নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • নগরবালক
  • কাঙালী ফকির চাষী

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

বিশিষ্ট নাগরিক


একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে, সে থাকে নিষ্পাপ ক্লেদমুক্ত। এ শিশুটিকে ঘিরে কত মানুষের অানন্দ, কত স্বপ্ন, কতশত অনুভূতি!
শিশুসুলভ বালখিল্য, বড়দের অাদিখ্যেতা, খেলার সাথীদের নির্মলতায় সে তখনো বোঝেনা সে কত নির্মম ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছে। এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে সে হয় শোষক হবে নয়তো শোষিত।
হয় বিশিষ্ট মানুষ হবে, নয়তো সাধারণ।
হয় বন্দুকের নল অন্যের দিকে তাক করবে, নয়তো তার নিজের দিকেই নলটি ঘুরবে।
ছোট্ট শিশুটি বড় হতে থাকে, অার ক্রমেই সে বদলে যেতে থাকে।
পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রতিকূলতা থেকে সে বদলে যেতে থাকে। সে স্বার্থান্বেষ, হিংস্রতা, নৈরাজ্য দেখে বদলে যেতে থাকে। সে দেখে চতুর্দিকে অনেক ভালোমানুষের মুখোশ, এই মুখোশের বিরুদ্ধে কথা বললে মার খেতে হয়। এই মুখোশ অনেক শক্তিশালী, এই মুখোশের অাড়ালে লুকিয়ে অাছে হাজারো বিষাক্ত দাঁত, ধারালো নখর, লোভাতুর জিভ।
এই মুখোশের বাহকদেরকে বলা হয় সুশীল সমাজ। এই নিপাট ভদ্র, সুশীতল, সুশীল শ্রেণী অত্যন্ত সমাদৃত। লোকে তাদেরকে তাজিম করে। তারা মহাপ্রাণ; কাগজে, অাইনে, সভায় তারা সদা পূজনীয়। তাদের মৃত্যুতে দেশ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। তাদের মৃত্যুতে পদস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং মিডিয়া শোকাতুর হয়ে পড়ে।

তারা গরিবের ঘরে গিয়ে ভাঙা খাটে বসলে প্রশংসিত হয় - অাহা কি মহান!
তারা মার্সিডিজে না চড়ে রিকশায় চড়ে রিকশাওয়ালাকে একদিন বখশিশ দিলে প্রশংসিত হয় - অাহা কি দিলওয়ালা!
তারা গরিবকে বস্ত্রদান করলে সুনামের জোয়ারেতে সয়লাব হয়ে যায় সবকিছু।
তারা দামি গাড়ি, বাড়ি, সাজসজ্জার জন্য যখন দু'হাতে টাকা উড়ায় তখনো সেই অাহা গ্রুপ হাজির..... অাহা কি স্টাইল, অাহা কি রুচিশীলতা, অাহা কি ফ্যাশন, অাহা কি অপূর্ব!

তারা মহাপ্রাণ, তাদের বেঁচে থাকার খুব দরকার। তাদেরকে বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার, রাষ্ট্রীয় অস্ত্রাগার, রাষ্ট্রীয় সব সুবিধাগার অবারিত করে দিতে হবে; কারণ তাদের বেঁচে থাকার খুব দরকার।
তাদের অসুখ হলে দেশবাসীকে দোয়ার দরিয়ায় ভাসানো হয়, তারা সুস্থ হলে দেশবাসীকে শোকরের সমুদ্রে অবগাহন করানো হয়।
তাদের পদধুলিতে ধন্য হয় অঙ্গন, প্রাঙ্গণ, প্রান্তর..... সব।
তারা বিশিষ্ট নাগরিক, কিন্তু রাস্তার ফুটপাতে শুয়ে থাকা লোকটি বিশিষ্ট নাগরিক নয়। ঝুপড়িতে অপুষ্ট সন্তান নিয়ে জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে সংগ্রাম করতে থাকা মা বিশিষ্ট নাগরিক নয়।
রাস্তার ধারে এবং নদীরপাড়ের হাজারো 'অবিশিষ্ট' লোকেরা মরলেও কিছু হয়না, কিন্তু বিশিষ্ট নাগরিকদের সর্দি হলেই হৈহৈ রব ওঠে।
বিশিষ্ট নাগরিকেরা মসজিদে সম্মানিত, মন্দিরে সম্মানিত, গির্জায় সম্মানিত, প্যাগোডায় সম্মানিত।
বিশিষ্ট লোকদের জন্যই পৃথিবীটা সুন্দর রয়েছে, শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
বিশিষ্ট নাগরিকদের জন্যেই গাছে ফুল ফোটে, পাখি গান গায়, মেঘমালা বৃষ্টি বর্ষণ করে। তাই বিশিষ্টদের বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্র, অস্ত্র, উপাসনালয় সদা উন্মুখ।
দুর্যোগ এবং বিপর্যয়ের সময় বিশিষ্টজনেরা এগিয়ে অাসেন অার্তমানবতার সেবায়। সেবা করতে গিয়ে যেন বিশিষ্টজনের কোন একটি লোমকূপও ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য সবার সে কি প্রাণান্তকর চেষ্টা!

বিশিষ্টজনদের মেধা, মননশীলতা, সৃজনশীলতার প্রশংসা করলেও সুখ পাওয়া যায়। সুখ পায় পুলিশ, সুখ পান সাংবাদিক, সুখ পান বিচারপতি।
অাসলে বিশিষ্টজন অত্যন্ত সৃজনশীল। নইলে বিশিষ্টজনদের সমাজে এত অবিচার অনাচার ঘটে, তবুও অনাচারীদের নাম প্রকাশিত হয়না কেন? অবিচারীদের কেশাগ্রও ছোঁয়া যায়না কেন?
নাম যদি প্রকাশ হয়েও যায় তবু তালিকার শেষ নামটা যে বিশিষ্টজনের, তা অপ্রকাশিতই রয়ে যায়।
পুলিশ, সাংবাদিক, বিচারপতি, সবাই জানে; অামপাবলিকও জানে, কিন্তু সম্মানিত এবং গুণীজনের সম্মান নষ্ট করা গুরুজনের মানা!
তাই ঘুরে যায় তদন্ত, থেমে যায় কলম।
অামপাবলিকও ভুলে যায় সবকিছু। গুণীজনদের প্রতি কূধারণা পোষণ করাও গুরুজনের মানা।
বিশিষ্ট নাগরিকের চিত্তের বিনোদন দরকার, প্রাণের নিশ্চয়তা দরকার; তাই বিদেশের ব্যাংকে, বিদেশের মাটিতে টাকা এবং বাড়ি থাকতে হয়। বিশিষ্ট নাগরিকের অসুখ হলে দেশের অসুখ হয়, বিশিষ্ট নাগরিকের মৃত্যু হলে দেশ এতিম হয়, বিশিষ্ট নাগরিকের অসম্মান হলে দেশের ইজ্জত যায়।

লোকেরা বিশিষ্ট নাগরিকের প্রশংসার প্রতিযোগ করে। কাব্য, গল্প, নাটক, সিনেমায় বিশিষ্টের বিশিষ্টামি প্রকাশ করা হয়। তবুও যেন প্রাণ ভরেনা, তবুও যেন তিয়াস মেটে না!
অবশেষে ভগবানের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন বিশিষ্ট নাগরিক।
অাসলে ওই যে ভগবান, অাল্লাহ এবং ঈশ্বর তারাও একেকজন বিশিষ্ট নাগরিক। তারা অদৃশ্য বিধায় তাদের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, এইসব অাল্লাহ এবং ভগবান প্রদত্ত ক্ষমতায়ই তো ক্ষমতাবান হয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা!
যেহেতু ভগবানেরা সর্বশক্তিমান!
বিশিষ্টদের টাকা হলে সম্মান দরকার হয়, সম্মান হলে টাকা দরকার হয়। অার এজন্য দরকার হয় প্রতিপক্ষ দমন। শুরু হয় দমন দমন খেলা। দমনলীলার সুবিধার জন্য সামনে টেনে অানা হয় অাল্লাহ, ঈশ্বর ও ভগবানের প্রতিমূর্তি। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় ভগবান, অাল্লাহ, ঈশ্বর অনুসারীদের মাঝে। যুদ্ধ হলে বিশিষ্টজনের লাভের হালখাতা ফুলে ওঠে, বীরত্বের কাহিনী ইতিহাস হয়, সুনামের জলাধার টইটুম্বুর হয়ে যায়। অার যুদ্ধের অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকে প্রত্যেক অনুসারীগণের নিজ নিজ 'অদৃশ্য বিশিষ্ট নাগরিক' তথা অাল্লাহ, ঈশ্বর কিংবা ভগবান।

অপরাধ যতই হোকনা কেন, মানি লোকের মান বাঁচাতে হয়। বিশিষ্ট নাগরিকদেরকে স্ট্যান্ডার্ড ভাষায় 'ভিঅাইপি' বলা হয়। কারাগারে থাকে ভিঅাইপি সেল, বিমানবন্দরে থাকে ভিঅাইপি এন্ট্রি, অবকাশ যাপন কেন্দ্রে থাকে ভিঅাইপি স্যুট।
তারা ভেরি ইমপর্টেন্ট পারসন; কিন্তু রেললাইনের পাশে, ফুটপাতের ধারে, ওভারব্রিজের নিচে শুয়ে থাকা লোকগুলো ভেরি ইমপর্টেন্ট নয়।
ভিঅাইপির সময়ের মূল্য অাছে, অর্থের মূল্য অাছে, স্বাস্থ্যের মূল্য অাছে।
তাই রাস্তায় ভিঅাইপির গাড়ির অগ্রাধিকার, শুল্কে ভিঅাইপির বিশেষ ছাড়, হাসপাতালে ভিঅাইপির খাস কদর, অর্থনীতিতে ভিঅাইপির স্পেশাল অফার, স্বাস্থ্যনীতিতে ভিঅাইপির সুবিধার বহর এসব তো থাকতেই হয়।
ভিঅাইপি শুধু জীবদ্দশায়ই ভিঅাইপি নন, মরে গিয়েও তিনি ভিঅাইপি।
তাকে নিয়ে কটুক্তি করলে মানুষের প্রাণ নেয়া হয়, ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়, বৈধ অস্ত্রধারীরা ধরে নিয়ে যায়।
ভিঅাইপি মরে গিয়ে দেবতা হয়ে যান, দেবতাকে রুষ্ট করতে হয়না, তাতে অমঙ্গল হয়। দেবতাকে নিয়ে কটুকাটব্য করলে অনুভূতি অাহত হয়। অাহত অনুভূতির বদলা হিসেবে কেড়ে নেয়া হয় মানুষের মান, সম্পদ, প্রাণ।
সমাজ, দেশ, পৃথিবীর সব জায়গায় বিশিষ্ট নাগরিকের জন্য 'বিশিষ্ট মর্যাদা' সংরক্ষিত।

সাধারণ মানুষের জন্য যা অবৈধ বিশিষ্ট নাগরিকের জন্য তা বৈধ। বিশিষ্টজনেরা কোন কাজ অনর্থক করেন না, করতে পারেননা।
তারা যখন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে মানুষকে হত্যা করার অস্ত্র বানাতে থাকেন তখন তার প্রশংসা করতে হবে, কারণ এসব অস্ত্র মানবকল্যাণের নিমিত্তেই নির্মিত!
ক্ষুধার্ত, অসহায় মানুষের উপর যখন খাদ্যের বদলে গাইডেড মিসাইল ফেলা হয় তখন তা হয় শুধুমাত্র মানবতার কল্যাণে, কারণ এটা বিশিষ্ট মানুষের মহানুভবতা! বিশিষ্টের ভুল হয়না, ভুল হতে পারে না। তাইতো বিশিষ্ট হওয়ার জন্য সবার সে কি প্রাণান্তকর চেষ্টা!
বিশিষ্টজনদের সুরক্ষার জন্য মাটির নিচে শহরও তৈরি করা হয়, কারণ যুদ্ধকালীন সময়ে বিশিষ্টজনকে বাঁচাতে হবে।

বিশিষ্ট দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বের করছেন নিত্যনতুন মারণাস্ত্র, যা করা হচ্ছে উঁচু দেশগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য। কার অস্ত্র কত বেশি মানুষ মারতে পারে এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় উঁচু দেশের মর্যাদার অাসন।
অন্য দেশগুলো বলে - অাহা কি পাওয়ার, অাহা কি ভয়ানক অস্ত্র!

এক সেকেন্ডে কত রাউন্ড গুলিবর্ষণ করতে পারে, কত মানুষের বসতভিটা ধ্বংস করতে পারে, কত মানুষের প্রাণ নিভিয়ে ফেলতে পারে এর উপর ভিত্তি করে নিরূপিত হয় নেতৃত্বের চেয়ার, উঁচুত্বের শ্রেণিবিভাগ।

বিশিষ্ট নাগরিকেরা বহুমুল্যবান মার্বেল পাথরের প্রাসাদে পুলকিত থাকেন, অতিদামি ঝাড়বাতির জৌলুশে ঝলকিত থাকেন, দামি ব্র্যান্ডি এবং হুইস্কির পার্টিতে মদমত্ত থাকেন; তাই তার শানের খেলাপ কিছু হলে তিনি তড়পান এবং গজরান। তার সম্মানের মূল্য অনেক, তাই তাকে নিয়ে সমালোচনা করলে পিষে ফেলতে হয়, ঠিক যেমন পিঁপড়াকে পিষে ফেলা হয়।

বিশিষ্ট নাগরিকের বেঁচে থাকার খুব দরকার। তাই ব্যাংকগুলো উদার হয়ে যায়, সংস্থাগুলি দিলদরিয়া হয়ে যায়, জনগণ তার জন্য জান কোরবান হয়ে যায়। ঋণখেলাপি হলেও তিনি মহান, বাঁ হাতের কারবার করলেও তিনি ডাকসাইটে, জনগণের প্রাণ নিলেও তিনি নারকেল ঝানু সমাজসেবক।

বিশিষ্ট নাগরিকেরা সাধারণত পুরুষ প্রজাতির হয়ে থাকেন; তাই বিশিষ্ট নাগরিকের চিত্তের পরিতৃপ্তি দরকার হয়। রাতে নতুন নতুন শয্যাসঙ্গিনীর দরকার পড়ে, অাবার স্থায়ীভাবে একটি রঙ্গচিঙ্গা পণ্যেরও দরকার হয়, এই পণ্যের নাম ভদ্রলোকদের ভাষায় "স্ত্রী।"
অনুষ্ঠান, নির্বাচন, অবকাশযাপন এর সময়ে বিশিষ্ট নাগরিকের স্ত্রী নামক পণ্যটিকে কড়া মেকাপে, ঝলসানো পোশাকে বেশ হাস্যোজ্বল দেখা যায়।
বছরের বাকি দিনগুলোতে স্ত্রী নামক "পদার্থের" কাজ হয় বিশিষ্ট নাগরিকের গুণকীর্তন করা, তার প্রাসাদ সামলানো, তার 'স্বামীত্বের' স্বীকৃতি দেয়া।

বিশিষ্ট নাগরিকদের অাবার অনেক শাখা অাছে। তারা ব্যবসানীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি সবকিছুতেই সিদ্ধহস্ত।
সব সুতো পাকানোতেই তাদের হাত পারঙ্গম। সব সুতোর সূত্র এসে ধর্ম নামক রঙে রঙিন হয়ে যায়। এই রঙ দিয়ে ধুলে ধারালো নোখর মোলায়েম হয়ে যায়, এই রঙ দিয়ে ধুলে বিষাক্ত দাঁত নির্বীষ হয়ে যায়, এই রঙ দিয়ে ধুলে লোভাতুর কালো জিভ দুধেল সাদা হয়ে যায়।

পৃথিবীটা বিশিষ্টজনদের জন্যে, বাকি সবাই শুধু সিঁড়ি। সিঁড়িতে পা রেখে বিশিষ্টজনেরা তরতর করে অারো বিশিষ্ট
হয়ে যায়। কখনো সিঁড়িতে সজোরে লাথি মারা হয়, কখনো পুরনো সিঁড়ি ভেঙে নতুন সিঁড়ি তৈরি করা হয়, কখনো সিঁড়ির রেলিং ভেঙে ফেলা হয়; সবই করা হয় বিশিষ্টের সব সুমহান অায়োজনের চূড়ান্ত করতে।
বিশিষ্টজনেরা খুব শক্তিশালী হয়ে থাকেন। শক্তি অাছে কিন্তু এর প্রদর্শন হবেনা তা কি হয়? চলতে থাকে শক্তিযুদ্ধ, দরকার হয় রণাঙ্গনের, দরকার হয় অাসবাবপত্র ধ্বংসের।
অাসবাবপত্র কি তা জানেন?
জানি বলতে পারবেননা। অাসবাবপত্র হচ্ছে ওই যে অামপাবলিক অাছে, তারা।
তারা সাধারণ মানুষ, তাই তাদের রক্ত ঝরতেই পারে, তাদের প্রাণ হনন চলতেই পারে। শুধু শক্তিবাজ বিশিষ্টজনেরা বেঁচে থাকলেই হলো।

সাধারণ মানুষগুলিকে নিশ্চয়ই কেউ গর্ভে ধারণ করেনি? নিশ্চয়ই তার মা তাকে বুকেরদুধ খাওয়ায়নি? নিশ্চয়ই তার বাবা তার জন্মে উল্লসিত হয়নি? নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে তার বাবা মা স্বপ্ন দেখেনি?
নিশ্চয়ই তিলতিল করে এই শিশুটিকে অাজকের যুবকে পরিণত করা হয়নি?
নিশ্চয়ই সন্তানের জন্য নির্ঘুম রাত কাটায়নি তার মা!
এসব করবেই বা কেন? এসব তো করে শুধু ভিঅাইপিরা, তারা যে পৃথিবী এবং দেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিক!
ভিঅাইপিরাই শুধু বাচ্চাদের অাদর করে, তাদের শিশুরাই প্রকৃত শিশু, তাদের সন্তানরাই শুধু সন্তান। সাধারণেরা তো কেবলমাত্র সিঁড়ি এবং অাসবাবপত্র।
ভিঅাইপির সন্তান দেখলে ক্লিকবাটনে হামলে পড়ে সাংবাদিক, হন্যে হয় পুলিশ, উপচে পড়ে জনগণ।

তাইতো ভিঅাইপির ছেলে যখন গরিব কৃষকের মেয়েকে একটুঅাধটু ফুর্তি করতে গিয়ে হত্যা করে ফেলে তখন বিচার হয়না। যখন কারখানা করার জন্য কৃষকদের বাস্তুভূমি জবরদখল করা হয় তখন সবাই নিরব থাকে। যখন ক্ষমতার জন্য সাধারণ মানুষের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে ফেলা হয় তখনও কিছু হয়না।
গরিবের প্রাণ গেলে যাক, ভিঅাইপির মান যেন না যায়। ভূমিহীন গরিবের সন্তান না খেয়ে মরুক, কিন্তু ভিঅাইপির সন্তান যেন সর্দিতে কষ্ট না পায়।
তাই নয় কি সাংবাদিক ভাইয়েরা? তাই নয় কি পুলিশ ভাইয়েরা? তাই নয় কি বিচারক ভাইয়েরা?

গৃহহারা লাখো মানুষের স্বপ্নগুলো ধূলিস্যাৎ হয়ে যাক, তবুও বেঁচে থাকুক বিশিষ্ট নাগরিকের অালিশান প্রাসাদ বানানোর স্বপ্ন। পিতৃহারা, সন্তানহারা, স্বামীহারা, স্ত্রীহারা মানুষ তো ভিঅাইপি না, তাই বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র প্রাণ কেড়ে নেয়া যেতেই পারে - তাই নয় কি, দেশের নীতিনির্ধারকগণ?

যুগেযুগে অাসেন বিশিষ্টজনেরা। লোকেরা তাদেরকে মহাপুরুষ, বীরপুরুষ, নবীজি, স্বামীজি কিংবা পুরুষোত্তম বলে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো জগতবাসীর উপকারের নামে তারা সাধন করেন মহা কর্মযজ্ঞ।
এই বিশিষ্ট পুরুষেরা কথা বললে লোকেরা তন্ময় হয়ে শোনে, তারা লিখলে লোকেরা মোহিত হয়ে পড়ে, তারা হাসলে বা কাঁদলে লোকেরা মুগ্ধ হয়ে দেখে।
তাদের কাছে সাধারণ মানুষের জীবন হচ্ছে পণ্য, তাদের কাছে নারীর দেহ হচ্ছে পণ্য। তাদের দৃষ্টিতে নারী এবং মানুষ অালাদা দুটি শব্দ, তাইতো তারা স্বামী কিংবা দেবতা।

তারা দিনেরবেলা সাধারণ মানুষকে প্রচন্ড ভালোবাসেন, রাতেরবেলা নির্দেশ দেন পিষে ফেলতে। তারা রাতেরবেলা নারীকে খুব ভালোবাসেন, দিনেরবেলা বলেন - "তুই শয়তানের রশি!"
দিন ফুরিয়ে গেলে জনগণ তাদের কাছে তাসেরঘর, রাত পোহালে নারী তাদের কাছে ধানের খড়।

তাদের সমালোচনা করা অন্যায়, কারণ এতে জাতির অমঙ্গল হয়। তারা বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছেন অালোর পথ। তারা সবাই পুরুষ, সবাই পুরুষতান্ত্রিকতার প্রবক্তা। তাদের কেউ ছিলেন ঈশ্বরের বাণীপ্রচারক, যাদেরকে মহাপুরুষ বলা হয়, কিন্তু মহানারী কাউকে বলা হয়না! তারা ছিলেন কঠোর শাসক, দিগ্বিজয়ী; কিন্তু মহামহিম!
তাইতো মহাপুরুষদের বিধানে নারী অপয়া। মহাপুরুষদের ধর্মগৃহে নারীর প্রবেশাধিকার নেই, মহাপুরুষদের ধর্মপদে নারীর সম্মানজনক অংশগ্রহণ নেই। মহাপুরুষদের কাছে নারী সর্বদা পেষণের বস্তু, শস্যক্ষেত্র। তাইতো তারা মহাপুরুষ, পুরুষতান্ত্রিকদের রক্ষাকর্তা। তাইতো তাদের প্রাণের এবং মানের এত দাম, তাইতো তাদের জ্ঞানের এত মূল্য।
তাদের দেখানো পথ ধরেই পুরুষ পেয়েছে গৌরব, নারী পেয়েছে 'খাদ্য' হওয়ার মর্যাদা (?)

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মুফতি মাসুদ
মুফতি মাসুদ এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 13 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, আগস্ট 14, 2017 - 6:00অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর