নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • সরকার আশেক মাহমুদ
  • সজল-আহমেদ
  • নরসুন্দর মানুষ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

জাতীয়তার ঘেরাটোপে শেকড় অনুসন্ধানী 'মাটির ময়না'


তারেক মাসুদের মাটির ময়নার আগে পরে বাংলা সিনেমার তুলনা করা বেশ ঝামেলার ব্যপার। ঝামেলা এই কারণে যে, এই এক মাটির ময়না সিনেমা বাংলা সিনেমার গতিপথকে অন্যভাবে বদলে দিতে পারতো। পারতো বলছি এ কারণে এরপর বাংলা সিনেমা, বিশেষ করে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলছি একান্তই বাংলাদেশি সিনেমা আর খুব একটা এগোয়নি, আর খুব একটা পেরে উঠেনি। এটি কতটুকু ক্ষতি কিংবা কতটুকু কী তা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। প্রাসঙ্গিক বিধায় শুরুতেই এই কথাটি পাড়তে হলো। তারেক মাসুদের মাটির ময়নার যে বয়ান আর আজকের যে দেশীয় প্রেক্ষাপট তার মধ্যে এই সিনেমার গভীর এক মিল আছে। অমিলও হয়তো আছে। তবে তা খুবই কম! খেয়াল করে যদি দেখি যে, তারেক মাসুদ মাটির ময়না নিয়ে যখন দেশ-বিদেশ করে বেড়াচ্ছেন তখন গোটা বিশ্বে-ই এক ধরণের পটপরিবর্তনও হয়ে গেছে। রাতারাতি না হলেও প্রায় হঠাৎ করেই এক ধরণের রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে তখন আমেরিকার টুইনটাওয়ার হামলা পরবর্তী এক মারণঘাতী যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় তখন মেতে উঠেছে। ক্রুসেড-ধর্মযুদ্ধ পার করে আসা মানুষ আবার কেমন করে যেনো আফগানিস্তান হয়ে ইরাক-সিরিয়াতে সেই একই খেলায় মেতে উঠলো। তারেক মাসুদের মাটির ময়নাও কাকতালীয়ভাবে হলেও তা এক ভয়াল যুদ্ধদিনের গল্প বলে যান। যুদ্ধের আগের পরিস্তিতি কেমন তাও তার কাহিনিচিত্রে তুলে ধরেন। এদিক দিয়ে তারেক মাসুদ ও তাঁর মাটির ময়না নিয়ে স্বরূপে আবির্ভাব বেশ তাৎপর্যবাহী।
মাটির ময়না সিনেমা অনেকটা উত্তম পুরুষে বয়ান। অনেকটা জবানবন্দি ধাঁচের। জবানবন্দী সজ্ঞানেই বললাম। গল্পের পটভূমি চল্লিশের দশকের পটভূমিতে বাস্তভিটে হারা এক মুসলমান ব্যক্তির। ধর্ম-জাতিগত দাঙ্গা ও দেশভাগের কারণে কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় নিঃস্ব কাজি সাহেব এর আগে কেমন ছিলেন তার বয়ান আমরা এই সিনেমায় খুব একটা পাই না। শুধু জনৈক খেয়াঘাটের মাঝির মুখে তার সম্পর্কে কিছুটা আভাস আমরা পাই। কাজি সাহেব এককালে কেতাদুরস্ত সাহেবি শিক্ষায় শিক্ষিত লোক। অর্থাৎ কলকাতাতেই কাজি সাহেব ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষা লাভ করেন। তখন সাহেবি পোশাকআশাকও পরিধান করতেন। তাহলে কাজি সাহেবের এই আমূল পরিবর্তন কী করে হয়? এমন বেমক্কা ধাঁচের প্রশ্নের উত্তর তারেক মাসুদ সহসা দেন নি। সিনেমায় সে প্রশ্নকে জারি রেখে তিনি সিনেমার প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর দেন। কাজি সাহেবের পোশাকি যে রূপ মাটির ময়নায় আমরা দেখি তার ভেতরের রূপটিও আমরা খানিকটা আন্দাজ করে নিতে পারি কিংবা করিও। একদম শহরের কেন্দ্রে-ই মফস্বলী গোছের যে শহরে কাজি বসবাস করেন সেই সংসারে স্ত্রী, পুত্র ও এক কন্যা নিয়ে প্রায় ছিমছাম সংসার। আর থাকার মধ্যে আছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একমাত্র ছোটো ভাই। সংসারের স্বচ্ছলতার ব্যাপারটি এড়িয়ে গিয়ে যদি আমরা এই কাজি সাহেবের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে সেখানে এক ধরণের নৈর্ব্যক্তিকতাও হয়তো দেখতে পাবো। তাঁর একান্ত একটি কাজের মধ্যে কাজ হলো হোমিওপ্যাথি নিয়ে নানান ধরণের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। হোমিওপ্যাথি নিয়ে যে ধরণের বিকারগ্রস্ততা আমরা তাঁর মধ্যে দেখি তা রীতিমত ভীতিকর। এই জের ধরে আমরা আসমা অর্থাৎ কাজি সাহেবের একমাত্র ছোট্ট মেয়েটি সাধারণ জ্বরে ভোগে মারা যায়। ধর্মের মোড়কে কাজি সাহেবের যে একগুঁয়ে রূপ আমরা প্রতক্ষ্য করি তা তৎকালীন সময়কে যতোটা না তুলে ধরে ততোখানি ধর্মের আবহে দেশভাগ, বাস্তুভিটেহারা মানুষদের পরিবর্তিত রূপকেও আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আমাদের সামনে তখন কাজির এই বদলে যাওয়া রূপটি খুব একটা আর অপরিচিত হয়ে ধরা দেয় না। 'একটি তুলসী গাছের কাহিনী'র যে বিস্তার তাকে আমরা কেউই আর অস্বীকার করতে পারছি না। তারেক মাসুদ বদলে যাওয়া পরিস্তিতে কাজির মানস জগতের যে চারিত্রিক রূপ বিস্তার করেন তা শেষতক আনুকে, কাজির পুত্র সন্তানকে কওমি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে সেই বার্তাটি পরিষ্কার করেন। শুরুতেই বদলে যাওয়া বৈশ্বিক রাজনীতির প্রসঙ্গটি তুলেছিলাম এর কারণ মাটির ময়নার যে রাজনীতি আর গোটা দুনিয়ায় বদলে যাওয়া যে বৈশ্বিক রাজনীতির এক ধরণের মিল না হলেও প্রায় কাছাকাছি এক ধরনের মিল তখন ছিলো, এমনকি আজও তা বহাল আছে। আনুকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজের বিগত দিনের ইংরেজি শিক্ষাকে 'কাজি একদিকে যেমন অস্বীকার করছেন' এই প্রশ্ন যখন বোদ্ধামহলকে দ্বিধান্বিত করে তোলে অন্যদিকে কাজির একমাত্র আপন ভাইটি তখন পুরোদস্তুর রাজনীতিতে জড়িয়ে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন হয়ে একাত্তরের জানুয়ারি-মার্চ অবধি এই ভাইয়ের সাথেই একই ঘরে, একই ছাঁদের নিচে বসবাসরত। কাজির মানস জগতের এই বিশালাকৃতির দ্বন্দ্বের বিস্তৃতি পুরো আখ্যানকে আরও দ্বিধান্বিতও যেমন করেছে তেমনি ক্রমশ এক রাজনীতিক ঘেরাটোপের পরিবেশ তৈরি করেছে!


আনুর যে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অনীহা তা তারেক মাসুদ শুরুতেই পরিষ্কার করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষার যে রূপ আমরা এই সিনেমায় পাই তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক অর্থে মুশকিল। দেশি টোল শিক্ষার বিপরীতে এই ভারতে ওলন্দাজ-ইংরেজ-ফরাসি আসার আগের চিত্র এক রকম আর এর পরের চিত্র অন্যরকম। এই পরিবর্তিত সময়ের মধ্যে যে ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তার জাতীয় রূপ আজকের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু এর মধ্যেই অনেক ফাঁক থেকে যায়। ফাঁক বলছি এ কারণে যে, এরমধ্যেই কিন্তু চলমান আরেকটি ধারাও বিদ্যমান ছিলো। তা আজকের দেওবন্দি ধাঁচের না হলেও ফারসি শিক্ষার আদলে ফারসি-আরবি-উর্দুর মিশেলে আজকের মাদ্রাসা ব্যবস্থা। এইরকম মেরুকরণে তারেক মাসুদ মাটির ময়নায় যে বিগ্রহ নিয়ে আসেন তা আনুর আদলে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকেও আবার প্রশ্নের সম্মুখীন করে ঝালাই করে নেওয়া। 'লালসালু'র যে বিকট রূপ আমরা দেখি তার থেকে দেশভাগ হয়ে ধর্মান্ধতার যে জিকির 'একটি তুলসী গাছের কাহিনী'তে পাই এর মাঝে এই আখ্যানের কাজি সাহেবের বেড়ে ওঠা। নিজের সাথে নিজের বোঝপড়ার যে দিকটি সিনেমায় দেখি তা বাঙালি মুসলমানের সংকটকে যতোটা না ফেরি করে ততোটা বেশি নিজেকে নিজে খুঁজে ফেরে। শেকড় খোঁজার এই যে প্রাণান্ত চেষ্টা তা তারেক মাসুদ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যের 'পথের পাঁচালি'কে সিনেমায় যে রূপে সত্যজিৎ রায় তুলে ধরলেন তার একটি দিক বেশ স্পষ্ট যে দিদি দুর্গার বিয়োগান্তক পরিণতি আপুকে সারা জীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু একান্নবর্তী পরিবার যখন ভাঙছে, ভাঙছে চারপাশও। দরিদ্র পুজারি ব্রাহ্মণের যে সাংসারিক টানাপোড়েন এর মূলে দুরভিক্ষ, পঞ্চাশের দশকের অস্তিরতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ নানা কার্যকারণ যুক্ত ছিলো। এই সময়ের, সমসাময়িক আখ্যান আমাদের মাটির ময়না। সত্যজিৎ রায় ও তারেক মাসুদের অপু-আনু, দুর্গা-আসমার মধ্যে এক ধরণের গভীর মিল আছে। চারিত্রিক মিল তো আছেই আছে এক ধরণের সংযোগও। দুর্গারও মৃত্যু হয় জ্বরে আসমারও। অপু ও আনুর মধ্যে মিলের থেকে অমিলই বেশি। যেখানে অপু দুর্গার স্মৃতি চিহ্ন বয়ে বেড়ায় আনু সেখানে মাটির ময়নায় আসমাকে খুঁজে বেড়ায়। দুর্গার চুরি করা হাড় যেদিন অপু পুকুরে ফেলে দেয় সেদিন থেকে অপু খানিকটা ভারমুক্ত হয় আনু তা করে না। মাটির ময়না লুকিয়ে রাখে, সযত্নে!

কাজি সাহেব প্রসঙ্গে মাটির ময়নার যে ধীরস্থির চিত্র আমরা দেখি তার আড়ালে ভাঙ্গাচুড়ো হ্নদয়টিও কিন্তু স্পষ্ট দেখি। তার অপচিকিৎসায়, জ্বরে ভোগে আসমা মারা যাওয়ার পর আমরা কাজির মধ্যে বিরাট এক পরিবর্তন দেখি। তার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রতি যে দৃঢ়তা দেখি তা আসমার অকাল মৃত্যুতে ভেঙ্গে চুরচুর হতে দেখি। কাজির দেহায়বে সেই ভেঙ্গে পরা নতজানু ভুলের মাশুল প্রতি নিয়ত দেখি। তাকে ঘনঘন তসবি হাতে দেখা যায়। ঘন ঘন এক আসমানি কিতাব পড়তে দেখা যায়। ঘন ঘন দোয়া কালাম পড়তে, আনমনে বিড়বিড় করতে দেখি। শেষতক তো হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস ছাড়তে বলতেও দেখি। কিন্ত ততোদিনে তার জেদ তার বিশ্বাস সব ক্রমশ ঘোলাটে হতে যেতে দেখি। আনুর মাদ্রাসার পড়ার ব্যপারে অনমনীয় মনোভাবের কাজিকে ততদিনে আপন আলয় আসতে দেখি! চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, নৌকা বাইচ কিংবা চড়ক পুজোর যে চিত্র আমরা এই সিনেমায় দেখি তার সার্বজনীন এক ধরণের ভাষ্য আছে। আছে অন্য রূপ, অন্য রঙও। কাকতালীয়ভাবে তারেক মাসুদের মাটির ময়নার আবির্ভাব ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক রূপের যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তা এই সিনেমার ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র আছে। একাত্তরের যে ভয়াল রূপ আমরা দেখি তা মাটির ময়নায় তারেক মাসুদ যুদ্ধকে সামনে রেখে কাজি চরিত্রকে যেভাবে সংঘাতে ফেলে সিনেমার পর্দা গুটিয়ে নেন তাতে অনেক কিছুই হতে পারে। কাজির নিজেকে হারায়ে খুঁজে ফেরা, শেকড়ের সন্ধান করা এই যুদ্ধ তাঁকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে কিংবা বিপরীতও হতে পারে। তালেবান-লাদেন আইসিস বুকোহারাম খুঁজতে গিয়ে ধর্মের যে বিকট রূপ অঙ্কন হলো ধর্মের যে বাড়বাড়ন্ত হলো আমাদের দেশি প্রেক্ষাপটে বিগত বছরগুলোয় যে রূপ আমরা দেখলাম তাতে মাটির ময়নার নিজস্বতা আমরা দেখি।


তারেক মাসুদ চড়কের পুজোয় পীঠে ধারালো লোহা গেঁথে ভক্তকে, ভক্তের মুখটিকেও চড়কিতে ঘূর্ণায়নমান যেমন দেখিয়েছেন তেমনি কোরবানির পশু জবাইয়ের দৃশ্যও দেখিয়েছেন তবে তা সেন্সর করে। নিজেকে খোঁজার এই পালায় কবি গান থেকে পুঁথি পাঠের যে রুপটি তারেক মাসুদ দেখাতে চেয়েছেন তা আমরা কিছুটা হলেও দেখতে পেরেছি। পরিচালক হিসেবে তারেক মাসুদ কাজির সামনে আসন্ন, অবধারিত ভয়াল যুদ্ধকে জারি রেখে যেভাবে ক্যামেরার ল্যান্স ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়েছেন তাতে আামরা হতবিহবিহবল হলেও খুব একটা অবাক হই না। কারণ আমাদের এর পরের ইতিহাস তো জানা ছিলো। হয় কাজি সাহেব নিজেকে মাটির ময়নায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন নয়তো নিজে নিজেই তাতে আগুনে ঘি ঢেলে ঘৃতাহুতি দিয়েছিলেন!

বিঃদ্রঃ লেখাটি সেপটেম্বর, ২০১৭ 'বহুস্বর' ছোটোকাগজে প্রকাশিত হয়েছে।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মনির হোসাইন
মনির হোসাইন এর ছবি
Offline
Last seen: 2 weeks 1 দিন ago
Joined: শনিবার, এপ্রিল 20, 2013 - 10:17অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর