নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সুখ নাই
  • লুসিফেরাস কাফের
  • কাঠমোল্লা
  • মিশু মিলন
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী

নতুন যাত্রী

  • সামসুল আলম
  • এস. এম. মাহবুব হোসেন
  • ইকরামুজ্জামান
  • রবিউল আলম ডিলার
  • জহুরুল হক
  • নীল দীপ
  • ইব্রাহীম
  • তারেক মোরশেদ
  • বাঙলা ভাষা
  • সন্দীপন বিশ্বাস জিতু

আপনি এখানে

স্নিগ্ধা ও তামাটে জলদাসের বিয়ে কাহিনি


আকস্মিক মা আমার জন্যে একটু সুন্দরি মেয়ে ঠিক করলেন। বিয়ে করাবেন আমাকে। মার ধারণা বিয়ে করলে আমি ঠিক হবো। কারণ কে বা কারা মাকে বলেছে, বিয়ে না করলে আমি নাকি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবোনা। ডিপ্রেশনে একদিন মারা যাবো। মাকে বিনীতভাবে বললাম, "মা! অনার্স শেষ হলো জাস্ট। ১-বছরের মাস্টার্সটা শেষ করি আগে। তুমিতো জান সব পরীক্ষাতে ১ম শ্রেণি আমার। মাস্টার্সে ১ম শ্রেণি পেলে, তারপর ভাল জব করবো আমি। বিয়ে করবো না কখনো আমি মা"! দুটো হাত ধরলেন মা আমার! আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, "কৈশোরে হিন্দু ঢুলীকন্যা সুমিকে বিয়ে করতে দেইনি আমি তোকে। এ বয়সে হিন্দু ঝরাপাতার প্রেমে যখন পড়লি, বিয়ে করতে চাইলি। তখন মুসলিম হতে বললাম আমি তাকে। হয়তো এ কারণেই মেয়েটি হিন্দু ছেলেকে বিয়ে করে কোলকাতা চলে গেছে। সব দোষ আমার বাবা! আমাকে তুই মাফ করে দে"!
:
মাকে ছাড়া পৃথিবীতে সম্ভবত আর কাউকে ঈশ্বরের মত এমনটা ভালবাসিনি আমি। মার চোখের জল কখনো দেখতে পারিনা সেই কৈশোর থেকেই। মাও পারেনা আমার চোখের জল দেখতে। তাই এ ২৭-বছরের জীবনে আমার সব সখ, চাওয়া, অন্যায় দাবী পুরণ করেছে মা। এবং আবার জলভরা চোখ দুটো আমার জলচোখে রেখে বললো, "বাবা তুই আমার কথা না শুনলে এবারের হজ্জে যাবোনা আমি। হজ্জ ছাড়া তোর মা মারা যাক এটা কি চাস তুই"?
:
অবশেষে ঢাকা ভার্সিটির ছাত্রাবস্থায়ই মার কথাতে বিয়ে করলাম আমি। কেবল শর্ত দিলাম, "বিয়ের আগে বউকে দেখবো না আমি। তাকে তুমি গ্রামের বাড়ি নিয়ে রাখবে তোমার সাথে। আমি ঢাকাতে পড়ালেখা শেষ করে, ভাল চাকুরী নেয়ার পর দেখা করবো বউর সাথে"। কিন্তু আমি কথামত বিয়ে করে গাঁয়ের বাড়িতে না যাওয়াতে, সপ্তাহখানেক পর সদ্য বিয়ে করা আমার স্ত্রী নিজে হাজির হলো একদিন ঢাকা ভার্সিটি ক্যাম্পাসে। সূর্যসেন হলে থাকি আমি। বউকে নিয়ে কি করবো এ হলে? তারপরো কর্তব্য বলে কথা। এখানে ওখানে ঘোরার পর বউকে নিয়ে শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেটে খেলাম দুপুরে। আগে ভাল করে তাকাইনি তার দিকে। খাওয়ার সময় মুখোমুখি বসাতে এই প্রথম ভাল করে দেখলাম স্নিগ্ধাকে। হ্যাঁ, স্নিগ্ধা হচ্ছে আমার বিয়ে করা বউর নাম। সত্যি সুন্দরী সে। আমার চেয়ে অন্তত ১-ইঞ্চি লম্বা ছফুট মেয়েটি। দেখতে ভারতীয় সিনেমার নায়িকাদের মত ফর্সা ছিপছিপে। বরিশালে বিএম কলেজে অনার্সে পড়ে সে ইতিহাসে। মফস্বল শহরে এমন সুন্দরি মেয়ে আছে, আগে জানতাম না আমি! এ কারণে হয়তো মা বলেছিল, "তুই না দেখলেও বুঝবি, তোর মা তোর জন্যে সুমি বা ঝরাপাতার চেয়ে অনেক সুন্দরী মেয়ে সিলেক্ট করেছে"!
:
সারাদিন থেকে সন্ধ্যার প্রাক্কালে স্নিগ্ধা একাই গেল ধানমন্ডিতে। সেখানে থাকে তার বোন ভগ্নিপতি। আমাকে বললো না তার সাথে যেতে। তাই আমিও গেলাম না কেন যেন। পরদিন বোনের বাসাতে ফোন করে জানলাম, "সকালে বরিশাল চলে গেছে স্নিগ্ধা। কারণ তার টিউটরিয়াল ক্লাস চলছে"।
:
কদিন পর মা জরুরি খবর দিলো আমায় বাড়ি যেতে। মার নির্দেশ আমার কাছে ঈশ্বরের নির্দেশের মতই। তাই রাতের লঞ্চে না ঘুমিয়ে একদম সূর্যওঠা ভোরেই নামলাম নদীর ঘাটে। মার হাতে শীতের পিঠা খাওয়ার পর মা অনেক কথা বললো আমায়। যার মোদ্দা কথা হচ্ছে, "স্নিগ্ধা ঢাকা গিয়েছে তাকে যথাযথ সম্মান করিনি আমি। দামী হোটেলে খাওয়াইনি। তার সাথে যাইনি তার বোনের বাসাতে। কিছু কিনে দেইনি ইত্যাদি। গায়ের রং চেহারাতো জলদাস জেলেদের মত কালোই, চলন বলনেও একদম "গেও" আমি। সুতরাং বউ মারাত্মক মন খারাপ করেছে এমন "গাইয়া" ছেলের কাছে তার মত সুন্দরী স্মার্ট শহুরে মেয়েকে বিয়ে দেয়াতে। বললাম - "মা কি করতে পারি আমি? তোমার ছেলে কি তোমার চেয়ে বেশি স্মার্ট হয়েছে ঢাবিতে ৩-বছর পড়ে? আসলেইতো আগাগোরা গ্রাম্য আমি। পুরোই জলদাস টাইপের। স্নিগ্ধা হয়তো এটা বলতে ভুলে গেছে যে, ও হচ্ছে ফর্সা আরিয়ান। আর আমি হলাম দ্রাবিঢ় শ্যামলা বাঙালি"। মা বললো, "সুন্দরী মেয়েদের আরিয়ান বলে নাকি"? বললাম, "হ্যাঁ মা ওরা ককেশাস থেকে এদেশে এসেছে। আমিতো এ মাটির ভূমিজ সন্তান সাঁওতাল বা জলদাস গোত্রীয়"! হেসে বললাম - "তুমিতো কিছুটা আরিয়ান মা, আমি পুরো গাইয়া"!
:
মার নির্দেশে একগাদা নানাবিধ মিঠাইমন্ডা কিনে পরদিন স্নিগ্ধাদের শহরের বাড়ি গেলাম দুজনে। স্নিগ্ধার মা-বাবা অনেকক্ষণ কথা বললো আমাদের সাথে কিন্তু স্নিগ্ধা সামনে এলোনা। ঘন্টাখানেক পর বাবার নির্দেশে তার মা অনেকটা জোর করে স্নিগ্ধাকে নিয়ে এলো আমাদের সামনে। এসেই স্নিগ্ধা তার বাবাকে বলতে থাকলো - "কার কাছে বিয়ে দিলে বাবা আমাকে আমার মতের বিরুদ্ধে? আমি যাকে পছন্দ করেছিলাম, সেতো তেরখাদার সৈয়দ বাড়ির রাজপুত্রের মত চেহারা। এমন গ্রাম্য জেলের সাথে ঘর করবো আমি? কখনো ঐ গ্রামে যাবোনা আমি। শহরে একটা বাড়ি পর্যন্ত নেই ওদের। ওদের গ্রামে গরু মহিষের বাঁথানের সাথে থাকবো আমি? কখনো এ বিয়ে মানবো না বাবা"! কথা শেষ হলে স্নিগ্ধার সাথে ওর মাও চলে গেল ভেতরে। ভেতর থেকে মা মেয়ের কান্নাকাটি শুনতে শুনতে কতক্ষণ বসে আমাকে আর মাকে ফিরে আসতে হল নিজ গ্রামে স্নিগ্ধাকে ছাড়াই।
:
কদিন পর স্নিগ্ধা "ডিভোর্স লেটার" পাঠালো আমাকে আমার গাঁয়ের ঠিকানায় এক লোকের হাতে। লোকটি মার হাতে খামটি দিয়ে বললো, "যদি ডিভোর্স না মানেন আপনারা, তাহলে স্নিগ্ধা যৌতুকের কেস করবে আপনার ছেলে আর আপনার নামে। আর ৫-লাখ টাকা আদায় করবে কাবিনের। সুতরাং চিন্তা করে কাজ করেন"। সব শুনে মাকে বললাম, "মা তোমার বিয়ের সাধ আমি পুরণ করেছি, এবার হজ্জে যাবে না মা? আমিও যাবো তোমার সাথে"! মাকেসহ হজ্জ করে মাস্টার্স পরীক্ষা দিলাম। এবং বিস্ময়করভাবে বেশিদিন বেকার থাকতে হয়নি আমায়। পরীক্ষার কদিন পর মিশনারী চালিত আসাদগেটের সেন্ট যোশেফ স্কুল এন্ড কলেজে "বাঙলা প্রভাষক" হিসেবে কাজ শুরু করলাম আমি। আর মাত্র নমাস ওখানে কাজ করার পরই "সিভিল সার্ভেন্ট" হিসেবে ২০০০ সনে যোগদান করলাম সরকারি চাকুরীতে।
:
২০১৮-তে মা মৃত আমার এখন। ১৮ বছরে প্রমোশন পেয়ে সরকারের "সিনিয়র পদে" জব করছি আমি ঢাকাতে। কদিন আগে খুলনার তেরখাদাতে একটা বেসরকারি উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ দাপ্তরিক ভিজিটে যাই একটা বেসরকারি ভার্সিটির সার্টিফিকেট সত্যতা যাচাই করতে। কাজশেষে দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা হলো ঐ কলেজের এক শিক্ষকের বাড়িতে। সকল শিক্ষকরা চাঁদা দিয়ে পিকনিকের মত খাবার ব্যবস্থা করেছে কলেজ সন্নিহিত শিক্ষক শহিদুল্লাহর বাড়ি।
:
খাবার পরিবেশনকালে স্নিগ্ধাকে দেখলাম শহিদুল্লাহর স্ত্রী হিসেবে। হ্যাঁ আমার প্রাক্তন স্ত্রী স্নিগ্ধা তার সহপাঠী শহিদুল্লার সাথে পালিয়ে এ তেরখাদাতে চলে এসেছে সেই ২০০০ সনেই। এ কারণে অনার্সটা কমপ্লিট হয়নি দুজনের। পরবর্তীতে বিয়ে করেছে তারা স্বামীর এ গ্রামে বসে। পরবর্তীতে দুজনেই ঢাকার "দারুল এহসান ইউনিভার্সিটি" থেকে মাস্টার্স শেষ করে এ প্রাইভেট কলেজে প্রভাষক তারা স্বামী-স্ত্রী। ৩-সন্তান স্নিগ্ধা-শহীদুল্লাহ দম্পতির। মাত্র ২-বার দেখা হয়েছিল আমার স্নিগ্ধার সাথে। একবার ঢাকা ভার্সিটিতে, আরেকবার তার ঘরের ড্রয়িং রুমে। আচ্ছা স্নিগ্ধা কি আমায় চিনতে পেরেছে? না চেনারতো কথা নয়। আমিতো সেই আগের মতই তামাটে জলদাস বাঙালি এখনো!
:
ইচ্ছে করে আজ থেকে যাই স্নিগ্ধার ঘর সংসার দেখতে। কিংবা ওকে একবার দেখাই ঢাকায় আমার শিক্ষা, পদমর্যাদা, অভিজাত ফ্লাট, আধুনিক গাড়ি আর সবসব প্রপঞ্চ। কিন্তু এসব কিছুই হয়না সামাজিক শৃঙ্খলের প্রেক্ষাপটে। চা নিয়ে আসে স্নিগ্ধা সবার জন্যে। স্বামী শহিদুল্লাহ বিনয়ের সাথে বলে, "স্যার গরিবের বাড়ি এসে ধন্য করেছেন আমাকে আর আমার স্ত্রীকে। আমাদের সার্টিফিকেটগুলো দেখবেন যেন বেতনাদি পেতে কোন সমস্যা না হয় স্যার"! রাতে খুলনা সার্কিট হাউজে থাকবো। তাই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে থাকি আমরা কলেজের দিকে। যেখানে গাড়ি দাঁড়িঁয়ে আছে আমাকে নেয়ার জন্যে।
:
বিদায়ের প্রাক্কালে কি এক খুশীতে নিজ হৃদয় বনভূমির বুনো ঘাসেরা হাসে আমার দিকে চেয়ে। সড়কপাশের বৃক্ষদের প্রেমময় জীবনের বুনো বাতাসের ঢেউ যেন উড়িয়ে দেয় চুলগুলো আমার। দুপুরের দগদগে মাঠের ঠিকরিয়ে উপছে পড়া রোদকষ্টের মত স্নিগ্ধাকে বলি, আপনি কি আমায় চিনতে পেরেছেন? প্রেমঘন উপচারি নারী কিংবা হিংসুটে পুরুষের রূঢ়তা কিভাবে কণ্ঠে এলো জানিনা আমি। মাঠের কোণে বেড়ে ওঠা বিষন্ন একাকি তালগাছের মত স্নিন্ধা বলে - "হ্যাঁ স্যার চিনতে পেরেছি"! এবার কেন যেন আমি জলঘন মানবিক দেহের প্রতিভূ হয়ে ভেসে যাই এক জলজ জীবনে। এবং ব্যথাতুর প্রেমিকার অদেখা পাঁজরের সংগোপিত হাড় ভেদ করে স্নিগ্ধার একদম পাঁজরে ঢুকে যাই আমি। যেখানে অবিরত ঢিপ-ঢিপ করছে তার ভাঙা বুকের ঘরগেরস্থালির তৈজসপত্ররা! আমার উনিশ বছরের ভালবাসাহীন কষ্টজীবনের মন্বন্তরে হাঁটা পথে কিভাবে স্নিন্ধাকে বলবো আমি যে, "স্নিগ্ধা তোমাদের এ ভার্সিটির সার্টিফিকেটকে অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। হাইকোর্টের নির্দেশে বন্ধ করা হয়েছে ঐ ভুয়া ভার্সিটি। কিভাবে তোমাকে আর তোমার স্বামীর এমপিও টিকিয়ে রাখবো আমি! খুবই কম ক্ষমতা আমার"!
:
এবার ইচ্ছে করেই আমার মানবিক প্রেমজ নৌকাগুলো যেন উড়ে যায় দূরের বিদেহপুরের পান্থনগরের ঘাটে। গাড়িতে উঠেও একবার স্নিগ্ধার দিকে তাকাই আমি জীবনঘন বিষাদবাতাস কিংবা মানবিক ভালবাসার বাষ্পঘন এক করুণ দীর্ঘশ্বাসে! গাড়ি চলতে থাকে সরু সড়কপথ ধরে ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে তেরখাদার বিলের পথে!

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 18 ঘন্টা 10 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর