নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অবাক ছেলে
  • মাহফুজ উল্লাহ হিমু
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • দ্বিতীয়নাম
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • রবিউল আলম ডিলার
  • আল হাসিম
  • মাহের ইসলাম
  • এহসান মুরাদ
  • ফাহিম ফয়সাল
  • সানভী সালেহীন
  • সাঞ্জানা প্রমী
  • অতৃপ্ত আত্বা
  • মনিকা দাস
  • আব্দুল্লাহ আল ম...

আপনি এখানে

গল্প : জয় পরাজয়


অনেকদিন পর গাঁ থেকে নিমন্ত্রণ এলো সাঁতার প্রতিযোগিতা হবে নদীতে। আমি যেন অবশ্যই যোগ দেই তাতে। কজন পরিচিত বন্ধু ফোনও করলো আমায়, আমি যেন যেতে ভুলে না যাই। গাঁয়ের বাতাস আর নদীর বুনো জলের তান্ডবে কতনা ঋণ আমার পদে পদে, তাকে কিভাবে ভুলি আমি! অবশেষে ছাইরঙা ঘুঘুদের একভাষিক ডানার সকরুণ উড়ালপথে গাঁয়ে পৌঁছে যাই আমি মৃত জোনাকির আলো দেখে দেখে।
:
কৈশোরে গাঁয়ের স্কুলে, বাজারে, জেলেদের মাঝে, এগাঁ ওগাঁ তথা সকল সাঁতারে সবাইকে পেছনে ফেলে ডুবসাঁতারে প্রথম হতাম আমি। তাই আন্তস্কুল প্রতিযোগিতায় নিজের স্কুলকে যেমন প্রতিনিধিত্ব করতাম, তেমনি আন্তদ্বীপ জেলেদের সাঁতার প্রতিযোগিতায় আমার গাঁয়ের জেলেদের সাথে জলে নামতাম আমি জলদাস হয়ে। যদিও জেলে পরিবারদের সদস্য ছিলাম না আমি কখনো। একবার চাষীদের গরু-দৌঁড় প্রতিযোগিতায়ও প্রথম হয়েছিলাম আমি। গরু-দৌঁড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে দুটো গরুকে জোয়ালে বেঁধে, পেছনে মই লাগিয়ে শুকনো বিলে ধুলো উড়িয়ে প্রতিযোগি তাগড়া জোয়ান গরুর দৌঁড় প্রতিযোগিতা। বিশেষ কৌশল জানা না থাকলে, এ প্রতিযোগিতায় মারাত্মক আহত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। জীবনঘাতী এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও একবার মাত করেছিলাম গ্রামের মানুষদের!
:
বর্ষাকালীন প্রতিযোগিতা বলে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক। আমার পরিচিত বন্ধু-স্বজন ছাড়াও, অনেক অপরিচিত মুখের ভীড়ে নিজেকে কেমন যেন অচেনা মনে হতে লাগলো আমার। তারপরো ঝড়বাতাসে যেন এক গামছা মাথায় শক্তহাতের রোমশ সারেঙ হয়ে নদীতে নামার প্রস্তুতি নেই আমি। আমার পরিচিত বন্ধুরা পাশে দাঁড়ায় সাহস আর তাদের বিজয়ের অংশদারী মমত্ববোধের সাতকাহন শোনাতে।
:
প্রবল খরস্রোতা নদীতে নামার আগে অনেকেই পুরো গায়ে সরিষার তেল মাখে, যাতে জল লেগে না থাকে জলজ শরীরে। গামছাকে নেংটির মত করে মালকোছা মারা গ্রামের নব কৃষক আর তরুণ জেলেদের মাঝে নিজেকে কেমন যেন অচেনা লাগে আমার। পুরনো পরিচিত দুচারজন নামে আমার সাথে। প্রতিযোগিতা নির্ধারিত হয় উজানস্রোতে প্রায় ১-কিমি পথ সাঁতরে যাওয়া। এ পরিচিত জলঝড়ের মেঘনাতে অনেকবার সাঁতরেছি আমি। তাই দুয়েক কিমি কোন পথই মনে হয়না আমার কাছে। বজ্রবৃষ্টির ঠাঠা প্রতিধ্বনির মাঝে বর্ষাতি গায়ের কুঁজো ব্যঙ হয়ে ডুবসাঁতারে এগুতে থাকি আমি প্রবল উজান স্রোতে।
:
বিপরীতমুখী ঘোলাজলঘূর্ণন কেটে কেটে আমি কেন যেন খুব একটা এগুতে পারিনা সেই আগের মত। আমার চারদিকের প্রতিযোগিরা সবাই কেমন যেন রাক্ষুসে হাঙুরমুখো হয়ে আমায় টেনে ধরতে চায়। মনে হয় কিষাণ পিতার ঔরসের অন্ধকারের লোলচর্ম প্রতিবিম্বের মত প্রবল জলস্রোত আমায় যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে পেছন দিকে। ওরা সবাই সমস্বরে বলছে - "তুমিতো আর আমাদের মাঝে নেই। শহুরে উচ্চবিত্ত চাকুরে হয়েছো তুমি, তাই আমাদের এ জয়ের মালা তোমাকে আর পরতে দেবোনা। তুমি পরাজিত হয়ে ফিরে যাবে তোমার খটখটে শহরে"!
:
ওদের প্রবল বাঁধাকে ডিঙিয়ে ত্রিকালজ্ঞ লালচোখ মোষেদের ভিড় ঠেলেঠেলে এগুতে থাকি সামনের দিকে। আমার কৈশোরিক শক্তিকে খুঁজে পেতে মাকে ডাক দিয়ে আমি। দেই আমার কৈশোরিক প্রেমিকা সুমিকে। সুমি আমার সকল সাঁতারের প্রণোদনা ছিল। কিন্তু এবার সুমি অনেক দূরে থাকে আমার! যুযুধান ঝড়ে জলজ প্রাণিজের জান্তব রাক্ষসমাঝে যখন এগুতে প্রাণপণে চেষ্টা করি আমি, তখন সুমি দূর থেকে হাসে আর হাত নেড়ে নেড়ে বলে, তুমি সত্যি এখন অচেনা জগতের মানুষ। অচেনা দেশের মানুষ। তোমাকে সাহস দেবো ক্যামনে আমি! তুমি কি জানোনা এ সাঁতারে তোমার অগ্রগামি এখন আমার জঠরের রেখে আসা সন্তান কানু জলদাস!
:
সুমির ছেলে কানুকে দুয়েকবার দেখেছি আমি। শুনেছি দক্ষ জেলে সে। কিন্তু আমার মত দক্ষ সাঁতারু এমনটা কখনো শুনিনি। শুনলে হয়তো ওদের জন্য পথ ছেড়ে দিতাম আমি! কিন্তু এখন কি সরে দাঁড়াতে পারি? জয়-পরাজয়ের সন্ধিক্ষণে আমি এখন! ঘন থলথলে আবলুশ অন্ধকারে হারানো পথের মত আমার চিরপরিচিত জলে সাঁতরাতে থাকি আমি কিছু না দেখেই! সপ্তবর্ণা মেঘের আলোয় উদ্ভাসিত খুশির আকাশের মত সাঁতরে পৌঁছে যাই আমি অন্তিম লাইনে! কিন্তু এখানে আমার পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী কাউকে কেন দেখতে পাচ্ছিনা আমি। তবে কি আমি অন্য কোন ঘাটে পৌঁছে গেছি!
:
একসময় ডুবজলে মৃতপ্রায় প্রেমিকার ব্যাকুল শুশ্রুষাময় ভালবাসার স্পর্শে চোখখুলে তাকাই আমি! কৈশোরিক শববাহকের চোখের জলে ভেজা রাইসরিষার পথে শুইয়ে কানু জলদাস বাঁচাতে চাইছে আমায়! ডুবে গিয়েছিলাম আমি। ভেসে গিয়েছিলাম অনেক দুরে! কষ্টধোঁয়ার দুর্গে বসবাস করে ঝরাবুকলের রক্তঝরা ফিনকির মত আমি বলি, আমি কি সাঁতারে প্রথম হইনি! হাজারো উপস্থিত দর্শকরা বলে ওঠে, আপনিতো ভেসে গিয়েছিলেন কাকা। কানু তুলে এনেছে আপনাকে! কানু জলদাস না হলে হয়তো সাগরে ভেসে যেতেন আপনি। বয়স কত হয়েছে গুণে দেখেননি? এখনো সাঁতার দিতে চান ৩০-বছর আগের মতন?
:
পেট্রলগন্ধী ঢাকার রাস্তা কিংবা কুয়াপুজোয় মত্ত বর্ষার ব্যঙের মত চারদিকে তাকাই আমি। হ্যা বয়সতো হয়েছে আমার। প্রেমিকার চিতায় শ্মশানে দু:খধোঁয়ার কুন্ডলীর মত তা মনে পড়ে যায় আমার! বৃষ্টিহীন চৈত্রের মাঠে শুকনো মরা ফড়িংয়ের নিতম্বের মত বলহীন হয়ে বলি, হ্যা বাবারা ভুলে গিয়েছিলাম আমি, যে আমার বয়স হয়েছে। আমার উচিত হয়নি তোমাদের সাথে এ প্রতিযোগিতায় নামা। কিন্তু তোমরা কি বলবে কে প্রথম হয়েছে?
:
কানু জলদাস হয়েছিল প্রথম কিন্তু আপনাকে তুলতে গিয়ে আর পারেনি সে। মহিষ দ্বীপের সারেং প্রথম হয়েছে সাঁতারে! কৃপণ প্রেমজ নারীর রিরংসিত হৃদয়ের মত ক্লেদাক্ত হয়ে বলি, কানু সুমির সন্তান না! অবশ্যই এরপর সে প্রথম হবে। ওর মা সুমি দক্ষ সাঁতারু ছিল। সুমির কাছেই সাঁতার শিখেছিলাম আমি। বারশিঙা সপ্তবর্ণা চিরকিশোরীর বাহুজ পেলবতা মেখে জয় পরাজয়ের দোদ্যুল্যমানতায় দুলতে থাকি আমি।
:
অনেকদিন আর গাঁয়ে যাইনি। জীবনের কত না বিচারহীন এজলাশে কাটে কত দিন কত রাত আমার এ ঢাকাতে! ঐ পরাজয়ের গ্লানি আমাকে দিনরাত কষ্টজলে ভিজিয়ে রাখে। বিলুপ্ত ভালবাসাহীন বিষাদের গহীন বোধ আর বোধিরা ঘুরতে থাকে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে আমার চারপাশে। ব্যথাতুর প্রেমিকের অদেখা পাঁজরের সংগোপিত হাড় মাংস হয়ে একদিন সুমি স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলে, "কানু তোমার মত সাঁতারু হয়েছে! ওর জন্য পথ ছেড়ে দেবেনা"! সুমির হাত ছুঁয়ে রোমান্টিকতার বুনো বাতাসে ভরা নিটোল ফাল্গুনের ঘ্রাণে বলি, ভালবাসার সপ্তবর্ণা রক্তিম শৈল্পিক তাবিজ কবজে তুমি আর কতোকাল ভেসে থাকবে মেঘনার জলে! প্রদূষণকালে বিদুষী কিশোরীর লিপস্টিক ঠোঁটে সুমি হাসতে থাকে মেঘনার জলে!

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 17 ঘন্টা 7 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর