নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 8 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ওয়াহিদা সুলতানা
  • নগরবালক
  • উদয় খান
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • আশিকুর রহমান আসিফ
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • কাঙালী ফকির চাষী
  • দীপ্ত সুন্দ অসুর

নতুন যাত্রী

  • আরিফ হাসান
  • সত্যন্মোচক
  • আহসান হাবীব তছলিম
  • মাহমুদুল হাসান সৌরভ
  • অনিরুদ্ধ আলম
  • মন্জুরুল
  • ইমরানkhan
  • মোঃ মনিরুজ্জামান
  • আশরাফ আল মিনার
  • সাইয়েদ৯৫১

আপনি এখানে

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ পঞ্চম পর্ব।


৯। অন্ধকার
এক ঘণ্টা ধরে সাবান দিয়ে গোসল করলো অর্থি, তারপরেও মনে হচ্ছে গায়ে এখনো নোংরা লেগে আছে। নোংরাটা লেগেছে আজ সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময়। সন্ধ্যা হলেই মহিলা কলেজের এপাশটা বেশ নীরব হয়ে যায়। লোকজনের চলাচল অনেক কমে যাইয়। অর্থি শাহবাগে থেকে ফেরার ফেরার সময় বাস থেকে নেমে গলির ভিতর দিয়ে হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলো। হঠাত তিন চারজন ছেলে ওকে ঘিরে ধরে। দুজন ছেলে মিলে হাত ধরে টেনে নির্মানাধীন একটা ভবনের দেয়ালে ওকে ঠেসে ধরে। আরেকটা ছেলে এক হাতে ছুরি উঁচিয়ে অন্য হাতে অর্থির মুখ চেপে ধরে। ওদের মধ্যে মাঝারি বয়সের একটা লোকও ছিল। সে দুহাত দিয়ে ওর বুক খামচে ধরে বলতে তাকে, ‘খুব তেল হইছে তোর, তাই না মাগী ? খুব বেশি কথা শিখছস ?’ অর্থির গালে জোরে একটা থাপ্পড় মারে ছেলেটা। তারপর আবার দুহাতে বুকে চাপ দিতে থাকে। ঘিন্নায় অর্থির বমি এসে যায়। একজন অর্থির শার্ট ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে। এমন সময় দু-চারজন লোকের গলার আওয়াজ পাওয়া যায়। তাদেরকে অর্থির দেবদূত বলে মনে হয়। আক্রমণকারীরা ওকে ফেলে দৌড় দেয়। যাবার সময় মাঝ বয়সী লোকটা বলে, ‘ আইজ ছাইড়া দিলাম, এরপর যদি আবার বাড়াবাড়ি করিস ,তাইলে তোর খবর আছে।’
অর্থির কি উচিৎ ঘটনাটা পুলিশকে জানানো ? বাবা-মা কেও এখনো কিছুই বলেনি সে। আজ কোনোমতে বেঁচে গেছে। ভবিষ্যতে হয়তো আরও বড় বিপদ হবে। বাবা-মাকে জানাতে চাইছে না ও। এর আগেও এমন একটা ঘটনা তাদের জানাতে পারেনি অর্থি। কৈশোরের ঘটনাটা অনেকদিন পর মনে পড়লো অর্থির। সে তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। শীতের ছুটিতে সবার সাথে অর্থিও গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলো। সেখানে এক দুপুরে ওর চাচাতো ভাই রাজিব ওকে নিয়ে পুকুরে মাছ ধরতে গিয়েছিলো। রাজিব বয়সে অর্থির চেয়ে বছর দুয়েকের বড় । পুকুরটা বাড়ি থেকে বেশ দূরে। আর পাড়ের চারদিকে ঘন জঙ্গল। বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলো ওরা। হঠাত রাজিব উঠে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলো। তারপর অর্থিকে শুইয়ে দিয়ে ওর উপর উঠে পড়ে রাজিব। কিছুক্ষণ কিশোরী অর্থির স্তন দলিত করে। তারপর চেষ্টা করে অর্থির জামা খুলে ফেলার। অর্থি ভয় পেয়ে রাজিবের হাতে জোরে কামড় দেয়।তারপর ওকে ফেলে দিয়ে ছুটে পালায়। এরপর আর কখনো গ্রামের বাড়ি যায় নি সে। বেড়ে উঠার সাথে সাথে অর্থি জেনেছে বাঙলাদেশের প্রায় প্রতিটা নারীই কৈশোরে-যৌবনে নিকটাত্মীয়দের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়। শালা সব পুরুষই ভিতরে ভিতরে ধর্ষক। কথাটা কি সত্যি? বিজয়ও কি ওকে শুধু একটা শরীর ভাবে? মনে হয় না। ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা কথা বুঝতে পেরেছে অর্থি, তা হলো বিজয় ওকে শ্রদ্ধা করে। আর এ শ্রদ্ধা থেকেই ওর প্রতি টান অনুভব করে। এখানে হয়তো যৌন আকর্ষণ মুখ্য নয়।
টিএসসি ক্যাফেটেরিয়াতে বসে কথা বলছিলো ওরা। অর্থি বিজয়ের চোখে-মুখে লাজুক একটা ভাব লক্ষ্য করে। কাল রাতে অর্থিকে ভালোবাসার কথা জানানোর পর থেকে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে ছেলেটা। কথা বলতেও ইতস্তত বোধ করছে। ওকে স্বাভাবিক করার জন্য অর্থি কাল রাতের কথা না তুলে বললো, ‘ পড়াশুনার কি খবর?’
‘হুম , ভালো। নিজের ধর্মীয় মতাদর্শ গ্রহণের জন্য যথেষ্ট জ্ঞান দরকার। এ ব্যাপারে সহায়ক কিছু বই সাজেস্ট করো তো।’
অর্থি হাসে। ‘হঠাত ধর্মের ব্যাপারে এত আগ্রহ !’
বিভিন্ন ব্লগে নাস্তিকরা সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম নিয়ে নানা উল্টাপাল্টা কথা বলে। আবার বিভিন্ন রেফারেন্স দিয়ে কেউ বলে ইসলাম হলো সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। আমি কারো কথায় প্রভাবিত না হয়ে মৌলিক জ্ঞান অর্জন করে নিজের মতো করে ভাবতে চাই।’
‘ বাহ ! আমার কাছে যদি পরামর্শ চাও তবে আমি বলবো , প্রথমেই কুরান শরিফের প্রতিটা আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করো। এরপর হাদিসের বইগুলো। এভাবেই অন্যান্য ধর্মীয় শাস্ত্র পড়বে। তারপর পড়তে হবে ধর্ম ও সৃষ্টিকর্তার দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়ে লেখা বইগুলো। যেমন ধরো আরজ আলী মাতুব্বরের লেখা ‘সত্যের সন্ধানে’ কিংবা রিচার্ড ডকিন্স’এর লেখা ‘দি গড ডিল্যুশন’ । ইদানীং অবশ্য কিছু বাংলাদেশি তরুণ লেখক বেশ ভালো লিখছেন।’
বিজয়ের ফোন বেজে ওঠে। মাসুদ ফোন করেছে। ফোন রিসিভ করতেই মাসুদ বলে, ‘কই তুই?’
‘আমি টিএসসিতে,তুই কই?’
‘ আজিজ মার্কেটে আছি। তুই টিএসসিতে থাক, আমি আসছি।’ ফোন কাটে মাসুদ।
অর্থি বলে, ‘তুমি বাসায় ফিরবে কখন?’
‘দেরী হবে। মাসুদ আসছে।ওকে নিয়ে একটু গুলিস্তান যাবো।’
‘আমার মাথা ধরেছে সারাদিন রোদের মধ্যে থেকে। বাসায় যাব।’ উঠে পড়লো অর্থি।
একাকী বাসায় ফেরার সময় শুয়োরের বাচ্চাদের আক্রমণের শিকার হতে হলো। ভীষণ রাগ লাগছে অর্থির। একই সঙ্গে প্রচণ্ড ঘৃণা ও ভয় কাজ করছে মনের ভিতরে। পালানোর সময় হারামজাদাটার বলা কথা মনে পড়লো- আর যদি বাড়াবাড়ি করিস তাইলে খবর আছে। কখন বাড়াবাড়ি করেছে অর্থি? হারামজাদাকে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়লো না। লোকটার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে আক্রমণটা পূর্বপরিকল্পিত ছিলো। অনলাইন পত্রিকা ও ফেসবুকে লেখালেখির সুবাদে অর্থিকে অনেক লোক চেনে। ফেসবুকে ওর ফলোয়ার সংখ্যা দশ হাজারের মতো। অর্থি নারীবাদী ও মুক্তমনা বলে ওর লেখা অনেকেরই পছন্দ হয় না। কমেন্টবক্সে অনেকেই অর্থিকে গালিগালাজ করে। ইনবক্সে নিয়মিত অশ্লীল বার্তা ও হুমকি পাঠায়। অর্থি এগুলোকে পাত্তা দিতো না। আজকের আক্রমণকারীরা কি তাদেরই কেউ? হুম, এটা হতে পারে। শাহবাগে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থি নিয়মিত আন্দোলনের পক্ষে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে লেখালেখি করে আসছে। এই কাজটাই হয়তো বাড়াবাড়ি। কালই থানায় গিয়ে ডায়েরী করা দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ক্ষতি হতে পারে।
অর্থি ওর নিউজ পোর্টালের সম্পাদক আসলাম ভাইকে ফোন করে ঘটনাটা সংক্ষেপে জানালো। তারপর ফেসবুকে ঢুঁকে বিজয়ের সাথে চ্যাট করলো। কিন্তু তাকে কিছু বললো না। অযাথা ছেলেটাকে দুশ্চিন্তায় ফেলার দরকার নাই। রাত একটা বাজে। অর্থি না খেয়েই শুয়ে পড়লো।
সকাল থেকেই একটা খবর সারাদেশে তোলপাড় তুললো। কাল রাতে মীরপুরে মুক্তমনা ব্লগার ও শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম কর্মী রাজিব হায়দারকে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা খুন করেছে। প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় রাজিবের বাসায় গেলেন রাজিবের পরিবারকে সান্তনা দিতে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লো রাজিবের ব্যাপারে বিভিন্ন খবর। বেড়িয়ে এলো ‘থাবা বাবা’ ছদ্মনামে লেখা রাজিবের বিভিন্ন ব্লগপোস্ট। জামায়াত শিবিরের সমার্থকরা রাজিবের এসব লেখাকে প্রচার করে বলতে লাগলো, শাহবাগে আন্দোলন করছে একদল নাস্তিক। আবার শাহবাগ আন্দোলনের সমার্থকরা দাবী করতে লাগলো, থাবা বাবার এসব ধর্মবিরোধী লেখা রাজিবের নয়। কেউ আবার এসব লেখাকে রাজিবের মেনে নিয়েই খুনীর বিচার দাবী করলো। এর আগে শফিউর রহমান ফারাবী নামের এক তরুণ ফেসবুকে লিখলো, যে ইমাম নাস্তিক রাজিবের জানামজা নামাজ পড়াবে তাকেও হত্যা করা হবে। পুলিশ ফারাবীকে গ্রেফতার করলো।
ব্লগার রাজিব হত্যা এবং তার ধর্মবিরোধী লেখা নিয়ে জামায়াত-শিবিরের প্রচারের ফলে কারণে মানুষ শাহবাগে আন্দোলনকারীদের ব্যাপারে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লো। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমান নাস্তিকদের আন্দোলন স্মর্থন করতে পারে না। একই সঙ্গে শাহবাগে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের মনে আতঙ্ক কাজ করতে থাকলো। তবে দেশপ্রেমিক তরুণদের টলানো গেলো না।
একদিন শাহবাগে যাওয়ার মুহুর্তে বিজয়ের পিতা কামাল সাহেব ওকে বললেন, ‘প্রজন্ম চত্বরে যেন আর যাস না। ওখানে নাকি সব নাস্তিকরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। ওদের সাথে বেশি মেশা ঠি না। কখন কে এসে খুন করে যাবে বলা যায় না। ’ বিজয় বেশ অবাক হয়। কয়েকদিন আগে বাবা নিজেও প্রজন্ম চত্বরে গিয়েছিলেন। আজ তিনিই যেতে বাধা দিচ্ছেন। অর্থাৎ রাজিব হত্যা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকদের বেশ কাজে এসেছে । ওরা তো এটাই চাইছিলো কেউ যেন শাহবাগে না যায়।

১০। চন্দ্রভ্রমণ
দুপচাচিয়া সিও অফিস বাস স্ট্যান্ডে বেশ কিছুদিন হলো যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে আন্দোলন চলছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে গণজাগরণ মঞ্চ বানানো হয়েছে। দুপচাচিয়া পাইলট হাই স্কুল, জাহানারা কামরুজ্জামান কলেজ আর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা মূলত আন্দোলনটা করছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক,সরকারি কর্মকর্তা, সুধীজন আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের সব নেতারা নিয়মিত মঞ্চে উপস্থিত থাকছেন।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মুকুল তালুকদারের বয়সের কারণে অনেকগুলো দাঁত পড়ে গিয়েছে। মাইক হাতে তিনি যে কি বললেন তার কিছুই বোঝা না গেলেও তার মুখ নিঃসৃত দ্রুতগামী পানি বুঝিয়ে দিচ্ছে, তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধের জোশ ফিরে পেয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা কবিতা আবৃত্তি করছে,গান গাইছে, স্লোগান দিচ্ছে। সবার মাঝখানে বসে একটা ছেলে স্লোগানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দূরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নাটোকটা দেখলেন তালোরা ফকিরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ শরাফত আলী। ঘৃণায় একদলা থুতু ফেললেন। তারপর দ্রুত মোটরসাইকেলে উঠে বসলেন। চালক ছেলেটাকে বললেন, ‘বাড়ি চ।’
শরাফত আলী ফকিরপাড়া গ্রামের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন। কিন্তু তিনি এ ধনসম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে অয়ান নি। জন্মেছিলেন গাঁয়ের সবচেয়ে দরিদ্র ঘরে। খুব বেশি পড়াশুনাও করতে পারেন নি। কয়েকদিন এর ওর বাড়িতে টুকটাক কাজ-কাম করেছেন। তারপর শুরু করলেন ধাপের হাটে বিস্কুট বিক্রি। বাড়িতেই বিস্কুট বানিয়ে হাটে নিয়ে গয়ে বিক্রি করতেন। মানুষের দিন চিরকাল এক রকম যায় না। শরাফত আলী বিস্কুট ব্যবসায় সফলতা পেলেন। গ্রামের মধ্যেই এখন তার বেশ বড় বিস্কুট ফ্যাক্টরি হয়েছে। নাম ‘পাক-বাগদাদ বিস্কট ফ্যাক্টরি’। বিশ-পঁচিশ জন শ্রমিক তার ফ্যাক্টরিতে নিয়মিত কাজ করে। ‘পাক-বাগদাদ বিস্কুট ফ্যাক্টরি’তে তৈরি বিস্কুট এখন সারা উত্তরবঙ্গে পাওয়া যায়।
শরাফত আলী পরিশ্রমী হলেও তার চারিত্রিক দুর্বলতা ছিল। যৌবনে হাতে টাকা-পয়সা আসতে লাগলো , বাজে কাজে সেসব টাকা উড়তেও লাগলো। টাকার ঘাটতি মেটাতে অসৎ পথেও বেশ ইনকাম করেছেন শরাফত আলী। এসব কারণে বুড়ো বয়সে এসে তিনি খানিকটা অপরাধবোধে ভুগতে লাগলেন ।
তো, বছর পাঁচেক আগে এসব কথা স্থানীয় সমজিদের ইমাম মতলব মিয়ার সাথে শেয়ার করলে মতলব মিয়া তাকে বললেন, ‘শরাফত ভাই,একবার হজ পালন করলে আল্লাহ পাক বান্দার অতীতের সমস্ত অপরাধ মাফ করে দেন।’ এ কথা শুনে শরাফত আলী সস্ত্রীক হজ পালনের ইরাদা করেন। হজে যাওয়ার আগে তিনি গাঁয়ের সমস্ত লোককে দাওয়াত করে খাইয়েছিলেন এবং মতলব মিয়ার হাতে দুটা হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘হুজুর,দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন আমার হজটা কবুল করেন।’
স্ত্রীকে নিয়ে মসজিদুল হারামে গিয়ে আল্লাহর কাছে অনেক কান্নাকাটি করে অতীতের সব গুনাহ থেকে মুক্তির সার্টিফিকেট নিয়ে আসেন শরাফত আলী। নামের আগে যুক্ত হওয়া আলহাজ শব্দটাই গাঁয়ে তাকে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিতে পরিণত করলো। লোকজন তাকে হাজী সাহেব বলে ডাকতে লাগলো। শরাফত আলী কিন্তু সত্যিই একজন পরহেজগার আদমিতে পরিণত হলেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তাসবিহ তেলাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কুরান শরিফ পড়া শিখলেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করতে লাগলেন জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ। তিনি শরাফত আলীকে ইসলামি রাজনীতির দীক্ষা দিতে লাগলেন। এছাড়া কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শরাফত আলীর একমাত্র পুত্র হোসেন আলী মোবাইল ফোনে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের রেকর্ড তুলে দিয়েছে। দুপুরে খাবার পর বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে এসব ওয়াজ শোনেন শরাফত আলী।
গত দুদিন ধরে শরাফত আলীর মন ভীষণ খারাপ। শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ খুলে বসা একদল নাস্তিক পোলাপানের উস্কানিতে ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের মিথ্যা মামলায় জামায়াতে ইসলামের নেতা ও ইসলামি বক্তা আল্লামা সাঈদী সাহেবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। মানসিক যন্ত্রণায় তাই দুদিন ধরে ঘুমাতে পারছিলেন না শরাফত আলী। আজকে বিকালেও উপজেলা সদরে গণজাগরণ মঞ্চের পোলাপানের হৈ-চৈ দেখে বিরক্ত হয়ে বাড়িতে এসে শুয়ে পড়েছেন তিনি। অনেক্ষণ ধরে এপাশ ওপাশ করার পর সবেমাত্র ঘুম ধরেছে এমন সময় আজানের শব্দে তার ঘুমটা ভেঙে গেলো । কয়েক সেকেন্ড পর বুঝতে পারলেন আজানটা মসজিদ থেকে নয় বরং বালিশের কাছে রাখা তার মোবাইল ফোন থেকে আসছে। এত রাতে ফোন করে ঘুম ভাঙানোয় বিরক্ত হলেন তিনি।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপ্রান্ত থেকে পুত্র হোসেনের সালাম শোনা গেল। সালামের জবাব দিতেই হোসেন বললো, ‘আব্বা,ঘটনা শুনেছেন?’
‘ হ,কাল থিকা হরতাল।’
‘ আরে ঘটনা তো সেইডা না’,তাড়াতাড়ি বলে উঠলো হোসেন।‘বাইরে গিয়া চান্দের দিকা তাকান,আল্লাহ পাকের কি অপার মহিমা ! চান্দের বুকে ভাইসা উঠছে সাঈদী সাহেবের ছবি।’
‘ কস কি !’ এত বড় বিস্ময়কর ঘটনা এই জীবনে আর কখনো শোনেন নি শরাফত আলী।
‘ হামি আর কি কইমু, আপনি নিজে গিয়াই দ্যাখেন। সারা দ্যাশের লোক জানে এইডা।’
শরাফত আলীর আর তর সইলো না। টেবিলের উপর থেকে চশমাটা নিয়ে দরজা খুলে উঠানে বেরিয়ে এসে চাঁদের দিকে তাকালেন। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলেন না। একটু পরেই একটা মানুষের মাথার ছবি দেখতে পেলেন। কালো কালো কিছু রেখা মিলে মাথার ছবি তৈরি হয়েছে। উপরে টুপি ও নিচে দাড়ি বোঝা যাচ্ছে।
আল্লাহু আকবর ! চেঁচিয়ে উঠলেন শরাফত আলী। পাশের বাড়ির সদ্য বিবাহিত মোসাদ্দেক নতুন বউয়ের সাথে আদর-সোহাগের পর প্রস্রাব করতে বের হয়েছিলো। ছেলেটা সবেমাত্র লুঙি উপরে তুলে বসেছে, এমন সময় শরাফত আলীর চিৎকার শুনতে পেলো। ভয় পেয়ে সে প্রস্রাব সমাপ্ত না করেই ছুটে এলো। দেখলো, শরাফত আলী চাঁদের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে ডাকছেন।
‘ কি হইছে চাচা?’ মোসাদ্দেক অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘চান্দের দিকে তাকা’, বললেন শরাফত আলী।
সেদিকে তাকিয়ে কিছুই বুঝতে পারলো না মোসাদ্দেক। আবার শরাফত আলীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো সে। শরাফত আলীর চেঁচামেচিতে আরও কয়েকজন লোক বেরিয়ে এসেছে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না বলে ক্ষেপে উঠলেন শরাফত আলী। মোসাদ্দেকের দিকে তাকিয়ে সবার উদ্দ্যেশ্যে বললেন, ‘দেখবার পাইস না? কানা নাকি ! চান্দের গায়ে সাঈদী সাহেবের মুখ দেখা যায়, ভালো কইরা তাকা।’
মুহুর্তের মধ্যে খবরটা সারা গাঁয়ে ছড়িয়ে পড়লো। তবে এটা যে শুধু শরাফত আলীর চেঁচামেচিতে হয়েছে তা না। দেখা গেলো, গাঁয়ের অনেক লোককেই তাদের পরিচিত মানুষেরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফোন করে খবরটা জানিয়েছে। সে রাতে ফকিরপাড়া গ্রামের কেউ আর ঘুমালো না। খোদার মহিমা আর আল্লামা সাঈদীর কেরামতি দেখার জন্য চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তাদের চোখে-মুখে কৌতূহল , বিস্ময়, আর আসন্ন গজবের আতঙ্ক। আল্লাহর ওলীকে ফাঁসির রায় দিয়েছে কাফের সরকার। আল্লাহ তাই নিজেই চাঁদের ওসিলায় জানান দিলেন তাঁর প্রিয় বান্দা কতটা নির্দোষ।
তবে সবাই যে গল্পটা বিশ্বাস করলো তা নয়। হাইস্কুলের গণিত শিক্ষক ফারুক হোসেন তো বলেই উঠলেন, ‘ তোরা চাঁদে সাইদীকে দেখতে পাস, আর আমি দেখি জালাল পাগলারে।’ কয়েকজন তার কথায় হো হো করে হেসে উঠলো। আবার কেউ কেউ এমনভাবে তাকালো যেন এখুনি তার উপর খোদার গজব নাজেল হবে ! ফকিরপাড়া গ্রামের কিছু শিক্ষিত মানুষ ব্যাপারটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। তাদের মস্তিষ্কের শিক্ষিত অংশ বললো, এটা অসম্ভব। আবার ধার্মিক মনটা জানান দিলো, আল্লাহ তার বান্দার হেফাজতের জন্য যেকোনো কিছুই করতে পারেন।
ফজরের নামাজের পর মতলব মিয়া জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদ ইউনিয়নের সকল ঈমানদার মুসলমানকে আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে সমাবেত হতে আহবান করলেন। জমায়েতের উদ্দ্যেশ্যে জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তব্য রাখলেন তিনি। শরাফত আলী তার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন দিলেন। সকাল নয়টার সময় মাদ্রাসা মাঠ থেকে শ্লোগান দিতে দিতে একটা মিছিল চললো উপজেলা সদরের দিকে। মিছিলে শামিল হলো চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে সত্তর বছর বয়সী বুড়ো সবাই। তাদের সবার হাতে লাঠি।
ওদিকে সকাল থেকেই উপজেলা সদরের সিও অফিস বাস স্ট্যান্ডে হাজির হয়েছিলেন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামীলীগ নেতাদের প্রচারণামূলক বিভিন্ন ব্যানার ও বিল বোর্ড খুলে পুড়িয়ে ফেলা হলো। রাগের চোটে অনেকে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে লাথি মারতে লাগলো। তালোড়া ইউনিয়ন থেকে মিছিলটা আসা এসে হাজির হওয়ামাত্র বারুদে আগুন ধরে গেলো। ক্ষিপ্ত জনতা প্রথমেই গণজাওরণ মঞ্চ পুড়িয়ে ফেললো। সামনেই আওয়ামীলীগের অফিস। জামায়াতের উপজেলা আমীর মাইক হাতে বারবার বললেন, ‘আপনারা কেউ আওয়ামীলীগের অফিসে কিছু করবেন না।’ কিন্তু আজকে কেউ নেতার কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করলো না। মুহুর্তের মধ্যে অফিসটার আর কোনো অস্তিত্ব রইলো না।
মিছিল এগিয়ে চললো। সামনে পড়লো নিরীহ কলেজ শিক্ষক ফরিদ হোসেনের বাড়ি। ভদ্রলোক গণজাগরণ মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কেউ একজন বলে উঠলো, ‘ নাস্তিক ফরিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দাও রে।’ সাথে সাথে জনতা ফরিদ হোসেনের বাড়ি আক্রমণ করলো। ভারী জনিসপত্র ভেঙে ফেলে বহনযোগ্য জিনিস লুট করা হলো। তারপর উন্মত্ত জনতা বাড়িটাতে অগ্নিসংযোগ করলো। পাশের বাড়ির ছাদ থেকে একটা ছেলে মুঠোফোনে ঘটনাটার ভিডিও ধারণ করছিলো। কয়েকজন লোক ঢিল ছুঁড়ে ছেলেটার মাথায় ফাটিয়ে দিলো। একইভাবে আওয়ামীলীগ নেতাদের বাড়িতে আক্রমণ করা হলো।তবে আগেভাগেই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াতে তারা বেঁচে গেলেন। আওয়ামীলীগ সভাপতির বাড়ি এবং গাড়ি পুড়িয়ে ফেলার তিন ঘণ্টা পর তিনি ব্যক্তিগত বন্দুক হাতে আবির্ভুত হয়ে সিংহ গর্জন করতে লাগলেন।
নাগর নদীর পাশ দিয়ে মিছিল চলছে। থানার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকটা পুলিশ তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে আধ্মরা হলো। কিছুক্ষণ পর জানা গেলো থানার সব পুলিশকে বগুড়া সদরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে নাকি বিরাট ঝামেলা হচ্ছে। এটা শুনে মিছিলকারীরা বুনো উল্লাসে মেতে পুলিশ বিহীন থানা লুট করলো। সারাদিন ধরে রাজপথ কাঁপিয়ে সন্ধ্যায় মিছিল শেষ হলো। দুদিন কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পেলো না। তারপর আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীরা ঘরে ফিরলেন। এক বিরাট মিছিল বের করে জানান দিলেন যে তারা মারা যান নি। হাই স্কুলের সামনে দিয়ে যখন মিছিলটা যাচ্ছিলো একটা কিশোর তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। এই ছেলেটাই হতকাল গণজাগরণ মঞ্চে স্লোগান দিচ্ছিলো। কয়েক বছর পরে সে ‘হুলিয়া’ নামক উপন্যাসে এসব ঘটনা লিখে ফেলবে। (চলবে)
আগের পর্বের লিংক
https://istishon.com/?q=node/28316

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

উলুল আমর অন্তর
উলুল আমর অন্তর এর ছবি
Offline
Last seen: 6 দিন 15 ঘন্টা ago
Joined: বুধবার, ফেব্রুয়ারী 15, 2017 - 1:09পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর