নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 6 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • জিসান রাহমান
  • নরসুন্দর মানুষ
  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • আকিব মেহেদী
  • নুর নবী দুলাল
  • হাইয়ুম সরকার

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে “পুরুষ দিবস” এবং কিছু সাম্প্রতিক ভাবনা।


১.
পুরুষ দিবস উপলক্ষ্যে, উওমেন চ্যাপ্টারে রাফী শামস এর লেখাটি পড়ে ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে এই জন্যে যে, যেখানে আমাদের প্রখ্যাত নারীবাদীরা “পিতৃতন্ত্র” শব্দটিকে “পুরুষতন্ত্র” বানিয়েছেন আর তারপরে “পুরুষতন্ত্র”কে বানিয়েছেন পুরুষের “শিশ্ন”র সমার্থক, সেখানে রাফি শামস এর মতো তরুনতর ব্লগার-লেখক পিতৃতন্ত্রের উপরে তাঁর ধারণার স্বচ্ছতা উপস্থাপন করছেন, এটা আগ্রহউদ্দীপক। আমি আশংকা করছি, এই লেখাটির জন্যে তিনি আমাদের নারীবাদীদের বিশেষত তাঁদের অনলাইন উম্মত বা প্রতিনিধিদের আক্রোশের তালিকাভুক্ত হয়ে যেতে পারেন ইতিমধ্যেই, তাকেও হয়তো পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসাবেই তকমা পেতে হবে (আমার বিশ্বাস তিনি ভালোবাসা দিয়ে সেই সকলকে নিরপেক্ষ করতে পারবেন)। এই ধরনের লেখা আমাদের আশা জাগায়। আশা জাগায় এইজন্যে যে, এই ছোট্ট লেখাটিতেও তিনি তাঁর বোঝাপড়ার স্বচ্ছতার নিশানা রেখেছেন। আমাদের আত্মদাবীকৃত নারীবাদী বন্ধুদের মতো লেজেগোবরে জড়িয়ে ফেলেন নি। আগ্রহী পাঠকেরা তাঁর লেখাটি পড়ে নিতে পারেন এখান থেকে। (এখানে)। রাফি মূলত তাঁর লেখাটিতে “পিতৃতন্ত্র” সম্পর্কে একটি দারুন মৌলিক ধারনাকে ব্যাখ্যা করেছেন।

২.
রাফি তাঁর লেখাটি শুরু করেছেন এভাবে –


“আমাদের মাঝে ‘পুরুষতন্ত্র’ নিয়ে একটা মিসকনসেপশন আছে। আমরা পুরুষ আর পুরুষতন্ত্রকে এক করে ফেলি। পুরুষতন্ত্র কোনও ব্যক্তি পুরুষ নয়, এটা একটা সিস্টেম। আমরা যখন পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলি, তখন মূলত এই সিস্টেমের বিরুদ্ধেই কথা বলি, কোনও ব্যক্তি পুরুষের বিরুদ্ধে নয়”।

তিনি খুব সহজ করে ব্যাখ্যা করেছেন – “পুরুষতন্ত্র” আসলে সামাজিক ভাবে বিনির্মিত একটি চিন্তাপদ্ধতি বা সিস্টেম। তাই ব্যক্তি পুরুষ আর সিস্টেম হিসাবে “পুরুষতন্ত্র” আলাদা বিষয়। আলাদা বলেই পুরুষ নিজেও এই “সিস্টেম” এর শিকার হতে পারে এবং এই “সিস্টেম” থেকে বেরুতে পারেনা।

৩.
ম্যারীল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশিয়লজি’র অধ্যাপক এবং লেখক ফিলিপ কোহেন তাঁর একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে (সূত্র) লিখেছেন, আমেরিকার ভোটারদের মাঝে এখন নারীরাই প্রধান অংশ। কিন্তু তাঁরা নির্বাচন করছেন জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা কে, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তিনি ইঙ্গিতে উল্লেখ করেছেন, এমন কি ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিক থেকে নারী সঙ্গীর প্রতি চরম বিশ্বাসভঙ্গের পরিচয় দেবার পরেও আমেরিকার নারী ভোটারেরা পুনরায় নির্বাচিত করেছিলেন বিল ক্লিনটনকে। এমন নয় যে এই সময়ে বিখ্যাত – অবিখ্যাত মিলিয়ে কোনও নারী প্রার্থী ছিলেন না। কেনো নারী ভোটারেরা পুরুষদেরকেই তাঁদের নেতা হিসাবে নির্বাচন করেন? কেনো আমেরিকার মতো একটি অগ্রসর দেশেও নারীরা তাঁদের নেতা হিসাবে নারীকে বা নারীদের নির্বাচিত করেন না? কেননা তাঁরা নারী – পুরুষ এই বায়োলজিক্যাল পরিচয়ের চাইতেও একটা সিস্টেম বা পদ্ধতির অংশ হিসাবেই সমাজে অংশ গ্রহন করেন। এই পদ্ধতিটি হচ্ছে পিতৃতন্ত্র (যাকে আমাদের নারীবাদীরা “পুরুষতন্ত্র” বলতে ভালোবাসেন, আপাতত এই লেখায় “পিতৃতন্ত্র” কে “পুরুষতন্ত্র” হিসাবেই লিখবো)। এটা প্রমান করে, “পুরুষতন্ত্র” আসলে নারী বা পুরুষে নয়, পুরুষতন্ত্র আমাদের মাথায়। এটা পুরুষের ও নারীর মাথায় সমান ভাবে বিদ্যমান। এটা একটা চিন্তাপদ্ধতি, জীবন পদ্ধতি, রাজনীতি – অর্থনীতি ও দর্শনও বটে।এটা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবে বিনির্মিত চিন্তা পদ্ধতি, দার্শনিক অবস্থান।

৪.
আমার মা বিয়ের পরে তাঁর পিতৃপ্রদত্ত নামটি বদলাননি। এমন কি বদলানোর কোনও প্রয়োজনও হয়নি। এমনকি খানিকটা অবাক করা বিষয় যে, আমার মা জানতেনও না যে বিয়ের পরে অনেক নারী তার নিজের নাম পালটে তার সাথে স্বামীর নামের কিছু অংশ যোগ করে দেন। যদিও আমার মা’র জন্মের বহু আগেই আমাদের একজন প্রধান নারীবাদী বেগম রোকেয়া তার নামের সাথে স্বামীর নামের অংশ যুক্ত করে দেখিয়ে দিয়েছেন, কি করে তা করতে হয়। আমার পাঁচ জন চাচী ও পাঁচজন ফুপু (মাশাল্লাহ! আমার দাদা - দাদীর জন্যে গৌরব বোধ করছি)। এঁদের কেউই তাঁদের নামের সাথে তাঁদের স্বামীর নাম কিম্বা পিতার নাম যোগ করেননি। করতে হয়নি। শুধুই বেগম, খাতুন, বিবি ইত্যাদি “নারী সূচক” আফটার নাম নিয়েই তাঁরা জীবন পার করে দিলেন। এর মানে এই নয় যে তাঁরা খুব স্বাধীন ছিলেন, মোটেও স্বাধীন ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের বাবার পরিচয়ে এবং পরে স্বামীর পরিচয়েই পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু নামের পেছনে বাবার ও স্বামীর নামের অংশটি নিয়ে কথা বলছি, কেননা বাবার ও স্বামীর নাম গ্রহনের সাথে পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্রের সাথে পুরুষের পার্থক্য টা বোঝা যাবে। এঁরা তাঁদের স্বামীর নাম নেন নাই। এঁদের সকলেই গ্রামের মানুষ। আমার মা-চাচীরা খুব বেশী পড়াশুনার সুযোগ পাননাই। ফুপুরা কলেজে পড়েছেন। কিন্তু কোনও বিচিত্র কারণে তাঁদের কারও নামের সাথেই তাঁদের বাবার কিম্বা স্বামীদের নাম যুক্ত হয়নি। কেনো? কেউ বলতে পারেন? কারণ, আমাদের পিতৃতন্ত্রের নিয়মে, নারীর নামের শেষে পিতার ও স্বামীর নাম যুক্ত করার প্রথাটি সাম্প্রতিক। কিন্তু পশ্চিমে এটা সাম্প্রতিক নয়, পুরনো এবং শক্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু দুনিয়ার অপর প্রান্তে কি ঘটছে দেখুন। মাত্র ৯% আমেরিকান নারী বিবাহের পরেও তাঁদের নিজেদের পারিবারিক নাম বা পদবী বা আফটার নেইম ব্যবহার করেন। বাকী ৯১% নারী বিবাহের পরে তাঁদের নিজেদের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর পদবী বা আফটার নেইম গ্রহন করেন। কেনো? আমেরিকার মতো একটি গণতান্ত্রিক, আধুনিক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন একটি অগ্রসর দেশে, সমাজে কি নারীকে বাধ্য করা হয় স্বামীর নাম গ্রহনের জন্যে? আমেরিকার নারীরা কি আমার চাচী-ফুপু-মা’র চাইতেও পশ্চাদপদ? অশিক্ষিত? আন্ডার প্রিভিলেজড? না, তা নয় মোটেও। তাহলে কারণটি কি? কারণটি হচ্ছে সিস্টেম বা পদ্ধতি। কারণটি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিকতা, ইংরাজিতে যাকে আমরা বলি “Institutionalization”। এই Institutionalization শব্দটার অর্থ অভিধানে এইভাবে লেখা হয়েছে এইভাবে -

“the action of establishing something as a convention or norm in an organization or culture”।

অর্থাৎ যখন কোনও চিন্তাকে বা বিষয়কে সমাজে মূল্যবোধ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। যখন কোনও চিন্তা সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করে, সেই পদ্ধতি বা কর্মটাকে বলে Institutionalization বা প্রাতিষ্ঠানিকীকরন। পুরুষ শুধু তার আধিপত্যকে চাপিয়ে দিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েনি, সেই আধিপত্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে এবং দেয়ার জন্যে সকল ব্যবস্থা করেছে। আমেরিকার নারিদের এই রকম গণদরে বিবাহের পরে স্বামীর নাম গ্রহনের জন্যে এখন আর ব্যাক্তি পুরুষকেই দানবের আকারে আবির্ভূত হতে হয়না। প্রতিষ্ঠান, আইন কিম্বা সামাজিক মূল্যবোধই সেই দায়িত্ব পালন করে।

প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিষয়টি ঘটে কখনও ধর্মের নামে, কখনও সংস্কৃতির নামে, কখনও আইনের নামে আবার কখনও বা মূল্যবোধের নামে। কিন্তু যখন কোনও বিষয় সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করে তখন তার বিরুদ্ধে সংগ্রামটির চরিত্র যায় বদলে। ব্যক্তি শারীরিক ভাবে দৃশ্যমান কিন্তু প্রতিষ্ঠান, প্রাতিষ্ঠানিকতা সবসময় তাঁর শরীর নিয়ে হাজির থাকেনা। যারা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য বোঝেন না তাঁরা ব্যক্তি মানুষের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কতটা ভিন্ন সেটাও বোঝেন না। ফলে আমাদের দেশের আত্মদাবীকৃত নারীবাদীদের লেখালেখির মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে “পুরুষ”, পুরুষতন্ত্র নয়। তাঁরা মনে করেন পুরুষের বিরুদ্ধে সংগ্রামই পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করবে। কেননা পুরুষতন্ত্র তো আকাশ থেকে “টুপ-টাপ” করে খসে পড়েনি। পুরুষতন্ত্র তো পুরুষেরই তৈরী, তাইনা? তাই যখন পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের মাঝে তফাতের প্রসঙ্গ ওঠে, তখনই তাঁরা মনে করিয়ে দেন, পুরুষতন্ত্র তো আকাশ থেকে আসেনি, পুরুষতন্ত্র তো পুরুষেরই তৈরী। কিন্তু পুরুষতন্ত্র যে পুরুষের হাতে তৈরী একটা স্বয়ংক্রিয় দানব, যে তার স্রষ্টাকেও গিলে খায়, এটা তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না।

৫.
ইংরাজিতে অনেকেই লেখেন – "I cannot agree more", অর্থাৎ আমি এই কথার সাথে শতভাগ একমত। হ্যাঁ, রাফি শামস এর সাথে আমি একশোভাগ একমত। পুরুষ ও “পুরুষতন্ত্র” নিয়ে আমাদের মাঝে ভয়াবহ রকমের মিসকনসেপশন আছে, এবং এই মিসকনসেপশন এর কারণেই “পুরুষতন্ত্র” বা পিতৃতন্ত্র’র বিরুদ্ধে আমাদের কোনও শানিত আন্দোলন গড়ে ওঠেনি আজও। কিছু শহুরে এলিট নারীর চাকুরীতে সাফল্যকে আমরা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজয় হিসাবে দেখি, কর্পোরেট উচ্চ পদস্থ নারী কর্মকরতাদের সাফল্যকে আমরা সামগ্রিক অর্থে নারীর সাফল্য হিসাবে দেখি, কেননা আমরা দেখি, নারীটি তাঁর চারপাশের প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষদের ছাড়িয়ে ক্ষমতাবান হয়ে উঠছেন। অর্থাৎ এখানে ব্যক্তি প্রধান হয়ে ওঠেন। তাই যুদ্ধটা – সংগ্রামটা ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির হয়ে ওঠে। পুরুষের সাথে নারীর যুদ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই মিসকনসেপশন এর কারণটি কি? এই মিসকনসেপশন এর উৎসটি কি? কোথায়? কেনো? এই প্রশ্নগুলো রাফি শামস এর লেখায় আসেনি, হয়তো পরে সময় করে তিনি লিখবেন আবারো। একটি ব্লগে এই সকল প্রশ্নের আলোচনা সম্ভবও নয়। এই সকল প্রশ্ন জরুরী।

৬.
উপরে করা আমার প্রশ্নগুলোর একটি প্রশ্ন নিয়ে আমি খানিকটা ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। “পুরুষতন্ত্র” কে “পুরুষ” ভাবার এই মিসকনসেপশন এর কারণ কি? এই ভুল ধারণার উৎস কি? বিস্তারিত আলোচনার আগে, আমাদের একজন প্রধান নারীবাদী লেখকের একটি উদ্ধৃতি তুলে দেই এখানেঃ

“পুরুষ বিশ্বাস করে এবং নারীকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুটি, মানুষ প্রজাতির মধ্যে পুরুষ নামক যে প্রানীটি আছে, তাঁর উরুসন্ধিতে দুই বা তিন ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের যে লিঙ্গ ঝুলে থাকে সেটি”।

তসলিমা নাসরিন (২০১৩), পুস্তক – নিষিদ্ধ

আমি জানি, তসলিমা নাসরিনের এই উদ্ধৃতিটি ব্যবহারের ঝুঁকি আছে। তবুও ব্যবহার করেছি, কারণ এই উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করার একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। আমাদের নারীবাদী লেখালেখিতে, সাহিত্যে, গবেষণায়, চিন্তা-ভাবনায় কি বিপুল অতিসরলীকরন আছে তার একটি উদাহরণ দেবার জন্যে তসলিমা নাসরিনের এই উক্তিটি ব্যবহার করছি। মূল পুস্তকটি আমি পড়িনি। এই উদ্ধৃতিটি মূলত তসলিমা নাসরিনের উম্মত বা সমর্থকদের দ্বারাই প্রচারিত। “তসলিমা পক্ষ” বলে যে অনলাইন সংগঠনটি রয়েছে, এই বানীটি তাঁদের দ্বারাই প্রচারিত। তবে অনেক ঘাটাঘাটি করে কয়েকটি অনলাইন উৎস থেকে আমি তসলিমা নাসরিনের মূল প্রবন্ধটি পেয়েছি এবং পড়েছি, এই উদ্ধৃতিটি আসলে তসলিমা নাসরিনেরই। কোনও সন্দেহ নেই, তসলিমা নাসরিন আমাদের প্রধান নারীবাদী লেখক এবং হয়তো তাঁর এই উদ্ধৃতিটিতে স্যাটায়ার কিম্বা ব্যাঙ্গাত্মক প্রকাশই মূখ্য, কিন্তু বাংলা ভাষায় পুরুষতন্ত্র নিয়ে আমাদের বোঝাপড়াগুলো উপরের এই উদ্ধৃতির মতোই ভয়াবহ রকমের অতিসরলীকৃত। দর্শন কিম্বা চিন্তার জগতে এই ধরনের সরলীকরণের নাম “রিডাকশনিজম”। কিন্তু “রিডাকশনিজম” শব্দটি আপাতভাবে নেগেটিভ হলেও, এর চর্চাটি সদর্থক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, কোনও জটিল বিষয় বা চিন্তাকে সরল করে উল্লেখ করা যেতে পারে যদিনা তাতে তার মূল ইতিহাস, প্রেক্ষিত, বোঝাপড়া বদলে না যায়। কিন্তু তসলিমা নাসরিনের উপরের উদ্ধৃতিটিতে আমাদেরকে, আমাদের সংগ্রামের লক্ষ্যকে পুরুষের ক্ষমতা ও ডমিন্যান্স এর কারণ হিসাবে ঐতিহাসিক ভাবে পুরুষের হাতে গড়ে ওঠা “পিতৃতন্ত্র”র বদলে পুরুষের শিশ্ন’র দিকেই তাক করে দেয়, অর্থাৎ “পিতৃতন্ত্র”র বদলে ব্যক্তি পুরুষ হয়ে ওঠেন প্রধান টার্গেট। পদ্ধতি বা সিস্টেম এর বদলে ব্যক্তি পুরুষকেই প্রধান করে তোলে এই ধরনের সরলীকৃত চিন্তা। আমাদের আত্মদাবীকৃত নারীবাদীদের চিন্তায় এই রকমের হাজার হাজার নমুনা আছে। তাইতো রাফী শামস কে নতুন করে প্রবন্ধ লিখতে হয় পুরুষ ও পুরুষতন্ত্র বোঝানোর জন্যে।

৭.
ফিরে আসি শামস রাফী’র লেখা প্রসঙ্গে। প্রথমত বলে নেয়া ভালো, এই “মিসকনসেপশন” থাকাটা কোনও মন্দ কিছু নয়। কোনও নেগেটিভ বিষয় নয়। বিষয়টি ভালো-মন্দ মূল্য বিচারের নয়। সামাজিক বিজ্ঞানের বহু বহু বিষয় নিয়ে আমাদের ভুল কিম্বা বিভ্রান্তিমূলক কিম্বা আধা সঠিক ধারণা নিয়েই আমরা বড় হই। নিশ্চিত ভাবেই প্রত্যক্ষ আন্দোলনের সংগ্রামের ইতিহাসে এই সকল ‘মিসকনসেপশন’ এক সময় দূর হয়ে যায়, যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অনলাইন জগতের আত্মদাবীকৃত নারীবাদীদের অসংখ্য লেখালেখি পড়েছি আমি, হয়তো এই পড়াশুনা যথেষ্ট নয় কোনও উপসংহার লেখার জন্যে, কিন্তু কয়েকশো ব্লগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনা পাঠ করার পর, আমার মনে হয়েছে, এখন হয়তো আমার ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার কথা বলা যেতে পারে। – এই মিসকনসেপশন এর উৎস আসলে -

ক – আমাদের চিন্তাভাবনায় ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকেই দুনিয়ার ইতিহাস বলে মনে করার প্রবনতা

খ – আমাদের ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের অতিসরলীকৃত অনুধাবন (over simplified interpretation)

গ - ইতিহাসকে বিশ্লেষণের দ্বন্দ্বমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব

ঘ – দুনিয়ার বিভিন্ন সমাজে নারীর সংগ্রামের ইতিহাসকে না জানা, না জানতে চাওয়ার প্রবনতা এবং সর্বোপরি

ঙ. “পিতৃতন্ত্রের ইতিহাস” না পড়া এবং পড়তে না চাওয়া

৮.
পুরুষ নারীর চাইতে শ্রেষ্ঠ, এটা কি স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক? নাকি এই ধারণা পুরুষের সৃষ্ট? আমি মুসলমান পরিবারের সন্তান তাই আমি এর সহজ উদাহরণ দেই কুরআনের সুরা নিসা থেকে। সুরা নিসার আগেও আরবে নারীরা পুরুষের দ্বারা পদানত ছিলো। কিন্তু সুরা নিসাতে, কথিত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর পক্ষে মুহাম্মদ ঘোষণা করলেন, পুরুষের প্রতি নারীর বশ্যতা আসলে আল্লাহ্‌ নির্ধারিত, নারীকে পুরুষের চাইতে কম সক্ষম করে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং এটাও আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত। এরও আগে খ্রিষ্ট ধর্ম কিম্বা অন্যান্য প্রাচীন ধর্মও একই কথা বলেছে বহুবার। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আগেও বিভিন্ন সমাজে নারীকে পদানত করা হয়েছে। নারীকে পুরুষের সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমন কি নারীকে একাধিক পুরুষের যৌথ সম্পত্তি হিসাবে ব্যবহারের নমুনাও আছে ইতিহাসে। এসকল ইতিহাস প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মেরও আগের ইতিহাস। সুতরাং শুধু ধর্ম আর তার দালালেরাই নারীকে দমন করেছে যুগে যুগে তা নয়। কিন্তু ধর্মগুলো এসে প্রতিষ্ঠিত করেছে, নারী যে পুরুষের চাইতে কম সক্ষম এটা শুধু স্বাভাবিকই নয়, এমন কি এটা ঈশ্বর নির্ধারিত। ধর্মগুলো ব্যাখ্যা করেছে, এটা পুরুষের সৃষ্ট নয় বরং এটাই ঈশ্বর নির্ধারিত। ভেবে দেখুন তো, মুহাম্মদের তথাকথিত “নবুয়ত” এর নামে তিনি যখন নারী বিষয়ে এই সুরা নিসার আয়াত গুলো দুনিয়াতে প্রচার করলেন, সেই আয়াত গুলোর বয়ান, বক্তব্য পনেরশো বছর আগে যখন কয়েকশো মুসলিম ছিলো আরবে, সেই সময়ে কেমন শক্তিমান ছিলো, আর আজকে কেমন শক্তিমান? অর্থাৎ, মুহাম্মদ একজন ব্যক্তি এবং পুরুষ ছিলেন। “নবুয়ত” এর নামে তিনি তাঁর নিজের কথাগুলোকেই চালিয়ে দিয়েছিলেন আরো অনেকের মতো করেই। এতে করে, মুহাম্মদ নিজেকে ক্ষমতাবান করেছেন, তার ইচ্ছাপুরন ঘটেছে, তার কাজকর্ম গুলোকে জায়েজ করা হয়েছে। কিন্তু মুহাম্মদ তো মারা গিয়েছিলেন মাত্র বাষট্টি বছর বয়সে। যুদ্ধবাজ এক নেতা হিসাবে তিনি প্রবল ক্ষমতা উপভোগ করেছেন দশ বছরেরও কম সময়। কিন্তু সুরা নিসার প্রভাবটি কি কেবল দশ বছর ছিলো? না ছিলোনা, বরং সুরা নিসা, আরো হাজার গুণ বেশী শক্তিমান হয়েছে পরবর্তী শতাব্দী গুলোতে। কেননা, সুরা নিসা কেবল আর মুহাম্মদ নামের একজন ব্যক্তির প্রতারনাময় “বয়ান” হিসাবে থাকেনি, সুরা নিসা প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে প্রায় দেড়শো কোটি মানুষের মাঝে। এটাই ব্যক্তি আর প্রাতিষ্ঠানিকতার শক্তির তফাৎ। ইসলাম তাই এখন আর মুহাম্মদ নয়, তার চাইতে কয়েক কোটি গুন শক্তিমান একটি প্রতিষ্ঠান। তাই নারীর সংগ্রামটি এখন আর ব্যক্তি মুহাম্মদের বহুবিবাহ আর তার অনিয়ন্ত্রিত যৌনকাতর ব্যক্তিচরিত্রের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারীর সংগ্রামটি এখন তার চাইতেও লক্ষ কোটি গুণ কঠিন হয়ে উঠেছে। যদি সংগ্রামটি পুরুষের বিরুদ্ধে হয় তাহলে তো ব্যক্তি মুহাম্মদ কিম্বা তার উত্তরাধিকারী মোল্লাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হবে, – নারীর সংগ্রামটি কি এখন মুহাম্মদ কিম্বা তার শারীরিক প্রতিনিধি ইসলামী মোল্লাদের বিরুদ্ধে? নাকি ইসলামী আইনের বিরুদ্ধে? শরীয়া আইনের বিরুদ্ধে? ইসলামী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে? মডারেট মুসলিম নামের আধুনিক পোশাকের পুরুষ ও নারীর চিন্তার বিরুদ্ধে?

৯.
রাফি শামস এর লেখাটি বরং আমাকে ভিন্ন একটি ভাবনার যোগান দিয়েছে। আমি প্রশ্ন তুলছি, কেনো পুরুষের জন্যে “আরো একটি” দিন লাগবে “পুরুষদিবস” হিসাবে? কেননা ইতিহাসে বছরের প্রতিটি দিবসই হয়েছে পুরুষের। হাজার হাজার বছর ধরে বছরের ৩৬৫ টি দিবসের প্রতিটিই হয়েছে পুরুষের। যে দিন গুলোতে পুরুষ ছিলো সিদ্ধান্ত গ্রহনকারীর ভুমিকায়, বিচারকের ভুমিকায়, নেতার ভুমিকায়। সেই ইতিহাসের খানিকটা পরিবর্তন হতে শুরু করে করেছে, কিন্তু আজও দুনিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহনের মূল ক্ষমতা পুরুষতন্ত্রের কাছে। কেবল উদাহরণ হিসাবে, যদি আজকের আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের কথাই ধরা হয়, ফরচুন ৫০০ কোম্পানীর শীর্ষতম পদগুলোতে এখনও ৯৭% পুরুষেরই আধিপত্য। এরাই সিদ্ধান্ত নেন, দুনিয়ার কোথায় মানুষ খাবে, কোথায় কম খাবে আর কোথায় অনাহারে থাকবে। এরাই সিদ্ধান্ত নেন, জ্বালানী তেলের দাম কত হবে। এরাই সিদ্ধান্ত নেন ম্যাটারনিটি লিভ বা মাতৃত্বকালীন ছুটি কতদিনের হবে, আবার এরাই সিদ্ধান্ত নেই এবারের “নারী দিবস” এর প্রতিপাদ্য কি হব্‌ কিম্বা এবারের “পুরুষ দিবস” এর প্রতিপাদ্য কি হবে। সেই পুরুষের কেনো আরেকটি “দিবস” দরকার হবে? কি করবে পুরুষ এই দিবসে?

১০.
কে না জানে প্রকৃত অর্থে, এই সকল “দিবস” ধারণা গুলো এক ধরনের পুঁজিবাদী প্রতারণা মাত্র। এই দিবস গুলো আর কিছুই নয়, পুঁজিবাদের প্রফিট বা লাভ করার জন্যে কিছু নিরাপদ পকেট মাত্র। এই দিবস গুলোতে কার্ড ব্যবসা জমে ওঠে, উপহার সামগ্রীর বেচা বিক্রি খানিকটা বেড়ে যায়, রেস্তোরা ব্যবসায় কিছু ‘এক্সট্রা ইনকাম’ এর সুযোগ তৈরী হয়। সারা দুনিয়াতে সৃজনশীল মানুষদের জীবনে এই সকল কথিত “দিবস” এর কোনও ভূমিকা নেই। ঢাকায় কিম্বা লাহোর কিম্বা মুম্বাই এর রিকশা চালক পুরুষের জীবনে এই দিবসের কোনও ভূমিকা নেই। সেই সকল পুরুষ আগেও যেমন নিপীড়ক ছিলো, এই পুরুষ দিবসেও তার কোনও কমতি বা বাড়তি ঘটেনা। পুরুষ দিবসে দুনিয়ার সকল পুরুষ ভালো হয়ে যায়না। পুরুষ দিবসে পুরুষতন্ত্র খানিকটা নরম হয়ে যায়না।

আমাদের আত্মদাবীকৃত নারীবাদী বন্ধুদের কাছ থেকেই জানলাম, পুরুষ দিবস আর “টয়লেট দিবস” নাকি একই দিনে। এটা উল্লেখ করে অনেক নারীবাদী বন্ধুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতে দেখেছি। অনেকেই মধ্যমা আঙ্গুল উচিয়ে পুরুষ দিবস কে বলেছেন “ফাক ইউ”। অনেকেই আবার লিখেছেন, পুরুষ দিবসে যেনো পুরুষ নারীর প্রতি আরো ভালোবাসা প্রবণ হয়ে ওঠে...... ইত্যাদি ... ইত্যাদি। বাস্তবতা হচ্ছে, পুরুষ দিবসও পুরুষতন্ত্রেরই একটি পরিকল্পিত দিবস, কেবল ব্যবসা বানিজ্য যার লক্ষ্য। তাই পুরুষ দিবসকে মধ্যমা আঙ্গুল উচিয়ে "ফাক ইউ" বলাটাও এক ধরনের অপচয়, বরং পিতৃতন্ত্রকে চিনতে শিখুন, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখুন।

শেষ কথা
রাফি শামস আপনি লিখুন, আরো বেশী করে লিখুন। নারীবাদের নামে যে বিপুল জঞ্জাল আছে আমাদের চারপাশে, সেই সকল দূর করা আপনার একার শক্তিতে কূলাবে না, আমি জানি। কিন্তু আপনার মতো অসংখ্য তরুনের লেখা দিয়ে এই জঞ্জাল পরিস্কার করা সম্ভব। মুশকিল হচ্ছে, আবর্জনার স্তুপ দ্রুত বড়ো হয়ে ওঠে, এর দুর্গন্ধও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। সেই তুলনায়, সুগন্ধ মিলিয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি।

নারীবাদ, নারীর নয়। নারীবাদ হচ্ছে মানুষের। যে বা যারাই নিজেকে মানুষ মনে করবেন, তাকেই নারীবাদের পক্ষে লড়াই এ দেখা যাবে। তাই আপনাকে এই সংগ্রামে দেখা যাবে, আরো অনেক বায়োলজিক্যাল পুরুষকেও দেখা যাবে এই সংগ্রামে। আমিও থাকবো সেই সংগ্রামে, আর এই যুদ্ধে থাকার জন্যে আমার কোনও আলাদা দিবসের দরকার নেই।

Comments

আব্দুর রহিম রানা এর ছবি
 

বেশ ভালো হয়েছে। দরুণ একটা লেখা।

 

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার এর ছবি
Offline
Last seen: 4 দিন 20 ঘন্টা ago
Joined: শনিবার, মার্চ 23, 2013 - 4:42পূর্বাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর