নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • শাম্মী হক

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

না ঘরকা না ঘাটকা


কাউকে বলা যায় না, কারুর কাঁধে মাথা রেখে কাদাও যায় না, প্রতিদিন কষ্টগুলো এভাবেই স্মৃতির বাক্সে জমা হতে থাকে। হেটে যাওয়া পথের বাকটা পেরুলেই পাতাল ট্রেন স্টেশনের সিঁড়ি বেয়ে আমার অবশ মগজটা ট্রেনের বিকট শব্দে বিন্দু মাত্র জেগে উঠবে না, আমি যেন ধাবমান জীবনের ট্রাক, এভাবেই সবুজ পৃথিবী ছেড়ে আমার আমিকে আমি স্যাঁতস্যাঁতে সুরঙ্গের অন্ধকারে সপে দেই, ট্রেনের ঠিক পেছনের দিকে একটা সিট পেয়ে মাথাটা অন্ধকার জানালার কার্নিশে হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে জীবনের আলো খোঁজার চেষ্টা করি, পাতালে যে সূর্যের আলো কোনদিনই পৌঁছুবে না, এর নাম প্রবাস।

স্বপ্ন শখ আনন্দ সুখ অর্থ প্রাচুর্য যে একাকীত্বের কাছে কতটা অসহায় তা শুধু মাত্র একজন অভিবাসীর কাছেই জানা আছে,
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥
তবু প্রাণ নৃত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ--
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥”
ঠিক এই জায়গাটিতে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়, আধুনিক সভ্যতা, সুখ অর্থ আর প্রাচুর্যের কাছে এসে আমি রবিঠাকুরের কাছে হেরে যাই, কাউকে বলা যায় না, কারুর কাঁধে মাথা রেখে কাদা যায় না, ওয়াকম্যানটা কানে দিয়ে ঐ একটা সময়েই খুব গোপনে আমি একজন বাঙালি।

বেশ ভূষায় বাইরে থেকে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে এই পশ্চিমা জগতে সদ্য আগত একজন বাঙালি, যদ্দুর মনে পরে চুলের ছাট ও রংটাও হয়তো একটু আধুনিক, চুলের এদিক সেদিক ব্লিচ করে হালকা সাদা করে নিয়েছি। কাঁধের উপর ঝোলানো ব্যাকপ্যাকে ওয়াকম্যানটা সব সময়ই ঢুকিয়ে নেই। অনেকটা পথ যেতে হবে, ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করার পর ঐ ওয়াকম্যানটাই আমার সাথী, কাজের দরজা পর্যন্ত গান শুনতে থাকি, সংগীতই হচ্ছে নিঃসঙ্গ জীবনের সুখ দুঃখের সাথী।

ট্রেনের কামরাতে এপাশ পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লোকজন বসেছে, বিভিন্ন স্টেশনে লোকজন কেউ উঠছে আবার কেউ নেমে যাচ্ছে। সামার শুরু হবে হবে এমন একটা গরমে পাতাল ট্রেনের ভেতরের বেশ সহনীয় মাত্রায় ঠাণ্ডাটা বেশ ভালই লাগছিল, দু একটা স্টেশন পেরুতেই পাশের সিটে দুজন বাঙালি বাচ্চা কাঁধে স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে উঠে বসলো, তাদের মাঝে একজন বেশ ভালই বাংলা বলছে কিন্তু ওপর বাচ্চাটি বন্ধুর কথার উত্তর দিচ্ছে সুইডিশ ভাষায়, বিষয়টা ঠিক অনুধাবন করার জন্যে আমিও তাদের কথোপকথন বোঝার চেষ্টা করছি, একজন অনর্গল পাশের বন্ধুর সাথে গল্পে ব্যস্ত। মনের বাক্সের কোণ থেকে আবার সেই পুঞ্জিভূত ব্যথাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, আমাকেও কি একদিন চিৎকার করে গাইতে হবে একদিন বাঙালি ছিলাম রে ? হয়তো একদিন আমিও কি ভালবাসার জন্যে খুঁজে আনবো ১০৮ টা নীল পদ্ম, তারপরও কথা রাখবে না বরুনা।

প্রবাসী বাঙালিদের সাথে আমার ওঠা বসা খুব একটা হয়ে ওঠেনি, তবুও খুব জানতে ইচ্ছে করছে এই বাচ্চা দুটির অভিভাবকরা তাদের এই আচরণকে কি ভাবে দেখছে, নিজেকে কি যেন একটা অনিচ্ছা বা অহংকার বোধে দুরে সরিয়ে রেখেছি, তার অবশ্য একটা কারণ আছে বৈকি, এ শহরে সচরাচর বাঙালি খুব একটা দেখা যায় না ৮০ দশকের প্রথম দিকে সুইডেনে বাঙালিদের সমাগম খুব একটা যে ঘটেছে তা বলা যাবে না, একবার এক রেস্তোরার মালিক বাঙালি ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় ঘটে, খুব আদর আপ্যায়ন করে প্রায় জোর করেই উনার বাসায় দাওয়াত দিলেন, এখানে স্ব জাতিও মেহমান পাওয়াটাও এক রকম ভাগ্যরে কথা। দুপুরের দিকে উনার বাসায় গিয়ে প্রথম ধাক্কাতেই একটু বিব্রত বোধ করছি, বাঙালি বাবু ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন: “বড় ভাই কি জোহরের নামাজটা শেষ করে নাকি পরে খাবেন”, আসলে সুইডেনে এসে এরকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে হতে হবে তা আমার মাথায় কল্পনাতেও ঢুকে নাই, আমি বিনয়ের সাথেই উত্তর দিলাম – নাহ:, আপনি নামাজ শেষ করুন আমি অপেক্ষা করছি” | ভদ্রলোকের স্ত্রী আছেন তবে এখনো দেখা হয়নি, হয়তো রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত, ঘরের দেয়ালে কাবা শরীফের একটা বিশাল চিত্র, আবার বুক সেলফের উপর ঠিক বাংলাদেশের মত কাপড়ে মোড়ানো কোরান শরীফ, বাথরুমের দরজার উপর ফ্রেমে বাধানো আরবিতে লেখা কিছু একটা ঝুঁকিয়ে রেখেছেন। আমার অবস্থা অনেকটা বেগতিক, ভাবছি সুদূর প্রবাসে এসে এরকম একটা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি, নিজেকে বোকা ভেবে নিজের উপর খুব অভিমান হচ্ছে।
এবার আমার আকাশ থেকে ধপাস করে মাটিতে পরে যাবার মত অবস্থা, ট্রেনের ভেতর যে বাচ্চাটি বাংলায় উত্তর না দিয়ে সুইডিশ ভাষায় বন্ধুর সাথে গল্প করছিল সেই বাচ্চাটি স্কুল শেষে ঘরে ফিরল, বাচ্চাকে সাথে নিয়ে মা বসার ঘরে প্রবেশ করতেই মনে হল, মা’র আগা গোঁড়া একটা ভারী হিজাবে আচ্ছাদিত, মাথায় উপর বিশাল এক কাপড়ের টুকরা দিয়ে গোলাকার আকৃতিতে পেঁচিয়ে রেখেছেন আর বাচ্চাটির সাথে আধো ইংরেজি ও সুইডিশ ভাষায় কথা বলছেন, সব কিছু দেখে শুনে বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক ও তার পরিবার এই প্রবাসে এসেও যতটা সৌদি আরবের দিকে ঝুঁকেছেন ততটাই বাঙালিত্বকে বিসর্জন দিয়েছেন। প্রবাসে এসে ছেলে মেয়েদের ইংরেজ বানালেই যে ছেলে মেয়েরা সভ্য ও আধুনিক হবে এ বিষয়টা যে কে প্রবাসী বাঙালিদের মগজে ঢুকিয়েছে তাই ভাবছি, বিশেষ করে সুইডেনের মত দেশে।

মাতৃভাষা শিক্ষার অধিকার সুইডেনের জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের একটি বিশেষ অধ্যায়, যা কিনা প্রতিটি নাগরিকের স্কুলের প্রথম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত নিজ ভাষা শিক্ষা নীতিমালা বা শিক্ষাক্রমের আওতার মাঝে পরে।
কাজেই সুইডেন তথা স্কেন্ডেনেভিয়ার দেশগুলোতে যে কোন ভাষাভাষীর মানুষ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়না, একটি শিশু খুব অল্প বয়সে অনায়াসে পাঁচটি কি তারও অধিক ভাষা রপ্ত করার মেধা রাখে, যাদের মাঝে এই মেধার অভাব দেখা যায় তারা হচ্ছেন অভিভাবক গোষ্ঠী, তাদের ধারণা ভাষা শিখলেই একটি শিশু বাঙালি হয়ে যায় আসলে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। একটি শিশুকে তার নিজের মাতৃভাষা ও সেই সাথে সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বড় করতে না পারলে তারা কখনোই নিজেদের আইডেন্টিটি খুঁজে পায়না।
এই আইডেন্টিটি বা স্বকীয় পরিচয়টা অভিভাবকদের সহযোগিতায় ঘরের বা পরিবারের ভেতর থেকে তৈরি না হলে শেষ বয়সে তা আর গড়ে ওঠেনা। কাজেই ছেলে মেয়েদের ভাষা শেখানোর পাশাপাশি অভিভাবকদের বাঙালি হবার প্রয়োজন বেশী হয়, যদি সন্তানদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সৃষ্টিতে ব্যাঘাত ঘটে তবে তারা না হবে ঘরকা না হবে ঘাটকা।
– মাহবুব আরিফ কিন্তু।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

কিন্তু
কিন্তু এর ছবি
Offline
Last seen: 4 weeks 1 ঘন্টা ago
Joined: শুক্রবার, এপ্রিল 8, 2016 - 5:41অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর