নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • দ্বিতীয়নাম
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • সুশান্ত কুমার
  • আলমামুন শাওন
  • সমুদ্র শাঁচি
  • অরুপ কুমার দেবনাথ
  • তাপস ভৌমিক
  • ইউসুফ শেখ
  • আনোয়ার আলী
  • সৌগত চর্বাক
  • সৌগত চার্বাক
  • মোঃ আব্দুল বারিক

আপনি এখানে

জুয়াড়ি


অশ্বত্থ গাছের গোড়ার একটা শিকড়ের গঠন এমন ছিল যে, বসলে প্রায় পিঁড়ির আরাম পাওয়া যেতো। গাছটা বেশ বর্ষীয়ান আর দীর্ঘ। স্থুল, তবে ততোটা নয়, যতোটা তার পত্নী বটবৃক্ষ। পতি-পত্নী মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব থাকায় বুঝিবা তাদের সকল গোপন কথা আদান-প্রদান করতো পাখিরা! স্পর্শের সুযোগ ছিল না ঠিকই, তবে দক্ষিণ কিংবা উত্তরের জোর বাতাসে একে অন্যের দিকে পত্র উড়িয়ে দিতো। হোক হলদেটে ছিন্নপত্র, তবু তাতে প্রিয়-প্রিয়ার শরীরের গন্ধ তো ছিল!

ছেলেবেলায় রাতুল বড়দের মুখে শুনেছিল, ঐ গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রী! বহু বছর আগে নাকি ওদের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার ঠাকুরদার বাবা অথবা ঠাকুরদার বাবার ঠাকুরদার কালেও হতে পারে! বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে টিকে আছে সেইসব কালের কথা। তখন নাকি গাছদুটো ছোট ছিল, বিয়েতে তিন গ্রামের মানুষকে নেমন্তন্ন করে খাইয়েছিল বাবুরা। তখন পুরো তল্লাটের অর্ধেক সম্পত্তি-ই ছিল বাবুদের। পাকিস্থান হওয়ার পরও সেই খানদানি বাবুদের বংশধররা কিছুটা ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার মধ্যেও টিকে ছিল এদশে। পঁয়ষট্টিতে বাবুদের গায়ে ভারতীয় চর তকমা লাগিয়ে, তাদের জায়গা-জমি যা ছিল সব শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করে পাকিস্থান সরকার। তখন সব ফেলে বাবুরা কেবল জীবনটা নিয়ে পালিয়ে চলে যায় ভারতে। রাতুলের তখনও জন্মই হয়নি, সব বড়দের মুখে শোনা কথা।

বাবুদের কিছু জমি মুসলিম লীগের চ্যালা-চামুণ্ডারা দখল করেছিল, আর কিছু জমি খাস পড়ে ছিল। বট-অশ্বত্থ সমেত মাঠটি ছিল খাস। রাতুলরা ঐ মাঠটিতে খেলাধুলা করতো। ততোদিনে অবশ্য পাকিস্থানের কবর ফুঁড়ে বাংলাদেশ নামক বৃক্ষটির জন্ম হয়ে গেছে। চৈত্র সংক্রান্তি, রথযাত্রা আর দূর্গাপূজার মেলা বসতো ওখানে বহুকাল আগে থেকেই। মেলা এখনও বসে।

বটবৃক্ষের গোড়ায় হতো নানান রকম পূজাপার্বণ। অশ্বত্থের ভাগ্য তার পত্নীর মতো অতোটা সুপ্রসন্ন ছিল না। বটগাছ বারো মাস পূজা পেতো, রঙীন সুতো-ফুলমালায় ঘেরা, তেল-সিঁদুরমাখা বউকে দূর থেকে হ্যাংলার মতো চেয়ে দেখতো অশ্বত্থ! শিকড় নামিয়ে বউ তার দিনে দিনে এমন স্থুল হয়েছিল যে আসল শরীরটা আর দেখাই যেতো না! বাবুদের ফেলে যাওয়া পোড়ো মন্দিরের দেয়ালের গায়ে যে বট-অশ্বত্থের চারা গজিয়েছিল, সেগুলো ছিল বড় দুটোর ছেলে-মেয়ে; বন্ধুদের সাথে গল্পের বুননে এমন ভাবনার ফুলই আঁকতো রাতুল।

মেলার সময় পুজো-আর্চা, ভক্তিশ্রদ্ধার কারণে বড়দের আকর্ষণ যতোই বটবৃক্ষ হোক না কেন, বালক-কিশোর-যুবাদের আকর্ষণ ছিল অশ্বত্থ গাছ। কারণ অশ্বত্থের তলায় ঐ পিঁড়ির মতো শিকড়টার ওপর পাছা ঠেকিয়ে ঘূর্ণায়মান জুয়ার বোর্ড নিয়ে বসতো তালেব আলী।

মেলার দিনগুলোতে দুপুরের আগেই অশ্বত্থ তলার পিঁড়ির মতো শিকড়ের ঐ জায়গাটির দখল নিতো তালেব আলী। ডুগডুগি বাজিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। তালেব আলী গায়ে পরতো একটা সাদা ফতুয়া, পরনে সাদা লুঙ্গি। লুঙ্গির একটা দুটো জায়গায় থাকতো পানের পিকের দাগ এবং রতিরঙ্গের ম্রিয়মান ছাপ। ডান হাতের কব্জিতে তামার তাগা আর আঙুলে বাহারি রঙিন পাথরের কয়েকটি আংটি। দীর্ঘ চুলে চপচপে করে নারকেল তেল দিয়ে পরিপাটি করে আঁচড়ে মাঝখানে সিঁথি কেটে পিছনে খোঁপা বেঁধে রাখতো। নারকেল তেলের তীব্র গন্ধ বাতাসে ছড়াতো। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঝোলা থেকে একটা পান বের করে মুখে পুড়তো। ঠোঁট বন্ধ করে পান চিবোতো বলে জর্দার ভারী গন্ধ মুখের বদলে ছড়াতো নাকের চর্মচিমনির গরম বাতাসের সৌজন্যে। মুখের পানটা শেষ হয়ে এলে মুখ বিকৃত করে মাড়ির ফাঁকফোকরে ঘাপটি মেরে থাকা দন্তপেষিত পান জিভের ডগা দিয়ে টেনে এনে গিলে ফেলতো। তখন অবশ্য ভুরভুর করে গন্ধ বের হতো মুখ থেকে। তেল চকচকে মাথার চুলের মধ্যে গোঁজা থাকতো দাঁত খোঁচানো কাঠি। একটা-দুটো নয়, অসংখ্য। মাঝে মাঝে চুলের ভেতর থেকে তৈলাক্ত কাঠি বের করে দাঁত খোঁচাতো। বাম কাঁধে জুয়ার বোর্ড রেখে সে বিভিন্ন গ্রামের মেলায় হেঁটে যেতো, এখনকার মতো তখন গ্রাম-গঞ্জে এতো পাকা রাস্তা ছিল না আর এতো ভ্যান বা ইজিবাইকও চলতো না; ধুলো বা কাদার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হতো। তালেব আলীর টাকার থলেটা গোঁজা থাকতো কোমরে। হাঁটার সময় তার কোমরের দুলুনিটা ছিল মাঝ বয়সী মাসি-পিসিদের মতো!

তার শ্মশ্রুমুণ্ডিত উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ চেহারায়ও একটা মেয়েলি আদল ছিল। দূর থেকে বসা অবস্থায় দেখলে অচেনা লোকের পক্ষে তাকে প্রৌঢ়া বলে ভুল করাই ছিল স্বাভাবিক।

তালেব আলীর চোখটা ছিল রক্তাভ। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, গাছপালা-পশুপাখি, সবার দিকেই এমন গভীর দৃষ্টিতে তাকাতো যেন মানুষের মনের অতলে থাকা কথাও সে দৃষ্টি দিয়ে পড়ে ফেলছে! জুয়াখেলার বাইরে সে কোনোদিন কারো ক্ষতি করেছে বলে শোনা যায় নি। কেবল বউ টিকতো না তার। চৌদ্দ থেকে চুয়াল্লিশ-নানান বয়সের নারীকেই সে পত্নীরূপে পেয়েছিল। কিন্তু ছ’মাস, এক বছর, এমনকি এক-দু’দিনের মাথায়ই স্ত্রীরা তাকে ত্যাগ করতো! তার এই বউ না থাকার রহস্য কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি। আবার সে খোঁজাও নয়, কেননা তার একজন বউয়ের একটা মরা বাচ্চা হয়েছিল। তাই তার এই বউ না থাকার ব্যাপারটি এলাকার মানুষের কাছে ছিল এক গভীর রহস্য। দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত মানুষের কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তরও সে দিতো না কখনো। স্ত্রী বিষয়ে তার মুখ থেকে কোনো আফসোসও শোনা যায়নি কোনোদিন অথবা তালেব আলী নিজেই ছিল তার আফসোসের শ্রোতা।

কৈশোরে জুয়া খেলতো রাতুল। মেলার দিন খুঁটিয়ে-কুড়িয়ে আট-দশটি টাকা হতো তার। কিন্তু এই আট-দশটি টাকাই জুয়ার চক্রে ঘুরিয়ে একশো টাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে মেলাখোলায় পা রাখতো সে। মেলাখোলায় গিয়ে পূজিত বটবৃক্ষের শরণাপন্ন হতো আগে। হাতজোড় করে বটবৃক্ষের উদ্দেশে বলতো, ‘ঠাকুর, আমার দশ টাকাকে খেলিয়ে তুমি একশো টাকা করে দিও। আমি আজই সন্ধ্যেবেলা দশটাকার হরিলুট কিনে দেব তোমাকে। তুমি পেট ভরে খেয়ো।’

প্রথমদিকে কোর্টে আট আনা ফেলে ধ্যানস্থ চোখে ঘূর্ণায়মান বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতো রাতুল। এক-দু’বার তার কাঙ্ক্ষিত হাতি-ঘোড়া কিংবা বাঘের ওপর কাঁটা থামলেই উৎফুল্ল হয়ে উঠতো। এরপর বিপুল উৎসাহে আধুলির বদলে ফেলতো তিনটে মায়া হরিণ অর্থাৎ এক টাকার নোট। দারুণ উত্তেজনায় খেলার চড়াই-উৎড়াই পার হতো সে। এই একটা দোয়েল হারে তো তিনটে মায়া হরিণ জেতে, আবার একটা শাপলা হাতছাড়া হয় তো, সুরুৎ করে হাতে চলে আসে দোয়েল!

শেষ পর্যন্ত বেলা আরও গড়ালে সে জুয়ার আসর থেকে বের হয়ে জগাই ময়রার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমৃতি কিংবা গরম জিলিপির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। আমৃতি-জিলিপি দূরে থাক, পকেটে তখন খোড়মা খাবার জন্য একটা আধুলিও অবশিষ্ট থাকতো না। জুয়ার চাকা সোজা ঘুরলেও তার ভাগ্যের চাকা উল্টোদিকে ঘুরে তাকে ফতুর করে ছাড়তো। তখন আফসোস করতো, ‘ইস! নয় টাকা যখন তেইশ টাকা হয়েছিল, তখন যদি খেলাটা বন্ধ করে দিতো!’
প্রায় প্রতিবারই একই আফসোস নিয়ে তেল-সিঁদূর মাখা বটবৃক্ষের দিকে আড়চোখে তাকাতে তাকাতে বাড়ি ফিরতো সে। হতচ্ছাড়া ঠাকুর তার ভক্তির মূল্য কোনোদিন বোঝেনি!

আজ এতো বছর বাদে এই রাতের বেলা ঘুমন্ত ছেলের পাশে বালিশে ঠেস দিয়ে রাতুলের মনে পড়ছে ছেলেবেলার সেই মেলাখোলা আর তালেব আলীর কথা। তখন সে ছিল অবুঝ বালক, দুষ্টু কিশোর; এখন সে নিজেই পিতা। দুই পুত্র তার দুই নয়নের মণি, শুভ্র আর অভ্র। শুভ্র’র এবার সতেরো বছর। কলেজে ভর্তি হয়েছে। আর অভ্র’র দশ চলছে, কাস ফাইভ।

আজ ছিল ছুটির দিন। ছুটির দিনে এমনিতেই একটু বেলায় সকাল হয়, তার ওপর গতরাতে একটু দেরিতে ঘুমানোয় ঘুমটা ভাঙতে চাইছিল না। কোলবালিশ আঁকড়ে পড়ে ছিল। সকালে বাজারে যাবার কথা ছিল। সুলেখা বারবার তাড়া দিয়েছে, আর সে বলেছে, ‘আর দশ মিনিট!’

শেষে সুলেখা চুপচাপ একাই বাজারে চলে গেছে। চোখ মেলে রাতুল যখন দেখেছে সুলেখা বাজারে যাবার জন্য তৈরি তখন কোলবালিশ ঠেলে রেখে লুঙ্গির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে তড়িঘড়ি করে উঠেও আর কোনো লাভ হয়নি। সে সঙ্গে যাবার জন্য পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে বলেছিল সুলেখাকে, সুলেখা পাঁচ সেকেন্ডও ব্যয় করেনি আলস অর্ধাঙ্গের জন্য। সুলেখা সময়ের কাজ সময়ে করে, আর সে সময়ের কাজ সময় গত হবার এক সপ্তাহ পরেও করে।

সুলেখা যাবার পর সে দরজা লাগিয়ে আবার বিছানায় ফিরে কাছে টেনে নিয়েছিল কোলবালিশটাকে। ঘুম আর আসছিল না চোখে, রেশ কেটে গিয়েছিল। কিন্তু চোখ বুজে থাকায় আরাম বোধ হচ্ছিল, আর এই আরামের জন্য মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিল সুলেখাকে। সুলেখাকে পেয়ে তার জীবন ধন্য, এমনটাই মনে করে রাতুল। সুলেখা মুখরা নয়, শান্ত এবং কর্তব্যপরায়ণ। ততোটা রাগী নয়, যতোটা অভিমানী। সে যেমন অলস, ঘুমকাতুরে আর পারিবারিক এবং সামাজিক দায়িত্বের প্রতি উদাসীন, সুলেখা না হয়ে অন্য কোনো মেয়ে হরে কী হতো কে জানে!

রাতুলের ধারণা সুলেখার যোগ্য সে নয়। আরও চৌকস কোনো পুরুষের স্ত্রী হলেই সুলেখাকে বেশি মানাতো। বিশেষত একটু বুদ্ধিজীবি ধরনের পুরুষের। সুলেখার লেখাপড়া, জ্ঞানের গভীরতার তল খুঁজে পায় না সে, পড়ার অভ্যাস তার একদম নেই। কিন্তু সুলেখা গভীর মনোযোগী পাঠক। একটু-আধটু লেখেও। ব্লগিং করে।

শান্তিতে কোলবালিশ আঁকড়ে ধরতে না ধরতেই বসের ফোন। ছুটির দিনেও শান্তিতে থাকতে দেয় না লোকটা। ইদানিং বসের সাথে সম্পর্কটা তলানিতে ঠেকে গেছে। ভেতরে ভেতরে সে চাকরি খুঁজছে। দু’জায়গায় আলাপ-আলোচনা চলছে। যেকোনো এক জায়গায় পাকা কথা হলেই রিজাইন লেটার ছুঁড়ে দেবে বসের মুখের ওপর।

সাতসকালে ফোনেই বসের সাথে একচোট হয়ে গিয়েছিল। কতো আর সহ্য করা যায়! শেষে মেজাজ বিগড়ে খানিকটা ঝাল উগড়ে দিয়েছিল। তাতে অবশ্য বেশ কাজ হয়েছে বলেই মনে হলো। বস কেমন যেন চুপসে গেছেন। রাতুল কোনোদিন বসের সাথে এই ভাষায় কথা বলেনি। বসও বোধ হয় এমন প্রতিরোধ আশা করেনি। তাই বস যেমনি বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি হয়তো খানিকটা ঘাবড়েও গেছেন। কারণ বসের কাজকর্মের ফাঁক-ফোকড় সব রাতুলের নখদর্পণে!

দুপুরের পর বন্ধু ইকবালের আসার কথা ছিল। ঠিক ছিল ইকবাল তাকে তুলে নিয়ে যাবে মিজানের ওখানে। সেখান থেকে মিজান আর আলবার্টকে নিয়ে সোজা পদ্মার চরে। রাত অব্দি আড্ডা আর সূরায় সংসারের একঘেয়েমি আর কান্তি ভুলে চার বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্বাদে ডুব দেবে। কিন্তু বস ফোন করে মেজাজটা বিগড়ে দিলো। এমনিতেই কদিন হলো সুলেখা তার ওপর বিরক্ত। বিরক্ত হবার কারণ রাতুলের একটা আবদার। রাতুল আরেকটা সন্তান চায়, একটা মেয়ের খুব ইচ্ছে তার। কিন্তু সুলেখা রাজি নয়, সোজা বলে দিয়েছে, ‘দুটোতেই ঝামেলার শেষ নেই, আমি আর পারবো না।’

সুলেখাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছে না রাতুল। কালরাতে তো রতিকালের পর কিছুক্ষণ চাপা ঝগড়াও হয়েছে দুজনের। এমনিতেই কালরাতে ঝগড়া হয়েছে, আলসেমি করে বাজারেও গেল না, এরপর ঘুরতে বেরিয়ে নাক ডুবিয়ে মদ পান করে রাতে বাসায় ফিরলে হবে আরেক অশান্তি। মুডটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই সে যেতে পারবে না জানিয়ে ইকবালকে মেসেজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওকে মেসেজ পাঠানোই উত্তম। ফোন করলে জোরাজুরি করে বড্ড। বাসায়ও চলে আসে। তার চেয়ে মেসেজ পাঠিয়ে ফোনটা বন্ধ করে রাখাটাই শ্রেয়। মেসেজ সেন্ড করতে গিয়ে দেখলো, মেসেজ ফেইলড হচ্ছে। নেটওয়ার্ক আছে, কাল সন্ধ্যায় দু’শো টাকা লোড করেছে। মেসেজ যাবে না কেন! কিন্তু দ্বিতীয়বারও মেসেজ ফেইলড। তখনই তার নজরে পড়লো সেইন্ট ফোল্ডারে চারটে সংখ্যার একটা নাম্বারে অনেকবার মেসেজ পাটানো হয়েছে। ফাইলটি ওপেন করে দেখলো বড় হাতের ইংরেজি বর্ণে লেখা-শচীন টেন্ডুলকার। ফোল্ডার ঘেটে দেখলো একই নাম্বারে অসংখ্য মেসেজ পাঠানো হয়েছে। এটা করলো কে!

শুভ্র কোচিংয়ে। তাছাড়া শুভ্র’র এমন কাজ করার কথা না। অভ্রকে ডাকলো রাতুল, ‘অভ্র...।
ঘরে ঢুকেই বাবার হাতে মোবাইল দেখে শরতের অভ্রতে যেন বর্ষার কালচে ছোঁয়া লাগলো!
‘মোবাইল থেকে মেসেজ পাঠিয়েছে কে?’
ধরা পড়ে মাথা নিচু করে সাদা মেঝেতে দৃষ্টি ফেলে চিৎ হয়ে মরে পড়ে থাকা একটা মশার হাত-পা গুনতে লাগলো অভ্র। তখনই সুলেখার ফোন। কান্না জড়ানো কণ্ঠ সুলেখার-‘শুভ্র অ্যাক্সিডেন্ট.....।’
এরপরই কেটে গেল ফোনটা। নিশ্চয় ওর ফোনে টাকা নেই। কী বলতে চেয়েছিল সুলেখা! শুভ্র অ্যাকসিডেন্ট করেছে! শুভ্র’র চিন্তায় তালগোল পাকিয়ে গেল রাতুলের, আর তখনই রেগে গিয়ে অভ্র’র গালে ঠাস করে একটা চড় কষে দিলো।

পিছন থেকে একটা সি এন জি শুভ্র’র রিক্সাকে ধাক্কা দিলে ও চিটকে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। পায়ের হাড়ে চিড় ধরেছে। প্ল্যাস্টার করতে হয়েছে। ছেলেটা মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে। ক’দিন ঘরে বসে থাকতে হবে কে জানে!
শুভ্রটা খুব শান্ত আর ভীতু। অভ্র’র উল্টো। ভয়ে খুব কেঁদেছে। অভ্র’র এমন হলে কান্না দূরে থাক, স্কুল বাদ দিয়ে বাসায় থাকতে হবে এই আনন্দে এক পায়েই নাচতে শুরু করতো। ছেলের ভয় করছে বলে সুলেখা ওর কাছেই শুয়েছে আজ। তাছাড়া বাথরুমেও ধরে নিতে হবে। ক্র্যাচে অভ্যস্ত তো নয়।

দু’ভাই এক ঘরেই ঘুমায়। কিন্তু আজকে বাবার কাছে ঘুমিয়েছে অভ্র। যতো দূরন্তপনাই করুক এতোদিন অব্দি রাতুল অভ্র’র গায়ে হাত তোলেনি। বড়জোর ধমক দিয়েছে। আজই প্রথম সে অভ্র’র গায়ে হাত তুলেছে। এখন এই মাঝরাতে তার পিতৃহৃদয় সেই যাতনায় হাহাকার করছে। ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কী শান্তু আর মায়াবী দেখাচ্ছে! কে বলবে এই ছেলে সারাদিন দূরন্তপনায় হাড় জ্বালায়! দূরন্ত হলেও মাথাটা পরিস্কার। উদ্ভট সব ভাবনা ঘুরপাক খায় মাথায়। অভ্র’র মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলো রাতুল। কপালে চুমুও খেলো। তারপর লাইটের সুইচটা অফ করে মাথা রাখলো বালিশে। মনের গাঙে হাবুডুবু খেতে লাগলো মেলাখোলা, তালেব আলী আর তার জুয়ার বোর্ড!

তালেব আলী জুয়া খেলতো পেটের জন্য। তার জীবনে কোনো বিলাসিতা ছিল না, জৌলুসের চাকচিক্য স্বপ্নও হয়তো ছিল না দু’চোখে। মোটা ভাত-মোটা কাপড়ে আটপৌরে জীবনটাকে টেনে নেবার জন্য জুয়ার বোর্ড কাঁধে নিয়ে সে মেলায় মেলায় ঘুরতো, মেলার জন্য অপেক্ষা করতো। কখনও কখনও হাঁটে-বাজারেও বসতো।

আর এই বসার জন্য নিজাম চৌকিদারকে তোলা দিতে হতো। তোলা না দিলে নিজাম চৌকিদার তাকে থানায় ধরে নেবার হুমকি দিতো। তাই বাধ্য হয়েই নিজাম চৌকিদারকে সে খুশি রাখতো। হয়তো অন্যান্য এলাকার চৌকিদার আর কোনো কোনো পাতি নেতাকেও চাঁদা দিতো সে, যাতে নির্বিঘ্নে জুয়ার আসর চালাতে পারে।

তালেব আলী কি এখনও বেঁচে আছে? জানে না রাতুল। তালেব আলীর কোনো বংশধর কি এখন তার সেই জুয়ার বোর্ডখানা নিয়ে মেলায় মেলায় ঘুরছে? তাও জানে না রাতুল। তবে ঘুরলেও তালেব আলীর মতো সুবিধা করতে পারবে না। তালেব আলীদের দিন শেষ! এখন জুয়া খেলতে মেলায় ছুটতে হয় না। নিজের ঘরে বসেই আয়েশ করে জুয়া খেলা যায়!
চতুর জুয়াড়ি তালেব আলীর কোর্টে রাতুল ছিল এক নাবালক আনাড়ি জুয়াড়ি। আর আজ না বুঝে তার ছেলেও জুয়া খেললো। এখন জুয়া খেলার মাধ্যম বদলেছে। ডিজিটাল জুয়াখেলা চলছে এখন। সন্ধ্যায় অভ্র ওর মাকে সব বলেছে। টিভিতে কুইজের প্রশ্ন ছিল, ‘ওয়ানডে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সর্বচ্চ রান সংগ্রাহক কে?’

সঠিক উত্তর দিয়ে সর্বচ্চ এস এম এস পাঠাতে পারলেই বিজয়ী হিসেবে পুরস্কার পাওয়া যাবে ক্রিকেটারদের অটোগ্রাফ সম্বলিত ব্যাট আর জার্সি। সেই লোভেই খুব সকালে অভ্র বাবার মোবাইল থেকে গোপনে এস, এম, এস পাঠিয়ে মোবাইলটা আবার বাবার বিছানার পাশেই রেখে দিয়েছিল। ডিজিটাল জুয়ার আসরে দু’শো টাকা শেষ! কুইজের আবরণে কী নিপুণ জুয়াখেলা চলছে!

তালেব আলী ছিল গ্রাম্য জনপদের একজন ক্ষুদ্র জুয়াড়ি। অশ্বত্থ তলায় ছোট্ট একটা জুয়ার বোর্ড নিয়ে অল্প কিছু মানুষের সাথে জুয়া খেলতো সে। কিন্তু এখন এই পুরো পৃথিবীটাই একটা জুয়ার বোর্ড। ঘুরছে বনবন করে। প্রতিনিয়ত বাসিন্দারা জুয়া খেলায় লিপ্ত। ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিছানো নানান রকম জুয়ার বিস্তীর্ণ জাল, জেনে বা না জেনে প্রত্যেকেই ঝানু জুয়াড়িদের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আর সেই নিজাম চৌকিদারের মতো তোলা নিয়ে এইসব ডিজিটাল জুয়াড়িদের মাথায় ছায়া দিয়ে রেখেছে রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, জনগণের ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব যার কাঁধে! পৃথিবীটা বদলাচ্ছে, বড় দ্রুত বদলাচ্ছে আমাদের দেশও। চারিদিকে ওত পেতে আছে জুয়াচক্র। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জুয়াখেলার ক্ষেত্র। জুয়াড়িদের লালসার ঘোড়ার লাগাম ধরার কেউ নেই, আছে পৃষ্ঠপোষক। শুভ্র-অভ্র কী পারবে এই জুয়ার বোর্ডে ভালভাবে টিকে থাকতে! টালমাটাল হয়ে যাবে না ওদের জীবন।

সন্তানদের অনাগত দিনের শঙ্কায় রাতুলের পিতৃহৃদয়ের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়লো রাত্রির গায়ে!

ঢাকা।
ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Online
Last seen: 1 ঘন্টা 20 min ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর