নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 7 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • গোলাম রব্বানী
  • বিকাশ দাস বাপ্পী
  • অনন্য আজাদ
  • নুর নবী দুলাল
  • আব্দুল্লাহ্ আল আসিফ
  • মোমিনুর রহমান মিন্টু
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • ফারজানা কাজী
  • আমি ফ্রিল্যান্স...
  • সোহেল বাপ্পি
  • হাসিন মাহতাব
  • কৃষ্ণ মহাম্মদ
  • মু.আরিফুল ইসলাম
  • রাজাবাবু
  • রক্স রাব্বি
  • আলমগীর আলম
  • সৌহার্দ্য দেওয়ান

আপনি এখানে

নুরজাহানের নিজ বসতভিটায় ফেরা জীবন


কদিন আগে ঘনবর্ষায় জলপ্লাবিত নতুন চর কেতুপুরে ঘুরতে গিয়ে একদম নদীর তীর ঘেষে জলমগ্ন কলাগাছ ঘেরা নুরজাহানের ঘর দেখলাম আমি। কাচা মাটির ঘরে পিঁড়িতে বসতে দিলো নুরজাহান আমায়। ওর ছেলেটাকে বাঁধা দেখলাম ঘরের খুঁটির সাথে রশি দিয়ে। বিস্ময়ভেঙে জানতে চাইলাম, ছেলেকে বেঁধে রাখার কারণ। নোংড়া কাপড়ের খুটে চোখ মুছে নুরজাহান শোনালো তার জীবনের যে গল্পকথা, তা হৃদয়কে দগ্ধ করলো আমার। এক গ্রামীণ নারীর জীবনের এ গল্প যেমন দুখ বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত, তেমনি নয়ন ভেজার অন্তরালে কাটাকষ্টের দুখসুখে ভারাক্রান্ত এক হৃদ মননের গান!
:
এইতো মাত্র কবছর আগে গাঁয়ের দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে নুরজাহানের বিয়ে হয়েছিল পাশের গাঁয়ের দেলোয়ারের সাথে। দুজনেই ১২/১৩ বছর থেকে কাজ করে পুরণো ঢাকার একটা পোশাক কারখানায়। সেই সুত্রে পরিচয়, প্রেম ও বিয়ে। ঢাকাতে ভাড়া বেশি বলে ওরা ওপারের কামরাঙির চরের মুলি বাঁশের কম ভাড়ার ঘরে ভাড়া থাকতো অনেকদিন থেকে। ৭/৮ বছর আগে গ্রামে গিয়ে শুনলাম, ওদের ১ম সন্তানটি মারা গেছে ঘরের নিচের ডোবার জলে পড়ে। কারণ বাঁশের খুটির এ ঘর মুলত সরকারের নিচু খাস জমিতে করা হয়েছে অবৈধ স্থাপনায়। ওদের অসতর্কতায় কোন এক সময়ে ২-বছরের শিশুটি টুপ করে পড়ে যায় নিচের ডোবায়। যখন টের পেলো মা নুরজাহান, তখন তার কোলের শিশু ডোবার নোংড়া জল খেলে হারিয়েছে এ পৃথিবীর মায়া। সন্তানের মৃত্যুর পর ঐ বাঁশের ঘর ছেড়ে দিতে চেয়েছিল তারা কিন্তু এতো কম ভাড়ায় আর পায়নি কোন ঘর এ তল্লাটে, তাই আবার থেকেই গেছে তারা এ অপয়া বাঁশের ঘরে আর্থিক দৈন্যতায়।
:
এবার ২য় বেবি হলো নুরজাহানের। গরিবের ঘরের শিশু, তাই সখ করে ছেলের নাম রাখলো স্বাপ্নিক 'বাদশা'। নিজে কাজে যায় গার্মেন্টসে, তাই মাকে এনে রাখলো কিছুদিন শিশুকে দেখভাল করার জন্যে। এভাবে মা আর নিজে কষ্ট করে ৩-বছরের বানালো বাদশাকে একদিন। ১ম সন্তানের মত যেন নিচে পানিতে পড়ে না যায়, তাই বাদশার কোমড়ে দঁড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতো সব সময় ঘরের পাটাতনে। ছুটির দিন থাকাতে ও নিচের ডোবার জল শুকিয়ে যাওয়ায়, শিশু বাদশার রশি খুলে দিলো নুরজাহান একদিন। স্বাধীনতা পেয়ে ঘরের দরজার সামনের ধুলো মাটিতে অন্য শিশুদের সাথে খেলতে গেলো বাদশা কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেলো না দুপুরে, বিকেলে কিংবা রাতেও। কেউ বলতেও পারলো না ছোট তিন সাড়ে তিন বছরের বাদশার খোঁজ। পুরো কামরাঙির চর চষে বেড়ালো নুরজাহান, তার মা আর স্বামী দেলোয়ার। মাইকিং করলো, মসজিদে ইমাম সাবকে বলে ঘোষণা দেওয়ালো। কিন্তু শিশু বাদশা নিরুদ্দেশই থেকে গেলো অনেকদিন অনেকরাত।
:
প্রায় ৩/৪ মাস চলে গেলেও কোন খোঁজ পেলোনা শিশুর। তারপরো প্রতি ছুটির দিনে সারাদিন বাদশাকে খুঁজে ফিরতো মা নুরজাহান ঢাকার আনাচে কানাচে, পথে-প্রান্তরে, অলিতে গলিতে। একদিন ভোর রাতের দিকে দরজা খুলে বাইরে এলে, নুরজাহানের চোখে পড়লো দুটো শিশুকে নিয়ে দৌঁড়ে যাচ্ছে এক মহিলা। নুরজাহানও পিছু নিলু তার। ঝাপসা অন্ধকারে চরের একটা বিচ্ছিন্ন ঘরে ঢুকলো ঐ মহিলা, শিশু দুটোকে নিয়ে। নুরজাহান ঘরের পেছনে কান পেতে শুনলো, ঐ মহিলা আর কজন পুরুষের চাপা স্বরের কথোপকথন, সাথে শিশুদের চাপা কান্নার ক্ষীণস্বর।
:
ঘরে ফিরে স্বামীকে বললো সে পুরো ঘটনাটা। সকালে দুজনে থানায় গিয়ে রাতের ঘটনা জানালো পুলিশকে। পুলিশ ধমক দিয়ে সরাতে চাইলো ওদের। শেষে নুরজাহানের স্বামীকে আটক করলো চুরির মামলা দিয়ে। সতর্ক করলো নুরজাহানকে, "আবার থানায় এলে তাকেও আটক করে চালান দেবে স্বামীর সাথে"। দমলো না নুরজাহান। তাদের কারখানায় স্বাস্থ্যঝুঁকি শেখাতে এনজিওর যে মহিলারা এসেছিল কজন, খোঁজ নিয়ে যোগাযোগ করলো তাদের সাথে। পুরো ঘটনা খুলে বললো তাদের। মাতৃস্নেহে কান্না ঝড়িয়ে বললো
- "আমার মনে হয় ঐ ঘরে আমার বাদশা ছাড়াও আরো বাচ্চাগো আটক কইরা রাখছে আফা"।
কথা শুনে গোয়েন্দা পুলিশসহ পরদিন দুপুরে হানা দিলো এনজিওর লোকজন পুরো টিম নিয়ে। ঘরে ঢুকে বিস্ময়ে তাজ্জব হয়ে গেলো সবাই। ৮-টা এলুমিনিয়ামের বড় পাতিলে ৮-টি শিশুকে হাত-পা ভেঙে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে তাতে। পুরুষত্ব যেন না থাকে, তাই শিশুদের পুরুষাঙ্গ ও অন্ডকোষ কেটে দেয়া হয়েছে। আর ঘুমের ঔষধ দিয়ে তাদের আধমরা করে রাখা হয়েছে ঐ পাতিলের ভেতর। প্রায় ৬-মাস এ গোলাকার পাতিলে এভাবে নড়াচড়াহীন অবস্থায় থাকলে, সবার হাত-পা গোল তথা পঙ্গু হবে। হাঁটতে পারবে না তারা আর। তারপর চড়া দামে বিক্রি করবে ওদের ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের কাছে। এদেরই ঢাকার ব্যস্ত সড়কে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হবে একদিন। ৮-টা পাতিলের একটা থেকে বিধ্বস্ত পঙ্গুপ্রায় বাদশাকেও বের করা হলো। মা নুরজাহান যখন বুকে তুলে নিলো তার হারানো শিশু বাদশাকে, তখন দাঁড়াতে পারছিলোনা সদা চঞ্চল এ শিশুটি। পুলিশ বাকি শিশুদের পাঠালো টঙ্গীর শিশুহোমে।
:
নিজে ছেলেকে পেয়ে দু:খগাঁথার এ স্বল্প জীবনের যাপিত সময়ের নিগুঢ়তায় মন উঠে যায় নুরজাহানের ঢাকা থেকে। মানবীয় সুখ অন্বেষণে পুরো জীবনটাই নুরজাহানের কাছে ভুল জীবনের খেলনাবাটির তরি-তরকারির স্বাদের মত তেতো বি্স্বাদময় মনে হলো তার। থানা থেকে স্বামীকে ছাড়িয়ে, এবার গাঁয়ের পথে পাড়ি দিতে মনস্থির করে ওরা। গহীনের মাঝরাতে মুলিবাঁশের ঘরে কৃষ্ণচূড়ায় ডগায় এক ফালি চাঁদ উঠলো একদিন। তারই আলোছায়ার ফাঁকে এ কষ্টজীবনের কালচে গলিপথ ঠেলে-ঠেলে নুরজাহান এগিয়ে গেলো তার গাঁয়ের পথে। ক্লান্ত কামারের হাঁফরের মতো নিঃসরণ দুঃখকথায় দোলায়িত জীবনে ওরা ফিরে গেলো ঐ দ্বীপগাঁয়ে। মন খারাপের ভাঙা পুরণো নৌকোয় জলসেচতনের বৃথা চেষ্টা বাদ দিয়ে, ওরা সত্যিই গাঁয়ে পৌছে গেল একদিন। দুখরা ওদের আঁকড়ে থাকতে পারলো না বেশিদিন। অকাল বোধনের কষ্টলগ্ন শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা গাঁয়ের দুখজীবনে নুরজাহান আবার সুখ খুঁজে পেলো মাছরাঙা, লাউডগা আর নরম সপ্তবর্ণা ঘাসফুলের সতেজতার মাঝে। ছোট্ট কুঁড়েতে ওরা রাঙিয়ে তুললো পুরণো অনাবাদি কর্ষিত জমিতে ভালবাসার হৃদয় লাঙল। কচি কলাপাতার ফাঁকে কাঁচা উঠুনের দুর্বা ঘাসে হাঁটতে শিখলো পঙ্গু বাদশা তার মায়ের হাত ধরে-ধরে অবশেষে একদিন !

Comments

ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
 

!

===============================================================
জানার ইচ্ছে নিজেকে, সমাজ, দেশ, পৃথিবি, মহাবিশ্ব, ধর্ম আর মানুষকে! এর জন্য অনন্তর চেষ্টা!!

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 4 ঘন্টা 55 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর