নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • কিন্তু
  • মিশু মিলন
  • শুভ মাইকেল ডি কস্তা

নতুন যাত্রী

  • ফারজানা কাজী
  • আমি ফ্রিল্যান্স...
  • সোহেল বাপ্পি
  • হাসিন মাহতাব
  • কৃষ্ণ মহাম্মদ
  • মু.আরিফুল ইসলাম
  • রাজাবাবু
  • রক্স রাব্বি
  • আলমগীর আলম
  • সৌহার্দ্য দেওয়ান

আপনি এখানে

আমার দেখা ধর্ম আমার দেখা প্রেম : সুফিয়া-নিরঞ্জন পর্ব


দিন দুয়েক আগে আকস্মিক সুফিয়ার সাথে দেখা ঢাকার মার্কিন দুতাবাসের সামনের ফুটপাথে। সাথে তার স্বামী মুস্তফা আর ২-সন্তান। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, ডিভি ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিটিজেন হয়েছে সুফিয়া, তার স্বামী মুস্তফা আর তাদের সন্তানরা। অনেকদিন পর গাঁয়ের সুফিয়াকে দেখে মনে পড়ে গেল পুরণো দু:খজনক বিয়োগান্তক জীবন স্মৃতি, যা মূলত সুফিয়াকে নিয়েই। এ সুফিয়ার জন্যে আমাদের সমবয়সি "নিরঞ্জন শীল"কে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়েছিল একদিন। দুজনেই আমাদের গাঁয়ের সন্তান এবং একই স্কুলে পড়তাম আমরা। "নিরঞ্জন" কৈশোরেই তার পারিবারিক পেশা হিসেবে চুল কাটাকেই ব্রুত হিসেবে নিয়েছিল শীল পরিবারের সন্তান হিসেবে। সেভেন-এইট পর্যন্ত পড়ালেখা করে হিন্দু শীল পরিবারের সন্তান "নিরঞ্জন শীল" বাবার সাথে পুরোদমে চুলকাটার কাজে হাত লাগায় স্কুল ছেড়ে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওরা চুল কাটতো গাঁয়ের মানুষের। বছর শেষে অগ্রহায়ণ মাসে ধান দিতো গ্রামের মানুষ ওদের। আমাদের বাড়ি লাগোয়া ১০/১২টি হিন্দু পরিবারেই ছিল ওদের কুঁড়েঘর একটা।
:
এ হিন্দু বাড়িগুলোর পাশেই ছিল মুসলমান কৃষক সলমান মাঝির কুঁড়ে। মাঝির কাজ করলেও মেয়ে সুফিয়াকে সে নিয়মিত পাঠাতো স্কুলে। এ আসা-যাওয়ার পথে কিভাবে যেন "হিন্দু নিরঞ্জন" আর "মুসলিম সুফিয়ার" মাঝে প্রেমের ঘটনা ঘটে যায়। এবং এ মুসলিম মেয়ের সাথে হিন্দু ছেলের প্রেমের ঘটনা রাষ্ট্র হতে বেশি সময় লাগেনা গাঁয়ে। সুফিয়ার তাগড়া জেলে ভাই ঘটনা শুনে নিরঞ্জন আর তার বাবাকে শাসায় যেন সুফিয়ার দিকে না তাকায় এই "হিন্দু-মালাউন"। কিন্তু প্রেমে সম্ভবত ধর্ম মানেনি কোনদিন কোন কালে। তাই সুযোগ পেলেই সুফিয়া নিরঞ্জন অব্যাহত রাখে তাদের গোপন প্রেম। এবং এক রাতে এ প্রেমের পরিণাম মারাত্মক হয় আমাদের সবার চোখের সামনেই।
:
গভীর রাতে সুফিয়ার সাথে জানালা দিয়ে নিরঞ্জন দেখা করতে গেলে, ওঁৎ পেতে থাকা সুফিয়ার ভাই আর বাবা জেলেদের মাছ ধরার বল্লম জাতীয় "টেটা" নিক্ষেপ করে নিরঞ্জনকে লক্ষ্য করে। যার একটা নিরঞ্জনের বুকে, অন্যটা তার হাঁটুর নিচের মাংসে বিদ্ধ হয়। এরপর আহত নিরঞ্জনকে আটক করে রাখে তারা সারারাত। মুসলমান মেয়ের সম্ভ্রমহানি করতে এসেছিল "মালাউন" নিরঞ্জন, এক কথা নানাবিধ চিৎকারে প্রকাশ করা হলে, ঐ রাতেই কয়েকশ মুসলমান পুরুষ জড়ো হয় "মালাউন"কে উচিত শিক্ষা দিতে। রাতেই খবর পেয়ে মা-সহ আমরা যাই সুফিয়াদের ঘরে। সুফিয়ার সাথে কথা বলে এবং আহত নিরঞ্জনের অবস্থা দেথে সবাইকে শাসায় মা। বলে, "মারা গেলে সবার জেলের ঘানি টানতে হবে বাপ-বেটার। আগে নিরঞ্জনকে বাঁচাই, তারপর মালাউন ফালাউন দেখবো"।
:
গ্রাম্য মোল্লাদের বাঁধার পরও আমাদের কিশো্র বন্ধুদের আগ্রহে একটা নৌকায় করে আহত "টেটাবিদ্ধ" নিথর নিরঞ্জনকে শহরে হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে আমার মা। বাবার সাথে আমরা ৪-বন্ধু নিরঞ্জনের সাথে যাই ঐ ইঞ্জিনহীন জেলে নৌকায়। কিন্তু নদীতে ভাটির প্রবল স্রোত তথা নদীতে উজান থাকাতে, শহরে পৌঁছতে বেশ দেরী হয় আমাদের। টিনের উপরে রেখে ৪-জনে কাঁধে করে হাসপাতালে নিলে, জরুরি বিভাগের ডাক্তারটা নিরঞ্জনকে 'মৃত' ঘোষণা করে। হাসপাতালে মৃত নিরঞ্জনের বুক ও হাঁটু থেকে টেটার ফলা খোলার পর লাশ নিয়ে দ্বীপগাঁয়ে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায় আমাদের।
:
গাঁয়ে নিরঞ্জনের লাশ দেখে সুফিয়ার ভাই-বাবা পলাতক থাকে বহুদিন স্ত্রী আর কন্যা ফেলে। হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী কাঠমোল্লারাও গাঁ-ঢাকা দেয় দ্রুত অবস্থা বেগতিক দেখে । পুলিশ এলেও ঘটনা আর তেমন এগোয় না সামনে। কারণ এলাকাটি মুসলমান প্রধান এবং একজন মুসলমান মেয়ের শ্লীলতাহানি করেছে হিন্দু নাপিতের ছেলে, এমন "রটনা"তে বিশ্বাস করে গাঁয়ের অনেক সাধারণ মানুষ। আমার মাও তার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে বিষয়টার আর কোন সুন্দর নিষ্পত্তি করতে পারেনা বিধায় ব্যাপারটা প্রায় তামাদি হয়ে যায়।
:
কিন্তু সুফিয়া আর তার দরিদ্র পরিবারে অনটন দেখা দেয় প্রকট। গাঁয়ে বিদ্যমান রটনা আর দারিদ্রের কারণে সুফিয়ার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। ফেরার স্বামী সন্তানহীন অসহায় অবস্থায় সুফিয়াকে নিয়ে বেশ বিপত্তিতে পড়ে তার মা। মালাউনের সাথে সেক্স করেছে এমন বদনাম রটাতে তার বিয়ে হচ্ছিল না। তাই আমার মানবতাবদি মায়ের পরামর্শে একদিন মাসহ সুফিয়া আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। মা সুফিয়াকে বিয়ের প্রতিশ্রিত দেয়, সুফিয়ার মা আমাদের ঘরে মাকে কাজে সাহায্য করতো এটা সেটা করে। আমি ইন্টারে পড়ার জন্য তখন শহরে চলে যাই এবং ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পরও সুফিয়া ও তার মা আমাদের বাড়ি ছিল। অবশেষে ঢাকা গাড়ির গ্যারেজে কাজ করে, আমাদের গাঁয়ের এমন একটি ছেলের সাথে বিয়ে দেন সুফিয়াকে আমার মা। বিয়ের পর সুফিয়া স্বামীর সাথে ঢাকা চলে যায়। ১০/১২ বছর পর সুফিয়ার মাও মারা যান আমাদের বাড়িতেই এক ঝড়ো-বাতাসে বজ্রপাতে। আমি জীবন সংঘাতে নানা ঘা খেয়ে অনেকটা জীবন বিমুখ থাকি বহুদিন। তাই পরিচিত স্বজনের আর কোন খোঁজ নিতে পারিনি বছর দশেক। সুফিয়ার খবরো আর নেয়া হয়নি তখন। পরে জেনেছি, সুফিয়া ডিভি ভিসা পেয়ে স্বামীসহ গ্যারেজের চাকুরি ইস্তফা দিয়ে চলে গেছে মার্কিন মুলুকে।
:
এই সুফিয়ার সাথে প্রায় ১৪/১৫ বছর পর হঠাৎ ঢাকার বারিধারার অভিজাত ফুটপাথে দেখা আমার। স্বামী মোস্তফা, ২-সন্তান আর সুফিয়ার পোশাক পরিচ্ছদ, কথা বলার ঢং দেখে বোঝাই গেলনা এই আমার গাঁয়ের সেই সুফিয়া! আমায় অনেক টানাটানি করলো অভিজাত কোন রেস্তোরায় বসিয়ে লাঞ্চ করাতে। অত্যাবশ্যক কাজ থাকাতে সুফিয়ার সাথে বসা হয়নি আমার। নিজের ঠিকানা দিয়ে দ্রুত চলে যেত হলো আমাকে।
:
কিশোর বয়স থেকেই নানাবিধ জটিল ধর্মীয় ঘটনা থেকে ঐ বয়সেই ধর্ম আমার চিন্তনে জমাট বাসা বাঁধে। যার প্রগাঢ়তা পেয়েছে এ পরিণত সময়ে এখন। মানব জীবনের এসব অপিচ্ছিল বোধ, আর নিউরনের ঝাঝালো রঙে বুকটা ঝাঝড়া হয় আমার। দ্রুত বাঁক ঘুরিয়ে বারিধারা ফেলে আমি গতিময় ড্রাইভ করি বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের দিকে। এখন কোথায় যাবো জানিনা আমি, আমার জরুরি কাজ ভুলে যেতে থাকে আমার মন আর বোধ। তাই তারুণ্যে হারিয়ে যাওয়া নিরঞ্জনরূপী এক পুরুষ হই আমি ফ্লাইওভারে উঠেই। যে নিরঞ্জন পরিপুষ্ট প্রেমিক হয়েছিল একদিন। গাঁয়ের আমার প্রতিবেশি নিরঞ্জন অবোধ্য ভালবাসার মৌ ফুলের গন্ধে ভেসে গিয়েছিল একদিন মেঘনার ঘোলা জলের মত। যাকে ধর্মবাজ মানুষেরা প্রেম হারানোর কষ্টের সাথে জড়তায় নির্লিপ্ত করেছিল এ কালোতীর্ণ ভুবনে। সুফিয়াকে দেখে অনেকদিন পর নিরঞ্জন ভালবাসার ঘ্রাণে উতলা করে দেয় আমায়, আমি পুর্বাচলের দিকে সীমাহীন গতিতে উদ্দেশ্যহীন ড্রাইভ করতে থাকি। ভেঙে পড়া জীবনের রহস্যময়ী সহোদরেরা দু:খ হয়ে দৌঁড়ুতে থাকে যুগল পথে আমার সাথে। মনের পাথরে হৃদয় ছুঁড়ে ভেঙে দেয়া জীবনে দেখি আমি আমার পরিচিত নিরঞ্জনদের। আমার সাথে আকাশের মাঠে হেঁটে চলা নক্ষত্রের খেলা করে ক্রমাগত জটিলতর জীবনচক্রে, যেখানে হেঁটে চলে মৃত প্রেমিক নিরঞ্জন আর সুফিয়ারা যুগলবন্দী প্রেমিক হয়ে!

Comments

সুবর্ণ জলের মাছ এর ছবি
 

বাহ চমৎকার !

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 7 ঘন্টা 6 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর