নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • অবাক ছেলে
  • মাহফুজ উল্লাহ হিমু
  • রাজর্ষি ব্যনার্জী
  • দ্বিতীয়নাম
  • মিশু মিলন

নতুন যাত্রী

  • রবিউল আলম ডিলার
  • আল হাসিম
  • মাহের ইসলাম
  • এহসান মুরাদ
  • ফাহিম ফয়সাল
  • সানভী সালেহীন
  • সাঞ্জানা প্রমী
  • অতৃপ্ত আত্বা
  • মনিকা দাস
  • আব্দুল্লাহ আল ম...

আপনি এখানে

আকাশ দেয়ালে একটা মেয়ের মুখ


আমার গাঁয়ের আসমা বেগম বিয়ের পরপরই স্বামীর সাথে তার কর্মস্থলে চলে যান মংলা বন্দরে। অনেকদিন থাকেন তিনি সেখানে সমুদ্র তীরে ভাড়া করা স্বপ্ন কুটিরে। একদিন গাঁয়ে খবর এলো, কি এক রোগে আকস্মিক মারা গেছে স্বামী মংলাতে। এবং তার কিছুদিন পর ভাইর সাথে একমাত্র কন্যা ইভাকে নিয়ে গাঁয়ে ফিরে এলো আসমা বেগম তার ভাইর পরিবারে। ভাই চেষ্টা করেছিল বোন আসমাকে আবার বিয়ে দিতে কিন্তু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আসমা আর নতুন করে বিয়ে বসেনকি কোথাও। মেয়েটাকে তিনি ভর্তি করান আমাদের গাঁয়ের হাই্স্কুলেই। গত বছর কি এক কাজে গাঁয়ে গিয়ে আকস্মিক দেখা হয় আসমা বেগম আর তার মেয়ের সাথে। মেয়েটা গত বছর এসএসসি পাশ করে এবার স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়েছে একাদশ শ্রেণিতে। আমার দোয়া চায় ইভা, যেন ভাল করতে পারে আসন্ন পরীক্ষায়।
:
আবার খবর পাই ছোট বোনের টেলিফোনে। জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে আসমা বেগম মারা গেছেন কিছুদিন আগে। মেয়েটি এখন বাবা-মাহীন একা মামা মামির পরিবারে থেকে পড়ালেখা করছে। ভাইবোনহীন একমাত্র ১৪/১৫ বছরের মেয়েটি কিভাবে একা সময় কাটাচ্ছে বাবার পর মাকে হারিয়ে চিন্তনে মনটা খারাপ হয় আমার। কিন্তু তারপরো ঢাকাবাসি আমি গ্রামীণ এসব সুখ-অসুখের ঘটনা এক সময় ভুলে যাই নিজের জীবন বাস্তবতার কঠিন নিগড়ে।
:
আমার ক্লাসমেট এবার গ্রামে ইলেকশন করছে নৌকা মার্কায়। আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধে বললো, "নির্বাচনের আগের দিন আমি যেন গাঁয়ে যাই একবার"। তার ইচ্ছে আমাকে নিয়ে স্বজনদের বাড়ি যাবে সে নির্বাচনি ক্যাম্পিংয়ে। এবং তাই ৩-দিনের ছুটিসহ গ্রামে সত্যি উপস্থিত হলাম ইলেকশনের দুদিন আগেই। ভোটের অনুরোধ নিয়ে বন্ধুর সাথে আসমা বেগমের ভাইর ঘরে ঢুকতেই যে কাণ্ড চোখে পড়লো, তাতে দু:খে শোকে পাথর হলাম আমি। ইভা নামের একাদশ পড়ুয়া মৃত আসমা বেগমের মেয়েটিকে একদল ফকির নানাবিধ রসায়ণে ঝাড়ফুঁক করছে। কারণ ৫-দিন থেকে মেয়েটি কেমন এলোমেলো আচরণ করছে। কেউ বলছে বদ-জীন এসেছে ইভার সাথে। কেউ বলেছে কদিন আগে মৃত মায়ের শোক ও সম্প্রতি গভীর রাতে ভয় পেয়ে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে ১৫-বছরের মেয়ে ইভা। মানে ৫-দিন থেকে ক্রমাগত বেশ কজন ফকির এনে তার মামা গ্রাম্য চিকিৎসা করাচ্ছেন এ মেয়েটিকে ভাল করাতে। ৫-দিন থেকে নাওয়া খাওয়াহীন মেয়েটাকে দেখে আঁতকে উঠি আমি। ক্রমাগত ঘুমহীনতা, তারপর নানাবিধ তেলপড়া, পানিপড়া ইত্যাদির চাপে খুবই খারাপ অবস্থা তার। মামাকে বলি কিভাবে এমন হলো মেয়েটি? চোখের জল ফেলে মামা যা বললেন তা শুনে তাজ্জব বনে যাই আমি।
:
খুব গরম পরাতে জানালা খুলে সামনের রুমে রাতে শুয়েছিল ইভা একা। কিন্তু অন্য ঘরের বৌ তাড়ানো বজ্জাত 'রিয়াজ' গভীর রাতে কু-মতলবে চুল ধরে টান দেয় ঘুমন্ত নির্দোষ ইভার। অন্ধকারে ঘুমের ঘোরে নিজের চুল টান দেয়াতে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে ইভা। চিৎকার শুনে অন্য ঘরের লোকজন দরজা জানালা দিয়ে তাকালে অন্ধকারে দৌঁড়ে পালাতে দেখে রিয়াজকে। সব জেনেও সন্ত্রাসি রিয়াজের ভয়ে মুখ খোলেনা কেউ। ভয়ে কাঁপতে থাকে ইভা তখন থেকেই। কদিন আ্গে মায়ের স্নেহাতুর আঁচলের ভেজা বৃষ্টির সুখ না সইতেই এমন ভীতিকর ঘটনায় চেতনা লোপ পায় মেয়েটির। নীরিহ মামা সব জেনেও কেবল ফকিরের করুণা ভিক্ষা করতে থাকে।
:
একটা শিশিরভেজা সবুজ ঘাসের মত ১৫-বছরের মা-মরা মেয়েটির এ কথা শুনে সমুদ্র কষ্টের নীল জলে হেঁটে যাই আমি কষ্ট বাতাসে হাত ধরাধরি করে। মামাকে বলি, "এসব তাবিজ ফকির করে মেয়েটাকে মেরে ফেলবেন আপনারা। তার চেয়ে শহরে মেন্টালের ডাক্তার দেখান"। তারপরো মামা ফকিরি চিকিৎসা অব্যাহত রাখে। আমি ফিরে আসি ঢাকাতে নিজ কাজে মন খারাপ করে। কদিন আগে খবর পাই, ফকিরি চিকিৎসায় মরণাপান্ন ইভা নামের মা মরা মেয়েটি। তেমন কিছুই খায়না, পড়ে না, রাতে ঘুমায়না সে। কেবল মৃত মায়ের কবরের উপর গিয়ে বসে থাকে আর বলে, "চারদিকে সাপ, মা আমায় ডাকছে"। নির্ঘুম প্রায় ১৫-দিন কাটছে তার কেবল পানি খেয়ে। বোনের শঙ্কা, "এমন হলে মারা যেতে পারে ছোট অবুঝ এ মেয়েটি"।
:
বোনের এসব কথা শুনে মুর্হুমুহু বজ্রের ধ্বনি শুনি মহাকালের ত্রাসের মত আবার নিজ বোধে আমি। অবশেষে সব ফেলে আবার পাড়ি দেই গাঁয়ের পথে। জেলা শহরে যখন পোস্টিং ছিল আমার, সেখানে এক মানবিক হিন্দু ডাক্তারের সাথে গভীর বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। গাঁয়ে যাওয়ার আগেই ফোন করে চলে যাই তার শহরের বাসাতে। সব শুনে মানবিক বোধে 'রথীন্দ্রনাথ বোস' নামের ঐ ডাক্তার আমার সাথে যেতে রাজি হন আমার দ্বীপগাঁয়ে ইভাকে দেখতে। এবং দুজনে চলে যাই এ গ্রীস্মের প্রচণ্ড তাপদাহে একদম বিদ্যুৎহীন গ্রামে ছোট যান্ত্রিক লঞ্চে চেপে।
:
বিকেলে ছোট লঞ্চ থেকে নামার প্রাক্কালে লঞ্চঘাটে নদীর তীরেই ইভাকে দেখতে পাই আমরা আমার বোনের সাথে। ভাবলেশহীনভাবে সে তাকিয়ে থাকে নদীর অশান্ত জলের দিকে। ঘুমহীন চোখগুলো লাল, আর না খাওয়াতে শরীর ভেঙে গেছে অনেকটা মৃত মানুষের মত। লঞ্চ থেকে নেমেই বন্ধু ডাক্তার সব শোনে তার মামা, আমার বোন আর ইভার কাছে। আসলে আতংকে এমন মানসিক বিকলন হয়েছে তার। ভয় পাওয়া, ঘুমহীনতা, না খাওয়া আর নিয়মিত স্নান না করার কারণে এমন মৃতকল্প হয়েছে মেয়েটি।একটা ডেক্সট্রোজ স্যালাইনের সাথে ভীতি নাশক আর ঘুমের ঔষধ দিলে ঐ রাতে সারারাত মৃত মানুষের মত ঘুমায় ইভা নামক জীবন্ত লাশটি। পরদিন বিকেল ৫-টার দিকেও না উঠলে ভয় পাই আমরা সবাই কিন্তু ডাক্তার বলে এখনই ঘুম ভাঙবে এবং সত্যি ঘুম ভেঙেই সে ক্ষুধার কথা বলে। ১৫-দিনে এই প্রথম সে নিজের ইচ্ছেতে খেতে চায় এবং বিস্ময়করভাবে অনেক খাবার খায় সে আমাদের সামনেই। মামী আর আমার বোন নদীর ঠান্ডা জলে অনেকক্ষণ স্নান করায় মা-হীন ইভাকে মায়ের মত। রাতে অনেকটা স্বাভাবিক কথা বলে ইভা আমাদের সবার সাথে। রাতে নদীতীরে এসে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারাভরা আকাশে নক্ষত্রমালার দিকে। পরদিন সকালে ইভাকে-সহ নদীতীরে আসি আমরা ঢাকায় ফিরবো বলে। সে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে এ দুদিনে। ডাক্তার বলে আর মেন্টাল দেখাতে হবেনা, নিয়মিত টেনশনমুক্ত থাকলে আর কোন ভয় না পেলে একদম ঠিক হবে সে।
:
তীব্র হাইড্রোলিক সাইরেন বাজায় দুরের শহরমুখি লঞ্চ। সিঁড়িতে পা রাখার আগে নীল অসীম সমুদ্রের মৌসুমিতার সুখদুখগুলো তুচ্ছ করে ইভার মাথায় হাত রেখে বলি, "তুমি ভাল হয়ে গেছো মা, এবার কলেজে যেও"। রৌদ্রবরণ জ্বলজ্বলে তপ্ত কষ্টে ভেজা চোখ তুলে তাকায় ইভা আমাদের দিকে। বলে, "থ্যাংকু ডাক্তার আঙ্কেল, থ্যাংকু কাকা"! লঞ্চ ঘাটে ভীড়লে ইভার হাত ছেড়ে দুজনে পা রাখি শহরগামি লঞ্চের সিঁড়িতে। জীবন নদীর পাড় ভাঙার অকল্যাণ শব্দের মত ইভা হাত নাড়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে। ইভার জন্যে কষ্টে ভেঙে যায় আমার মনোসমীক্ষণের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমার কালপর্বগুলো ধাপে ধাপে। লঞ্চটি ক্রমে দুরে যেতে থাকলে ধুসর হয় তীরে দাড়ানো ইভার শুকনো মুখ কিন্তু তারপরো গোটা আকাশকে ফ্রেম বানিয়ে টানাতে ইচ্ছে করে আমার আকাশ দেয়ালে মা মরা ইভার ছবিটি!

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 17 ঘন্টা 7 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর