নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • ওয়াহিদা সুলতানা
  • নগরবালক
  • উদয় খান
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • আশিকুর রহমান আসিফ
  • ড. লজিক্যাল বাঙালি
  • কাঙালী ফকির চাষী

নতুন যাত্রী

  • আরিফ হাসান
  • সত্যন্মোচক
  • আহসান হাবীব তছলিম
  • মাহমুদুল হাসান সৌরভ
  • অনিরুদ্ধ আলম
  • মন্জুরুল
  • ইমরানkhan
  • মোঃ মনিরুজ্জামান
  • আশরাফ আল মিনার
  • সাইয়েদ৯৫১

আপনি এখানে

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ তৃতীয় পর্ব


৫। প্রজন্ম
কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে নেট প্র্যাক্টিস করছে ক্রিকেটাররা। দীর্ঘক্ষণ একটানা ব্যাটিং করে হেলমেট, গ্লাভস খুলে মাঠের মধ্যে বসে পড়লো মাসুদ। কলাবাগানের হয়ে প্রথম বিভাগে খেলে সে । বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব-১৯ দলেও তার ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মাসুদের পাশে এসে বসলো বিজয় । ও নিজেও এক সময় ক্রিকেট খেলতো । মাসুদ আর বিজয় বাল্যবন্ধু । দুজনের বাসাই মোহাম্মদপুরে ।
‘আরেকটা রাজাকারের বিচারের রায় দিলো আজকে ,শুনেছিস?’ বিজয় বললো।
-‘হুম , কাদের মোল্লারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিছে।হালা রাজাকার । ফাঁসি দেওনের দরকার আছিলো’। মাসুদ বললো।
বিজয় কিছু বলার আগেই মুখ খুললো ক্রিকেটার ফরহাদ ।‘তুই কীভাবে জানলি কাদের মোল্লা রাজাকার ছিলেন? একাত্তর সালে তো মনে হয় তোর বাপই বাচ্চা আছিলো !’
‘এটা গোটা বাংলাদেশ জানে কসাই কাদের কতো বড় দেশদ্রোহী । মীরপুর, মোহাম্মদপুরে সাড়ে তিনশো লোক মারছে এই কাদের মোল্লা। আর তুই আইছিস হের লাইগা ওকালতি করতে’। বিদ্রূপ করে বললো মাসুদ।
‘চুপ শালা, এইডাই তো হাসিনার চক্রান্ত । একদিকে রাজাকারদের মন্ত্রী বানাইছে আর অন্যদিকে বিএনপি-জামাতের সব নেতাকে রাজাকার ঘোষণা করতেসে’।
‘রাজাকারের জন্য তোর এতো দরদ ক্যান?’ শালা,দালালি করতে আইছস’।ক্ষেপে উঠেছে মাসুদ ।
‘দালাল তো তোরা ,রেন্ডিগো দালাল।দ্যাশটারে ইন্ডিয়ার কাছে বেইচা দে’।
অর্থহীন এই ঝগড়ায় বিরক্ত হয় বিজয় ।মাসুদকে নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে এলো। লাফ দিয়ে বাসে উঠলো ওরা। কোনো সিট ফাঁকা না থাকায় দাঁড়িয়ে থাকতে হলো। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো বাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত। যাত্রীরা কাদের মোল্লার বিচারের রায় নিয়ে তর্ক করছে। কেউ কাদের মোল্লার ফাঁসি চায়, কেউ কেউ যাবজ্জীবন দণ্ডেই সন্তুষ্ট।আবার অনেকেই বিশ্বাস করে জামাত নেতা কাদের মোল্লা নির্দোষ। আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার মাত্র।
বিজয় যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার কাছেই একটা সিটে বসে কণ্ডাক্টরের সাথে ঝগড়া করছে এক মাঝবয়সী লোক। সায়েন্স ল্যাব থেকে উঠেছে লোকটা, নামবে আসাদগেটে। ভাড়া দিয়েছে পাঁচ টাকা । কণ্ডাক্টর চাইছে দশ টাকা। আরো দু-তিন জন যাত্রী মাঝবয়সী লোকটাকে সমর্থন করে কণ্ডাক্টরকে বকাবকি শুরু করলো । একজন বলে উঠলো, ‘হারামজাদা, এতো লোক গাড়িতে তুলেছিস, এতো ধীরে গাড়ি চলছে ,তারপরেও তুই কথা বলিস কোন সাহসে ! আমারে চিনিস না, আর একটা কথা বললে থাপড়ে সোজা করবো’।
লোকটার কথা বলার ভঙ্গি দেখে হাসি পেলো বিজয় । এই না হলে টিপিক্যাল মিডল ক্লাস বাঙালি ! জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত পরাজিত হওয়ার ব্যর্থতা, অন্যের কাছে ছোট হওয়ার লজ্জা,সন্তানদের মানুষ করার দুশ্চিন্তা সবকিছু মিলিয়ে জীবনের প্রতি যে ক্রোধ সৃষ্টি হয় , তা এসে ঝাড়বে বাসের কণ্ডাক্টরের উপর । টাকা দিয়ে গাড়িতে উঠেছে। এতটুকু হক তো তার আছেই।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাসায় ঢুঁকে বাবাকে টিভির সামনে দেখতে পেলো বিজয়। ওর পিতা প্রফেসর কামাল হাসান একজন মুক্তিযোদ্ধা ।এ নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই । নতুন কারো সাথে পরিচিত হলেই নিজের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় জানাতে বিলম্ব হয় না তাঁর। আর আলাপ খানিক জমলেই শুরু করেন একাত্তরে তাঁর বীরত্বের গল্প।
খবরে দেখাচ্ছে, কাদের মোল্লার বিচারের রায়ে অসন্তুষ্ট বিশিষ্ট নাগরিকরা। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে আন্দোলন করছেন বামপন্থি নেতৃবৃন্দ ও প্রগতিশীল শিল্পীগণ। কামাল হাসান উত্তেজিত হয়ে উঠলেন । বললেন, ‘এতো বড় একটা দেশদ্রোহীকে ফাঁসি না দিলে ফাঁসি দিবে কাকে ?’
ঢাকা কলেজের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কামাল হাসান। গত বছর রিটায়ার্ড করেছেন তিনি।এখন বাড়িতে বসে বই,পুস্তক,খবরের কাগজ পড়ে, শরীরচর্চা করে, বৌয়ের সাথে ঝগড়া করে সময় কাটছে তার। ভদ্রলোক তিন সন্তানের জনক ।
কামাল-ফরিদা দম্পতির বড় কন্যার নাম মুক্তি । বাংলাদেশের অন্য দশটা পিতার মতোই মুক্তির জন্মের পর পরই তাকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন কামাল হাসান । কিন্তু অতি রূপবতী মেয়েদের নাকি পড়াশুনায় মনোযোগ কম থাকে । মেডিকেল কলেজে পড়ার মতো মেধা ছিলো না মুক্তির । তবে নিজে চিকিৎসক না হলেও রূপের জালে ফেলে চিকিৎসক স্বামী ঠিকই জোগাড় করেছে সে।
মুক্তি তখন একাদশ শ্রেণির ছাত্রী । ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ফয়সালের কাছে জীববিজ্ঞান পড়তো সে। তো , টিউশনির ফাঁকে হবু চিকিৎসক ফয়সাল তার রূপসী ছাত্রীর কাছে রোমান্টিক পুরুষ হিশেবে আবির্ভূত হলো। বছর দুয়েক পরে মুক্তি ইডেন কলেজে ভর্তি হলো। ফয়সালও পেশাগত জীবন শুরু করে । ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তারের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হতে দ্বিধা করেন নি কামাল-ফরিদা দম্পতি । ব্যস, বিয়ে হয়ে গেলো মুক্তি ও ফয়সালের।
গুলশানে অভিজাত ফ্ল্যাটে থাকে ফয়সাল, মুক্তি ও তাদের একমাত্র সন্তান ফারহান। ফ্যসালের পিতা-মাতা কেউই এখন বেঁচে নেই । ছোট্ট সংসারটা পুরোপুরি মুক্তির হাতের মুঠোয়। লোকে বলে, প্রেমের বিয়েতে গড়া সংসার নাকি সুখের হয় না। ফয়সাল ও মুক্তির ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য নহে।
মুক্তির চেয়ে দুবছরের ছোট কামাল সাহেবের দ্বিতীয় কন্যা জয়িতা দেখতে শ্যমলা। তার রূপ মুক্তির মতো আগুন ঝড়ানো নয় , বরং স্নিগ্ধ, কোমল। দেখলেই ভালবাসতে ইচ্ছে করে। জয়িতাকে সর্বগুণে গুণান্বিতা বললে ভুল হবে না। পিতার স্বপ্ন পূরণ করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে সে ডাক্তারি পড়ছে। জয়িতার আচার ব্যবহারেও সবাই তুষ্ট। তাছাড়া সাংসারিক কাজকর্মেও সে পটু। তিন সন্তানের মধ্যে জয়িতাকেই সম্ভবত বেশি ভালোবাসেন কামাল সাহেব। অন্য সন্তানদের সাথে তিনি ঠিকমতো মিশতেই পারেন নি।
দুবার কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে একটা পুত্র সন্তানের আশায় স্ত্রী ফরিদাকে নিয়ে আজমীর শরিফ গিয়েছিলেন কামাল হাসান । খাজা মহিউদ্দিন চিশতীর মাজারে গিয়ে খালি হাতে কেউ ফিরে না । দেশে ফিরেই গর্ভবতী হন ফরিদা। জন্ম নিলো বিজয়।
একমাত্র পুত্রকে কামাল সাহেব দিয়েছিলেন নিজের মতো করে বেড়ে উঠার স্বাধীনতা । এসএসসি পাশ করে বিজয় যখন সায়েন্স ছেড়ে আর্টস নিয়ে পড়তে চাইলো,আপত্তি করেন নি তিনি। ঢাকা কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাস্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হয় বিজয়।
হাত-মুখ ধুয়ে নিজের রুমে গিয়ে বিজয় দেখলো, দাদু দুহাতে কানের কাছে রেডিও চেপে ধরে খবর শুনছেন । পুরনো আমলের মানুষ । এখনো রেডিওতে খবর না শুনলে তার চলে না। বিজয় বিছানায় শুয়ে পড়লো । কিছুক্ষণ পর জয়িতা এসে ডাক দিলো, ‘ভাপা পিঠা বানিয়েছি। খাবিনা?’
-‘রেখে দে, পরে খাবো’। বিজয় বললো।
-‘দাদু খেয়েছেন ?’
-‘হুম, বেশ কয়েকটা খেয়েছেন। আর খাওয়া চলবে না উনার’।
এার দাদু কথা বললেন, ‘কম খেয়ে দশ বছর বেশি বাঁচার চেয়ে সবকিছুর স্বাদ নিয়ে আগে মরা ভালো’।
‘আপনারা পুরনো আমলের লোক এতো তাড়াতাড়ি মরবেন না। আজ পর্যন্ত আপনাকে কোনোদিন ভয়ানক অসুস্থ হতে দেখিনি’। বিজয় বললো।
দাদুর বয়স প্রায় নব্বই বছর। কিন্তু শরীর এখনো মজবুত তার। হাঁটাচলায় কোনো সমস্যা হয় না। শুধু কানে কম শোনেন আর চোখে কম দেখেন। ডায়াবেটিস ধরা পড়ায় খাবার দাবারে শুধু একটু পরিবর্তন এসেছে। আর কিছু না।
বিছানায় উঠে বসে পিঠা খেতে লাগলো বিজয়। বয়সে তিন বছরের ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে জয়িতা। বড় হয়ে গেছে বিজয়।
‘তুই কি রিয়ার প্রেমে পড়েছিস?’ দাদু বাথরুমে গেলে হঠাতই বলে উঠলো জয়িতা।
বিজয়ের হৃদস্পন্দন বেড়ে উঠলো। ‘মানে কী!’ চেঁচিয়ে উঠলো সে।
-‘ কাল দেখলাম অর্থিদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন কথা বলছিস। এর আগেও একদিন তোদের দুজনকে একসাথে দেখেছি।
-‘আরে ধুর, অর্থি আপু তো আমার চেয়ে বয়সে বড়। ওর বাসায় গিয়েছিলাম বই নিতে। আর সে আমার ভার্সিটির বড় আপু এবং প্রতিবেশি। সো, আমরা একসাথে বাসায় আসতেই পারি । ধুর, মেজাজটাই খারাপ করে দিলি ফালতু কথা বলে’।
-‘আচ্ছা, বাদ দে’।
- ‘তুই একটা ইল মাইন্ডের মেয়ে। অর্থি আপু জার্নালিজমে পড়ে, পাশাপাশি সে একটা অনলাইন পত্রিকাতেও কাজ করে। ওর বাসায় অনেক বই। সেখান থেকে বই নেওয়া নিশ্চয় আমার অপরাধ নয় । তাছাড়া আমি নিজে আগ বাড়িয়ে তার কাছে যাই নি । সে নিজেই আমার কাছ থেকে রাস্ট্রবিজ্ঞানের একটা বই চেয়েছিলো’। কৈফিয়ত দিচ্ছে বিজয়।
হেসে ফেললো জয়িতা।বললো, ‘তুই এতো খেপলি কেনো? পিঠা খা’।
বিজয় বললো, ‘খাবো না তোর পিঠা, নিয়ে যা’।
‘আচ্ছা আমি যাচ্ছি, তুই খা’। জয়িতা বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে।
পিঠা শেষ করে চিৎকার করে চা দিতে বলে ফেসবুকে প্রবেশ করলো বিজয়। চ্যাটলিস্টে গিয়ে অ্যাঞ্জেল ফারিহাকে দেখতে পেলো। মোহাম্মদপুরেই থাকে মডেল ফারিহা। মেয়েটা কয়েকটা মিউজিক ভিডিওতে কাজ করে তরুণোদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফেসবুকে প্রতিদিন নিজের আকর্ষণীয় ছবি আপলোড করে এবং ন্যাকা ন্যাকা সব স্ট্যাটাস দিয়ে ইয়াং ছেলেদের মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। ফারিহার জনপ্রিয়তার আরেকটা কারণ হলো তার বয়স কম এবং রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস সিংগেল। ফেসবুকে তার ফলোয়ারের সংখ্যা প্রায় সতেরো হাজার। ছয়মাস ফলোয়ার থেকে ফারিহার প্রতিটা ছবি ও স্ট্যাটাসে নিয়মিত ভালো ভালো কমেন্ট করার পর বিজয় তার ফ্রেন্ড হতে পেরেছিলো।
‘হাই, কেমন আছো?’ বিজয় মেসেজ দিলো।
-‘নট ব্যাড । ইউ?’ দুই মিনিট পর রিপ্লাই এলো।
-‘ওয়েল। নতুন কোনো ভিডিও তে কাজ করছ?’
-‘নোপ। সামনে এইচএসসি এক্সাম ইউ নো। পড়াশুনার চাপ বেড়েছে। তাই কয়েকটা অফার থাকা সত্বেও কাজ করতে পারছি না, না করে দিয়েছি সবাইকে’।
মডেল মেয়েদের এসব ভাব একদমই সহ্য হয় না বিজয়ের। অশ্লীল ভাষায় গালি দিতে ইচ্ছে করে । কিন্তু এমন রূপসী মেয়ের সাথে সামান্য রাফ বিহ্যাভ করলে নিজেরই লস। ব্লক খেতে হবে। কে জানে, হয়তো এই ফারিহাই কয়েক বছর পর ঢাকাই ছবির হিরোইন হয়ে যাবে! তখন ফ্রেন্ডলিস্টে ফারিহার উপস্থিতিই বিজয়ের মান বাড়িয়ে দিবে।
‘তোমার অ্যাক্টিং আমার খুব ভালো লাগে’, নিজেকে সংযত করে বিজয় তোষামোদ করে।
-‘থ্যাংস , আচ্ছা বাই’। চলে গেলো ফারিহা।
টাইমলাইনে আজ শুধু কাদের মোল্লার বিচার বিষয়ক পোস্ট। বাঙালি হৈ-চৈ করার মতো একটা টপিক পেলে হয়! একেকজন নিজেদের বিশেষজ্ঞ প্রমাণের লড়াইয়ে নামে। ঘণ্টা খানেক আগে লেখা ফাতেমা রিয়ার স্ট্যাটাসে চোখ আটকালো বিজয়ের। অর্থি লিখেছে – বিকাল থেকে ‘ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক’- এর সদস্যরা আছি শাহবাগে। কসাই কাদেরের ফাঁসির দাবী জানাতে এসেছি। ফাঁসির রায় না শোনা পর্যন্ত আমরা শাহবাগ ছাড়বো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা চলে আসুন। একাত্তরের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার। জয় বাংলা।
শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচী বিষয়ে আরও কয়েকটা লেখা নজরে এলো বিজয়ের। কাল একবার যাওয়া যেতে পারে। ব্যালকনি থেকে রেডিওর শব্দ আসছে। দাদু ক্রিকেটপাগল মানুষ। চেয়ারে বসে রেডিওতে খেলার ধারাভাষ্য শুনছেন। বসার ঘরে গেলো বিজয় । কামাল সাহেব এখনো টিভির সামনে। এক চ্যানেলের খবর শুনে মন ভরে না তার। একটার খবর শুনে আরেকটায় চলে যান তিনি। অথবা টকশো দেখেন।
রিমোটটা হাতে নিয়ে বিজয় বললো, ‘বিপিএল খেলা দেখব’।
কিছু না বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন কামাল সাহেব।
‘আপদ বিদায় হলো’ মনে মনে বলো বিজয়। ঘণ্টাখানেক খেলা দেখে আবার ফেসবুকে ঢুকলো সে। অর্থিকে মেসেজ দিলো , কই আছো?’
-‘এই মাত্র বাসায় এলাম। কি করছ?’ অর্থি প্রত্যুত্তর দেয়।
-‘ খেলা দেখি । শাহবাগে ছিলে? কি হচ্ছে?’
-‘আন্দোলন। কাল আবার যাব।তুমিও এসো’।
-ওকে যাব।রাতে খেয়েছ?’
-‘নাহ, শুয়ে আছি। কাল পারলে প্ল্যাকার্ড বানিয়ে এনো’।
-‘আচ্ছা। একটা কথা ছিল’।
-কী? বলো।
-‘ইমতিয়াজের সাথে তোমার কথা হয়?’
- ‘একসাথে পড়ি। কথা তো হবেই , বাট তার সাথে আমার কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই।
-‘এখনো ভালোবাসো তাকে?’ জানতে চায় বিজয়।
-‘না’। ছোট্ট রিপ্লাই আসে অর্থির।
কিছুক্ষণ পর বড় করে রিপ্লাই আসে, ‘ ভালোবাসার প্রশ্নই আসে না। সে আমার সাথে রিলেশন থাকা অবস্থায় আরেকটা মেয়ের সাথে প্রেম করেছে।তাকে বিয়ে করেছে। আমাকে বলে ফ্যামিলির চাপে নাকি বিয়ে করেছে। এটা মিথ্যা কথা আমি জানি। ছেলেদের উপর আবার ফ্যামিলির চাপ কিসের? না, তার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ নাই । আমি এমন মেয়ে না যে একটা ব্রেকাপের পর কেঁদে বুক ভাসাবো ! প্রতারকের জন্য আমার কোনো ভালোবাসা নেই’।
-হুম, বাদ দাও’।
-‘ওকে। কাদের মোল্লার বিচার নিয়ে শাহেদ খান স্যার একটা ব্লগপোস্ট লিখেছেন, পড়েছ ?’
‘নাহ, দেখিনি’, বিজয় মেসেজ দেয়। ‘ তবে তিনি যে দেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা,রাজাকারের নির্মমতা নিয়ে বিশাল কলাম লিখেছেন তা বুঝতে পারছি। এমন একটা হট টপিক তাঁর মতো প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ছাড়বেন কেনো?’
-‘হিহিহি। স্যারের লেখা আমার ভালো লাগে। তিনি নাকি তোমার রিলেটিভ?’
-দূর সম্পর্কের আত্মীয়।বগুড়াতে আমাদের গ্রামেই তাঁর বাড়ি’।
-‘কাল ক্লাস আছে তোমার ?’ অর্থি জানতে চাইলো ।
-‘হুম, নয়টা থেকে। ক্লাস শেষে শাহবাগ যাব।এই আম্মু ডাকছে, খেতে যাব’।
-আচ্ছা যাও, কাল শাহবাগে গিয়ে ফোন দিও’।
-‘ওকে ,বাই’।
রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে মাসুদকে ফোন দিলো বিজয়। বললো, ‘কাল শাহবাগ যাবি?’
মাসুদ বললো, দশটার সময় যাব। ফেসবুকে দেখলাম অনেকেই আসবে। তোর ক্লাস আছে?’
-‘ক্লাস একটা আছে। তবে ভাবছি ক্লাসে যাব না। তুই সকালে ফোন দিস। একসাথে যাব শাহবাগে’।
রুমটাতে বিজয় একা থাকে। এই রুমে আগে দাদু আর বিজয় থাকতো। মুক্তি আপুর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার রুমে দাদু থাকেন। তবে এখনো প্রতি মাসে মুক্তিরা এলে তিনি বিজয়ের রুমেই থাকেন।
সদ্য কেনা জন গ্রিনের ‘ দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ বইটা হাতে নিলো বিজয়। ক্যান্সারে ভোগা এক টিনেজার মেয়ের ভালোবাসার গল্প। এত সুন্দর রোমান্টিক উপন্যাস আগে কখনো পড়েনি বিজয়। তিন ঘণ্টা একটানা মজে থাকলো বইটার পাতায়। তারপর জয়িতা এসে যখন রুমের লাইট বন্ধ করে দিতে বললো, তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত দুটা বাজে।
লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো বিজয়।

৬। গণজাগরণ
‘ সাহিত্য মতবাদের ইতিহাসে এক অতি পুরনো কথা - art for art’s sake তথা শিল্পের জন্য শিল্প। এর আধুনিক বাংলা প্রতিশব্দ কলাকৈবল্যবাদ। কলাকৈবল্যবাদের মূলকথা- শিল্প সাহিত্য থাকবে এর সৌন্দর্য মাধুর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ । অর্থাৎ শিল্প সাহিত্যে কোনো আদর্শ উদ্দেশ্য প্রতিফলিত না হয়ে তা সুষমামণ্ডিত উচ্চমার্গের বিষয় হয়ে উঠবে’। একটু থামলো শাহেদ। ছাত্র-ছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওর কথা কেউ বুঝতে পারছে না।সহজ করে বলতে হবে।
‘নির্মাতা আপন মনে আপনার জন্য নির্মাণ করবেন শিল্পসাহিত্য’ , আবার বলা শুরু করলো শাহেদ।
‘যে সাহিত্যে বাইরের কোনো উদ্দেশ্য থাকবে তা সাহিত্য না হয়ে হবে প্রচারপত্র বা বিজ্ঞাপন। এই ধরণের সৃষ্টি শিল্প-সুষমামণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে না। স্রষ্টা সব সময় খেয়াল রাখবেন, তার সৃষ্টি যেন কোণোভাবেই সৌন্দর্য মাধুর্যের বাইরে না যায়। সার্থক রসনিষ্পত্তিই হবে শিল্প সৃষ্টির একমাত্র কারণ। অর্থাৎ শিল্পের সার্থকতা শিল্পকর্মে। তাতে কারোর কোনো কল্যাণ কি অকল্যাণ হলো তা দেখার দায় শিল্পের নয়। একেই কলাকৈবল্যবাদী শিল্প-সাহিত্য বলা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই ধারণার যাত্রা শুরু। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্প-সাহিত্যের প্রধান নিয়ন্ত্রণ নীতিই ছিলো কলাকৈবল্যবাদ। তোমরা নিশ্চয়ই অস্কার ওয়াইল্ডের নাম শুনেছ।তিনি এ ধারার প্রধানতম অধিবক্তা। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকে কলাকৈবল্যবাদী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মনে করলেও সামগ্রিক রবীন্দ্র কাব্য তথা সাহিত্য বিচারে এর সত্যতা প্রমাণিত হয় না’।
একটা মেয়ে উঠে দাঁড়ালো । ‘স্যার, যে শিল্প-সাহিত্যে কোনো উদ্দেশ্য সাধিত হয় না , তা কার জন্য ? মানুষ তো সংবেদনশীল প্রাণী ।তার যদি কোনো উদ্দেশ্য না থাকে সে কার জন্য গান করবে?’
‘যৌক্তিক প্রশ্ন’, শাহেদ খুশি হয় । ‘এই কারণেই বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই কলাকৈবল্যবাদের ধারণায় ভাটা পড়ে। ক্রমে সাহিত্যে আসে সামাজিক বাস্তবতার নীতি’।
ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে এগুলো শাহেদ। পেছন থেকে কেউ ‘স্যার’ বলে ডাকলো তাকে। ঘুরে তাকিয়ে রাজিব হোসেনকে দেখতে পেলো শাহেদ। শাহেদের প্রিয় ছাত্র রাজিব এ বছর বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিশেবে জয়েন করেছে। কাছে এসে সে বললো, ‘ শাহবাগে আন্দোলন হচ্ছে, যাবেন ?’
-‘হুম যাব, তুমি গিয়েছিলে?’
-‘জ্বি স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পাশাপাশি বিখ্যাত সব ব্যক্তিরা এসেছেন। একটু আগেই নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে দেখলাম’।
-আচ্ছা, আমিও যাই’।
কলাভবন থেকে বেরিয়ে রিক্সা নিয়ে শাহবাগের দিকে চললো শাহেদ। নজরুলের সমাধির সামনে এসে রিক্সা দাঁড়িয়ে গেলো। সামনে অসংখ্য মানুষের ভীড়। বেশিরভাগই ছাত্র-ছাত্রী। গোল হয়ে বসে কয়েকটা বৃত্ত তৈরি করেছে তারা। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দেশাত্মবোধক গান গাইছে, কেউবা কবিতা আবৃত্তি করছে। মাঝে মাঝেই শ্লোগান দিচ্ছে সবাই- ‘ক’ তে কাদের মোল্লা,তুই রাজাকার,তুই রাজাকার; ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই; রাজাকারের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও ।
প্রত্যেকটা টিভি চ্যানেল, সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকরা চলে এসেছে। তারা সমাবেশে আগত মুক্তিযোদ্ধা,শিক্ষক, শিল্পী-সাহিত্যিক, ছাত্রনেতাদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। একাত্তরে মামা গেরিল বাহিনীর প্রধান শহীদুল হক মামাকে চিনতে পারলো শাহেদ। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক বলছেন, ‘ কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দেওয়া মুক্তিযুদ্ধকে অপমানের সমতুল্য। আমরা এ রায় মানি না’।
জাদুঘরের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহ আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে বললেন, ‘কাদের মোল্লা এতো খুন করার পরেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় নি,তাহলে আর কতো খুন করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে ?’এবার শাহেদকে অনুরোধ করা হলো কিছু বলার জন্য। সে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বললো, তোমরা প্রমাণ করেছ , তোমরা সত্যিই তোমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ কর’। শাহেদের বক্তব্যের পরেই শিল্পী ফকির আলমগীর গান গেয়ে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করলেন।

স্নান করে টেবিলে খাবার নিয়ে বসেছে ভাস্বতী। প্রজ্ঞাকে খাওয়াচ্ছে। শাহেদ এখনো খেতে আসেনি। ঘণ্টাখানেক আগে ওকে টিভিতে কথা বলতে দেখেছে ভাস্বতী। ভাস্বতী এসব পছন্দ করে না। সে জানে, আজকে যাদের বিরুদ্ধে শাহেদ কথা বছে, দুদিন পর তারাই ক্ষমতয় আসবে। বাঙালি এক জঘন্য জঘন্য জাত। একাত্তরে শত শত মানুষকে হত্যাকারী ও ধর্ষককেই স্বাধীন বাংলাদেশে মন্ত্রী হতে দেখা গিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীর গাড়িতে উড়তে থাকে লাল- সবুজের বৈজয়ন্তী। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ হারানো লাখো শহীদদের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে?
কলিংবেল বেজে উঠলো। ‘বাবা এসেছে’ বলে ছুটে গিয়ে দরজা খুললো প্রজ্ঞা। হাত-মুখ ধুয়ে খেতে বসলো শাহেদ।
‘আজকে বইমেলায় যাবে?’ শাহেদ বললো। ‘আমার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে’।
-‘তাই! হুম, যাব। এবার তো এখনো যাই নি বইমেলায়’। কে কে আসবেন?’
-‘আনিসুজ্জামান স্যার মোড়ক উন্মোচন করবেন, আমার কয়েকজন কলিগ থাকবেন সাথে’।
শাহেদের পাতে রুই মাছের মুড়ো তুলে দিয়ে ভাস্বতী বললো, ‘ তুমি কিন্তু বোরিং হয়ে যাচ্ছ। আগে কত রোমান্টিক কবিতা লিখতে, এখন শুধু হাবিজাবি লিখ। অথচ তোমার কবিতা পড়েই প্রেমে পড়েছিলাম আমি’।
শাহেদ হাসলো। মনে পড়লো অনেকদিন আগের একটা ঘটনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটা রেইনট্রি গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। ওর বুকে মাথা গুঁজে কাঁদছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেয়েটা।
বিকেলে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে শাহেদ খানের লেখা ‘ বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম চর্চা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হলো। কিছুক্ষণ পর শাহেদকে মুক্তচিন্তার স্টলে রেখে প্রজ্ঞাকে নিয়ে বইমেলা ঘুরতে লাগলো ভাস্বতী। (চলবে)
আগের পর্বের লিংক https://istishon.com/?q=node/28206

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

উলুল আমর অন্তর
উলুল আমর অন্তর এর ছবি
Offline
Last seen: 6 দিন 15 ঘন্টা ago
Joined: বুধবার, ফেব্রুয়ারী 15, 2017 - 1:09পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর