নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 5 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সৈকত সমুদ্র
  • জিসান রাহমান
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • আকিব মেহেদী

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

সূর্যের সঙ্গে সহবাস


সূর্যের সঙ্গে সহবাস
সাইয়িদ রফিকুল হক

শীলা নিজস্ব ডেসিং-টেবিলটার বড় আয়নার সামনে নিজেকে বারবার ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখছিলো। নিজের চেহারাটা দেখে সে সন্তুষ্ট। কিন্তু কেউ-একজন সন্তুষ্ট হবে কিনা—আজ সে তা-ই ভাবছিলো—আর নিজেকে বারবার দেখছিলো।
আজ তাকে একজন দেখতে আসবে। তবে তাদের বাসায় নয় বাইরে। আজকাল এসবই চলছে। লোকজন এখন বাইরে কনে-দেখার জোগাড়-যত্ন করে থাকে।

দেখতে সে সুন্দর। তার চেহারায় কোনো খুঁত নাই। কিন্তু বয়সের একটা ছাপ চেহারায় পড়েছে কিনা—সে তা-ই বারবার দেখছিলো। আর সে খুব মনোযোগ দিয়ে আজ নিজেকে দেখছে। এই দেখাদেখির মধ্যে আজ কেমন একটা ভালোলাগাও যেন তার মধ্যে কাজ করছে। এতোদিন তার মধ্যে এসব ছিল না। আর কয়েক বছর যাবৎ সে নিজেকে এসব থেকে একরকম গুটিয়ে নিয়েছিলো। আজ হঠাৎ করেই যেন তার মনের মধ্যে আবার একটা স্বপ্ন অঙ্কুরিত হতে যাচ্ছে। তবে এজন্য তার মা-ই নেপথ্যের শক্তি হিসাবে কাজ করেছেন।

তার ত্বকটা এখনও বেশ কমণীয় আর খুব উজ্জ্বল। কিন্তু তারপরও বয়সের একটা ছাপ থাকে। আর সময় গড়ালে সব মানুষের চেহারায়ই বয়সের একটা ছাপ পড়ে যায়। এগুলো কোনোকিছুতেই ঢেকে রাখা যায় না। সেটা সহজে লুকানোও যায় না। তবে আজকাল কসমেটিক-সার্জারির জোরে কিছু-কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া সম্ভব হলেও সবাইকে সবসময় ধোঁকা দেওয়া যায় না। তবে এক্ষেত্রে সাধারণ পুরুষদের ধোঁকা দেওয়া গেলেও সমাজে কিছু-কিছু মহিলা রয়েছে—তাদের চোখকে কখনও ফাঁকি দেওয়া যায় না। এরা খুব সহজেই মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বসতে পারে। মিশতে পারে, আর তা ধরে ফেলতে পারে। তাছাড়া, এমনও পুরুষ আছে যারা দেখামাত্র বুঝে ফেলে মেয়েটার বয়স কত! এইসব পুরুষদের নিয়ে সে খুব শংকিত। এতোদিন সে নিজের চেহারা নিয়ে খুব একটা ভাবেনি। আর প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ, সে ধরেই নিয়েছিলো—সে আর বিবাহ করবে না। কিন্তু পারিবারিক চাপে শীলা শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে রাজী হয়েছে। তবে সে চাইলেই তো আর বিয়ে করা যায় না। এজন্য আরেকটি পক্ষকেও সম্মতি দিতে হবে।
তার এই তেত্রিশ বছর বয়সে এখন চাইলেই হুট করে আর বিয়ে করা যায় না। এখন তার প্রেম করার বয়সটাও নাই। তাই, এখন তাকে একটা সেটেল-ম্যারেজের দিকেই অগ্রসর হতে হবে। আর সে এখন পারিবারিক চাপে এই কাজটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আজ তার সঙ্গে একটি ছেলে দেখা করতে আসবে। সে বিদেশে থাকে। খুব সম্ভব ছেলেটি ইতালি থাকে। আর টাকাপয়সাও নাকি তার প্রচুর আছে। পড়ালেখা সে কতদূর করেছে—তা শীলা এখনও ভালোভাবে জানে না। তবে সে পারিবারিকভাবে জেনেছে, এই ছেলেটা ঢাকার হাতিরপুলে ইতোমধ্যে একটা বড়সড় ফ্ল্যাট কিনেছে। আর এই ঢাকা-শহরেরই কয়েকটা জায়গায় তার নামে জমির প্লটও আছে। আর পড়ালেখাও নাকি একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কিছু-একটা করছে। তাতে শীলার সঙ্গে ম্যাচিংয়ে তেমন-একটা সমস্যা হবে না। আর সে নাকি দেখতেশুনতেও ভালো। আর তাদের ফ্যামিলিও নাকি শিক্ষিত। এরপর পারিবারিক চাপটা আরও বেড়ে গেছে। শীলা আর অমত করতে পারেনি। তাই, শীলা আজ-এখন একরকম কনে সাজার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শীলা এখন সালোয়ার-কামিজ পরে রয়েছে। সে আজ কী পরবে—আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এতোক্ষণ তা-ই ভাবছে। আরেকটু পরেই তাকে একদম রেডি হয়ে প্রায় কনে সেজে বাইরে বেরুতে হবে। কিন্তু শীলা এখন ঘরপোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়! এই তো বছর কয়েক আগেও সে আরও তিন-তিনবার কনে সেজে কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো। কিন্তু তাদের নাকি শীলাকে পছন্দ হয়নি। তার চেহারার খুঁত তারা খুব-একটা ধরতে পারেনি। কিন্তু প্রতিবারই ছেলেপক্ষ বলে দিয়েছে: ‘মেয়ের বয়সটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছে! আরেকটু কম হলে...।’
পাত্র নিজে এবং তার বন্ধুরা মিলেমিশে তাকে গোরু দেখার মতো করে দেখেছে। তবুও তাদের পছন্দ হয়নি! আর ছেলেপক্ষের সঙ্গে আসা মেয়েগুলোতো পারলে সেখানেই তাকে একদম ন্যাংটা করে দেখে! প্রতিবারই মেয়েগুলো শকুনের চোখ দিয়ে তাকে বারবার দেখেছে। আর তাকে কতরকমের যে প্রশ্ন করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নাই।

সে নিজেকে দেখতে-দেখতে ধীরে ধীরে গায়ের পোশাকগুলো একে-একে খুলতে থাকে। একটা সময় সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের নগ্নশরীরটা সে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। সবকিছুই তার ভালো মনে হয়। কিন্তু বুকের দিকে তাকিয়ে তার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। আর তার বুক-চিরে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘঃশ্বাস। সে দেখতে পায়—তার স্তনজোড়া একেবারে ঝুলে গেছে। এ-দুটো এখন তার নাভি ছুঁই-ছুঁই করছে। মনে মনে সে নিজের ভুলের জন্য এখন খুব আফসোস করলো।
নিজের স্তনজোড়া দেখে শীলার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। একরাশ হতাশা নিয়ে সে এভাবেই কিছুক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় সে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
এইসময় একে-একে নানাঘটনা তার মনে পড়তে থাকে। ভার্সিটিতে পড়ার সময় তার এই স্তনজোড়ার উপর অমানুষিক অত্যাচারনির্যাতন চলেছে। গত কয়েকটি বছর ধরেও এই নির্যাতন অব্যাহত ছিল। প্রেমের দাবিতে সবাই তাকে নানাভাবে প্রতারিত করেছে। কেউ তাকে ভালোবাসেনি। আর সবাই তার কাছ থেকে শুধু সুযোগ নিয়েছে!

ভার্সিটিতে ঢোকার পরপরই তার সঙ্গে পরিচয় হয় শিহাবের। তারপর বন্ধুত্ব। সেই সুযোগে শিহাব একদিন হঠাৎ তাকে প্রেমনিবেদন করে বসলো। এরপর শুরু হলো শিহাবের স্তন-আক্রমণ। সে সময়ে-অসময়ে ভার্সিটির আনাচেকানাচে, আড়ালেআবডালে যেখানে-যখন-যেমন সুযোগ পেয়েছে তা কাজে লাগিয়েছে। আর প্রেমের ভবিষত্যের কথা ভেবে শীলাও নীরবে এসব সয়ে গেছে।
শীলা তখন অনেক চেষ্টা করেও শিহাবকে বাধা দিতে পারেনি। একসময় প্রেমিক বলে সে শিহাবকে খুব খাতিরযত্ন করে দেহের এই উপরিভাগ ভোগ করতে দিয়েছে। আর চতুর শিহাবও শীলার এ দুটো জিনিস নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করে নিজের ইচ্ছেমতো তা যখন-তখন মর্দন করেছে। সে একবছরের স্তনমর্দনে শীলার দফারফা করে ছেড়েছে।
এরপর শীলা বুঝতে পারলো শিহাবের লোভ আরও অন্যদিকে। সে আরও ক্রমশ নিচের দিকেও নামতে চাচ্ছে। শীলা আরও বুঝতে পারলো: শিহাব হয়তো তাকে আর বিবাহ করবে না। সে এভাবেই তাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে।
শীলা অনন্যোপায় হয়ে নিজে থেকেই একদিন সরে পড়লো। তখন তার মনে একরাশ হতাশা এসে ভর করেছিলো। এমন সময় তার এই হতাশাভাবটা কাটাতে তার পাশে এসে দাঁড়ালো তাদের ভার্সিটির অন্য-একটা ডিপার্টমেন্টের তার দুই-ইয়ার সিনিয়র সোহেল। সে শিহাবের চেয়েও আগ্রাসী। আর মাত্র একমাসের মধ্যে সে শীলার স্তনজোড়া দখলে নিয়ে ক্রমশ আরও নিচের দিকে নামতে থাকে। আর সে কত যে মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলতে থাকে!
শীলা আর বাধা দিতে পারলো না। সোহেল শীলার স্তনজোড়া মর্দন করতে-করতে একবারে ঝুলিয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে সে নিম্নগামী অভিযানেও বেশ পারদর্শী। সে প্রতিনিয়ত নিম্নগামী অভিযানের দ্বারা শীলার নিচের দিকে নামতে চাইতো। তবুও শীলা তাকে পুরাপুরি সুযোগটা দেয়নি। শীলা তাকে পুরা দেহটা দেয়নি। অনেক কষ্টে সে নিজেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পেরেছিলো।
সে সবকিছু সহ্য করেছে শুধু একটা ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য। সে প্রতিনিয়ত দাঁতে দাঁত চেপে নিজের যৌবনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু কেউ তাকে ভালোবাসেনি। তার জীবনে সবাই ছিল খুব সুযোগসন্ধানী।
সোহেলের কার্যকলাপে শীলা একসময় অসহায় হয়ে ওঠে। কিছুদিন পরে সে বুঝতে পারলো সোহেলও তাকে বিবাহ করবে না। প্রেমের নামে সে শুধু তার দেহটাকেই খুবলে খেতে চায়। আর সে তার দেহের উপরে-নিচে কোনোদিকই বাদ দিতে চায় না।
তার অনুমানই সত্য হলো। ভার্সিটির ফাইনাল পরীক্ষার পরে সোহেলকে আর কোনোদিন খুঁজে পায়নি শীলা। তখন তার খুব কষ্ট হয়েছিলো। মাসখানেক সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে পাগলের মতো শুধু কেঁদেছে। তবুও সোহেল আর কখনও ফিরে আসেনি শীলার কাছে।

তারপর আরও কতদিন পার হয়ে যায়। সে একটা অফিসে ভালো চাকরি পেলো। কিন্তু তার মনটা অশান্ত হয়ে ওঠে। তবুও সে তৃতীয়বারের মতো আরেকটা ভুল করলো—অফিস-কলিগ হারুনসাহেবের পাল্লায় পড়ে। সেও তাকে একসময় সোহেলের মতো স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে।
সে তাকে খুব ভালোবাসার কথা বলেছিলো। তখন শীলার বয়সটা ছিল আটাশ। এইসময় তার একটা বিয়ে করার খুব ইচ্ছে হলো। আর সে ভাবলো: এবার সে সংসারী হবে। আর সে নিজের একটা ভবিষ্যৎ গড়বে। কিন্তু হিতে বিপরীত। এখানেও তার জীবনের রেলগাড়িটা থমকে দাঁড়ায়।
হারুনসাহেব তার উপরের দিকটা ইচ্ছেমতো ভোগ করেছে। সে নিচের দিকেও নামতে চেয়েছিলো। কিন্তু শীলা তার সে ইচ্ছে পূরণ করেনি। সে আগের মতোই সাবধানতা অবলম্বন করেছিলো।

হারুনের সঙ্গে শীলার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হতো। কিন্তু দৈহিকসম্পর্ক হতো না। আর তারা এসময় এমনভাবে চলাফেরা করতো—যেন একেবারে স্বামী-স্ত্রী! তবুও তাদের সেই ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি—তবুও তাদের বিয়ে হয়নি। কিন্তু হারুন ধীরে ধীরে চেষ্টা করে শীলার দেহের নিচের দিকে নামার জন্য। একটা সময় সে একেবারে মরীয়া হয়ে উঠলো। আর শীলা বুঝলো, এভাবে চলতে থাকলে সে একসময় জোরপূর্বক দেহদানের ফলে হঠাৎ গর্ভবতী হয়ে পড়তে পারে। তাই, সে হারুনকে একদিন চাপ দিলো তাকে বিয়ে করার জন্য। হারুন কয়েকদিন সময় নিলো একটা-কিছু করার জন্য। শীলা তার ভাঙ্গামনে তবুও কিছুটা আনন্দ খুঁজে পায়। কিন্তু ক’দিন পরে সে বুঝতে পারলো: হারুন তাকে বিয়ে করবে না। সে আরও পরে জানলো: হারুন নাকি তার ভয়ে এই অফিস থেকে বদলি হয়ে চলে গেছে। এরপর শীলা খুব ভেঙ্গে পড়েছিলো। আর তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো এই জীবনে সে আর বিবাহ করবে না। বিয়ের শখ তার মিটে গেছে। এখন পারিবারিক চাপে তাকে আবার সিদ্ধান্ত বদলাতে হচ্ছে। আজ আবার সে বিয়ের কনে সাজতে যাচ্ছে!

শীলার ফিগারটা এখনও চমৎকার। ভারী নিতম্বের সঙ্গে তার ভারী স্তনজোড়া বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু এগুলো অনেকখানি ঝুলে যাওয়ায় শীলা এখন আতংকিত। নইলে, তার মতো এমন সুন্দর ফিগার এদেশে খুব কম মেয়েরই আছে। তবুও শীলা আজ আশায় বুক বাঁধে। আর মায়ের মুখটি তার মনে পড়ে। তাকে সৎপাত্রস্থ করার জন্য তার মা কতই না চেষ্টা-তদবির করছেন!

শীলা মনের সকল হতাশা ঝেড়ে ফেলে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর নিজের নগ্নদেহটাকে পুনঃনিরীক্ষণ করতে লাগলো। শেষমেশ সে নিজেকে একটা কনে হিসাবে প্রস্তুত করতে লাগলো। আর
সে এখন শাড়িপরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমে সে একটা টাইট ব্রা পরলো। এটা তাকে স্তনজোড়ার ঝুলে পড়া অবস্থা থেকে রেহাই দিলো। টাইট ব্রাটা পরে তার মনে হলো: এখন কোনোকিছু বোঝার উপায় নাই। তার বুকটা এখন ষোলো বছরের একটা কুমারীমেয়ের মতোই মনে হচ্ছে।

বাঙালি-পুরুষদের অনেকেই সবসময় পছন্দের রমণী হিসাবে ষোড়শীকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর কোনো মেয়ের স্তন আকর্ষণীয় না হলে তার দিকে তাকানোটা এরা প্রয়োজনও মনে করে না। এদের ষোড়শীর স্তনের প্রতি ভয়ানক আকর্ষণ। শীলাও ব্যাপারটা ভালোভাবে জানে। তাই, সে সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
শীলা ব্রা-টার উপর ম্যাজেন্টা কালারের একটা ব্লাউজ পরে নিলো।
শাড়িটা পরে সে সামান্য প্রসাধনীর কাজটা সারতে লাগলো। ইতোমধ্যে কাজের মেয়েটা তার রুমের কাছে এসে বাইরে থেকে তাকে কয়েকবার তাগাদা দিয়ে গেছে। সে হাত চালিয়ে আরও বেশি তাড়াহুড়া করতে থাকে। তার হাতে এখন সময় একেবারে কম।

ছেলেপক্ষ তাদের দুপুর সাড়ে বারোটার সময় নিউমার্কেটের সামনে বড় চাইনিজটাতে আসতে বলেছে। এখন বাজে প্রায় বারোটা। তার তাড়াহুড়ার মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

সবকিছু ঠিকঠাক করে সে বারোটার সময় রুমের দরজা খুলে বাইরে এলো।
আর প্রথমেই সামনে পড়লো তার ছোটখালামণি। তিনি শীলাকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, “মামণিকে আজ তো খুব সুন্দর লাগছে! যেন পরীর দেশের রাজকন্যা!”
শীলা কিছু না বলে শুধু একটুখানি হাসলো।
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ওর মা বললেন, “যার জন্য সেজেছে তাদের পছন্দ হলেই ভালো।”
ওরা আর কিছু না বলে বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে।
শীলা, বাসা থেকে বের হওয়ার একটু আগে তার মা-কে সালাম করলো।
ওর মা প্রায় কেঁদে ফেললেন। আর তিনি তার হাতটা শীলার মাথার উপর রেখে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বললেন, “আল্লাহ ভরসা মা। আর তোমার খালার কথামতো চলবে। যা বলার সেই বলবে। তোমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবে। আর নয়তো নিজে উপযাচক হয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা বলার দরকার নাই।”

শীলা মায়ের কথায় মাথানিচু করে সম্মতি জানিয়ে ওর খালার সঙ্গে বাসা থেকে বেরিয়ে এলো।
নিচে ওর খালার গাড়িটা অপেক্ষা করছিলো। ওরা দু’জন তাতে চেপে বসতেই ড্রাইভার গাড়িটা ছেড়ে দিলো। একটু পরে সে গাড়ির গতিও বাড়িয়ে দিলো।
মোহাম্মদপুর থেকে নিউমার্কেটে যেতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু আজ ছুটির দিন বলে হঠাৎ রাস্তায় একটুখানি ভিড় বেড়েছে। ড্রাইভার দেখেশুনে গাড়িটা চালাচ্ছে। তবুও কোনোভাবেই একটা জ্যাম থেকে তারা কিছুতেই বেরিয়ে যেতে পারছে না।
এতে শীলার খালা নাজিরা আক্তার শীলার চেয়ে বেশি টেনশন করছেন। ঠিক সময়ে পৌঁছুতে না পারলে কী-একটা লজ্জার বিষয়। তবে তিনি আপনমনেই সবকিছু ভাবছেন। ভাগ্নীকে তিনি কিছুই বুঝতে দিচ্ছেন না।

শীলা গাড়িতে চুপচাপ বসে রয়েছে। তার মধ্যে কোনোপ্রকার তাড়াহুড়া কিংবা টেনশন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সে জানে, এসবের কোনো প্রয়োজন নাই।
নাজিরা আক্তারের টেনশন কিছুতেই কমছে না। তিনি হঠাৎ জ্যামের এই অবসরে শীলার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ছেলেপক্ষের কাছে তোর আগের সম্পর্কের কোনোকিছু স্বীকার করার বা বলার কোনো দরকার নাই।”
শীলা এতে একটু গম্ভীর হয়ে বললো, “খালা, লোকের কাছে মিথ্যা বলে লাভ কী? তারচেয়ে ওদের কাছে সত্যটা বলে দেই। ওরা সব জেনেশুনে যদি আমাকে বিয়ে করে তাহলে আমি রাজী।”
নাজিরা আক্তার এবার স্নেহমাখা হাসিতে বললেন, “মা, বিয়ের আগে তোমার তিন-চারজন প্রেমিকের কথা শুনলে বাংলাদেশের কোনো ছেলেই তোমাকে বিয়ে করতে চাইবে না। এমনকি আমার নিজের ছেলে হলেও না। তাই, বিয়েশাদীর ব্যাপারে একটুআধটু তোমাকে মিথ্যাকথা বলতেই হবে। আর এতে দোষের কিছু নাই! আমি শুনেছি, বিয়েশাদীর ব্যাপারে নাকি এসব জায়েজ!”

শীলা এসব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর সে মনভার করে বললো, “এজন্য আমার বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না। বড়আপুর মতো সারাজীবন একা-একা থাকতে ইচ্ছে করে।”
নাজিরা আক্তার মাতৃস্নেহে শীলার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন, “মা, এতো অবুঝ হলে চলে না। আমাদের দেশে একটা মেয়ের বিয়ে না করে সারাজীবন একা-একা থাকা যে কত কষ্টের—তা আমি বুঝতে পারি। তোর বড়বোন মিলাও তো এখন হাড়ে-হাড়ে এসব টের পাচ্ছে। তার এখন বিয়ের বয়স নাই বলে তাকে আমরা আর জোরাজুরি করছি না। কিন্তু তোর তো এখনও বিয়ের বয়স আছে মা। তোর এখন মাত্র তেত্রিশ। তাই বলছিলাম মা—তুই আমাদের কথাটা একটু শুনিস।”
শেষে তিনি বোনঝির হাতটা বন্ধুর মতো চেপে ধরে বললেন, “আমাদের কথাটা একটু ভাবিস মা। আর তোর মায়ের কথাটাও মনে রাখিস। আরও মনে রাখিস মা—এটা ইউরোপ-আমেরিকা নয়। এখানে তুই চাইলেও একটা মেয়ে হয়ে বিয়ে না করে সারাজীবন কাটাতে পারবি না। এদেশে মেয়েদের এখনও অনেক সমস্যা। শুধু লোকনিন্দা নয়—সামাজিক নানাকারণে লোকজন তোর জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে তুলবে। তাই, সময় থাকতে তুই হাতের লক্ষ্মী আর পায়ে ঠেলিস না, মা।”

শীলার মনোজগতে এবার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। সে মনে মনে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে থাকে। গার্জিয়ানদের কথা শুনতে তার মনটা সায় না দিলেও আপাততঃ এখন সে এসব শুনবে। তাই, সে কোনো কথা না বলে আগের মতো চুপচাপ বসে রইলো। আর তার খালার মুখের দিকে চেয়ে একটুখানি হাসলো।

জ্যামটা ছাড়ার পর নাজিরা আক্তার যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
এবার গাড়িটা আগের চেয়ে আরও দ্রুতবেগে ছুটতে লাগলো। আর বাকী রাস্তাটুকু প্রায় ফাঁকা পেয়ে ড্রাইভার গাড়িটাকে প্রায় একটানে নিউমার্কেটের সামনে নিয়ে এলো।
নিউমার্কেটের সামনে নেমে শীলা অবাক হয়ে দেখলো, সেখানে তার খালু অনেক আগে থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি ওদের দেখে হাত নাড়লেন।
শীলাকে দেখে তিনি হাসিমুখে ওর কাছে এগিয়ে এলেন।
শীলা তাকে সালাম দিলো।
নাজিরা আক্তার ড্রাইভারকে গাড়িটা পার্কিংয়ের যথাস্থানে রাখার কথা বললেন। তারপর তিনি শীলার কাছে এসে বললেন, “তোর খালুকে এখানে আমিই আসতে বলেছি। আমাদের সঙ্গে থাকতে বলেছি। অনেক ভেবেচিন্তে আমার মনে হলো যে—আমাদের সঙ্গে একজন পুরুষলোক থাকা দরকার। তোর কোনো আপত্তি নেই তো, মা?”
শীলা এবার হেসে ফেললো। আর বললো, “আমার আবার আপত্তি কীসের খালা? তোমরা যা ভালো মনে করছো—তা-ই কর।”
শীলার কথা শুনে ওর খালু হেসে বললেন, “এই তো আমাদের মামণিটা একেবারে লক্ষ্মীমেয়েটির মতো কথা বলতে শিখে গেছে!”
এতে শীলার হাসির মাত্রা কিছুটা বেড়ে গেল। সে অন্যদিকে তাকিয়ে হাসিটা লুকালো।

চাইনিজে ঢুকে ওরা ভীষণ অবাক হলো। আর দেখলো, অনুমানে বুঝলো, ছেলেপক্ষ আগেভাগেই এখানে এসে বসে আছে। আর এই বিষয়টা লক্ষ্য করে নাজিরা আক্তার স্বামীর দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করে বললেন, “ছেলেটার মনে হয় বিয়ে করার গরজ আছে!”
কথাটা বলে তিনি স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে হাসলেন।
কায়সারসাহেবও স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসলেন।

ওরাও খুব একটা দেরি করেনি। এখন সাড়ে বারোটাই বাজে।
তাই, ঘড়ি দেখে নাজিরা আক্তার খুশি মনে বললেন, “যাক, আমাদেরও তাহলে লেট হয়নি।”

ওরা এবার ছেলেপক্ষকে সরাসরি খুঁজে বের করার জন্য ছেলেপক্ষের ঘটকের কাছে ফোন করলো। আর তখনই ওদের ফোন পেয়ে একটি মাঝবয়সী-লোক ওদের কাছে এসে নাজিরা আক্তারের দিকে চেয়ে বললো, “আপনি নাজিরা-খালা?”
তিনি হেসে বললেন, “হ্যাঁ।”
তারপর লোকটি বললো, “আমার নাম ইশতিয়াক আহমেদ। গত কয়েকদিন ফোনে আপনার সঙ্গে আমারই কথাবার্তা হয়েছিলো।”
তারপর সে ডানদিকে ইঙ্গিত করে বললো, “একটু এদিকে আসুন। আপনাদের পাত্র ওদিকটায় বসে আছে।”
ওরা সাগ্রহে সেদিকে এগিয়ে গেল।
কিন্তু কাছে গিয়ে ওরা অবাক হলো। বিশেষ করে নাজিরা আক্তার ছেলেটাকে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন। তিনি দেখলেন, পাত্র কিছুটা বয়স্ক। কিন্তু ছবির সঙ্গে তার হুবহু মিল রয়েছে। আর সে যে সুপুরুষ তাতে কোনো সন্দেহ নাই।

ছেলেটি উঠে দাঁড়িয়ে নাজিরা আক্তারকে সম্ভ্রমের সঙ্গে সালাম দিলো। আর ওরা না বসা পর্যন্ত সে দাঁড়িয়েই রইলো।
এতে নাজিরা আক্তার কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে শীলাকে নিয়ে ওর সামনের আসনটাতে বসলেন। আর নাজিরা আক্তারের পাশের চেয়ারটাতে বসলেন তার স্বামী কায়সারসাহেব।

ইশতিয়াক তার বন্ধুর পাশে বসলো। আর সে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই পাত্র নামক ছেলেটি নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিতে লাগলো:

“আমার নাম শফিক আহমেদ। ইশতিয়াক সম্পর্কের দিক থেকে আমার চাচাতো ভাই এবং বন্ধুও বটে। আর এই বিয়েতে সেই আমার ঘটক। আমাদের আত্মীয়স্বজন কোনো মহিলাকে সঙ্গে আনিনি। কারণ, বিয়ে করবো আমি। এখানে আমার পছন্দই চূড়ান্ত। তাছাড়া, মহিলারা একটু খুঁতখুঁতে স্বভাবের হয়ে থাকে। সেজন্য আমরা দু’জন পুরুষ এসেছি।”
নাজিরা আক্তার একটু হেসে শফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাকে তুমি করেই সম্বোধন করি?”
শফিক হেসে বললো, “তাইতো বলবেন। আপনি খালামণি। তাছাড়া, আপনি বয়সে আমার চেযে একটু বড়ই হবেন।”
একথা শুনে নাজিরা আক্তার আগের চেয়ে আরেকটু বেশি প্রসন্ন হলেন।
তিনি কিছু বলার আগে কায়সারসাহেব বললেন, “আপনি কোন দেশে সেটেল?”
শফিক বললো, “ইতালি। তবে আমি সেখানে আর নাও যেতে পারি। বিদেশে আমার এখন আর ভালো লাগে না। সংসারের হাল ধরার জন্য আমি চব্বিশ-বছর বয়সে বিএ পাস করে ইতালি চলে যাই। আর সেখানেই পড়ে ছিলাম চব্বিশ-বছর। ছোট ভাইবোন সবাইকে মানুষ করেছি। এজন্য আমার নিজের বিয়ের কথা এতোদিন ভাবতে পারিনি। বর্তমানে আমার বয়স আটচল্লিশ। আমি এখানেই বিয়ে করে বসবাস করতে চাই। এমনকি এখানেই একটা ব্যবসা করার ইচ্ছেও আছে।”

নাজিরা আক্তার পাত্রের মুখে তার বয়স শুনে আবার ঘাবড়ে গেলেন। অনুমানে তিনি বুঝেছিলেন, পাত্রের বয়স বেশি। কিন্তু এখন শুনলেন, একেবারে আটচল্লিশ! তিনি সভয়ে বারবার শীলার মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। আর এই এসি-রুমেও একটু-একটু ঘামছিলেন!
কিন্তু শীলা খুব স্বাভাবিকভঙ্গিতে বসে রয়েছে। সে এখনও পর্যন্ত একটি কথাও বলেনি।

নাজিরা আক্তার কথার খেই হারিয়ে ফেললেন। তারপর তিনি শফিকের দিকে তাকিয়ে শীলাকে দেখিয়ে বললেন, “আপনাদের পাত্রী। ওর নাম শীলা। আমার বড়বোনের মেয়ে। সে ঢাকার সবচেয়ে নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্সসহ এম.এ. ডিগ্রী অর্জন করেছে। বর্তমানে সে একটি প্রথমশ্রেণীর সরকারি-চাকরিও করছে। আর ওর বাবা নেই। মা আছেন। বড় এক বোন আছে। আর একমাত্র বড়ভাই সস্ত্রীক গ্রামের বাড়িতে থাকে। তিনি রাজনীতি করেন বলে গ্রামেই থাকেন। নইলে, এরা শহরেরই মানুষ। ওর বাবা সরকারি-কর্মকর্তা ছিলেন। আপনাদের আর যদি কিছু জানার দরকার হয় তাহলে আমাকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারবেন।”
শফিক বেশ সুন্দর করে হেসে বললো, “এসব তো আমরা আগেই জেনেছি খালামণি। ইশতিয়াক আমাকে সব বলেছে।”
নাজিরা আক্তারের এবার সবকিছু মনে পড়লো। হ্যাঁ, তাইতো, তিনি তো আগেই টেলিফোনে ঘটককে এসবকিছু বলে দিয়েছিলেন। তবুও কেন যে এসব আজ আবার বলতে গেলেন! আসলে, তিনি এখন খুব নার্ভাস ফিল করছেন। এজন্য তার কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার বয়স বেশি শুনে তিনি চমকে গেছেন। প্রথমে তাকে দেখে তার মনে হয়েছিলো—ছেলেটার বয়স একটু বেশি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তার নিজের মুখে আটচল্লিশ শুনে তিনি এখন রীতিমতো ঘাবড়ে গেছেন।

শফিক একটু পরে কোনোরকম রাখঢাক না করে বলতে লাগলো, “এসব পারিবারিক বিষয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নাই। আমরা শুধু সুন্দর মনের একটা পাত্রী চাই। আর আমার মনে হয়—সেটা আমরা পেয়ে গেছি। আপনার ভাগ্নীকে দেখে আমাদের এখন তা-ই মনে হচ্ছে।”
একথা শোনার পর নাজিরা আক্তার ও কায়সারসাহেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
শফিক আমন্ত্রিত মেহমানদের পছন্দের খাবারের অর্ডার দিলো। এগুলো আগে থেকে রেডি করা ছিল। তাই, খাবার আসতে বেশি সময় লাগলো না।

শীলা সবকিছু এতোক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো। শফিককে তার খুব ভদ্রলোক মনে হলো। তার তাকাবার ভঙ্গিটুকু অনেক সুন্দর। আর সে মানুষের মতো তাকায়। তার রয়েছে একজোড়া মানুষের চোখ। শীলা দেখলো, সে বারবার শুধু তার মুখের দিকেই তাকাচ্ছে। শরীরের অন্য কোনোদিকে তার সামান্য খেয়ালও নাই। তার চোখ দুটিকে শীলার খুব নিষ্পাপ মনে হলো। আর সেই চোখে কোনো খাইখাইভাব নাই। সেখানে কোনো কামনার আগুন জ্বলছে না। সেখানে সে দেখতে পেলো, সৌম্যকান্ত-সুন্দর-পুরুষের এক নিখুঁত মূর্তি। তার বয়সটা একটু বেশি। কিন্তু তাকে দেখে তা বোঝার উপায় নাই। তার মনে হলো—লোকটা বুঝি বানিয়ে-বানিয়ে নিজের বয়স বেশি বলেছে। তা নয় তো কী? শীলার চোখে শফিকের বয়স নির্ধারিত হলো—খুব বেশি হলে ত্রিশ-বত্রিশ। তার পৌরুষদীপ্ত চেহারা শীলাকে বেশ প্রবলভাবে আকর্ষণ করলো। সে এতোদিন যে কয়েকজন ছেলেকে দেখেছিলো তাদের কাউকেই এতোটা উজ্জ্বল মনে হয়নি। তারা ছিল রাস্তার ঘোলাটে ল্যাম্পপোস্টের বাতির আলোর মতো। সেখানে কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবুও তারা ছেলে বলে কথা। আর তাদের সঙ্গে বিবাহের আশায় শীলা তাদের সঙ্গ দিয়েছে। কিন্তু সে আজ শফিকের মধ্যে দেখতে পেয়েছে প্রদীপ্ত সূর্যের মতো প্রচণ্ড যৌবন। এখানে মেঘের কোনো আনাগোনা সে দেখতে পাচ্ছে না। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর আর পৌরুষদীপ্ত চাহনি তাকে সত্যি মুগ্ধ করেছে।
শীলার বারবার মনে হচ্ছে—শফিকের চোখেমুখে আগের ছেলেগেুলোর মতো কোনোপ্রকার লাম্পট্যের ছিটেফোঁটাও নাই। সেখানে শুধু মনুষ্যত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। আর শফিকের আগে আর-কাউকেই তার পুরুষ মনে হলো না। ওগুলো ছিল শুধু যৌনচেতনায় আক্রান্ত বিকলাঙ্গ জীব মাত্র। আজ সে শুধু শফিকের মধ্যেই পরিপূর্ণ ও নিখুঁত পৌরুষ খুঁজে পেয়েছে।

শফিক খুব ফর্সা আর উজ্জ্বল। শীলার মনে হলো—সে যেন তার অন্ধকার জীবনে একমাত্র আশার আলো আর দুপুরের প্রখর সূর্যের মতো তেজোদীপ্ত অথচ বিনয়ী পুরুষ। এমন একটা সূর্যের সঙ্গে একই ছাদের নিচে তার সহবাস জমবে ভালো। এমন মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করার আনন্দই আলাদা। সে শফিককে এখনও পর্যন্ত মুগ্ধতার সঙ্গে দেখেই চলেছে।

শীলা কিছু বলবে ভেবেছিলো। এমন সময় কায়সারসাহেব হঠাৎ শফিকের দিকে চেয়ে বললেন, “বাবাজী, নামাজ পড়েন কিনা?”
কথাটা শুনে এখানে উপবিষ্ট সবাই কেমন যেন একটা অপ্রস্তুত হলো। এমনকি নাজিরা আক্তারও যেন মনখারাপ করলেন। কিন্তু স্বামীর অপমান হবে ভেবে তিনি কিছু বলতে পারলেন না।

শীলা খুবই অবাক হয়েছে তার খালুর এই প্রশ্নটা শুনে। এখানে, মনু্ষ্যত্ব-বিচারের কোনো চেষ্টা নাই। শুধুই নামাজ দিয়ে সবকিছু পরিমাপের অপচেষ্টা! এই সমাজের-মানুষের নির্লজ্জ আচরণ দেখে শীলা যারপরনাই বিস্মিত ও স্তম্ভিত।
সে তার খালুর এই বোকামি দেখে মনে মনে ভীষণভাবে লজ্জিত হলো। আর সে ভাবতে লাগলো: শফিক আবার কীনা-না-কী মনে করে বসে!

শফিক প্রশ্নটা শুনে ভড়কে যায়নি। সে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে অনেক ভেবেচিন্তে দেখলো, এমন একটা প্রশ্নের উত্তর না দিলে সাধারণ এই মানুষগুলো তাদের সম্পর্কে সবসময় ভুলধারণা পোষণ করেই চলবে। তাই, সে একটু হেসে খুব স্বাভাবিকভাবে বলতে লাগলো, “খালুজী, বিয়ের সঙ্গে নামাজের কোনো সম্পর্ক নাই। এখানে, শুধু দুটি মনের মিল দেখতে হবে।... আর আমি নামাজ পড়ি না। কখনও নামাজ পড়বো কিনা তাও জানি না। তবে আমরা তো সবসময় কাজের মধ্যে ডুবে রয়েছি। আমরা, আমাদের পরিবারের জন্য কাজ করছি, সমাজের জন্য কাজ করছি, রাষ্ট্রের জন্যও করছি। আর আমাদের প্রতিটি ভালোকাজই সাধারণ এই ধর্মকর্মের চেয়ে অনেক উত্তম। আর ভালোকাজের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নাই।”
চাইনিজের পরিবেশটা আগের মতো আবার স্বাভাবিক হতে থাকে। কায়সারসাহেব আর-কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। তার স্ত্রী চোখের ইশারায় সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন।
শীলাও মনে মনে শফিকের কথা সমর্থন করলো। তার মন বলছিলো—সমাজের ঘুষখোর, সুদখোর, নামাজী, হাজীপাজী, ধার্মিকদের চেয়ে এরা শতগুনে ভালো। এদের ধর্মের কোনো প্রয়োজন নাই। এরা এমনিতে ভালোমানুষ।

এমন একটা সময় পরিবেশটা রসালো করে তোলার জন্য শফিক উপযাচক হয়ে বেশ সুন্দরভাবে হেসে শীলার দিকে তাকিয়ে বললো, “আপনি কিছু বলছেন না যে! আমাকে বুঝি আপনার পছন্দ হয়নি? আর আমার বয়সটাও খুব বেশি মনে হচ্ছে? তা হতেই পারে। তবুও আমি নিজেকে এখনও একজন যুবক মনে করি।”
এই একটিমাত্র কথা শুনে শীলা শব্দ করে হেসে ফেললো। তারপর সে শফিকের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমার নাম তো খালার মুখে শুনেছেন, তবুও বলছি। আমি শীলা। আমার পুরা নাম সাদিয়া আফরিন শীলা।”
এই পর্যন্ত বলে শীলা একটু থেমে গেল। তারপর সে কিছুটা সময় নিয়ে বারবার সবার দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখতে থাকে। একসময় সে বলে ফেললো, “আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আর আপনার বয়সটাও এতো মনে হচ্ছে না। আপনি আসলেই একজন যুবক।”

নাজিরা আক্তার এবং কায়সারসাহেব যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়লেন। তবে তারা খুশি। তাদের চোখেমুখে দারুণ একটা আনন্দের আভাস যেন ফুটে উঠলো।

আর শীলার মুখ থেকে কথাটা শোনামাত্র শফিক মনে মনে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। আর সে আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে খুব সুন্দর করে আগের মতো বলতে লাগলো: “আপনাকে দেখামাত্র আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আপনার মুখে অনেক মায়া জমে আছে। আমি এমন একটি মায়াবী মুখই চেয়েছি।”

শীলার মনে হলো এতোকাল পরে সে একজন মহাপুরুষের দেখা পেয়েছে। তার অন্ধকার-জীবনে সে সূর্যের হাসি দেখতে পেয়েছে। আজই প্রথম সূর্য উঠেছে তার জীবনে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
পূর্বরাজাবাজার, ঢাকা,
বাংলাদেশ।
০৪/১২/২০১৭

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাইয়িদ রফিকুল হক
সাইয়িদ রফিকুল হক এর ছবি
Online
Last seen: 55 min 48 sec ago
Joined: রবিবার, জানুয়ারী 3, 2016 - 7:20পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর