নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 4 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • শ্মশান বাসী
  • আহমেদ শামীম
  • গোলাপ মাহমুদ

নতুন যাত্রী

  • নীল মুহাম্মদ জা...
  • ইতাম পরদেশী
  • মুহম্মদ ইকরামুল হক
  • রাজন আলী
  • প্রশান্ত ভৌমিক
  • শঙ্খচূড় ইমাম
  • ডার্ক টু লাইট
  • সৌম্যজিৎ দত্ত
  • হিমু মিয়া
  • এস এম শাওন

আপনি এখানে

“জগৎজ্যোতি দাসঃ ইতিহাসের এক অজানা বীরশ্রেষ্ঠর গল্প"


‘সেদিন জগৎজ্যোতির দলটা ছিল ৪২ জনের। খালিয়াজুড়ির কল্যাণপুর থেকে কয়েকটা নৌকায় মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলটার মূল অপারেশন ছিল আজমিরীগঞ্জ পেরিয়ে বাহুবল গিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন উড়িয়ে দেওয়া। যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধা সুবল দাসের দলকে সাহায্য করার জন্য ঘুঙ্গিয়ারগাঁও, শাল্লায় পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে গুলি বিনিময় করেছে জ্যোতির দল। সেখান থেকে ভোরে রওনা হয়ে সকাল নয়টায় ইউনিয়ন অফিসের সামনে হঠাৎ তাদের চোখে পড়ে রাজাকারদের নৌকা, তেলাপোকাগুলো নিরীহ জেলেদের নৌকা আটকে লুটপাট করছে। এক জেলে ইলিয়াসকে চিনতে পেরে আকুল স্বরে অনুনয় করল, ‘ও দাসবাবুর ভাই, আপনারা আমাদের বাঁচান।’ তৎক্ষণাৎ আক্রমণে কয়েকজন রাজাকার মারা যায় সেখানেই। বাকিরা দুই নৌকায় ইঁদুরের বাচ্চার মতো পালিয়ে আসতে থাকে। জ্যোতি বাকিদের অপেক্ষা করতে বলে ১২ জন সঙ্গে নিয়ে তাড়া করেন সেই পলায়নপর তেলাপোকাগুলোকে। অন্যরা তাঁর সঙ্গে আসতে চেয়েছিল, জগৎজ্যোতি ধমক দিয়ে বলেছেন, ‘কয়টা রাজাকার ধরতে সবার আসার কি দরকার?’

নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে শুকনো বিল পেরিয়ে তেলাপোকাগুলো পালিয়ে যায় জলসুখার দিকে। জলসুখা জ্যোতির গ্রাম। নাড়িপোতা ঠিকানা। কিন্তু জ্যোতি তখন অপারেশনে, তাই কাছে এসেও ফিরে যান। যাওয়ার সময় মর্টারের রেঞ্জে কাছাকাছি এক রাজাকারের বাড়িতে মর্টার শেলিং করেন তাঁরা।

ফেরার সময় হঠাৎই পাল্টে যায় সবকিছু। চায়নিজ রাইফেলের গুলির আওয়াজ ভেসে আসে অনতিদূর থেকে। চায়নিজ রাইফেল পাকিস্তানিদের অস্ত্র, রাজাকারদের কাছে চায়নিজ রাইফেল থাকার কথা না। তাদের দৌড় বন্দুক পর্যন্তই। বিলের কাছে আসার পর তারা দেখে, একদিকে আজমিরীগঞ্জ, অন্যদিকে শাল্লা ও মার্কুলির দিক থেকে গানবোটে করে পাকিস্তানি আর্মিরা এসে নদীর পাড়ে পজিশন নিচ্ছে।

ঠিক উল্টোদিকের বদলপুরেও গুলির আওয়াজ। রাজাকারগুলো ছিল আসলে ঘুঁটি, তাদের টোপ হিসেবে কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানিদের ত্রাস দাস পার্টিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে পাকিস্তান আর্মি। সুপ্রশিক্ষিত হিংস্র পাকি হায়েনাগুলো এত দিন রোম ওঠা নেড়িকুকুরের মতো সকাল-বিকেল মার খেয়েছে দাস পার্টির দুর্ধর্ষ গেরিলাদের হাতে, আজ তারা আটঘাট বেঁধেই এসেছে।

দুই দিক থেকেই পাকিস্তান আর্মি পজিশন নেয় নদীর পাড়জুড়ে, আর জ্যোতির দলের ১২ জন পজিশন নেয় নদী আর শুকনো বিলের মাঝে। দূরত্বটা এতই কাছে যে পাকি জওয়ানদের পজিশন নেওয়ার জন্য অফিসারদের দেওয়া উর্দু কমান্ডও শুনতে পাচ্ছিলেন জগৎজ্যোতিরা। জ্যোতি আর তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড ইলিয়াস সামনের কলামে, দুজনের হাতেই মেশিনগান আর দুই ইঞ্চি মর্টার-এরপরের সারিতে মতিউর, রশিদ, আইয়ুব আলী, বিনোদ বিহারী বৈষ্ণব, ধন মিয়া, কাজল, সুনীল, নীলু, কাইয়ুম ও আতাউর। বিপরীতে অগুনতি পাকিস্তানি সেনা। যুদ্ধ শুরু হলো সামনাসামনি।

মাত্র ১২ জন যোদ্ধা নিয়ে নিতান্তই এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত জগৎজ্যোতির কণ্ঠ চিরে হঠাৎ বেরোয় এক অদ্ভুত উৎসাহের কথা, ‘চল, আজ শালাদের জ্যান্ত ধরব, একেবারে হাতেনাতে।’ মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে অকুতোভয় দুঃসাহসে যুদ্ধ করে যাওয়া ছোট্ট দলটায় তবুও ছোবল দিতে আপ্রাণ চেষ্টায় মাতে মৃত্যু। আইয়ুব আলির মাথায় গুলি লাগে, তাঁকে দুজনের জিম্মায় দিয়ে পিছিয়ে বদলপুরের দিকে পাঠিয়ে দেন জ্যোতি। ভয়ংকর একপেশে সে যুদ্ধে একটু পর আহত হন আরেক মুক্তিযোদ্ধা। মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকে পাকিস্তান এয়ারফোর্সের ফগার, শিকারি হাউন্ডের মতো।

ওদিকে বদলপুরে থাকা মূল দলের বাকি ৩০ জনকে আটকে রাখে পাকিস্তানিদের আরেকটি দল। কোনো সাহায্য পৌঁছায় না জ্যোতির দলের কাছে, দলের মাথাটা বাগে পেয়েছে আজ পাকিস্তানিরা, কেটে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করে যায় তারা।

ক্রমেই কঠিন হয়ে যাওয়া যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইলিয়াস জিজ্ঞেস করেন, ‘দাদা, কী করব?’
নির্মোহ গলায় জ্যোতির শান্ত জবাব, ‘তোর যা খুশি কর।’
কমান্ডার যেন বুঝতে পেরেছিলেন এটাই তাঁর শেষ যুদ্ধ। শেষ যুদ্ধ পরিচালনার ভার তাই প্রিয় সহযোদ্ধার কাঁধে দিয়ে জ্যোতি মন দেন নিখুঁত নিশানার দিকে। ফুরিয়ে আসতে থাকে গুলি। ইলিয়াস বিনোদ বিহারীসহ আরও দুই-তিনজনকে পাঠান বদলপুর থেকে যেভাবেই হোক গুলিসহ রসদ আনার জন্য। বেলা সাড়ে তিনটায় হুট করে গুলি লাগে ইলিয়াসের বুকের বাঁ পাশে। হাত দিয়ে দেখেন, কী আশ্চর্য, হৃৎপিণ্ড ভেদ না করেই গুলি বেরিয়ে গেছে যেন কীভাবে।
মাথার গামছা খুলে বুকের ক্ষতস্থান বেঁধে দিতে দিতে জ্যোতি জিজ্ঞেস করেন, ‘বাঁচবি?’
বুকে বুলেটের ক্ষত নিয়ে আহত ইলিয়াস জবাব দেন, ‘মনে হয় বাঁচতে পারি।’
কমান্ডার নির্দেশ দেন, ‘তবে যুদ্ধ কর।’

১২ জন থেকে যোদ্ধার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় পাঁচজনে। একটু পরে স্রেফ ইলিয়াস আর জ্যোতি ছাড়া আর কারোর অস্ত্র থেকে গুলির শব্দ শোনা যায় না। এমনকি জ্যোতির এলএমজির গুলি সরবরাহকারীও নেই আর। মধ্য নভেম্বরের দীর্ঘ বিকেলের সেই ক্লান্ত সময়ে এক অসম্ভব যুদ্ধে লিপ্ত হন দুই যোদ্ধা। ইলিয়াস গুলি লোড করতে থাকেন, আর জ্যোতি ১০০ গজ দূরে সারিবদ্ধ পাকিস্তানিদের গুলি করতে থাকেন অকুতোভয় তীব্রতায়। নিখুঁত নিশানায়, একটার পর একটা।

মাথার ওপর দিয়ে তীব্র গর্জন করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তানিদের একটার পর একটা গুলি। তাতে বাঁধ দিতে মাঝে মাঝেই মর্টার থেকে শেলিং করছেন তাঁরা। মনে ক্ষীণ আশা, সন্ধ্যা হয়ে গেলে হয়তো পাকিস্তানিদের ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যাবে। হায়, সময় ওটুকু সময়ও দেয়নি সেদিন।

সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগে জ্যোতির মাথা ভেদ করে যায় এক আচমকা পাকিস্তানি বুলেট। গলা কাটা মহিষের মতো ছটফট করে জ্যোতির শরীর, ইলিয়াস জড়ায়ে ধরেন তারে, ডাকেন, ‘দাদা, ও দাদা’ জ্যোতি একবার মাথা তোলেন, মাথা পড়ে যায়।

যাওয়ার আগে মাতৃভাষায় স্রেফ দুটো ক্লান্ত শব্দ উচ্চারিত হয় পাকিস্তানিদের সীমাহীন আতঙ্ক আর ভয়ের কারিগরের কণ্ঠ থেকে, ‘আমি যাইগ্যা।’ সেদিন কাঁদতে পারেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাদের কাঁদার নিয়ম নেই যে। ইলিয়াস কাঁদেন ৪৩ বছর পর, ২০১৫ সালের ২০ জুন, স্বাধীন মাটিতে সেদিনের সেই যুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে। দাদার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদেন, তাঁর কমান্ডারের জন্য এ কান্না বড় শোকার্ত, তীব্র আর্তনাদের। এ কান্না হৃদয়ের গহিন ভেতরের, বড় যন্ত্রণার।“

’৭১ সালের ১৬ নভেম্বর শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস। হাওর অঞ্চলের এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম জাতীয় স্তরের মানুষজনেরা জানে বলে মনে হয় না। হাওরে এত বড় যুদ্ধও আর হয়নি। অথচ তাঁকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মানও আমরা দিতে পারিনি।

কৃতজ্ঞতাঃ
“জগৎজ্যোতি দাসঃ ইতিহাসের বীরশ্রেষ্ঠ”
মোস্তাফা জব্বার
সাম্প্রতিক দেশকাল; ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

জলের গান
জলের গান এর ছবি
Offline
Last seen: 3 weeks 48 min ago
Joined: শুক্রবার, নভেম্বর 1, 2013 - 4:15পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

কপিরাইট © ইস্টিশন ব্লগ ® ২০১৮ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর