নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সরকার আশেক মাহমুদ
  • নুর নবী দুলাল
  • শাম্মী হক
  • মারুফুর রহমান খান
  • মিশু মিলন
  • মাহের ইসলাম

নতুন যাত্রী

  • চয়ন অর্কিড
  • ফজলে রাব্বী খান
  • হূমায়ুন কবির
  • রকিব খান
  • সজল আল সানভী
  • শহীদ আহমেদ
  • মো ইকরামুজ্জামান
  • মিজান
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী
  • ডাঃ নেইল আকাশ

আপনি এখানে

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ প্রথম পর্বের খসড়া


১। প্রারম্ভিকা। মাঘের শীতে বাঘও কাঁপে।আর উত্তরবঙ্গের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মাঝে মড়ক নামে।বগুড়া,রাজশাহী,রংপুর,পঞ্চগড়ের গ্রামগুলোতে সন্ধ্যার পর বাড়ির বাইরে বেরুনো কঠিন হয়ে পড়ে। ঘন কুয়াশায় কাছের জিনিসও দেখা দায়।সবুজ ঘাস,গাছপালা এমনভাবে শিশিরসিক্ত হয়ে থাকে যেন খানিক আগেই বৃষ্টি হয়েছে।এশার নামাযের পরপরই পুরো গ্রাম নীরব হয়ে যায়।
সুবহে সাদিকের সময় যখন মুয়জ্জিনের কণ্ঠ ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম’ বলে ডাক দেয় ,ঠিক তখনি কোনো না কোনো বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।বোঝা যায়, কেউ দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো।মড়াবাড়ির মহিলারা শোকের গীত গাইতে শুরু করে।প্রতিবেশী নারীরা এসে তাদের জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেয়।সদ্য ঘুম ভাঙা বাচ্চা ছেলেটা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক চোখে ক্রন্দনরতা মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধরা ওযু -তায়াম্মুম করে মসজিদে যায়।আজ হঠাৎ তরুণদের মনেও তাকওয়া জাগ্রত হয়।
মসজিদের ইমাম কাতার সোজা করতে বলে সামনে এগিয়ে যান।মুসল্লিরা তার পেছনে নামাযে দাঁড়ায় ।আল্লাহর হুকুম পালন শেষে ইমাম সাহেব কুরান-হাদিস থেকে তেলাওয়াত করে মুসল্লিদের কাছে আয়াতের মর্মার্থ ব্যাখ্যা করেন।বৃদ্ধরা ভক্তির সাথে শুনতে থাকে।মাঝে মাঝে বেশখ্‌ বেশখ্‌ বলে চিতকার করে ইমামের কথাকে সমর্থন জানায়।কাছেই কোথাও থেকে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ভেসে আসে।ইমাম সাহেব জোরে বলে উঠেন, ‘প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’।

বৃদ্ধরা কাঁপতে থাকে। কাঁপুনি টা কি ইমামের মুখে মৃত্যুর কথা শুনে নাকি শীতের প্রকোপে তা বোঝা যায় না।

২।প্রত্যাবর্তন

‘সম্মানিত যাত্রী,সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি বিশ মিনিট।জরুরি মালামাল নিজের কাছে রাখবেন।গাড়ির নম্বর মনে রাখবেন’।
বাসের সুপারভাইজারের কণ্ঠে ঘুম ভাংলো শাহেদ খানের।ঘড়ি দেখলো সে।বেলা তিনটা বাজে।পাশের সিটে শুয়ে থাকা চার বছর বয়সী কন্যা প্রজ্ঞার দিকে তাকালো ও।ঘুমন্ত শিশুকে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে।
প্রজ্ঞাকে কোলে তুলে নিয়ে বাস থেকে নামলো শাহেদ।বড় একটা রেস্টুরেন্টের সামনে সাড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে ওনেকগুলো বাস।রেস্টুরেন্টের নাম ফুড কর্নার।ঢাকা থেকে বগুড়াগামী বাসগুলো সাধারণত সিরাজঞ্জের এসব রেস্টুরেন্টে যাত্রাবিরতি দেয়।কয়েকটা বাস কর্তৃপক্ষের আবার নিজস্ব রেস্টুরেন্টও আছে।
রেস্টুরেন্টের ওয়াশরুমে গিয়ে প্রজ্ঞার ঘুম ভানালো শাহেদ।ফ্রেশ হয়ে একটা টেবিলে খেতে বসল ওরা।নিজের জন্য ভাত,ডাল , গরুর মাংস আর প্রজ্ঞার জন্য স্যান্ডুইচ অর্ডার করলো শাহেদ।বাসায় তো গরুর মাংস ওঠে না।অনেকদিন পর খাচ্ছে বলে মাংসটা খুব ভালো লাগলো ।প্রজ্ঞা স্যন্ডুইচটা অর্ধেক খেয়ে রেখ দিলো।
বেয়ারা একটা কাগজ নিয়ে এলো,ভ্যাটসহ দুশো আশি টাকা বিল হয়েছে। ওর হাতে একশো টাকার তিনটা নোট ধরে দিল শাহেদ।বললো ,বাকিটা রেখে দাও। রেস্টুরেন্টের বাইরে একটা দোকান থেকে প্রজ্ঞার জন্য চকোলেট আর এক বোতল পানি কিনলো সে।তারপর বাসে উঠে কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বুজলো শাহেদ। প্রিয় সঙ্গিতশিল্পী বব ডিলানের ‘গার্ল ফ্রম দ্য নর্থ কান্ট্রি’ গানটা শুনছে।আবার যাত্রা শুরু করলো বগুড়া ,নওগাঁগামী বাস।
কিছুক্ষণ পর ফোনের রিংটোন বেযে উঠলো।ভাস্বতী ফোন করেছে।শাহেদ কিছু বলার আগেই ভাস্বতী বলে,কই আছ এখন?
-সিরাজগঞ্জ , শাহেদ বললো।
- ওহ, প্রজ্ঞা কি করছে?
-ঘুমুচ্ছে।তুমি কি করছ?
-টিভি দেখি। লাঞ্চ করেছো?
- হুম ,করেছি।
-আর কতক্ষণ লাগবে পৌঁছুতে ?
- ঘণ্টা দুয়েক লাগতে পারে ।
-প্রজ্ঞার ঠাণ্ডা লাগছে না তো ?
- আরে না ।
স্ত্রীর সাথে আরো দু-চারটা কথা বলে ফোন রাখে শহেদ।জন্মের পরপরই ওদের প্রথম সন্তান মারা গিয়েছিলো।তাই প্রজ্ঞার ব্যাপারে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকে ভাস্বতী।শাহেদ জানে দিনে অন্তত দশবার ফোন করে প্রজ্ঞার খোঁজ নিবে ও।

বিকাল সাড়ে চারটার সময় বগুড়ার দুপচাচিয়া উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে নামলো শাহেদ।প্রায় দশবছর পর দুপচাচিয়া এলো সে। এর মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠান,সেমিনারে যোগ দিতে বগুড়া শহরে এলেও বাড়িতে আসে নি। আসলে আসতে পারে নি।দশ বছর আগের ক্ষতটা এখনো শুকায় নি।কিন্তু এবার আসতে বাধ্য হলো সে। তার বৃদ্ধা মা ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করলেন।মরার আগে নাতনীর মুখ দেখে যেতে চান।উনি নাতনীকে দেখতে চান কিন্তু ভাস্বতীর ব্যাপারে কিছু জানতে চান নি। অর্থাৎ এতদিন পরেও ভাস্বতীকে মেনে নিতে পারে নি খান পরিবার। অভিমানে আসতেই চায় নি শাহেদ।কিন্তু ভাস্বতী জোর করে ওকে পাঠিয়ে দিলো।অনেক উন্নতি হয়েছে দুপচাচিয়া উপজেলার। রাস্তা অনেক প্রসারিত হয়েছে। দুপাশে বড় বড় মার্কেট হয়েছে। তালোড়া রোডে দাঁড়ানো কয়েকটা রিক্সাওয়ালা তালোড়া ,গয়াবান্দা,তালোড়া বলে চেঁচাচ্ছে । শাহেদ কাছে যেতেই একটা অল্পবয়সী রিক্সাওয়ালা লাগেজ টেনে নিলো।
কই যাবেন ?জানতে চাইলো ছেলেটা।
-তালোড়া , খাঁ পাড়া। আলিয়া মাদ্রাসার ওখানে।
- পঞ্চাশ টাকা দিয়েন।

দীর্ঘদিন পর আসায় ভাড়া সম্পর্কে কোন ধারণা ছিলো না শাহেদের।তাই আর কথা না বলে উঠে পড়লো রিক্সায়।সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসছে।উত্তরবঙ্গে আসার পর থেকেই শীতটা টের পাচ্ছে শাহেদ। প্রজ্ঞার ঘুম ভেঙেছে। ‘মামণি,ঠান্ডা লাগছে?’জানতে চাইলো শাহেদ।মাথা নাড়লো প্রজ্ঞা।দু হাতে জড়িয়ে ধরলো বাবার গলা।
বড় রাস্তার পাশেই আলিয়া মাদ্রাসা।মাদ্রাসার মাঠের পাশ দিয়ে একটা সরু পথ গিয়েছে।এটা আগে কাঁচা রাস্তা ছিলো।এখন পাকা করা হয়েছে। খান বাড়ির সামনে রিক্সা থেক নামলো শাহেদ।বাড়িটা ব্রিটিশ আমলে ওর দাদামশায় তৈরি করেছিলেন।পরবর্তীতে বাড়ির ভিতরেই আরো কয়েকটা ঘর তৈরি করা হয়েছে ।কয়েকবার মিস্ত্রিও লাগানো হয়েছে পুরনো দেয়াল মেরামত করতে।তবে মেইন গেটটা এখনো আগের মতই রয়েছে।
খোলা গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো ওরা।উঠানের একপাশে কয়েকটা নতুন ঘর উঠেছে।অপর পাশে বিশাল রান্নাঘর।সেখান থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ শোনা গেলো,’কে?’ শাহেদ ওদিকে তাকাতেই একজন নারী মাথায় কাপড় দিয়ে ওকে সালাম দিলো।শফিকের বউ,চিনতে পারলো শাহেদ।‘ভালো আছেন?’ জানতে চাইলো শাহেদ।মহিলা হাসলো।দুজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন।আম্মা আর চাচী।আম্মা ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন।চাচি প্রজ্ঞাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেতে লাগলেন।

পাঞ্জাবি,পায়জামা পরিহিত দাড়িওয়ালা এক লোক শাহেদকে সালাম দিলো।প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে বুঝলো ,লোকটা আসলে তালেব ভাই।বেশ অবাক হলো শাহেদ।মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাসদের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনে নামা তুখোড় ছাত্রনেতা আবু তালেবকে এই বেশে দেখবে ,ভাবতেই পারেনি ও।মনে পড়লো অনেকদিন আগের একটা ঘটনার কথা। রক্ষণশীল পরিবারের ছেলে হয়েও সেই সত্তরের দশকে নামায,রোযা কিছুই করতেন না তালেব ভাই।চাচার সাথে নিয়মিত ঝগড়া করতেন এ নিয়ে ।একদিন তর্ক করতে গিয়ে আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করে বসলেন ।চাচা রেগে গিয়ে তালেব ভাইয়ের ঘর থেকে সব বই-পুস্তক,লিফলেট বের করে সেগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন।মোটা একটা বই পুড়তে অনেক সময় নিচ্ছিলো।বইটার নাম কোনোদিন ভুলবে না শাহেদ।পরবর্তীতে সে নিজেও বেশ কয়েকবার বইটি পড়েছে।দুনিয়া কাঁপানো একটা বই- দাস ক্যাপিটাল,কার্ল মার্ক্স।

রাত নটার মধ্যে চাচা হায়দার খান ছাড়া প্রায় সবার সাথেই দেখা হলো শহেদের।একাত্তর সালে শাহেদের বাবা ওসমান খান নিহত হওয়ার পর থেকে হায়দার খানই এ বাড়ির কর্তা । হায়দার খানের তিন পুত্র। বড় ছেলে চিরকুমার আবু তালেব আলিয় মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষক।মেজোজনের নাম শফিক,সে পৌরসভার কাউন্সিলর। শফিক বিবাহিত এবং দু সন্তানের জনক।

হায়দার খানের সবচেয়ে ছোট ছেলে সুমন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে।নাহ , পড়ে বললে ভুল হবে। লোকাল কলেজে ভর্তি হয়ে আছে , ভাইয়ের পলিটিক্যাল পাওয়ার কাজে লাগিয়ে মাস্তানি করে বেড়ায়।খুব বড় অপরাধ অবশ্য করেনি । উৎসব ,পার্বনে চাঁদাবাজি করা,কলেজে মারপিট করা,মটোরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই যা।
হায়দার খানের বড় ভাই শহীদ ওসমান খানের দুই সন্তান।প্রথমজন শাহানা ।গার্লস স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পরেছিলো সে। ওসমান খান একদিন শাহানাকে গাঁয়ের বজলুর সাথে হেসে কথা বলতে দেখেন।এর এক মাসের মধ্যেই তেরো বছর বয়সী শাহানাকে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে সংসার শুরু করতে হলো।

শাহানার ছোট ভাই শাহেদ এ বাড়ির সবচেয়ে শিক্ষিত ছেলে।নিজ উদ্যোগে পড়াশুনা করে শাহেদ এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক।

নাস্তা করে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো শাহেদ। মা এসে বললেন, ‘ যা, তোর চাচার সাথে দেখা করে আয়’। একটু অস্বস্তি অনুভব করলো শাহেদ। তবুও উঠলো সে। হায়দার খানের রুমে গিয়ে সালাম দিলো, শরীর কেমন আছে জানতে চাইলো। মাথা ঝাঁকালেন আশি পেরুনো বৃদ্ধ।এই লোকটার সাথে শাহেদের শৈশব জড়িয়ে আছে। তাকে সাঁতার , সাইকেল চালানো,মাছ ধরা সবকিছুই শিখিয়েছেন তিনি।প্রতি সপ্তাহে তার সাথে হাটে যেতো শাহেদ। নিজের সন্তানদের চেয়ে পিতৃহারা ভাতিজাকে কম ভালোবাসেন নি তিনি। কিন্তু সম্পর্কটা এখন আর সহজ নেই।

বছর দশেক আগে শাহেদ যখন ভাস্বতীকে বিয়ে করে আনলো ,ওদেরকে বাড়িতে উঠতে দেন নি হায়দার খান।বলেছিলেন, ’মুসলমান না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটা তোর বউ না।আগে ওকে মুসলমান বানা,তারপর বিয়া কর’। বাড়ির অন্য লোকেরা হায়দার খানের মুখের উপর কথা বলতে পারে না।প্রতিবেশি ময়-মুরুব্বিরা শাহেদকে অনেক বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু খান বাড়ির সব মরদের ঘাড়ের একটা রগ নাকি বাঁকা ।স্বভাবে এরা সবাই গোঁয়ার । সেই জন্মগত একগুঁয়েমির কারণেই হয়তো শিক্ষিত প্রগতিশীল তরুণ শাহেদ সেদিন পাড়াগাঁয়ের মাতবর হায়দার খানের কথা মেনে নেয় নি।ভাস্বতীকে নিয়ে সেদিনই ঢাকা ফিরে গিয়েছিলো সে।

রাতে একসাথে খেতে বসলো বাড়ির সব পুরুষ। গ্রামদেশে নারীরা কখনোই পুরুষের সাথে খেতে বসে না।আগে খাবার পরিবেশন করে ।পুরুষের দল খেয়ে উঠে গেলে গল্প করতে করতে খায় নারীরা।খাওয়া শেষে শফিকের সাথে বসার ঘরে গেলো শাহেদ। বাড়ির মেইনগেটের পাশেই এ ঘরটা শফিক বানিয়েছে গাঁয়ের লোকদের বিচার-সালিশের জন্য। ঘরটাতে টেবিল,কয়েকটা চেয়ার আর দুটা বেঞ্চি পাতা।একটা শো-কেসে বেশ কয়েকটা ক্রেস্ট।দেয়ালে ঝুলছে মেজর জিয়া ও খালেদা জিয়ার ছবি ।বগুড়ার মাটি বিএনপির ঘাঁটি ।চেয়ারে বসে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলো শফিক।তারপর শাহেদের দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলো।বহুদিন পর গল্প করার সুযোগ পেয়েছে দুই বাল্যবন্ধু।

-‘ভাবী কেমন আছে’?জানতে চাইলো শফিক।‘সাথে নিয়ে এলি না কেনো?’
-ভাস্বতীকে নিয়ে এসে অযাথা ঝামেলা করতে ইচ্ছা হয়নি। বাদ দে, তোর রাজনীতির খবর বল।
-এবার দিয়ে দুবার কাউন্সিলর হলাম।ভাবছি আগামী নির্বাচনে মেয়র পদে দাঁড়াব ।এমপি সাহেব সাপোর্ট দিচ্ছে।দেখা যাক কি হয়।
দু’কাপ চা নিয়ে এলো কাজের মেয়েটা ।শাহেদকে বললো,আপনের বেটিরে দাদী ঘুম পাড়াই দিছে।
শীতের রাতে এক কাপ চা আর সিগারেটের চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না।একের পর এক সিগারেট খেতে খেত শাহেদ শুনতে থাকলো লোকাল পলিটিক্সের কথা।দুপচাচিয়া উপজেলার ছয়টা ইউনিয়নের মধ্যে তালোড়া সবচেয়ে উন্নত।এখানকার অনেক লোকই দেশের নানা গুরতুত্বপূর্ন পদে অধিষ্ঠিত। এছাড়া আছে বিদেশফেরত অসংখ্য মালদার লোক। তালোড়ার মানুষ আর দুপচাচিয়া উপজেলার অধীনে থাকতে চায় না । উপরমহলের হস্তক্ষেপে এরা নিজস্ব পৌরসভা পেয়েছে।এখন তদবির করে যাচ্ছে, তালোড়াকে উপজেলা ঘোষণা করার জন্য।
‘তালেব ভাইয়ের কাহিনী বল তো’ ,শাহেদ বললো।
‘আর বলিস না’,বিরক্ত কণ্ঠে শফিক বলতে লাগলো, ‘বছর পাঁচেক আগে সামাদ মাস্টারের সাথে তাবলিগে গেছিলো।তিন চিল্লা শেষ করে এসে মহা হুজুর হয়ে গেছে।বাসার সবাইকে শুদ্ধ আরবিতে কলেমা আর তিনটা সুরা মুখস্ত করিয়ে ছেড়েছে। তাবলিগে গিয়ে শিখেছে ,প্রস্রাবের পর কুলুখ নিয়ে চল্লিশ কদম হাঁটতে হয়। তাই এখন প্রস্রাব করে লুঙ্গির ভিতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ান। বিশ্রী অবস্থা’।
হেসে ফেললো শাহেদ।ওর মনে পড়লো এককালের বাম নেতাদের একটা বয়সের পর কাঠমোল্লা হয়ে যাওয়ার ঘটনা সে আগেও দেখেছে। কবি আল মাহমুদ,ফরহাদ মজহারের মত সাহিত্যিকরা এর উদাহরণ।
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে শাহেদ বললো,আওয়ামীলীগ তো তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করলো।তোর কি মনে হয় বিএনপি ইলেকশনে যাবে?
-‘কখনোই না’ ।শফিক বলতে শুরু করলো, ‘আওয়ামীলীগের অধীনে নির্বাচন হওয়া মানেই ভোট জালিয়াতি , সেন্টার দখল । জোর করে আবার ক্ষমতায় আসবে আওয়ামীলীগ। ইলেকশনে গেলে সেই পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হবে বিএনপি। আর বিএনপি নির্বাচনে না গেলে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন করার ক্ষমতা শেখ হাসিনার নাই’।
-ধর,যেভাবেই হোক জাতীয় পার্টিকে নিয়া একটা নির্বাচন করলো আওয়ামীলীগ। তাহলে তো আরো পাঁচ বছরর জন্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে বিএনপি।
-তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারবে না তাহলে আওয়ামীলীগ।সারাদেশে আগুন জ্বলবে।
আরো কিছুক্ষণ গল্প করে ঘুমোতে গেলো ওরা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পিঠা-পুলির ব্যাপক আয়োজন দেখতে পেলো শাহেদ।আর আছে খেজুরের রস।খাওয়া শেষে খান বাড়ির পুকুরঘাটে গিয়ে দেখলো,জেলেদের দিয়ে মাছ ধরাচ্ছে শফিক।প্রায় একশো বছর বয়স পুকুরটার। আগে এর মালিকানা ছিলো চৌধুরীদের।দেশভাগের পর চৌধুরীরা পুকুরটা আর কয়েক বিঘা জমি ওর দাদামশায়ের কাছে বিক্রি করে দিয়ে ইণ্ডিয়া চলে যায়।
দুপুর বারোটার সময় শাহেদের রুমে এসে তালেব ভাই জুম্মার নামাযে যাওয়ার জন্য ডাক দিলেন। ধর্মকর্মে শাহেদের আগ্রহ নাই।কিন্তু এখন সে মসজিদে না গেলে এ বাড়ির প্রতিটা মানুষ অসন্তুষ্ট হবে। দীর্ঘদিন পর নামাযে গেলো শাহেদ।
মসজিদটা সম্প্রতি দোতলা করা হয়েছে। নামাযের আগে খুৎবায় ইমাম সাহেব হালাল রিজিক অন্বেষণের উপর গুরুত্বারোপ করলেন।নামায শেষে পরিচিত বেশ কিছু মানুষের সাথে কথা হলো।
দুপুরে খেয়ে ঘণ্টাখানেক ঘুমালো শাহেদ ।তারপর প্রজ্ঞাকে নিয়ে ঘুরতে বেরুলো গ্রামে। হু হু বাতাস বইছে। চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিলো শাহেদ।বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় শফিক বলেছিলো ,চাচার নামে স্টেশনের রোডটা করেছি,দেখিস। প্রজ্ঞাকে নিয়ে সেদিকে যেতেই দেখতে পেলো একটা ফলক।তাতে বড় করে লেখা, ‘শহীদ ওসমান খান সড়ক’। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ পিতাকে নিয়ে শাহেদের মনে সব সময় একটা গর্ব কাজ করে।

রেল লাইনের পাশ দিয়ে হাঁটছে ওরা।পাশেই আলুর ক্ষেত। দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠের দিকে তাকিয়ে নিজের কৈশোর,প্রথম যৌবনের কথা মনে পড়ে শাহেদের।শীতের রাতগুলোতে মাঠের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসতো সব বন্ধুরা ।আগুনের মধ্যে দিতো নতুন আলু । রাত জেগে আড্ডা দিতো আর লবণ দিয়ে খেতো পোড়া আলু । মাথার উপরে উন্মুক্ত আকাশে জ্বলছে নক্ষত্ররাজি।আহারে !কত সহজ ,কতই না সুন্দর ছিলো সময়টা।হিমালয় থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাস শাহেদের মনে হাহাকার সৃষ্টি করে। ওকে স্মরণ করিয়ে দেয়,আর নেই সেইসব দিন-রাত্রি। আর কখনো সে সুখের সময় ফিরে আসবে না। (চলবে)
দ্বিতীয় পর্বের লিংকঃ https://istishon.com/?q=node/28206

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

উলুল আমর অন্তর
উলুল আমর অন্তর এর ছবি
Offline
Last seen: 2 months 3 দিন ago
Joined: বুধবার, ফেব্রুয়ারী 15, 2017 - 1:09পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর