নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • লুসিফেরাস কাফের
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • সুখ নাই
  • কাঠমোল্লা
  • মিশু মিলন
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী

নতুন যাত্রী

  • সামসুল আলম
  • এস. এম. মাহবুব হোসেন
  • ইকরামুজ্জামান
  • রবিউল আলম ডিলার
  • জহুরুল হক
  • নীল দীপ
  • ইব্রাহীম
  • তারেক মোরশেদ
  • বাঙলা ভাষা
  • সন্দীপন বিশ্বাস জিতু

আপনি এখানে

দেশভাগ : সাম্প্রদায়িকতা না বর্ণবাদ?


রক্তাক্ত ১৯৭১ আমাদের জাতীয় স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছে বেদানাময় ১৯৪৭ সালকে।নতুন করে পাওয়া স্বাধীনতা ভুলিয়ে দিয়েছে দেশভাগের ব্যাথা। বলছি বটে ব্যাথা। কিন্তুু সত্যিই কী এপারের অর্থাৎ আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে যারা বসবাস করছেন, আরো স্পষ্ট করে বললে বাঙালী মুসলমানের মনে আদৌও দেশভাগের জন্য কোন ব্যাথা উপলব্ধ হয়?তারাতো একসময় হিন্দুদের আধিপত্য থেকে মুক্তির জন্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য পাকিস্তান নামের আলাদা দেশ চেয়েছিল। তারা সেটা পেয়েছে। তাহলে কিসের জন্য বা কাদের জন্য তাদের মনে ব্যাথার উদ্রেক হবে? বাংলাদেশের সাহিত্যে আছে কী দেশভাগের বেদনা? স্মৃতিকথায় উচ্চকিত হয় বেদনাময় দেশভাগের কথা?খুব একটা হয়না। তার পরিবর্তে এদেশের একাডেমিয়া এবং একাডেমিয়ার বাইরে থেকে দেশভাগের ইতিহাস বিষয়ক দুচারটে যেসব বই প্রকাশিত হয়ে সেখানে দেশভাগের জন্য বাঙালি হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতা, এবং কংগ্রেসের হাইকমান্ড বিশেষ করে গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল আর এদিকে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুমহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে দোষারোপ করে ইতিহাসের একটা জটিল বাস্তবতার অতিসরল আখ্যান বয়ান করে বইয়ের সমাপ্তি টানা হয়।

বাঙালি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত নয়। বাঙালি মুসলমান কী অসাম্প্রদায়িক? বিশ শতকের বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান কেউই সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে ছিলেন না, দুএকজন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদে। কারণ তখন পুরো উপমহাদেশে ধর্মের সাথে রাজনীতির মিশ্রনে এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, অন্যভাবে বললে, ধীরে ধীরে এমন একটা বিষময় পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, তখনকার জটিল সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই বিষময় পরিবেশের প্রভাব উপেক্ষা করে শুভবোধ দিয়ে পরিচালিত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আর সাধারণ মানুষের বাইরে যারা ছিলেন অর্থাৎ রাজনীতিবিদেরা, তারা নিজেরাই ছিলেন সেই বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টির প্রভাবক। তারা তখন ব্যস্ত ছিলেন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের কাজে। রাজনীতি এমনই জিনিস যে তা জনগনের জন্য পরিচালিত হলেও শেষ সিদ্ধান্তটা রাজনীতিবিদরাই নেন। দেশভাগে জনগনের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে কিনা তা আজ বোঝার উপায় নেই। কিন্তুু দেশভাগের বিশেষ করে বাংলাভাগের সিদ্ধান্তটা যে রাজনীতিবদেরাই নিয়েছেন সেটাতো ঐতিহাসিক সত্য।

প্রশ্ন হচ্ছে দেশভাগে বাঙালি হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতা নাকি বর্ণবাদ কোনটা বেশী দায়ী? হিন্দুদের মধ্যে তো বহু বর্ণে গোত্রে বিভাজন রয়েছে। সকল হিন্দুকে এক "হিন্দুধর্ম" নামক ছাতার নিচে ফেলে দেশভাগের জন্য হিন্দুকে( অর্থাৎ সকল হিন্দুকে) দায়ী করা কতটা যুক্তি ও ইতিহাসম্মত? নিম্নবর্ণের হিন্দু এবং আতরাফ বা নিম্নবর্গের মুসলমানের মধ্যে হৃদ্যতা যতখানি ছিলো, শত্রুতা ছিলোনা তার সিকিভাগও।আবার দেখছি ঢাকার নবাব পরিবারের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পাচ্ছেন ঢাকা ও আশেপাশের হিন্দু জমিদারগণ। মিলটা লক্ষ্য করেছেন? উচুঁ তলার হিন্দুর সাথে উঁচু তলার মুসলমানের মিল। আবার নিম্নবর্গের মুসলমানের সাথে নিম্নবর্গের হিন্দুর মিল। বিভাজনরেখাটা এখানে ধর্মের নয়, শ্রেণীর বা বর্ণের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই হিন্দু ছাত্রদের জন্য নির্মিত হয় জগন্নাথ হল। এই হলে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থাকা ও খাবার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এবং এই নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্রদের সাথে সখ্য ছিল ঢাকা হলের মুসলিম ছাত্রদের সাথে, জগন্নাথ হলের উচ্চ বর্ণের হিন্দু ছাত্রদের সাথে নয়।

আরেকটা জনপ্রিয় যে গল্প আমরা শুনি তা হচ্ছে হিন্দু জমিদারদের হাতে নিগৃহীত হতো মুসলমান প্রজা। গল্পটা সত্য। কিন্তুু এই সত্যের মধ্যে একটা আবছায়া ভাব আছে। হিন্দু জমিদারের হাতে শুধুই কী মুসলমান প্রজা শোষিত ও নিগৃহীত হতো? হিন্দু জমিদার কী হিন্দু প্রজাদের আলাদা খাতির যত্ন করতো? নাকি পুর্ববঙ্গের সকল হিন্দুই জমিদার ছিলো, কোন হিন্দু প্রজা ছিলোনা?

আমার মনে হয় ইতিহাসকারেরা যেটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলছেন সেটা আসলে বর্ণবাদ। ধর্মীয় বিভাজনের চাইতে বেশী ক্রিয়াশীল ছিলো শ্রেণীর বিভাজন। দেশভাগের সময় উচ্চবর্ণের হিন্দুদের অনেকেই চলে গেছে ওপার বাংলায়। এদেশে থেকে গেছে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। এরা থেকে গেছে কারণ প্রতিবেশী নিম্মবর্ণের মুসলমানের সাথে এদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও যাপিত অভিজ্ঞতা প্রায় অভিন্ন। উঁচু বর্ণের হিন্দু ও মুসলমান উভয় কর্তৃক এরা পরিত্যজ্য, অচ্ছুত। এই অভিজ্ঞতা নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও মুসলমানকে এক সূত্রে গ্রন্থিত করেছে। তাছাড়া বাংলার লৌকিক ঐতিহ্যের শক্তিশালী ক্রিয়ার ফলে এখানে হিন্দু মুসলমানের বহুকাল একসাথে মিলেমিশে থাকার ঐতিহ্য তো ছিলোই।

অন্যদিকে বর্ণহিন্দু এবং জমিদার শ্রেণী ভয় পেয়েছে যে নবগঠিত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তারা উদীয়মান মুসলমান ধণিকশ্রেণী কর্তৃক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।পদ পদবী প্রতিপত্তি এবং "সাম্রাজ্য" হারানোর আশঙ্কা তো ছিলোই।অবশেষে যখন আর সাম্রাজ্য ধরে রাখা গেল না, এবং সাম্রাজ্য হারিয়ে যখন উচ্চবর্ণের জমিদার শ্রেণী নিম্নবর্গের মানুষে পরিণত হতে চলল, তখনই তাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে বর্ণবাদের সহযোগী আরেক রূপ - ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা। এতোদিন যে হিন্দু জমিদাররা উচ্চবর্গের মুসলমানের সাথে সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে, আজকে জমিদারি হারানোর পর তাদের ভেতর জেগে উঠল হীনম্মন্যতা ও ক্রোধ। জাত্যভিমানের অহমিকা সে ত্যাগ করতে পারলো না। তাই ত্যাগ করল দেশ। নবগঠিত পূর্বপাকিস্তানে উদীয়মান ধনিক মুসলমান শ্রেণীর কাছে মাথা নিচু করে থাকতে হবে এমন ভবিষ্যৎ শঙ্কায় হিন্দু জমিদার ও উচ্চবর্ণের সদস্যরা দেশ ত্যাগ করলো শুধু নয়, দেশটাকে ভাগ করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গে সাম্রাজ্যের অধিপতীর মর্যাদা না হোক, উচ্চ বর্ণের হিন্দুত্বের স্বাদ নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত নিল।পেছনে ফেলে গেল সহায় সম্বলহীন নিম্নবর্ণের হিন্দুদেরকে।

হ্যাঁ, হিন্দু মুসলমানের মধ্যেকার সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে বিশ শতকের শুরুতেই । ছেচল্লিশের দাঙ্গা তার সর্বোচ্চ পর্যায়।হিন্দু মুসমমান পরস্পর পরস্পরের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। একটা সামগ্রিক অস্থিরতা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।এই অবস্থায় মানবতার প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যায়, মানুষ তখন আস্থা খুঁজে নেয় নিজের ধর্মীয় সাম্প্রদায়ের কাছে। সেখানেই সে বেশী নিরাপদ বোধ করে। কিন্তুু আস্থাহীনতা ও ভয়ের রাজ্যের পর্যায়ে আসতে মূল ভূমিকা রেখেছে বর্ণবাদ।উঁচু বর্ণের লোকেদের হীন বর্ণবাদ সাধারণ মানুষকে ঠেলে দিয়েছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার চৌকাঠে। এরপর থেকে শুরু হয়েছে দেশান্তর। এখনো চলছে নীরবে। দেশভাগ এমন একটা পরিণতি যার প্রভাবে দেশান্তর একটি স্থায়ী প্রক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আমার হাইপোথিসিস হচ্ছে দেশভাগের পেছনে হিন্দুদের যেটুকু দায় বা দোষ ইতিহাসবিদেরা দেন,সেই দোষটা ঠিক হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতা নয়।যেটা মূলত দেশভাগের পেছনে কাজ করেছে তা হলো বর্ণবাদ - আধিপত্যশীল উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারশ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থ এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুত্বের অহমিকাবোধ।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সুবিনয় মুস্তফী
সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 16 min ago
Joined: শুক্রবার, নভেম্বর 4, 2016 - 4:58অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর