নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • লুসিফেরাস কাফের
  • সাইয়িদ রফিকুল হক

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

আড়াই হাজার বৃক্ষের কত হাজার কথা!



'যশোর রোড' আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কালোত্তীর্ণ সাক্ষী। যশোর রোডের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে কান পাতলে শুনা যায় দেড় কোটি স্বরণার্থীর ক্লান্ত পদ-ধ্বনী। ইতিহাস, সংগ্রাম আর ঐতিহ্যের নিরব সাক্ষী এই যশোর রোডের দু'পাশে সবুঝের নয়ানোভিরাম শতবর্ষী অসংখ্য বৃক্ষরাজী শুধু একটি শোষিত জাতির জন্মযুদ্ধেরই প্রত্যাক্ষদর্শীই নয়, বরং প্রাচীন বাংলার লোকজ ইতিহাসের একটি অংশও। অবিভক্ত ভারত-বর্ষের বহু সংগ্রাম-বিপ্লব আর বিপ্লবের পথে অজস্র সফল বিপ্লবীর পদ চারনায় মুখর হয়েছিলো এই যশোর রোড। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাস্তার দু'পাশের আড়াই হাজার শতবর্ষি বৃক্ষকে সংস্কারের নামে কেটে ফেলা একটি জাতির শেকড় উপড়ে ফেলার সমান। রাষ্ট্রের এই বিমাতাসুলভ আচরণ কোনভাবেই মেনে নেয়ার নয়।

শুধু একটি জাতির জন্মযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হিসেবেই যশোর রোড বিখ্যাত নয়, এই রাস্তাটির সম্পর্ক রয়েছে বাঙালির গোড়াপত্তনের সাথেও। যশোর রোড নির্মাণের পেছনে আজ থেকে দেড়'শ বৎসর আগেকার এক জমিদারের মাতৃ ভক্তির একটি সত্য ইতিহাস আছে।

প্রাচীন যশোর থেকে শুরু করে কালীঘাট পর্যন্ত এই গোটা সড়কটি আজ আর যশোর রোড বলে পরিচিত নয়। বর্তমানে শুধু এপাড়ের কালীগঞ্জ থেকে বেনাপোল আর ওপার বাংলার পেট্রাপোল থেকে কালীঘাট পর্যন্ত সড়কটিকেই যশোর রোড বলা হয়।

আজ যে যশোর রোড দেখি সেটা জমিদার কালীপোদ্দারের যশোর রোড। কালীগঞ্জের জমিদার ছিলেন তিনি। তার মা যশোদাদেবীর ইচ্ছা গঙ্গাস্নানে যাবেন। কিন্তু কীভাবে? পথ নেই, নেই যোগাযোগের  ব্যবস্থা। জলপথে গেলে বহুদিন লেগে যায়, তার উপর আছে জলদস্যুর ভয়। মায়ের ইচ্ছা জলপথ নয়, সড়ক পথেই যাবেন গঙ্গাস্নানে। রাজমাতার ইচ্ছাই তার জন্য আদেশ। মায়ের ইচ্ছাপূরণে মাত্র দু’বছরের মধ্যে কালীগঞ্জ থেকে কলকাতার গঙ্গাতীরের কালীঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করে দিলেন।

কিন্তু রাজমাতা আবারও বিগড়ে বসলেন। বললেন, "রাস্তাতো হলো, কিন্তু প্রখর রোদ্রে যায় কিভাবে? জমিদার তাই শাহী লস্কর, পাইক-পেয়াদাকে মায়ের সঙ্গে পাঠাবেন বলে হুকুম দিলেন। কিন্তু মা তাতে রাজী নন। গো ধরলেন, "আমি না হয় শাহী লস্কর নিয়ে গঙ্গাস্নানে যাবো, কিন্তু প্রজাদের কী হবে?
মায়ের ইচ্ছার কথা রাজা বুঝলেন। তাই তিনি রাস্তার দু’ধারে গাছ লাগিয়ে দিলেন। এতে প্রজাদেরও উপকার হবে আর রাস্তার সৌন্দর্য-শোভা বাড়বে। হাজার-হাজার রেইন ট্রি-কড়ই গাছ লাগিয়ে দিলেন রাজা। জনশ্রুতি রয়েছে, এই রেইন ট্রি-কড়ইর শীতল ছায়া ধরেই জীবন সায়াহ্নে রাজমাতা যশোদাদেবী গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। ধন্য রাজমাতা, সাধু রাজা প্রতাপাদিত্য! দেড়'শত বৎসর ধরে এপার বাংলা-ওপার বাংলার অসংখ্য মানুষ সেই শীতল ছায়ায় আজো শরীর জুড়ায়। আজো পথ শ্রমে ক্লান্ত কত পথিক সেই সব শতবর্ষি বৃক্ষ শাখার অবিরাম প্রবাহিত বায়ু বেগে দেহ-মন সতেজ করে।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যশোর রোডের প্রাচীন এই বৃক্ষরাজি। তারা দেখেছে অনেক কিছুই। দেখেছ জমিদার কালীপোদ্দার, রাজমাতা যশোদাদেবী, রাজা প্রতাপাদিত্য, শেরশাহ সূরীকে। এই সড়ক ও বৃক্ষগুলো দেখেছে মুঘল, দেখেছে বারো-ভূইয়াদের আমল। এরা দেখেছে, বৃটিশ শাসন ও তাদের প্রস্থান। দেখেছে দাঙ্গা ও ভারত-বিভক্তির ফলে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম। প্রত্যক্ষ করেছে, দাঙ্গার ফলে কোটি মানুষের মানচিত্র পরিবর্তন ও রক্তপাত। এই অবারিত বৃক্ষরাজি কেবল পথশ্রমে ক্লান্ত দেড় কোটি বাঙালি শরাণার্থীর অনিশ্চিত গন্তব্যপানে ছুটে যাওয়া দেখেনি, এরা দেখেছে ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালির মহান বিজয়, দেখেছে সেই বিজয়ে উচ্ছাসিত দেড় কোটি মানুষের আপনালয়ে ফেরার আনদ! সবকিছুরই নীরব সাক্ষী এই যশোর রোড ও তার শরীরে শোভাবর্ধক গহনার মতো এই প্রাচীন গাছগুলো।

শুধু উপরোক্ত কারণেই বিখ্যাত নয় যশোর রোড।
এই রাস্তা নিয়ে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দেড় কোটি শরণার্থী নিয়ে আমেরিকার বিখ্যাত কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিল- ‘সেপ্টেম্বর ইন যশোর রোড’ নামের বিশ্ব বিবেক নাড়িয়ে দেয়া একটা কবিতা। সেই কবিতায় সুর দিয়ে গান গেয়েছিলো নোবেল বিজয়ী কবি ও গীতিকার বব ডিলান, বিটলস ব্যান্ডের তরুণ শিল্পিরা। সেই সব কবিতা-গান বাঙালির পক্ষে বিশ্ব বিবেক কে জাগিয়ে তুলতে বিরাট ভুমিকা রেখেছিলো।

স্প্যানিশ বাহিনীর সেনাপতি হার্নান কার্টেজ যে গাছের নীচে বসে প্রাচীন মেক্সিকান সম্রাট মন্টেজুমার সাথে যুদ্ধের সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন সেই গাছটি আজো সংরক্ষন করে রেখেছে মেক্সিকানরা। ইউনেস্কো সেই গাছটিকে বিশ্বসভ্যতার অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনী ফ্রান্সের প্যারিস শহরের ওপর কোনো বোমা হামলা করেনি শুধু ল্যুভর মিউজিয়াম রক্ষার্তে। যে হিটলার হাসতে হাসতে অসংখ্য মানুষ খুন করতে পারতো, সেই ভয়ংকর খুনি হিটলারের ভালোবাসা ছিলো বিশ্বসভ্যতার অদি নিদর্শনের প্রতি। কিন্তু সামান্য একটা রাস্তা সংস্কার করতে গিয়ে আমরা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের মহামুল্যবান নিদর্শন ধ্বংস করতে বসেছি স্বয়ং রাষ্ট্রিয় তত্বাবধায়নে।

সরকার তার রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় রাস্তা-ঘাট সংস্কার করবে। সরকার বাহাদুর সেটা করুক, আমরা তার বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু সংস্কারের নামে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই মহামুল্যবান নিদর্শন ধ্বংস করার বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানাই। আমরা চাই বাঙালি জন্মযুদ্ধের সাক্ষী হয়ে থাকা এই বৃক্ষ সমুহ অক্ষত রেখেই সেটা হোক। রক্ষা পাক অ্যালেন গিন্সবার্গের 'সেপ্টেম্বর ইন যশোর রোড' কবিতার পটভুমি, বেঁচে থাকুক জমিদার কালিপোদ্দারের মাতৃভক্তি নিদর্শন, অক্ষত থাকুক দেড় কোটি শরণার্থীকে পরম মমতায় আশ্রয় দেয়া আড়াই হাজার শতবর্ষী বৃক্ষরাজি।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

রহমান বর্ণিল
রহমান বর্ণিল এর ছবি
Offline
Last seen: 1 month 1 দিন ago
Joined: রবিবার, অক্টোবর 22, 2017 - 9:43অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর