নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • জিসান রাহমান
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • আকিব মেহেদী
  • নুর নবী দুলাল
  • হাইয়ুম সরকার

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

দ্বিধাথরথর চিত্তে দুখবাতাসের অমরাবতীর তীরে


ঢাকা থেকে এক মুক্তমনা প্রবাসি বন্ধুকে নিয়ে সমুদ্র মোহনায় বেড়াতে এসে বিকেলে নৌকো ভ্রমণে বের হলাম দুজনে। পূর্ব পরিচিত নৌকো বলে মাঝির ভূমিকাতে নিজেই 'এ্যাক্ট' করছিলাম কৈশোরিক অভিজ্ঞতায়। সমুদ্র বাতাসে জীবনের আনন্দঝড়ে পাল ওড়াবো যখন, এক অনুপম ভাললাগায় ঠিক তখনই, আকস্মিক একটা স্পিডবোটে ৩-জঙ্গী এসে একদম কাছাকাছি হলো আমাদের বোটের। কিছু বোঝার আগেই, এ সুখ-সফেন জলবাতাসে ৩-জনেই চাপাতি দিয়ে এলোপাথারি কোঁপাতে শুরু করলো আমাদের দুজনকে, কালবিলম্ব না করে হাঙরপূর্ণ এ কাফন-সমুদ্রে। কুঁপিয়ে ওরা ফেলে দিল আমাদের দুজনকে জলে ওদের বিশেষ ধর্মীয় স্লোগান তুলে। সাগরের শীতের স্বচ্ছ নীলজল টকটকে লাল রক্তে একাকার করে আমরা ক্রমে দুজনে নিমজ্জিত হতে থাকলাম, দুূ:খময় মৃত্যু জলতলে। ১ম ২/৩-টা চাপাতির আঘাতে খুব ব্যথা পেয়েছিলাম আমি, তারপর কি হলো, তা আর মনে নেই আমার। ক্রমে ভারী মাংসল রক্তাক্ত দেহ জলতলে ডুবতে থাকলে, নিচের উষ্ণ প্রবাহমান জলস্রোত দ্রুত ভাসিয়ে নিতে থাকলো আমাদের দুজনকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের খুব গভীর তলদেশীয় খাদে। এক জলবায়বীয় অনুভবহীন মৃত জগতে ভাসতে থাকলাম আমরা, যতক্ষণ না পৌঁছলাম এক বিশেষ মহাসাগরীয় খাদে।
:
একটা অভাবিত সুন্দরের মাঝে আলোকোজ্জ্বল এক ঝলমলে জলদেশের গভীরে পড়তেই আবার প্রাণতায় ফিরে গেলাম আমরা। সম্ভবত ঐ সুন্দর জলস্পর্শে আমাদের চাপাতির কোপগুলো সব নিমিশেই বিলিন হয়ে গেল। কোন ব্যথা, যন্ত্রণা, কষ্ট কিছুই রইলো না, আর আমাদের দুজনের। বরং এক শিল্পিত জীবনের শেষ প্রপঞ্চের সমাপিত আনন্দের মত, এক স্নিগ্ধ ঘ্রাণতায় ভেসে যেতে থাকলাম আমরা অসিমতার মাঝে। জীবন প্রগাঢ়তায় সুখবৃষ্টির এক সুন্দরি লীলাবতীর ধুসরতার ডাকে, এগিয়ে যেতে থাকলাম আমরা সামনে এক বিশাল বৈকুণ্ঠের মাঠ পেরিয়ে। কি বিস্ময় ! এ মাঠে চেনা-অচেনা অগণিত মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম এক বিশেষ ভঙ্গীতে। কেউ ঘুমুচ্ছে, কেউ বই পড়ছে, কেই হাঁটছে, আবার কেউ স্লোগাল তুলছে ন্যায্যতা আর মুক্তির। এখানেও!
:
খুব কাছে গিয়ে জীবন্ত এসব মানুষদের স্পর্শ করতে চাইলাম আমরা দুজনে। কিন্তু ওরা মননের এক বিশেষ ভাষায় বললো - "এটা সত্য আর সুন্দরের জন্যে কথা বলে জীবন দিয়েছে যারা, তাদের অমরাবতী। তোমরাও নীত আর নির্বাচিত হয়েছো এ জগতে। মানবিয় সভ্যতার বিষাদে পুড়ে, প্রেমজ দেহ লীন হয়ে অনন্ত সুখে ভাসবে তোমরা এ অমরাবতীর তীরে। তাই আমাদের মাঝে নিজের পছন্দমত যায়গা দেখে দাঁড়িয়ে যাও তোমরা। নতুন দ্বিতীয় সুখস্তরে নীত হওয়ার আগ পর্যন্ত, এ অমরাবতীতে থাকবে তোমরা আমাদের সাথে। কাউকে স্পর্শ করতে পারবে না কেউ এখানে। অন্যের সুখ বিনষ্ট হতে পারে তাতে এ প্রান্তরে।
:
চারদিকে তাকিয়ে প্রথম প্রেমের পৌষালী কৈশোরিক ছেলেবেলার সুখ খোঁজার মত এ অমরাবতীর তীরে মাঠময় জলঘ্রাণে হাঁটতে থাকলাম আমরা একটা অনুপম বিষাদ-আ্নন্দে! আহ! কত মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে কত-শত বিশেষ ভঙ্গীমায়! সক্রেটিস, জর্দানো ব্রুনো, মিশরীয় নব্য প্লেটোবাদী দার্শনিক হাইপেশিয়া, নিকোলাস্ কোপের্নিকাস্, হুমায়ুন আজাদ, আরজ আলী মাতবর, অভিজিৎ, জন অ্যান্ডারসন, হুগো, সভেৎলানা, হেক্টর অভালস, এজে আয়ের, অ্যালান বাদিও, বোদলেয়ার, গ্যালিলিও, জুলিয়ান বেগ্গিনি, মিখাইল বাকুনিন, সিমোন দ্য বোভোয়ার, জেরেমি বেন্থাম, সাইমন ব্ল্যাকবার্ন, ইরন ব্রুক, রুডল্ফ কার্নাপ, জেসন আরন, উলভেরিন, ফরেস্ট জে একারম্যান, ডগলাস অ্যাডামস, জর্জ আমাডু, কিংসলি আমিস, শেঠ অ্যাণ্ড্রুজ আরো কতজন! কজনকেই বা চিনি আমি! কেউ মাঘের শীত কুয়াশায় পকেটে হাত ঢুকিয়ে, কেউবা কপালে হাত তুলে সূর্যক্ষরতা নিরোধের চেষ্টায়। আবার কেউবা প্রিয় লেখকের বই পড়ছে এক বিশেষ রূপ-সুষমায়। যেন জীবন বোধের ধুসর দিনরাত্রির দ্বিধাহীন সমর্পিত এক কল্পধারা!
:
বিস্ময়কর এ স্বপ্ন জল-বাতাস মাঠে সৃষ্ট জগতের প্রতারিত, বঞ্চিত, দন্ডিত মানুষগুলো নিজ সত্যকে দৃঢ়তায় আঁকড়ে আছে এ অমরাবতীর তীরে। মিথ্যুক শাসক আর ধর্মান্ধতায় নিমজ্জিত শঠ মানুষশূন্য এ বিশুদ্ধ জীবনের গোলাভরা সোনামুখি ধানের ঘ্রাণে এগুতে থাকি আমি আরো সামনে। আমার প্রিয় কবি, যার কবিতা নিয়ে চর্চা আর গবেষণা করেছিলাম আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, হ্যাঁ সেই দেবোপম একিলিসের গোঁড়ালির মত ভঙ্গুর সকাল-সন্ধ্যার কষ্টজীবনের শাশ্বতীর কবি সুধীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেলাম এ অমরাবতীতে! পাশ দাঁড়ানোর আগে মনে প্রশ্ন জাগলো আমার, 'আচ্ছা কবিরা কি সব ভবিষ্যত সৃষ্টা হয়? না হলে কিভাবে কবি আমায় তরুণ বয়সেই শুনিয়েছিলেন -
.
"শ্রান্ত বরষা, অবেলার অবসরে,
প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া
স্বর্ণ সুযোগে লুকোচুরি-খেলা করে
গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।
আগত শরৎ অগোচর প্রতিবেশে;
হানে মৃদঙ্গ বাতাসে প্রতিধ্বনি;
মূক প্রতীক্ষা সমাপ্ত অবশেষে,
মাঠে, ঘাটে, বাটে আরব্ধ আগমনী।
কুহেলীকলুষ, দীর্ঘ দিনের সীমা
এখনই হারাবে কৌমুদীজাগরে যে;
বিরহ বিজন ধৈর্যের ধূসরিমা
রঞ্জিত হবে দলিত শেফালী শেজে।
মিলনোৎসবে সেও তো পড়েনি বাকী;
নবান্নে তার আসন রয়েছে পাতা
পশ্চাতে চায় আমারই উদাস আঁখি;
একবেণী হিয়া ছাড়ে না মলিন কাঁথা।।
একদা এমনই বাদলশেষের রাতে
মনে হয় যেন শত জনমের আগে-
সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;
একটি পণের অমিত প্রগল্ভতা
মর্ত্যে আনিল ধ্রুবতারকারে ধ’রে;
একটি স্মৃতির মানুষী দুর্বলতা
প্রলয়েরে পথ ছেড়ে দিল অকাতরে।।
সন্ধিলগ্ন ফিরেছে সগৌরবে:
অধরা আবার ডাকে সুধাসংকেতে;
মদমুকুলিত তারই দেহসৌরভে
অনামা কুসুম অজানায় ওঠে মেতে।
ভরা নদী তার আবেগের প্রতিনিধি,
অবাধ সাগরে উধাও অগাধ থেকে;
অমল আকাশে মুকুরিত তার হৃদি;
স্বাতি মণিময় তারই প্রত্যভিষেকে।
স্বপ্নালু নিশা নীল তার আঁখি-সম;
সে-রোমরাজির কোমলতা ঘাসে ঘাসে;
পুনরাবৃত্ত রসনায় প্রিয়তম;
কিন্তু সে আজ আর কারে ভালবাসে।
স্মৃতিপিপীলিকা তাই পুঞ্জিত করে
অমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণা:
সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে
আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।
একদা এমনই বাদল শেষের রাতে---
মনে হয় যেন শত জনমের আগে---
সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে ;
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে ;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে |
একটি কথার দ্বিধাথরথর চুড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী"।
:
এবং এক দ্বিধাথরথর চিত্তে বিভূতিভুষণ, অমীয় চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায় আর সুধীন্দ্রনাথের মত সাতটি অমরাবতীর মাঝে দাঁড়িয়ে গেলাম আমি এ অসীমতার সুখ প্রপঞ্চের তীরে। এসব প্রিয় মানুষদের দিকে তাকিয়ে, জীবনের আনন্দ অক্ষরেখার জোয়ারে প্লাবিত শব্দমালারা উড়তে থাকলো আমাদের চারদিকে, সুখের ডুবজলে খুঁজে মরা ধুসর প্রান্তরের দু:খবাতাসের মত!

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

ড. লজিক্যাল বাঙালি
ড. লজিক্যাল বাঙালি এর ছবি
Offline
Last seen: 23 ঘন্টা 54 min ago
Joined: সোমবার, ডিসেম্বর 30, 2013 - 1:53অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর