নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ
  • সলিম সাহা

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

বিষাক্ত রাজনীতি:- দ্বিতীয় পর্ব-


স্বাধীনতার পর শিখ অধ্যুষিত পূর্ব পাঞ্জাব, পাঞ্জাব নামে পরিচিত হয়। এই পাঞ্জাবেই প্রথম দেখা যায় বিষাক্ত রাজনীতির ছোবল। ঘটনাটি ছিল এইরকম- শিখদের প্রথম দিকে দাবী ছিল পাঞ্জাবকে বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক কিন্তু পরবর্তীকালে জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালার নেতৃত্বে এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য পরিবর্তীত হয়ে তা স্বাধীন খালিস্তান গঠন করার আন্দোলনে পরিবর্তিত হয়। যদিও প্রথম দিকে ভিন্দ্রানওয়ালাকে কংগ্রেস ব্যবহার করতে চেয়েছিল, আকালি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভুত্ব স্থাপনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই ভিন্দ্রানওয়ালাই পরবর্তীকালে ভারত যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিখদের জন্য স্বাধীন খালিস্তান গঠন করতে উদ্ধত হয়। বলাই বাহুল্য বহু শিখ ভিন্দ্রানওয়ালাকে সমর্থন করেছিল।

আসলে 1977 সালের লোকসভা নির্বাচনে পাঞ্জাবে কংগ্রেস খুব খারাপ ভাবে হারে এবং পরবর্তী কালে বিধানসভা নির্বাচনে ও কংগ্রেসের পরাজয়ের পর সেখানে আকালি দলের সরকার গঠিত হয়। এই আকালীদের রোখার উদ্দেশ্যে তৎকালীন কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা ও পাঞ্জাবের পূর্বমুখ্যমন্ত্রী জ্ঞানী জৈল সিং (1972-77) এর পরামর্শে সঞ্জয় গান্ধী ভিন্দ্রানওয়ালাকে সমর্থন করে। আসলে ভিন্দ্রানওয়ালা ছিলেন জ্ঞানী জৈল সিং এর ঘনিষ্ঠ তাই কংগ্রেস মনে করত ভিন্দ্রানওয়ালা কংগ্রেসের পক্ষে ফলপ্রুস হবে।
তাই বলা যায় ভিন্দ্রানওয়ালা হচ্ছে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফসল এবং জ্ঞানী জৈল সিং ও সঞ্জয় গান্ধীর মতো নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তি অর্জন করেছিল। যদিও ভিন্দ্রানওয়ালা প্রথম দিকে এই লড়াই শুরু করেছিলেন হিন্দির বিরুদ্ধে পাঞ্জাবি ভাষার সংগ্রাম হিসাবে কিন্তু পরবর্তী কালে তা হিন্দুদের বিরুদ্ধে শিখদের সংগ্রাম হিসাবে পরিবর্তিত হয়, এবং অচিরেই এই আন্দোলন শিখদের জন্য স্বাধীন খালিস্তান গঠনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। এই সময় পাঞ্জাবের অবস্থা ছিল অগ্নিগর্ভ পাঞ্জাবে হিন্দুদের ধরে ধরে হত্যা করা হতে থাকে, রাজনৈতিক লাভ লোকসানের কথা ভেবে সরকার কোন শক্ত ব্যবস্থা নেয়নি তাই ভিন্দ্রানওয়ালার সাহস বৃদ্ধি পেতে থাকে। যদিও ইন্দিরা গান্ধী এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন কিন্তু জ্ঞানী জৈল সিং ও অন্যান্য কিছু অধিকারিকদের অসহযোগিতায় তিনি ব্যবস্থা নিতে পারেন নি।

ভিন্দ্রানওয়ালার সাহস কতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল তার একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যায়। তার একটি বহু চর্চিত কর্মকান্ড হল পাঞ্জাব পুলিশের ডি আই জি- আফতার সিং অ্যাটাবলের হত্যা। এই পুলিশ আধিকারিক নিরস্ত্র অবস্থায় অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে গিয়েছিলেন পার্থনা করার জন্য কিন্তু ফেরার সময় দিনের বেলা প্রকাশ্যে স্বর্ণমন্দিরের সিঁড়িতে ভিন্দ্রানওয়ালার লোকেরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। ভিন্দ্রানওয়ালার এমন ভয় ছিল যে অন্য পুলিশ আধিকারিকরা উচ্চ পদস্থ পুলিশ আধিকারিকের লাশটি ও বাইরে আনতে পারেনি। এই আধিকারিকের লাশ ঘন্টার পর ঘন্টা মন্দিরের সিঁড়িতে পড়ে থাকে। শেষে তৎকালীন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী দরবারা সিং ভিন্দ্রানওয়ালাকে ফোন করেন এবং অনুরোধের সুরে বলেন- 'ডি আই জি আফতার সিং এর লাশ দু ঘন্টা দরবারে পড়ে আছে'। তখন ভিন্দ্রানওয়ালা বলেন- তা আমি কি করতে পারি? তখন দরবারা সিং আবার বলেন- 'আপনি আপনার লোকদের সরিয়ে দিন যাতে আমরা লাশটি বের করে আনতে পারি'। এথেকেই বোঝা যায় ভিন্দ্রানওয়ালার প্রভাব প্রতিপত্তি কতদূর বৃদ্ধি পেয়েছিল। যখন দরবারা সিং কে বলা হয় আপনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? তখন উনি বলেন দেশের গৃহমন্ত্রীকে এই প্রশ্ন করুন, আসলে উনি এটা বোঝাতে চেয়েছিলেন জ্ঞানী জৈল সিং এর ছত্রছায়ায় ভিন্দ্রানওয়ালার এই প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী দরবারা সিং ইন্দিরা গান্ধীকে শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিতে বলেন এবং মন্দিরে পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী যখন এই প্রস্তাব নিয়ে নিজের গৃহমন্ত্রী জ্ঞানী জৈল সিং এর সঙ্গে আলোচনা করেন জৈল সিং তখন এই প্রস্তাব উড়িয়ে দেয়। এভাবে পাঞ্জাবের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে থাকে। 5 ই অক্টোবর 1983 সালে পাঞ্জাবের কাপুরথালা থেকে জলন্ধর একটি বাস যায়, পথে কিছু শিখ দুষ্কৃতী বাস রুকে 6 জন হিন্দুকে গুলি মেরে হত্যা করে। এই রকম ঘটনা আগেও বেশ কয়েক বার দেখা যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী দরবারা সিং সরকারকে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেন। তবে অনেকের মতে এই সিদ্ধান্ত ইন্দিরার সঠিক ছিল না এর ফলে ভিন্দ্রানওয়ালার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী এক বড় নেতা কেন্দ্রিয় সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তবে এর পরেও পাঞ্জাবের অবস্থা স্বাভাবিক হয়নি।

পরিস্থিতি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে ইন্দিরা গান্ধী এক বড় সিদ্ধান্ত নেন। দেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি হিসাবে জ্ঞানী জৈল সিংকে নির্বাচিত করা হয়। মনে করা হয় এক শিখ রাষ্ট্রপতি হলে হয়তো এই বিতর্কের অবসান হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেরকম কিছু দেখা যায় নি। বরং দেখা যাই আরও উগ্রতা প্রদর্শন করে 15ই ডিসেম্বর 1983 সালে ভিন্দ্রানওয়ালা ও তার অনুগামীরা স্বর্ণ মন্দির ও আকাল তখতের দখল নেয়। এই আকাল তখতের ধার্মিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে, এটি শিখদের সর্বোচ্চ আসন। তাই স্বর্ণমন্দির থেকেই ভিন্দ্রানওয়ালা শিখদের ধর্মের ভিত্তিতে খালিস্তান গঠনের জন্য সুড়সুড়ি দিতে থাকে এবং স্বর্ণ মন্দিরে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মজুত করে রাখে।

প্রকৃতপক্ষে খালিস্তান গঠনের নামে ভিন্দ্রানওয়ালা ভারতবর্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে এটা বলাই যায়। এরই সঙ্গে ভিন্দ্রানওয়ালা দার্শনিক ভঙ্গিতে বলেন-"আমরা দেশলাই কাঠির মত এমনিতে ঠান্ডা কিন্তু জ্বলে গেলে ভয়ংকর"। এভাবে প্রচ্ছন্নে ইন্দিরা গান্ধীকেও হুমকি দিতে থাকে। তৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশের ঐক্য ও অখন্ডতা সুরক্ষিত রাখতে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে 1984 সালের 5 ই জুন ভারতীয় সেনাবাহিনী "অপারেশন ব্লু স্টার" শুরু করে। এখানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দেখা যায়, প্রচুর রক্তপাত হয় এবং স্বর্ণমন্দিরের ও বিশেষ ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই সংঘর্ষে জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালা সমেত 325 জনের ও অধিক মানুষ নিহত হয়।

ইন্দিরা গান্ধী দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখতে সক্ষম হন। এখানেই ইন্দিরা গান্ধীর সৎসাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। ইন্দিরা গান্ধী বিষয়টি রাজনৈতিক লাভ লোকসানের দিক থেকে না দেখে প্রকৃত দেশ নেতার মত কাজ করেছিলেন। তবে ইন্দিরা গান্ধীর এই কর্মকান্ডে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিং প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হন এবং মনে মনে খুব দুঃখ পান। জৈল সিং মনে করেন ইন্দিরা এত বড় একটা কাজ করার আগে একবার ও তাঁকে জানানোর প্রয়োজন মনে করল না! আসলে ইন্দিরা গান্ধী প্রতিটি বিষয় রাষ্ট্রপতিকে জানাতেন এবং তার পরামর্শ নিতেন কিন্তু তিনি গোপন সূত্রে খবর পান, তাদের গোপন কথা রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বিশেষ সূত্রে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাই ইন্দিরা ব্লু স্টার অপারেশন বিষয়টি পুরোপুরি গোপন রাখেন এবং রাষ্ট্রপতি জৈল সিং কে আভাস ও দেন নি। জৈল সিং পরবর্তী কালে নিজের আত্তজীবনীতে লিখেছেন- "আমি বার বার ইন্দিরাকে এটা বলেছি পাঞ্জাবের বিষয়ে বিশেষত ভিন্দ্রানওয়ালার বিষয়ে তাড়াহুড়ো করে উত্তেজক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না। এর পরিণাম খারাপ হতে পারে কিন্তু ইন্দিরা মনে হয় আমায় বিশ্বাস করতে পারেন নি"।

ইন্দিরা গান্ধী তার এই কর্মকান্ডের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। এই সময় ইন্দিরা গান্ধীকে মাঝে মাঝে বিষন্ন মনে হত এবং তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই মৃত্যু নিয়ে কথা বলতেন। তিনি বলতেন আমি মনে হয় আমার দায়িত্ব অনেকাংশেই পালন করতে পেরেছি ইত্যাদি...। এই সময় আই বি রিপোর্টের ভিত্তিতে ইন্দিরা গান্ধীর শিখ রক্ষীদের বদল করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় কিন্তু ইন্দিরা বলেন-"আপনাদের কি মনে হয় ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয়? আমি ভারত নামক একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। শিখদের বহিষ্কার করা হলে তাদের অপমান করা হবে। তাই কোন কিছু পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই যেমন চলছে চলুক"। তাই ইন্দিরার কথায় শিখরক্ষীদের আবার পুনরায় ইন্দিরা গান্ধীর রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

মৃত্যুর আগের দিন অর্থাৎ 1984 সালের 30 শে অক্টোবর ওড়িষ্যার কটক শহরে এক জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন সেখানে তিনি বলেন-"যতক্ষণ আমার নিশ্বাস আছে ততক্ষণ আমার সেবাই চলবে। আর যখন আমার মৃত্যু হবে আমি এটা বলতে পারব যে- আমার এক এক বিন্দু রক্ত ভারতকে নব জীবন দেবে এবং ভারতকে শক্তিশালী বানাবে"। অনেক গবেষকদের মতে ইন্দিরা গান্ধী নিজের আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অথচ বাস্তবের কি নিষ্ঠুর পরিহাস- যে ইন্দিরা তার শিখ রক্ষীদের এতো বিশ্বাস করেছিলেন, তারাই ধর্মের আফিম খেয়ে শেষ পর্যন্ত ইন্দিরার বুকে গুলি চালায়। এই গুলির আঘাতে 1984 সালের 31 শে অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধী মহাপ্রয়ান লাভ করেন। ইন্দিরা গান্ধী প্রকৃত পক্ষে নিজের কথা রেখেছিলেন, তিনি তার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে দেশের মাটির ঋণ শোধ করেছিলেন।

চলবে...

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

বাহ চমৎকার লেখা। খুব ভাল লাগলো। ধন্যবাদ লেখককে!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 
রক্তিম বিপ্লবী এর ছবি
 

ধন্যবাদ দাদা। আপনার মতামত থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি এবং আরও ভালো কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। আপনার মন্তব্য থেকে নতুন করে সাহস ও শক্তি পায়। প্রথম পর্বের লেখাটি ও পড়ার আমন্ত্রণ রইল।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রক্তিম বিপ্লবী
রক্তিম বিপ্লবী এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 4 দিন ago
Joined: মঙ্গলবার, আগস্ট 29, 2017 - 3:02অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর