নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • দ্বিতীয়নাম
  • বেহুলার ভেলা
  • অাব্দুল ফাত্তাহ

নতুন যাত্রী

  • সুশান্ত কুমার
  • আলমামুন শাওন
  • সমুদ্র শাঁচি
  • অরুপ কুমার দেবনাথ
  • তাপস ভৌমিক
  • ইউসুফ শেখ
  • আনোয়ার আলী
  • সৌগত চর্বাক
  • সৌগত চার্বাক
  • মোঃ আব্দুল বারিক

আপনি এখানে

অর্জন বিসর্জনের বিজয়


ভোরবেলা ঘন
কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেলে তার
মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে
যেখানে এখন কেউ কারো চেনা নয়, কেউ কারো
ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ : শামসুর রাহমান (১৯৮৩)

চল্লিশের দশকে আমরা ভেবেছিলাম ধর্মের ভিত্তিতে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে উঠলে আমাদের ভাগ্য বদলাবে। শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে ব্যক্তিক এবং সামষ্টিক উন্নয়ন ঘটবে। সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভাগের চিন্তাটা চল্লিশের দশকেই উদ্ভূত। তার আগে উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমানেরা সরকারি চাকরিতে এক অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিল বটে, একের কর্তৃক অন্যকে বঞ্চিত করার অভিযোগও ছিল, পারষ্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতিও দৃশ্যমান ছিলো। উগ্রপন্থী হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদ, এবং মুসলমান মোল্লাদের ইসলাম রক্ষার আন্দোলনও ছিলো। তবে এসবের কোনটাই কোনদিন উপমহাদেশের রাজনীতিতে প্রবল পরাক্রমশালী এবং মূলধারার রাজনীতিতে পাকাপোক্ত আসন পায়নি চল্লিশের দশকের আগে।চল্লিশের দশক জুড়ে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি একটু একটু করে রাজনীতির ডমিনেন্ট আইডিওলোজির স্থান দখল করতে থাকে।এভাবে যখন পাকাপোক্ত আসন যখন পেল তখন ক্ষীনদৃষ্টিদোষে দুষ্ট হয়ে অবিমৃষ্যকারীর মতো ধর্মের ভিত্তিতেই আমরা দেশভাগ করে ছাড়লাম।এর পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতি যায় হোক, সামনে ছিলো ধর্মীয় বিভাজনের স্থূল রাজনীতি। তার ভিত্তিতেই উপমহাদেশের মাটি ও মানুষ ভাগাভাগি। আমরা পেলাম সিংহভাগ মুসলমানের হোমল্যান্ড পাকিস্তান।

পাকিস্তান রাষ্ট্রটার মধ্যে বাস করতে যেয়ে আমরা দেখলাম ধর্মীয় ঐক্যতত্ত্ব এখানে আর কাজ করছেনা। মুসলমানই মুসলমানকে শোষণ নির্যাতন করছে। ভাবতে শুরু করলাম ঘটনা কী?তখন দেখলাম যে ধর্ম নয়, মানুষকে একতাবদ্ধ করে তার সংস্কৃতি। পূ্র্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি অনেক ভিন্ন পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে। আমাদের ভাষা, সাহিত্য, দৈনন্দিন জীবনাচার, ঐতিহ্য, লোকগাঁথা, খাদ্যাভ্যাস সবই পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে আলাদা ধরনের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বোধ আমাদের মাথায় অাসেনি চল্লিশের দশকে।তখন ধর্মের আফিমে বুঁদ ছিলাম বলে উপমহাদেশের পশ্চিম অংশের মানুষদের সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক তফাৎ চোখে পড়েনি। চোখে যখন পড়ল ততদিনে আমরা জড়িয়ে গিয়েছি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে অভিন্ন রাষ্ট্রের বন্ধনে। এবার বন্ধন মুক্তির পালা। প্রথম মুক্তি ঘটে আমাদের চেতনায়, পরে বাস্তব জগতে। চেতনার মুক্তিটা হচ্ছে আমরা উপলব্ধি করলাম যে আমরা হিন্দু হই আর মুসলমান হই আর যা ই হয়, আমরা আসলে বাঙালি।এটাই আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়। যে পরিচয় নির্ধারণ করে দিয়েছে আমাদের পরবর্তী রাজনীতির পথ পরিক্রমা।

ব্রিটিশ আমলে আইডেন্টিটি পলিটিক্সের চাইতে গুরুত্ব পেত চাকরি, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অধিকতর সুবিধা বা প্রিভিলেইজ আদায়ের "পলিটিক্স অব পিটিশন"। কিন্তু এবার আমরা ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গন্ডি পেরিয়ে উন্মোচন করলাম নিজেদের নতুন পরিচয় - বাঙালি। এর রাজনৈতিক পরিণতির নাম "বাঙালি জাতীয়তাবাদ"।বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন আমাদের আইডেন্টিটি পলিটিক্সকে আরো পোক্ত করল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আরো গতি পেল।এরই ফলশ্রুতিতে এবং ধারাবাহিকতায় একাত্তরে রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হলো।

সাতচল্লিশ থেক একাত্তর পর্বের রাজনীতিতে অনেক রকম উপাদান সক্রিয় ছিলো। শেষপর্যন্ত যদিও ধর্মের নামে গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোড় দ্বিজাতী তত্ত্বকে কবরস্থ করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিজয় হলো, কিন্তুু সমান্তরালে বিভিন্ন কায়েমী শ্রেণীস্বার্থের মানুষের ক্লাস পলিটিক্সও চলছিলো।এসব ক্লাস পলিটিক্সে সাধারণত পুঁজিপতি-লুটেরা-প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীরই জয় হয়।রুশ বিপ্লবের মতো কোন বিপ্লব হলে ভিন্ন কথা।

সাতচল্লিশে আমরা যেমন ধর্মের নামে বেহুঁশ হবার কারনে সাংস্কৃতিক দূরত্বকে বিবেচনায় আনতে পারিনি, একাত্তরে তেমনি আমরা দেখতে পারিনি বিভিন্ন শ্রেণীস্বার্থের ক্লাস পলিটিক্স।বড় বিপদ যখন সামনে আসে তখন ক্ষুদ্র স্বার্থ ক্ষণিকের জন্য বিসর্জন দিয়ে মানুষ একত্র হয় বড় বিপদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য।পাকিস্তানি শাসন আমাদের জন্য একটা বড় বিপদ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল।সেই বিপদের দিনে দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর, পেশার, বর্ণের, গোত্রের এবং স্বার্থের মানুষ দেশ স্বাধীন করার তাগিদে একত্র হয়েছিলো। তারা সত্যিই মাত্র নয় মাসে দেশটাকে শত্রুমুক্ত করেও ফেলল। বিভিন্ন শ্রেণীর বিভিন্ন স্বার্থ কিছু সময়ের জন্য চাপা থাকলো স্বাধীনতা যুদ্ধের উৎসাহে এবং উন্মাদনায়।যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে যারা মাথাচাড়া দিবে কিছুদিন পরেই।

আমরা ভেবেছিলাম সাংস্কৃতিক( ভাষা যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাত্র) ঐক্যের ভিত্তিতে দেশ গড়লেই সব শোষণ নিষ্পেষণ বঞ্চনা হতাশা থেকে মুক্তি পাবো। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেরকমই প্রতিভাস সৃষ্টি করে জনগনকে আকৃষ্ট করেছিলেন এবং তাদেরকে মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে আহবান করলেন। সেই আহবান বৃথা যায়নি।জনগনের ঐক্য দেশ স্বাধীন করল। কিন্তুু সমাজকাঠামোর পরিবর্তন কী কিছু হলো? হয়নি। সেই পাকিস্তানি আমলাতন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র আর সমাজনীতির ধারবাহিকতা বজায় থাকলো। পরিবর্তন কিছু হয়েছে অবশ্য।বাঙালিদের নিজস্ব একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, পতাকা, জাতীয় সংগীত, সংবিধান, সংসদ, বিশ্ব মানচিত্রে স্থান, রাষ্ট্রক্ষমতায় বাঙালীদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য লাভ এসব হয়েছে , ব্যবসায় বাণিজ্য, সরকারি চাকরিতে, সেনাবাহিনীতে ইত্যাদি যেসব জায়গায় সুযোগ লাভের জন্য বাঙালিরা এতোদিন পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, সে সমস্ত ক্ষেত্রে বাঙালির নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

কিন্তুু এই বাঙালি কারা?শাসনক্ষমতা লাভকারীরা বাঙালি হলেই কী ক্ষমতাহীন বিত্তহীন বাঙালিদের দুঃখ দুর্দশার অবসান হয়?শোষক বাঙালি কি এতোদিনকার শোষিত বাঙালির প্রতি সহানুভূতিশীল হবে? না হয়নি। হয়ও না।এই না হওয়াতে আমাদের চিন্তার জগতে নতুন ভাবনার উদয় হওয়ার কথা ছিলো। সেটা হয়েছে কিনা জানিনা। আমাদের বোধোদয় হওয়া উচিৎ ছিলো যে জাতিতে সে বাঙালি হোক, পাঞ্জাবী হোক বা ইংলিশ, এই পরিচয়ের চাইতে বড় পরিচয় হচ্ছে তার শ্রেণী পরিচয়। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা লাভকারী বাঙালি আর পাকিস্তানের পাঞ্জাবি ক্ষমতাবানেরা আসলে একই শ্রেণীর লোক। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানি পুঁজিবাদী সামন্তবাদী শোষক শ্রেণীর হাত থেকে "ট্রান্সফার অব পাওয়ার" হয়েছে বাঙালি সামন্তবাদী পুঁজিবাদী জোটের হাতে।যদি বাঙালিদের এই জোটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো এরা সকলেই একইধরনের স্বার্থের বন্ধনে বাধা।তাদের শ্রেণী চরিত্র অভিন্ন। সমাজের উপরতলার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত এবং রাজনৈতিক এলিট, শ্রেণী পরিচয়ে যারা বুর্জোয়া এবং লুম্পেনবুর্জোয়া, তারাই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সকল প্রকার সুফলভোগী হয়েছে।বাকীরা দর্শক মাত্র।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্তত নব্বই ভাগ যোদ্ধা এসেছিলেন গ্রাম থেকে, কৃষকেরা -শ্রমিকেরা।আর ছিলেন সেই কৃষক শ্রমিকের টাকায় শহরে লেখাপড়া শেখা তাদের সন্তান, ভাই ও স্বজনেরা।যুদ্ধ শেষে কৃষকেরা আবার গ্রামে মাঠে ক্ষেতে ফিরে গেছেন।শ্রমিক গেছে মজুরি খাটতে। স্বাধীনতার পরে কিছু স্বপ্নবান, আদর্শবান তরুন তখনকার হেজিমনিক পলিটিক্যাল আইডিওলোজি এবং সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে এবং হতাশ হয়ে নতুন রাজনৈতিক ফ্রন্ট খুলেছে। তাদের পরিণতি শুভ হয়নি। শহুরে বুর্জোয়ারাই স্বাধীনতার ফল ভোগ করেছে সবচেয়ে বেশী। কৃষকের কথা, গ্রামের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, নারীর কথা, বীরাঙ্গনার কথা, আদিবাসীদের কথা সব ভুলে গেছে।পাকিস্তানি বর্বরতার প্রথম ও প্রধান শিকার হয়েছে হিন্দু জনগোষ্ঠী;স্রেফ হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারনেই তাদের প্রতি এই বাড়তি আক্রোশ। এই কথাও কেউ বলেনা। স্বাধীনতার ফল এদের কারো ঘরেই তেমনভাবে পৌঁছাল না, অথচ স্বাধীনতার জন্য এরাই দিয়েছে সর্বাধিক।স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক বইপত্রে দেখি সব বুর্জোয়া দল আর রাজনৈতিক ও সামরিক এলিটদের ভূমিকার কথা। অধ্যাপক আহমেদ কামাল তাঁর 'কালের কল্লোল' বইয়ের মুখবন্ধে সঠিক কথাটিই লিখেছেন -" রাজনৈতিক আলোচনা আর ইতিহাসের গল্পের প্রায় সবটাই জুড়ে আছে বাংলাদেশের সমাজের উচ্চবর্গের চিন্তা,চেতনা আর তাদের গৌরবের ক্লান্তিহীন কাহিনী "। যেন মুক্তিযুদ্ধে কোন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, বেকার যুবক ইত্যাদি অংশগ্রহণ করেনি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে এই শ্রেণীর লোকই ছিলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এদেরই হওয়ার কথা মেইনস্ট্রিম। কিন্তুু শহুরে এলিট বুদ্ধিজীবী আর গবেষকদের হাতে পড়ে এরা হয়ে গেছে সাবলটার্ন। ইতিহাসে যারা ছিলো সম্মুখ সমরে,ইতিহাসের বইয়ে তারা হয়ে গেল অজ্ঞাতকুলশীল। এ এক বিরাট ট্র্যাজেডি।কাদের বিসর্জনের বিনিময়ে কাদের অর্জন! এই ট্র্যাজেডি দেখেই জাতি চরিত্র সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সুবিনয় মুস্তফী
সুবিনয় মুস্তফী এর ছবি
Offline
Last seen: 21 ঘন্টা 55 min ago
Joined: শুক্রবার, নভেম্বর 4, 2016 - 4:58অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর