিলের ধুলোতে মেয়েটির মাখামাখি। শেফালি নামের মেয়েটির গায়ের ধুলো দেখালো মা কুলসুম সবাইকে। কুলসুমের আত্মীয়স্বজন আর এলাকার অনেক নারীরা্ ওদের পক্ষে চলে গেলো। একাকি অবস্থা বেগতিক দেখে, মোবাইল না নিয়েই ফিরে এলাম নদীর ঘাটে, কোন রকমে ঐ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে !
:
কিন্তু আকস্মিক নিজের এমন বোকামি, আর ঘটনাটায় মনটা খারাপ হলো আমার খুব। জেদে বাড়ির দিকে না গিয়ে একটা ট্রলার নিয়ে সোজা চলে গেলাম দুরবর্তী থানা সদরে অনেক জলপথ ভেঙে। দুপুর দুটোর আগে থানায় এলেন না 'ওসি' সাহেব। নিজের দাপ্তরিক পরিচয় দিয়ে তাকে পুরো ঘটনা বলাতে, অনেকক্ষণ হাসলেন তিনি। শেষে বললেন, "স্যার, আপনি আমাদের না জানিয়ে এভাবে যাওয়া একদম ছেলেমানুষি হয়েছে। ভাগ্য ভাল আপনার যে, ঐ চরের লোকজন রেপ কেসে আপনাকে আটকে রাখেনি। বড়ই ড্যাঞ্চারাস চর ওটা"!। অবশেষে চা খাইয়ে একটা লিখিত অভিযোগ নিলেন তিনি। একজন 'এসআই'কে নির্দেশ দিলেন, ৬-পুলিশ নিয়ে আমার সাথে সন্ধ্যার পর ঐ দুর্গম চরে যেতে। কারণ দিনে গেলে নদীর তীরে পুলিশ দেখেই সবাই সটকে পড়ে, তাই কাউকে আর ধরা যায়না। থানার 'বকশি'কে ডেকে আরো ছটি ওয়ারেন্ট দিতে বললেন ঐ এসআইর হাতে।
:
দুর্গম চরে পুলিশের ভাঙা গাড়ি কিংবা মোটর-বাইক কিছুই যাবেনা, তাই এসআই বিনীতভাবে ট্রলার ভাড়া করতে বললেন আমায়। রাত ৮-টার দিকে রওয়ানা করবেন তারা ঐ চরে যেতে। থানা হেড-কোয়ার্টারে এক স্বজনের বাড়িতে কাটিয়ে ঠিক ৮-টায় আবার হাজির হলাম থানাতে। ১-SI, ২-ASI-সহ মোট ১০-পুলিশের অস্ত্র, ৮-পেন্ডিং ওয়ারেন্ট, নাইট আউট-পাস ইত্যাদি ঠিক-ঠাক করতে রাত ১১-টা হয়ে গেলো। মাঘের কুয়াশাঘন কন-কনে শীতে ১০-পুলিশের সাথে রাত ১-টায় নামলাম ঐ দুর্গম চরে। নদী থেকে একটা খালের মধ্যে ঢুকতে হবে আমাদের লোকালয়ে যেতে, তাই টর্চ মেরে-মেরে এগুতে থাকলাম আমরা। পুলিশ মাঝিদের বললো - "টর্চ জ্বালিও না। তাহলে এই চরের একটা আসামিকেও পাওয়া যাবেনা, টর্চ দেখে পুলিশ টের পেলে সবকটা বদমাশ পালিয়ে যাবে ঘর ছেড়ে"।
:
এবং তাই হলো। আমরা যখন রেট দিলাম আবুল কাসেমের ঘরে, তখন পেছনের দরজা খোলা পেলাম তার। আবুল কাসেম আর কুলসুম কাউকে পেলাম না ঘরে। ৪-ভাইবোনসহ কাসেমের মেয়ে শেফালিকে পাওয়া গেলো ঘরের কোনে ভয়ার্ত। "দিনে শেফালিও তার মায়ের সাথে আমার নামে মিথ্যে কথা বলেছে" এ অভিযোগে পুলিশ আটক করে শেফালিকে। পুলিশের ধমকে শেফালি কাঁপতে-কাঁপতে তাৎক্ষণিক বলে - "তার মা-বাবা ফোনসহ দৌঁড়ে পালিয়েছে ঐ বিলের দিকে। সে কিছু জানেনা, সবই তার মায়ের নির্দেশে বলেছে। আর ফোনটাও তার বাবা আমার বাসা থেকেই চুরি করে এনেছে"।
:
দুটো হাত বেঁধে শেফালিকে আনা হয় ট্রলারে। একজন কন্সটোবলকে শেফালির পাহারায় রেখে, আবার সব পুলিশ নামে বাকি ৮-আসামির ওয়ারেন্ট তামিল করতে। এসআই আমাকে অনুরোধ করে ট্রলারে 'রেস্ট' করতে। কিন্তু এই শীতের রাতে অন্ধকারে কুয়াশার নিচে খোলা ট্রলারে বসে থাকার চেয়ে, ৮-আসামির রেট দেখা রোমাঞ্চকর আর উপভোগ্য মনে হয় আমার কাছে। এবং সঙ্গী হলাম পুলিশের সাথে আমিও। ঘুট-ঘুটে অন্ধকারে কারো বাড়ির পেছনে, কারো উঠুনে, কারো বা পুকুর পাড়ে রাত ৪-টা পর্যন্ত পুরো চরের ৮-বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ কিন্তু বিস্ময়করভাবে মাত্র একজন আসামি ধরতে পারে, যার পা-ভাঙার কারণে পালাতে পারেনি সে। বাকিরা সবাই ট্রলারের শব্দ আর টর্চের আলো দেখে পালিয়ে যায় বিশাল মাঠ আর পাশের হোগলা পাতার বনে।
:
ভোর ৪-টায় ট্রলারে উঠে হাত বাঁধা শেফালিকে কান্নারত বিধ্বস্ত দেখি আবছা ধোয়াশাময় অন্ধকারে। ট্রলার নদীর অপর তীরে পৌঁছলে, আমার গাঁয়ের নিকটস্থ চরের নদীর তীরে নামিয়ে দেয় আমায় ভোর ৫-টার দিকে একাকি। আবছা অন্ধকারে কিভাবে এ চর ঘেষে একাকি বাড়িতে যাবো জনমানবশূন্য এ নদীতীরে, তাই তরুণ ট্রলার মাঝির হেলপ চাই পথ নির্দেশনার। দুরের আলো-ছায়ার ধানক্ষেতের মাঝের পথ দেখাতে এসে এক ফাঁকে কম বয়সি মাঝি আকস্মিক বলেই ফেলে-
- "স্যার, চিন্তা কইরেন না। দিনের ব্যালা আপনেরে অপমান করার শোধ শেফালি থেকে নিয়া নিছি আমরা ৩-জনে মিলা! ওরে বিলে নামাইয়া ৩-জনে মিলা আচ্ছা কইরা চুইদা দিছি! আপনারে অপমান করার সাধ মিটাইয়া দিছি ছেমড়ি মাগির"!
কথাটা বলেই দৌঁড়ে ট্রলার মাঝি ফিরে যায় তার ট্রলারে। ১০-পুলিশ শেফালি আর খোঁড়া আসামিকে নিয়ে কুয়াশাঘন অন্ধকারে হারিয়ে যায় থানার পথে ট্রলার।
:
বিমর্ষ চিত্তে এ অনির্বাণ বিস্তীর্ণ নক্ষত্রময় ঝলমলে আকাশ-পানে চেয়ে মাঘরাতের প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি আমি ঐ চরের বিজন ঘাসবনে। শেফালি নামক এক তামাটেরঙা গ্রামীণ কিশোরির নরকের পোড়াদেহ আর পুজময় রক্তের তুফান খেলা করে আমার চোখের সামনে তখন অবিরত! একটা হারাণো মোবাইল উ্রদ্ধারে সারারাত নিষ্ফল ঘাস-চরে কাটিয়ে শূন্যহাতে ফেরার দু:খবোধের চেয়ে, শেফালি নামের এ অচেনা হাতবাঁধা কিশোরির বৈশ্বিক জিঘাংসাময় সময়ে ৩-পুরুষের ক্রমাগত ধর্ষণদৃশ্য চোখে ভাসে আমার!
:
এসব চিন্তনে এ অন্ধকারে মৃত্তিকার ঘাসবনে জন্ম নেয় কতগুলো নিকষ বৃক্ষফুল! প্রচণ্ড ঠান্ডার মাঝেও মৃত্যুকে ঢাকনা দেয়া পুতিগন্ধময় ম্যানহোল উপচে ওঠে এক দুর্গন্ধময় জীবনের গান। বাবার মোবাইল চুরি বা দিনে কথিত অভিযোগের কারণে একটুও আর শাস্তি দিতে ইচ্ছে করেনা শেফালিকে আমার। বরং মনটা চায় যেন ঐ হায়েনাদের থেকে উদ্ধার করে শেফালিকে পৌঁছে দিতে পারি তার চরের নল-খাকড়া ঘেরা ঘরে। কিন্তু তার কিছুই হয়না। বরং বহতা জীবনের সুতীব্র আর্তিতে ভরা কান্নাময় সুরের মাঝে এবার ফর্সা হয় চারদিক। জীবন অরণ্যের আদ্যোপান্ত ঘেটে-ঘেটে, বোধের অফুরান বিবমিষার বিরুদ্ধে হেঁটে ক্লান্ত পায়ে আমি এবার এগুতে থাকি আমার বাড়ির পথে। বৃক্ষকষের ব্যথার মত একবোঝা কুহেলী-কলুষ শব্দময়তা ধর্ষিতারূপে শেফালি সামনে এসে পথ আগলে ধরে আমার !

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 18 ঘন্টা 14 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর