নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

লেখক ও শিল্পের দায়বোধ


(১)

'আশাবাদ' কিংবা 'নৈরাশ্যবাদ' নিয়ে যে জীবনযাপন তাকে সাহিত্য-সিনেমা ও গানে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়, তার এক ধরণের করণকৌশল হয়তো আছে। বোধকরি সেসব নানাভাবে, নানা মাধ্যম হয়ে উৎসাহী কিংবা তৎসংশ্লিষ্টজনেরা তা পঠনপাঠন ও নানাভাবে ব্যবহার করেনও হয়তো। এর ব্যবহারিক দিক আছে। সেরকম করে ধরে নিলে দাঁড়ায় যে, এই ধারার একটি প্রভাব আছে বা থাকেও। নির্দিষ্ট করে বললে বলতে হয় সাহিত্যে এই আশাবাদী বা নৈরাশ্যবাদ কেমন করে ফুটে ওঠে? বা সাহিত্যে এই ধরণের গালভরা প্রপঞ্চগুলি কিভাবে চিত্রায়িত হয়? তার রূপ সাম্প্রতিক থেকে অতীতের সাহিত্য কেমন কিভাবে ফুটে ওঠেছে? সাহিত্যে এই সামাজিক বাস্তবতাটুকু কীভাবে চিত্রায়িত হয়? বা সাহিত্যের এই দায়টুকু কিভাবে পালন করে? লেখক কিভাবে দায় বা দায়মুক্তি পান? বেশ ঘোরেল বা এলোমেলো ধরণের মনে হলেও সাহিত্য-গান এসব মাধ্যম সমাজ-রাষ্ট্রের বাস্তবিক চিত্রকেই ফেরি করে নিজেকে জানান দেয়। আখ্যান-কাহিনি থেকে চরিত্রেরা ওঠে এসে সেইসব বাস্তবিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে নিজেকে তার অস্তিত্বকে জানান দেয়। ঘটনার বিকাশ সময় কিংবা চারিত্রিক যে বিন্যাস তার রূপরেখা সমস্ত পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি একটি ভূখণ্ড জাতি সমাজ ধর্মকে ঘিরে তার পারিপার্শ্বকে ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থানকে নিয়েই আবর্তিত হয়। অনেক সুক্ষাতিসুক্ষ্ণ বিষয় আছে যা কাহিনি, চরিত্রের মাধ্যমে লেখক উপস্থাপন করেন, যা হয়তোবা আমরা প্রতিদিনই দেখি। কিন্তু ওইভাবে হয়তো ধরা পড়ে না কিংবা ধরা পড়লেও হয়তোবা ভাবনা-চিন্তের অবকাশটুকু আর হয়ে ওঠে না। যা নির্দিষ্ট করে পঠনপাঠনে অনেকটা সহজভাবে ধরা দেয়, মাথায় খেলে যায়। ওই জায়গাটুকু লেখকের, একান্ত তাঁরই। এই বোধটুকু তিনি পাঠককে দেন। তাঁর কাহিনি, চারিত্রিক অবয়ব থেকে সমাজ-রাষ্ট্রের অবস্থান হয়ে রাজনৈতিক চিত্র এসবের যে 'নৈর্ব্যক্তিক দায় আছে!' লেখক থেকে শিল্পী শিল্পের তার একটা ব্যপ্তি যেনো পাঠক হয়ে গোটা সমাজ রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। এটি একটি পরীক্ষিত ও অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম। নৈর্ব্যক্তিক অথচ রাজনৈতিক, নৈর্ব্যক্তিক অথচ শক্তিশালী!

(২)

'মিলির হাতে স্ট্যানগান' গল্পের যে কাহিনি তা স্বাধীনতার পরপরের সমসাময়িক সময়ের। আব্বাস পাগলা তখনও ক্লিন শেভড হয় নি। মিলিও তখন এক অদম্য একরোখা। বিদ্রোহী। চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনা, নিজের ঘর থেকে ভাই পরিবার সবার মধ্যে যে এক ধরণের অস্থিরতা ক্ষয় তা এই গল্পের প্রধান অনুষঙ্গ হলেও পাশাপাশি রাজনৈতিক যে অবক্ষয়তা মিলিকে ক্ষুব্ধ করে আব্বাসকে মানসিক বিকারগ্রস্থ করে। তখনকার রাজনৈতিক দিনপঞ্জিতে আমরা দেখি 'সর্বহারা' 'জাসদ' হয়ে 'বাকশাল' অবধি যে গোড়াপত্তন তা যুদ্ধোত্তর একটা দেশের জন্য সাধারণ জনগণের জন্য কল্যাণকর ছিলো কী না তা আজ প্রশ্নতোলার অবকাশ নেই বরং সেসবের যে রূপ নগর ঢাকা ছাড়িয়ে ছোটোবড়ো শহর, মফস্বলে গ্রামেগ্রামে ছড়িয়ে পড়লো। চরম এক অরাজক পরিস্থিতির বয়ান নগর ঢাকার এই 'মিলির হাতে স্ট্যানগান' গল্পটি। বস্তুত মিলি ক্ষুব্ধ হলেও তার চরম প্রতিক্রিয়া হিসেবে সে চাইলে এইসব ভেদ-বিভেদের রাজনৈতিক অবস্থানে নিজেকে নিজেকে নিয়ে যেতো পারতো কিন্তু তা সত্ত্বেও সে নিজেকে তার ইচ্ছেয় নিজেকে সম্প্রসারিত করেছে। আব্বাস পাগলার মধ্যে যে ক্ষোভ রাগ কিংবা যুদ্ধফেরত আব্বাসের এই পরিণতিকে যখন একটা আসন্ন কিছুর সংকেত মিলি ধরে নিয়ে কিছু একটা ভাবছে তখনি হহাসপাতাল ফেরত আব্বাস ক্লিন শেভড হয়ে সুস্থ। পুরোদস্তুর মাস্টার। মিলির রক্ষিত স্ট্যানগান আর জ্বলে ওঠেনি, মিলি কার্যত এক নতুন পরিবর্তন দেখে! এই যে বোধ ভেদের জায়গায় পাঠককে এক করে এক আশাবাদের মধ্যে নৈরাশ্যকে টেনে এনে কিংবা আব্বাস ও মিলির সীমাবদ্ধতাকে পরিবর্তিত সময়ের ফ্রেমে নিয়ে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক ধরণের দ্বন্দ্ব-দ্বিধা কিংবা সচেতনভাবে পাঠককে অস্বস্তিকর সময়ে দাঁড় করানো এ গল্প ও ইতিহাসের ঢামাঢোলে দেখলে এর এক ধরণের ব্যপ্তি ও পূর্ণতা আছে। আশেপাশের পরম্পরা যেসব রোমহর্ষক ঘটনাবলী মিলির সামনে কিংবা আড়ালে ঘটছিলো তাতে তার বিদ্রোহী হয়ে হিতাহিত কাণ্ড করে ফেললে বরং এক ধরণের স্বস্তিদায়ক মনে হতো কিন্তু গল্পের কিংবা গল্পকারের এ অভিপ্রায় ছিলো না। বরং এসবকে নিয়ে ব্যক্তি অবস্থানের যে রাজনৈতিক মতদ্বৈততা ও পরম্পর আদর্শিক অবস্থানে আর মিলির হাতে স্ট্যানগান ওঠে নি! অস্বস্তি এটাই। শিল্প ও লেখকের দায় কিংবা রাজনীতিও হয়তো এটাই!

(৩)

বৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আর তার স্ত্রীকে নিয়ে গোটা আখ্যান। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল দিনমান আশায় থাকেন যে, সরকারি দফতর থেকে তার অবসরের যাবতীয় বেতন-ভাতাদি সংক্রান্ত চিঠিপত্র কবে আসবে। দিন যায়, মাস যায়। স্বামী স্ত্রী আশায় আশায় দিন গোনেন। না আসে না। কাঙ্ক্ষিত সেই চিঠি আসে না। ডাকপিয়ন আসে, যথারীতি অন্যদের চিঠি আসে তার সেই চিঠি আসে না। অন্যদের বাসায় ডাকপিয়ন কড়া নাড়লেও তাদের বাসায় কড়া নাড়ে না। এদিকে দিন মাস সময় করে করে তাদের অবসরের দিনগুলির মতো জমানো টাকাগুলিও একদিন প্রায় ফুরিয়ে আসে। স্ত্রী অতিশয় চিন্তিত। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিনই কেমন চুপসে যান। বলতে চেয়েও বলতে পারেন না। দিন যায়, যায়ও না। একদিন স্বামীস্ত্রী দু'জনেই ভালোভাবে বুঝতে পারেন যে তাদের জমানো টাকা আর নেই বললেই চলে। তখন স্ত্রী করুণ মুখে, নিরুপায় হয়ে যখন কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেন, এরপর আমরা খাব কী? সমস্ত কিছু দাঁতে দাঁত চেপে কর্নেল বলেন, 'গু' খাবো! কলম্বিয়ার সেই সময়কার ভয়ানক সামরিক শাসন শোষন ও নির্যাতনের যে রূপ তা ইতিহাসেও আজও কলঙ্কিত এক অধ্যায়। সেই প্রেক্ষাপটে নামহীন এই দম্পতির যে দিনলিপি তা পাঠককে অনেকটা ভীত করে তোলে কিংবা পরিণতিটাও হয়তো তাঁরা খানিকটা আন্দাজ করে নেন। আখ্যানকার মারকেজ যে বাস্তবতাকে লেখনীতে তুলে ধরেন তা হতবিহ্বলতাকে পাশ কাটিয়ে রুঢ় ও কঠিন অমানবিক সময় যা 'লা ভিয়োলেন্সিয়া' বা বর্বর হিংস্রতার কাল নামে কলম্বিয়ানরা আজও সেইসব দিনগুলিকে মনে করে শিউরে ওঠে।

(৪)

গান বা শিল্পীর দায়বোধ নিয়ে অনেকেই হয়তো নানাভাবে প্রশ্ন তুলবেন বা বোধাকরি তুলেও থাকেন। অনেকে আবার এমত প্রকাশ করেন যে, শোনার আরাম হলেই তো হলো কিংবা নিজেকে মানিয়ে নিয়ে শোনা বলে কথা! এসবের বাহাস হয় হয়তো। হয়ে আসছেও। নানা সময়ে নানা কালে সেসবের এক ধরণের বৈঠকি চর্চাও হয়ে আসছে। অধুনা লালন থেকে হালের আব্দুল গফুর হালি অবধি সেসবের দিকে চোখ ফেরালেই এক ধরণের দায়বোধ পাওয়া যায়। শাহ্‌ আব্দুল করিমকে স্মরণে নিয়ে ধরলে পরে এরকম বেশকিছু গানে আমরা সমাজ রাষ্ট্র কিংবা দায়-দ্বায়িত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

"...এদিকেও তিন-চাইরখানেও
বাবাজান গেলায়,
কম দামে নি দামান মিলে
খুজিয়া চাইলায়..
ছনের ঘরে থাকুইন জামাই
তবু টেলিবিশন চায়..
বড় ভাবি গো, ভাবি,

আমারে ঠ্যাকাইছৈন আল্লায...।।"

গানটির সময়জ্ঞান আর হাওরপাড়ের সেই সময়কার গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন পাশাপাশি ষাট-সত্তর দশকের বিলেত পাড়ি দেওয়া বাঙালিদের পরিবর্তিত অবস্থার মধ্যে কৃষি কিংবা দিনমজুর যাদের বোরোক্ষেত কেন্দ্রিক অনিশ্চিত আর্থিক সঙ্গতি-অসঙ্গতির মধ্যে সোমত্ত মেয়েকে যৌতুক দিয়ে বিয়ে দেওয়ার যে প্রাণপণ চেষ্টা তা এই গানের শুরু থেকে শেষ অবধি কথ্যঢঙে শিল্পী তাঁর মতো বয়ান করে যান। আছে আশি ও নব্বই দশকের নারীদের অধিকারের কথা। আছে সে সময় শহর আর গ্রামের নারীদের তুলনামূলক এক ধরণের জননীতি ও রাজনীতিতে উঠে আসার আভাস।


"...নারী-পুরুষ সমান অধিকার
শুনি শোনা শোনা,
এই ব্যাপারে কি করা যায়
তাই করি ভাবনা..
এ করিম কয় দুঃখের বিষয়
মাইয়ার বাপ যে নিরুপায়!..
বড় ভাবি গো, ভাবি,
আমারে ঠ্যাকাইছৈন আল্লায়!"

দায় ও দায়বোধ ছাড়া সাহিত্য, গান হয় কী না তা এই লেখার বিষয়বস্তু নয়। শুধু এই সময়ে, এই ভূখণ্ডে-রাষ্ট্রের দিকে চোখ ফেরালে বুঝা যায় সাহিত্য-গান কিংবা শিল্প, শিল্পীদের আজ এমন নতজানু করুণ রুগ্ন দলিত কিংবা সাধারণী দশা কেনো! আমাদের এই ভূখণ্ডের, এই বঙ্গের মহাজনেরা সেটুকু বুঝেন কীনা কে জানে!

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মনির হোসাইন
মনির হোসাইন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 6 দিন ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 20, 2013 - 10:17অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর