নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

There is currently 1 user online.

  • নুর নবী দুলাল

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

অাই মিস ইউ, বাবা!


গত 24-07-17 তারিখে এটি পোস্ট করেছিলাম অামার "বিশ্বাস মন্ডল" অাইডি থেকে, গুগল ড্রাইভের কল্যাণে লেখাটি অাবার ফিরে পেলাম, তাই রিপোস্ট করলাম। বিশ্বাস মন্ডল অাইডি বর্তমানে জাকারবার্গের কারাগারে বন্দি হয়ে অাছে।
তখন অামি বাংলাদেশে ছিলাম, উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াতাম। সমস্যা ছিল ত্রিমুখী, এর সাথে সদ্য পিতৃবিয়োগের কষ্ট।
পিতৃবিয়োগ কিংবা শোকাবহ কিছু ঘটলে অনেকেই নাস্তিক থেকে কিছুদিনের জন্য ধার্মিক হয়ে যায়। অামি অামার তখনকার স্বাভাবিকভাবে চলমান বিশ্বাসে কোন পরিবর্তন ঘটাইনি, যদিও বাবার জানাজার নামাজ পড়েছিলাম। এখন যদি অামার মৃত্যু হয় তাহলে যেন জানাজা না দেয়া হয়, কারণ অামি ১০০% পিওর এক্স মুসলিম।
~~~~~~~~~~~
অাই মিস ইউ বাবা!

প্রিয় বাবা, অাপনি ছিলেন উদারনৈতিক, সত্যবাদী। উদারতা ও চিন্তার গভীরতা শিখিয়েছেন অামাকে। অাপনি হুজুর ছিলেন বটে, কিন্তু মোল্লাদের ভন্ডামি অাপনার পছন্দ ছিলনা। সাহিত্যচর্চা ও বইপড়ার নেশা ছিল অাপনার। মোল্লাদের চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন (যেহেতু অাপনি নিজেও ইমাম ছিলেন,) তাই শৈশবকালে অামাকে মাদ্রাসায় ঘুমাতে না দিয়ে বাসায় রাখতেন। ভিডিও গেম খেলা ও সিনেমা দেখার নেশা ছিল অামার, এজন্য প্রচুর মার খেয়েছিলাম হুজুরদের হাতে এবং অাপনার কাছে। ভিডিও গেম, সিনেমা, নাটক, গল্প, উপন্যাস এসব কিছুই হারাম ইসলামে। এবং এরজন্য পিটানো সুন্নত, তাই পিটুনি খেয়েছি অনেক। অাপনিও একসময় কট্টর মুসলিম ছিলেন, ক্রমেই অামি বড় হতে থাকলাম, প্রতিবাদ করা শিখতে থাকলাম। অামি অাপনার সাথে তর্ক করতাম নারী অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, শিল্প-সংস্কৃতি ইত্যকার বিষয়ে।
অাপনি ইমাম গাজ্জালীর মস্তবড় ভক্ত ছিলেন। গাজ্জালীর 'বৌ-পেটানো' থিওরির অাপনি সমর্থক ছিলেন।
নারী নির্যাতন, সমাজ, পৃথিবী এবং বিভিন্ন ইসলামিক মতাদর্শের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিয়ে অাপনার সাথে বিতর্ক করতাম। অাপনি প্রথমদিকে অামাকে বেয়াদব বললেও শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থা ছেড়ে মডারেট হলেন! অাপনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। বলিষ্ঠ কন্ঠ, কবিতা রচনা, সুন্দর চিত্রাঙ্কন, হাতের লেখা, ইলেকট্রিক কাজ, বিভিন্ন রকম টেকনিক্যাল কাজ এসব কিছুতে অাপনি ছিলেন অনন্য প্রতিভাধর।
কোনো কাজ শিখতে খুব একটা সময় লাগতো না অাপনার। হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রোধ, অহংকার, পরশ্রীকাতরতা এসব কিছু থেকে অাপনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। এক্স মুসলিম হওয়ার পর মাঝেমধ্যে মনে হত - অাপনি ইমাম হয়েও যেন ঠিক হুজুর নন! হুজুর হতে হলে যে পরিমাণ হিংসা, ঘৃণা থাকতে হয় তা তো অাপনার মধ্যে পাইনি।

অাপনি ঢাকার একটি বড় মসজিদের ইমাম হয়েও বণ্কিমচন্দ্র, রবিঠাকুর, নজরুল, হুমায়ুন অাহমেদ, মাসুদ রানা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং শরতচন্দ্রের বই পড়তেন। অামিও লুকিয়ে লুকিয়ে অাপনার সেসব বই পড়তাম, অাপনার পড়া শেষ হলে! অামাকে কাফেরদের বই পড়তে দিতেন না ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয়ে, অামি কিন্তু অাপনার মতই বইপাগল ছিলাম, এখনও অাছি। একটু বড় হওয়ার পর রাতে মাদ্রাসায় থাকতাম, সবাই যখন ঘুমাত তখন অামরা চারজন মাদ্রাসার দেয়াল টপকে সারারাত রাসেলদের বাসায় গিয়ে হিন্দি এবং বাংলা সিনেমা দেখতাম। রাত তিনটায় অাবার মাদ্রাসায় ঢুকে যার যার বিছানায় শুয়ে পড়তাম!

অারেকটু বড় হওয়ার পর জীবনানন্দ, রবীন্দ্র, নজরুল, তসলিমা পাঠ করা শুরু করলাম। পকেট খরচ বাঁচিয়ে নিলক্ষেত গিয়ে পুরনো বই কিনতাম কম দাম দিয়ে।
তসলিমার বই কিনতে গিয়ে বেশ প্যারা পোহাতাম, ছোটছোট দাড়িবিশিষ্ট, পাজামা-পান্জাবি-টুপি পরিহিত তরুণ মাদ্রাসা ছাত্রের কাছে অনেক দোকানি অস্বীকার করতো - বলতো, তসলিমার বই নেই!

ছেলেকে অালেম বানানোর অনেক ইচ্ছা ছিল অাপনার। অামার হুজুররা অাপনাকে বলতেন - "ওকে সঠিকভাবে নেগরানি (গাইড) দিতে  পারলে ও অনেক বড় অালেম হবে।" হুজুরদের কাছ থেকে অামার মেধার প্রশংসা শুনে কি খুশিই না অাপনি হতেন! যেদিন তিনঘন্টা সময়ের মধ্যে কোরঅানের ১১ পৃষ্ঠা মুখস্ত করেছিলাম সেদিন অাপনি কত খুশি হয়েছিলেন!
রীতিমত অামার হুজুরকে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন।

হাফেজী শেষ করে যখন কিতাবখানায় ভর্তি হয়ে একের পর এক চমকপ্রদ রেজাল্ট করতে থাকলাম তখন অাপনি কত খুশি হতেন! দাওয়াত খেতে গেলে পকেটে করে অাপেল কিংবা অাঙ্গুর অামার জন্য পকেটে করে মাদ্রাসায় নিয়ে অাসতেন - ভুলিনি বাবা অামি এসব। অামার মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী মসজিদের ইমাম হওয়ার কারণে অামার শিক্ষকগণ অাপনাকে শ্রদ্ধা করতেন, অনেক্ষণ গল্প করতেন। মিসরের অাল অাজহার ইউনিভার্সিটির সাবেক ছাত্র জনৈক ইমাম সাহেব অামার অারবি ভাষাজ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন, অামার সম্পর্কে অনেক বড় মাপের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তিনি, তখন গর্বে অাপনার বুক ভরে গিয়েছিল।

মাদ্রাসার অারবি ভাষা ও সাহিত্যের পরীক্ষায় যখন ১০০ তে ১০০ পেয়েছিলাম তখন অাপনি সীমাহীন খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে অাপনি কষ্ট পেতে থাকলেন, অাপনার অাশাগুলি ভেঙ্গে যেতে লাগলো। অাপনার ছেলে বড় হচ্ছিল অার ক্রমশ নাস্তিক্যের দিকে ঝুঁকছিল!
স্ত্রীকে পেটানো নিয়ে কোরঅানের সূরা নিসা এর ৩৪ নং অায়াতকে সরাসরি অবজ্ঞা করতাম অামি।

অাপনি অনেক বড় বড় অালেমের কাছে নিয়ে গেলেন দোয়ার জন্য। অামার হেদায়াতের জন্য অালেমরা দোয়া করতেন, মূল্যবান উপদেশ দিতেন। হুজুররা জানতোনা - ক্লাসের ফার্স্টবয় ক্রমেই নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে! অাপনি একটু অাধটু জানলেন, অার কষ্ট পাচ্ছিলেন। প্রিয় বাবা, অামি অাপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি। তাইতো অামি মাদ্রাসার সব লেখাপড়া শেষ করেছি। অামি অাপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, তাইতো অন্য পেশায় না গিয়ে মসজিদের ইমামতি ও মাদ্রাসার শিক্ষকতা পেশাকেই অাঁকড়ে ধরেছি! অামি অাপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, তাইতো পীর বংশের ধার্মিক ও হিজাবী বউ বিয়ে করেছি। অাপনি যখন দেখলেন, অামি অত্যন্ত সম্মানের সাথে ইমামতি করছি, অাপনি খুশি হলেন। অাপনি ভাবলেন, অাপনার ছেলে ধর্মপরায়ণ হয়েছে। সবকিছু ভালই ছিল, কিন্তু ভেজাল বাঁধালো অাপনার পুত্রবধূ - সে অাপনাদের কাছে বললো, অামি নাকি মনেমনে ইসলামবিরোধী! অামি অস্বীকার করেছি, কারণ অামি অাপনাকে এবং মাকে কষ্ট দিতে চাইনি। তবে অাপনার পুত্রবধূর অভিযোগ মিথ্যা ছিলনা। অাপনি অামাকে বারবার কোন হক্কানী পীর বা ওলির হাতে বয়াত করে জীবনযাপন করতে উপদেশ দিলেন, অামি চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন হুজুরই পছন্দ হলনা! অামি যখন হজ্বে যাই তখন অাপনি কি খুশি! অাপনি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত এলেন অামার সাথে, অাপনি, মা এবং স্ত্রী সবাই বিশ্বাস করলেন - হজ্বে গিয়ে অামার ঈমান নসীব হবে। কিন্তু দুখ এটাই - হজ্বে গিয়ে ঈমানের বাকি অংশও হারিয়ে ফেললাম! অল্প বয়সে হজ্ব নসীব হওয়াকে অামার ঈমান ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অাল্লাহর দান, এ বিশ্বাসও শেষ হয়ে গেল অাপনার! তবে অাপনি জানতেন না, অাপনার ছেলে মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের কট্টর সমালোচক!

প্রিয় বাবা, ইসলামে ফিরতে অামি চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। মোহাম্মদকে নবী মানতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। অামার ইসলাম মানার সাথে অনেক লোকের খুশির প্রশ্ন; শ্রদ্ধাভাজন শ্বশুর-শাশুড়ি, মা, ভাইবোন সবার সম্পর্ক এই বিষয়টার সাথে। অামাকে নিজ সন্তানের চেয়েও বেশি ভালবাসেন শ্বশুর এবং শাশুড়ি, শালাগুলি দুলাভাইকে না দেখলে যেন বেঁহুশ হয়ে যেত! সবার মঙ্গলের জন্যই অামি নিজেকে রিমান্ডে নিয়ে বোঝাতে লাগলাম - বল হে মন, ইসলাম সত্য। কিন্তু মন অবিচল, হলোনা কোন টল!

প্রিয় বাবা, খুব বেশিদিন হয়নি অাপনি অামাদের কাঁদিয়ে চলে গেছেন। অামি অার পারছিনা ইসলাম এবং মোহম্মদকে অাদর্শ মানতে, ক্ষমা করবেন বাবা। অাপনি তো অনেক উদার ছিলেন, অাপনি তো মোল্লাদের লাম্পট্য ও ভন্ডামির বিরুদ্ধে ছিলেন, অাপনি কি কখনো বোঝেননি - ইসলাম মাত্রই ভন্ডামি ও ধাপ্পাবাজি? অাপনি কোথায় অাছেন, কেমন অাছেন জানিনা। সত্যিই যদি পরকাল থাকে তাহলে ঈশ্বর অাপনার সাথে সেখানে কেমন অাচরণ করছেন তা জানিনা। মানুষ ও মানবতার জন্য অামার অনেক কিছু করার অাছে। প্রিয়তমা পত্নী চলে গেছে শর্ত দিয়ে : অার নয় প্রতারণা, মনেপ্রাণে পূর্ণাঙ্গ ধার্মিক হলে অামি স্বামী, নইলে অাসামি! অামি একা, বড় একা। প্রিয় বাবা, অামি অামার পথটাই বেছে নিলাম, যা মনে করি সত্য। সবাই চলে যাক, তবুও অামি অামার পথেই চলবো। প্রিয় বাবা, অামি ভুলপথে নেই। এ তো অাপনারই পথ, যে পথ সাম্য, প্রেম, মানবতা ও মানুষের মুক্তির কথা বলে। অাপনি ভেবেছিলেন, মোহাম্মদ এই পথের রক্তক; কিন্তু সেটা ভুল, মোহাম্মদ এ পথের ভক্ষক।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মুফতি মাসুদ
মুফতি মাসুদ এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 6 দিন ago
Joined: সোমবার, আগস্ট 14, 2017 - 6:00অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর