নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • দ্বিতীয়নাম
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

ইভাকে হল থেকে বের করে দেয়ার নেপথ্যের ঘটনা


১.
সেটি ছিলো ৮ জানুয়ারি রাত্রিবেলাকার ঘটনা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যথারীতি শীতের প্রকোপ খুব বেশি ছিল। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। লেপ মুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বাকৃবি শাখার সাধারণ সম্পাদক ইশরাত জাহান শাপলা জানালো ইভাকে নাকি আবারো ওরা ডেকেছে। “ওরা” আমার ক্যাম্পাসে বেশ দাপুটে। পুরো ক্যাম্পাস তাদের। তারা হলে সিট দেন। তাদের কথায় প্রশাসন উঠে বসে। সুতরাং ওরা হচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আর ইভা প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকেই সে সক্রিয়ভাবে ছাত্র ফ্রন্ট করে। পুরো নাম আফসানা আহমেদ ইভা। কিন্তু ইভার ছাত্র ফ্রন্টের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বেশ ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটা ফার্স্ট ইয়ার, মেয়েটা বেয়াদপ ইত্যাদি অপপ্রচার শুরু করে হলের মধ্যে। ইভাকে তারা ছাত্রলীগ করার জন্যও চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু ইভা সবকিছু ছাপিয়ে একজন ছাত্র ফ্রন্ট কর্মী হিসেবে সবার মধ্যে মিশে গিয়েছিল। এই মিশে যাওয়াটা ছাত্রলীগের ঈর্ষা দ্বিগুণ করে তোলে। তাদের চোখ-মুখ-নাসিকা জোরে জোরে গর্জন করতে থাকে। ইভাকে শায়েস্তা করার জন্য তারা ফন্দি আঁটতে থাকে।

সেটি ছিলো ৪ জানুয়ারি ২০১৮। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাকৃবিতে ছাত্রলীগের এরকম কোন মিছিল থাকলে এতদিন ছেলেদের হলের প্রথমবর্ষের সবাইকে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ করতে হত। কিন্তু এই বছর তারা মেয়েদের হলও বাদ দিতে চাচ্ছে না। তাই মেয়েদের হল থেকেও হুমকি ধামকি দিয়ে তারা মিছিলে নেয়ার জন্য তৈরি হয়। ৪ জানুয়রি এরকম কিছু হবে এটা আঁচ করতে পেরে হলের বেশ কিছু মেয়ে মিছিলের ভয়ে ক্লাস শেষে সেদিন হলেই ফিরে নি। যারা তখন হলে ছিল তাদের সবাইকে ধমক দিয়ে দিয়ে বের করা হয়। এমন সময় ইভা সাহস করে পরিষ্কার জানিয়ে দিল- “আপু দেখেন, আমি তো ছাত্র ফ্রন্ট করি। আমি এ মিছিলে যাব না।”
খুব সাধারণ একটি সত্য কথা ছিল। কিন্তু এই সাধারণ সত্যটি বলাও যেন মহা অন্যায়। কারণ এ কথার মধ্যে একটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গন্ধ ছিল। যে গন্ধ পেয়েই ওরা আঁতকে ওঠে। যদি এরকম আরো পাঁটচা মেয়ে কথা বলে তাহলে তো পলিটিক্সই শেষ! টনক নড়ল রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের। ঐ রাতেই ইভাকে ডেকে তারা অনেক হুমকি ধামকি দেয়। “ভুলে যেয়ো না তুমি ফার্স্ট ইয়ার”, “এই হলের প্রত্যেকটা সিট ছাত্রলীগ দেয়”, “এখানে থাকতে হলে বাধ্যতামূলক ছাত্রলীগ করতে হবে”, “এখানে আমরা যা বলবো তা হবে” ইত্যাদি ইত্যাদি।

ইভা পরের দিন সকালে বেগম রোকেয়া হলের প্রভোস্ট ম্যামকে ফোন দিয়ে পুরো বিষয়টা জানায়। কিন্তু ম্যামের জবাব শুনে সে হতভম্ব বনে যায়। ম্যাম বলেন, “তুমি ফার্স্ট ইয়ার। ফার্স্ট ইয়ারদের কোন সংগঠন নাই। বড় আপুরা মিছিলে ডাকলে তুমি কেন যাবে না? অবশ্যই যাবে। না গিয়ে তুমি বেয়াদবি করেছ। তুমি একটা বেয়াদব!”

এ কেমন জবাব! এত বড় একটা অভিযোগের পর প্রভোস্ট ম্যামের এই জবাব দেয়ার কথা? পরে নাকি ম্যাম আবার তাকে শায়েস্তা করার জন্য তার বাবার নাম্বারও তার কাছ থেকে নেন। ম্যামের এরকম একরোখা এবং পক্ষপাতমূলক আচরণে ইভা দিশা হারিয়ে ফেলে। ম্যামের এরকম পক্ষপাতমূলক আচরণের পরেও ইভা হলে একটা অভিযোগ পত্র জমা দেয়। কিন্তু প্রশাসনের তো টনক নড়ে না। ইভাকে এর পরেও আরেক দফা হুমকি দেয়া হয় এবং হল থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য আল্টিমেটাম দেয়া হয়। সকল নাটের গুরু ছিল ঐ হলের ছাত্রলীগ কর্মী ইলা, স্বর্ণা, সিনথি, শিলা। তাদের এই হুমকি দেয়ার সাথে সাথে যে মহিয়সী নারীর নামে ঐ হলের নামকরণ করা হয়েছিল সেই বেগম রোকেয়ার চেতনা নিশ্চয়ই তখন প্রহসনের হাসি হাসছিল। যে পুরুষতন্ত্রের কালো থাবা থেকে রোকেয়া এদেশের নারী সমাজকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন আজ সেই নারী সমাজেরই একটা অংশ ক্ষমতার লোভে মোহাবিষ্ট হয়ে আরেক নারীর ওপর ফ্যাসিস্ট হতেও দ্বিধা বোধ করে না। কী এক ভয়ংকর অধঃপতন!

ইলা, শিলা, সিনথি, শিলা গ্যাংয়ের এসব হুমকি ধামকির চূড়ান্ত মঞ্চায়ন হয় গত ৮ জানুয়ারিতে। যে প্রেক্ষাপট দিয়ে আমি লেখাটি শুরু করেছিলাম। ইভাকে তারা সেদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে ডেকে নিয়ে উপর্যুপরি হুমকি দেয় এবং রোকেয়া হল ছেড়ে হেলথ কেয়ার সেন্টারের( যেখানে সিট সংকুলান না হওয়ায় কিছু ছাত্রীকে রাখা হয়েছিল) তিন তলায় যাওয়ার জন্য জোর করে। কিন্তু এরকম অনৈতিকতার প্রতি ইভা কোন আপোষ করে নি। ছাত্রলীগের কর্মীরা ইভার জিনিসপত্র হলের বুয়াদের দিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে ইভাকে হল থেকে বের করে দেয়। তখন ঘটনা স্থলে দ্রুত বাকৃবি শাখা ছাত্র ফ্রন্ট সম্পাদক ইশনাত জাহান শাপলা এবং অর্থ সম্পাদক এসে উপস্থিত হয়। তারা দুজনেই ঐ হলের আবাসিক ছাত্রী। হল গেট বন্ধ করে দেয়ায় তারা হলের সামনেই অবস্থান নেয়। এক এক করে তারা প্রক্টর প্রভোস্ট সবাইকে ফোন দেয়। প্রক্টর এক বার ফোন ধরার পর আর কোন ফোন ধরেন নি। প্রভোস্ট এক নজর হলে এসেছিলেন বটে। কিন্তু তিনিও ইলা, শিলা, সিনথি, শিলা গ্যাংয়ের মত করে তাকে হেলথ কেয়ারের তিন তলায় থাকার সমাধান দিলেন। বোঝার বাকি রইলো না প্রভোস্ট ম্যাম নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছেন। মিশে গেছেন একটা অন্যায় এবং মিথ্যার সাথে। ইভা সে সিদ্ধাস্ত মানে নি। ইভা রাত ৪ টা পর্যন্ত ঐ কনকনে শীতের মধ্যে হল গেটে বসা ছিল। প্রশাসনের কেউ তার কথা আর মাথায় রাখে নি। সবাই নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছিল। অন্যদিকে তীব্র শীতে হলের সামনে নিরাপত্তাহীনতায় কাঁতরাচ্ছিল ইভা। কাঁতরাচ্ছিল একটি সত্য!

ইভার হাতে তখন একটাই রাস্তা খোলা ছিল। জীবন দিয়ে হলেও নিজের অধিকার রক্ষা করা। শুধু নিজের না, ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষাথীদের অধিকারও। ইভা পরের দিন সকালে আমরণ অনশনে বসে। বসার সাথে সাথেই আলোড়ন তৈরি হয়ে যায় পুরো দেশ জুড়ে।

ইভার সারাদিনের অনশনে প্রশাসনের টনক নড়ে। বিকেল চারটার দিকে ইভা তার হলের সিট ফিরে পায়। তবে ইভার বিরুদ্ধে চক্রান্ত থেমে নেই। শুনলাম রোকেয়া হলে বল পূর্বক ইভার বিরুদ্ধে স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেটা দিয়ে কি করবে কে জানে। হয়তো আরো কোনো নাটক সাজাবে। সে অপেক্ষায়ই হয় তো আমাদের থাকতে হবে।

২.
ইভা অনাস প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী হয়ে যে জিনিসটি দেখিয়ে গেল তা আমাদের সবাইকেই বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এখন যা চলছে তা এক কথায় বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবে জোর জবরদস্তি করে পেশি শক্তির দাপটে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন যেভাবে তাদের মিছিলের দৈর্ঘ্য বাড়ানোর চেষ্টা করে তাতে তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পায়। এতে শুধু তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই নয়, আমাদের প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদেরও বিবেক বোধের দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পায়। তারা সব সময় ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার দাপটের নিচে মাথা নিচু করে থাকেন। ক্ষমতাসীনদের নেয়া অনৈতিক সিদ্ধান্তে কী রকম নির্লজ্জ ভাবে তারা তাদের গলা মেলান! এটি তাদের শিক্ষকতা পেশার মহত্বকে মারাত্মক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সর্বোপরি আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর পরিস্থিতি খুবই খারাপ। প্রত্যেক হলেই কোন না কোন ভাবে ক্ষমতাসীনদের দখলদারিত্ব রয়েছে। হলের সিটগুলো অনেক সময় তারা ছাত্র ছাত্রীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের কাছে বিক্রি পর্যন্ত করে। শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন করার জন্য এখানে থাকে পৃথক টর্চার সেলের মত ব্যবস্থা। যে টর্চার সেলের নির্যাতন সইতে না পেরে বাকৃবিতে ২০১৪ সালে সাদ ইবনে মমতাজ নামের এক শিক্ষার্থীর জীবন পর্যন্ত বলি হয়।

এরকম যেন আর কোন সাদকে জীবন দিতে না হয় সেই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাই। ইভাদের যেন আর মাঝ রাতে হল থেকে বের করে দেয়া না হয়। আমরা যেন শুনতে পাই হলের প্রশাসনই হলের সিট বন্টন করে। ইলা-শিলারা নয়। আমরা যেন ইলা, শিলা, স্বর্ণা, সিনথিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে পারি।

সৌরভ দাস
সভাপতি
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাকৃবি শাখা।

Comments

সুজন আরাফাত এর ছবি
 

দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এরকম ঘটনা কাম্য নয়;এটা খুবই হতাশাজনক। ছাত্ররাজনীতির নামে অপরাজনীতির চর্চা হচ্ছে দেশের সকল বিদ্যাপীঠে। দলীয় লেজুড়বৃত্তির চর্চা ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে মেরুদণ্ডহীন ভাবে গড়ে তুলছে। ইভার এমন প্রতিবাদ এমন সময়ে অন্ধকারে যেন টিমটিম করে জ্বলতে থাকা আশার প্রদীপ।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সৌরভ দাস
সৌরভ দাস এর ছবি
Offline
Last seen: 1 week 1 দিন ago
Joined: বৃহস্পতিবার, আগস্ট 13, 2015 - 8:18অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর