নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 3 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • সাইয়িদ রফিকুল হক
  • নুর নবী দুলাল
  • নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে

নতুন যাত্রী

  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান
  • একরামুল হক
  • আব্দুর রহমান ইমন
  • ইমরান হোসেন মনা
  • আবু উষা
  • জনৈক জুম্ম
  • ফরিদ আলম
  • নিহত নক্ষত্র

আপনি এখানে

জালালের গল্প : প্রসঙ্গকথা ও অন্যান্য



'জালালের গল্প' চলচ্চিত্রটিকে মূলত চলচ্চিত্র বলা যায়না। বলা যেতে পারে তারো থেকে কিছুটা বাড়িয়ে। একটি সফল, সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলা যেতে পারে। কিংবা বলা যেতে পারে সহজাত জীবনপ্রবাহের একটি সম্মুখ চিত্র। শিল্পোতীর্ণ আবার একেবারেই সাদামাটা বলা যেতে পারে। আবু শাহেদ ইমনের কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, সম্পাদনা ও পরিচালনায় জন্মরুপ লাভ করেছে 'জালালের গল্প'। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম, মৌসুমী হামিদ ও তৌকির আহমেদ। কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন জালাল (আরাফাত রহমান)। তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পুরো চলচ্চিত্রটি।

প্রথমেই বলে রাখি, যারা কেবলমাত্র বিনোদন লাভের জন্য কিংবা পয়সা উসুলের জন্য 'জালালের গল্প' দেখবেন, তাদের জন্য এটি নয়। এটি বহমান সময়ের এমন এক চলচ্চিত্র যা দর্শককে ভাবাবে। ভাবতে শেখাবে অনুভবের গহীন উপলব্ধি থেকে।

বস্তুত তিনটি খন্ডে বিভক্ত এই চলচ্চিত্রের প্রথমেই দেখা যায় এক গ্রামবাসীকে নদীর ধারে গোসল করতে। হঠাৎ করেই তার কানে ছোট্ট একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসে। বিষয়টা উদঘাটন করতে অনেক লোক জড়ো হয় নদীঘাটে। তারা একটা বড় পাতিলের মধ্যে ভেসে আসা জালালকে আবিষ্কার করে। সেখান থেকেই শুরু হয় মূল কাহিনীপ্রবাহ। জালালকে ঘরে আনার কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামে সৌভাগ্য বয়ে আসে। সেবারে লাখ লাখ মাছ বানের জলে নদীতে ভেসে আসে। লোকজন সবাই ভাবতে শুরু করে জালাল খোদাপ্রদত্ত তাদের ভাগ্যপরিবর্তনী ফেরেশতাস্বরুপ। তারা মাসকয়েক বয়সী শিশু জালালের হাতে ও পায়ে ছোঁয়া পানিপড়া নিতে যায় আর সদকাস্বরুপ কিছু টাকা দেয় জালালের তথাকথিত পালিত পিতাকে। এভাবে গ্রামবাসীদের আনাগোনা নিয়তই লেগে থাকে ঐ লোকের বাড়িতে। উদ্দেশ্য, জালালের হাতে-পায়ে ছোঁয়া পানিপড়া নেবে। সেই পানিপড়া খেয়ে মানুষের অসুখ অারোগ্য হলে পানিপড়ার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। জালালের পালিত পিতাও লোভে পড়ে পানিপড়া দেয়ার নামে প্রচুর টাকা ইনকাম করে। একসময় হিংসুকের কুনজর লাগে তার প্রতি। জালালের বাপের অধিক অর্থাপার্জন তার সহ্য হয়না। সে সবার বিশ্বাস ভাঙানোর চেষ্টা করে। একসময় গ্রামপঞ্চায়েতের কাছে নালিশ জানালে পঞ্চায়েত বিচারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানায়, জালালকে যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই পাতিলে পুরে নদীজলে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। জালালের বাবা অনেক আপত্তি করলেও শেষমেষ তাকে সে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়। জালাল আবার নদীতে ভেসে যায়। এখানেই প্রথম খন্ডের সমাপ্তি। স্বাভাবিক ও ধর্মপরায়ণ জনমানব জীবনের সরলতা, রসবোধ ও আঞ্চলিক সংলাপে ভরপুর প্রথম দৃশ্য লাভ করেছে ব্যাপক গতিময়তা।

চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় অংশে দেখা যায় জালালের শৈশব রুপ। এক সম্ভ্রান্ত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লোকের (এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন তৌকির আহমেদ) কাছে থাকে জালাল। তাকে সে "আব্বা" বলে ডাকে। লোকটির সবকিছু থাকলেও বংশের প্রদীপ নেই। সন্তানের আশায় তিনি দুটো বিয়ের পর তৃতীয় বিয়ে করেন। তৃতীয়পক্ষের বৌয়ের থেকেও সন্তানসম্ভাবী কোনো লক্ষণ না দেখায় তিনি বাধ্য হয়ে কবিরাজ ডাকেন। কবিরাজ নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে জালালের তৃতীয় মায়ের সাথে গোপন সম্পর্কে লিপ্ত হয়। কিন্তু জালাল এ বিষয়ে জেনে গেলে সেই ভন্ড কবিরাজ জালালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাকে বাড়িছাড়া করে। জালালকে বস্তায় পুরে কলাগাছের ভেলায় করে ভাসিয়ে দেয়া হয়। সাথে ভাসিয়ে দেয়া হয় সেই পাতিল, যেটাতে করে জালাল ভেসে এসেছিল সেই সম্ভ্রান্তশালীর কাছে। জালাল আর্তনাদ করতে করতে ভেসে যায় দূরে। এই দৃশ্যে ফুটে উঠেছে জালালের চরম অসহায়তা ও কবিরাজের সুবিধাভোগী নিষ্ঠু্রতা।

তৃতীয় অর্থাৎ শেষ খন্ডে আর্বিভাব ঘটে কাহিনীর প্রধান দুটো চরিত্র মোশাররফ করিম ও মৌসুমী হামিদের। মোশাররফ করিম এখানে একজন দালাল তথা মাতব্বরের ভূমিকা নেভান। এই দৃশ্যে তিনি একজন ইটের ভাটার মালিক। সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করলেও জালালকে তিনি ছোট ভাইয়ের মতো দেখেন ও স্নেহ করেন। জালাল তার কাছেই থাকে। জালালের যুবক বয়সের চরিত্র এই খন্ডে ফুটে উঠেছে। একদিন জালাল ও তার বড়ভাইয়ের দুই সহকর্মী ইসলামপুরের স্টেশন থেকে মধ্যরাতে মৌসুমী হামিদ ওরফে শিলাকে উদ্ধার করে ঘরে আনে। শিলা তার পরিচয় বলতে অপারগতা দেখায়। প্রথমাংশে জালালের বড় ভাই তার সাথে কটু ব্যবহার ও জোরপূর্বক তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করলেও পরে শিলা নিজেকে তার স্ত্রীর মতো করে মানিয়ে নেয়। একসময় সে সন্তানসম্ভবা হলে জালালের মাতব্বর বড়ভাই বাচ্চাটি নষ্ট করতে চায়। কিন্তু শিলা তা করতে দেয়না। হঠাৎ একদিন শিলার প্রসববেদনা উঠলে জালাল ডাক্তার আনতে গিয়ে এসে দেখে তার ভাবি একটি ফুটফুটে শিশু জন্ম দিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। উল্লেখ্য যে, শিলা জালালের বড়ভাই অর্থাৎ মোশাররফ করিমের সাথে সংসার করলেও আসন্ন ইলেকশনের পদপ্রার্থী বড়ভাই তাকে বিয়ে করেনি, করতে চায়নি। তার মন্তব্যমতে শিলা হলো যাত্রাপালাগানের মেয়ে এবং তাকে বিয়ে করা তার ধর্মানুগত নয়। শিলার সন্তান প্রসবের পাঁচ মাস পরের ইলেকশন এবং সদ্যজন্মানো শিশুটির কথা ভেবে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্তে জালালের বড়ভাই আসতে পারেনা। অন্যদিকে শিলার সাথে তার কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক না থাকায় শিশুটির আদতপক্ষে কোনো পরিচয় নেই এবং সমাজও এর পরিপন্থী। একথা বিবেচনায় জালালের বড়ভাইয়ের দুই সহকর্মী বাচ্চাশিশুটিকে পাতিলে ভরে নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেয়। সেই পাতিলে, যেটাতে করে জালাল শিশুকালে ভেসে এসেছিল। জালাল অনেক চেষ্টা করে বাচ্চাটিকে ফেরাতে, কিন্তু সাঁতার না জানা জালাল কিছু করতে পারেনা। খোলা আকাশের নিচে নদীর বুকে ভাসমান পাতিলের দৃশ্য আর তার ভেতরে বাচ্চাশিশুর ক্রন্দনধ্বনির মাধ্যমে শেষ হয় 'জালালের গল্প'।

বিনোদনকলা ও নাচগানের জাঁকজমকতা ছাড়াও ভিন্নধর্মী চিন্তার ও গূঢ় ভাবাবেগের যে এরকম একটি চলচ্চিত্র হতে পারে, তা দেখিয়ে দিয়েছেন নবপরিচালক আবু শাহেদ ইমন। 'জালালের গল্প' তার প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র; এবং প্রথমেই তিনি দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। অনেক সুনাম কুড়িয়ে এনেছেন বিশ্বব্যাপী। 'জালাল'স স্টোরি' নামে ইংরেজি ভাষাতে অনূদিত এ চলচ্চিত্রটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। আবু শাহেদ ইমন কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পেয়েছেন তার কর্মফলস্বরুপ। চলচ্চিত্রে অভিনেতা মোশাররফ করিমের অভিনয় ছিলো অত্যন্ত দক্ষ ও সুচারু। আরাফাত রহমান জালালের চরিত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গুরুত্বের সাথে নিভিয়েছেন। মৌসুমী হামিদ ও তৌকির আহমেদের অভিনয় চোখে পড়ার মতো। কাহিনীর শেষ খন্ডে পাতিলে ভাসিয়ে দেওয়া বাচ্চাশিশুটি যেন জালালেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অনেক বছর আগেও জালাল ঠিক এরকমই কোনো এক অজ্ঞাতনামা নদীর ধার ভেসে আসে। 'জালালের গল্প' একেবারেই সাদামাটা একটি সহজ ও স্বাভাবিক জীবনের গল্প; আবার বাস্তববাদী গাম্ভীর্যেরও ধারক। চলচ্চিত্রটি জীবনমুখী একটি স্বচ্ছল প্রবাহচিত্র, যা আমাদের জগৎকেন্দ্রিক কিছু ভাবনা ভাবতে শেখায়। গ্রাম্যসামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে ফুটে উঠেছে কাহিনীর দৃশ্যকল্প ও সংলাপ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে নেয়া যেতে পারে 'জালালের গল্প'কে।

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

সাদিক আল আমিন
সাদিক আল আমিন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 9 ঘন্টা ago
Joined: মঙ্গলবার, মার্চ 28, 2017 - 6:21অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর