নীড়পাতা

টিকিট কাউন্টার

ওয়েটিং রুম

এখন 2 জন যাত্রী প্লাটফরমে আছেন

  • নুর নবী দুলাল
  • সুব্রত শুভ

নতুন যাত্রী

  • মহক ঠাকুর
  • সুপ্ত শুভ
  • সাধু পুরুষ
  • মোনাজ হক
  • অচিন্তা দত্ত
  • নীল পদ্ম
  • ব্লগ সার্চম্যান
  • আদি মানব
  • নগরবালক
  • মানিকুজ্জামান

আপনি এখানে

উদ্বাস্তু


জ্বলন্ত উনুনের তপ্ত কড়াইয়ের ধোঁয়া ওঠা তেলে দুটো কইমাছ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপসীর কানে আসে উচ্চকিত ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান; কানে আসা মাত্র হাত ফসকে পড়ে যায় কইমাছের বাটিটা, বাটির অবশিষ্ট দুটো কইয়ের একটা উনুনের মুখ দিয়ে পড়ে আগুনের ভেতর, আরেকটা মেঝেতে। কিন্তু কইমাছ দেখার সময় কোথায় তাপসীর? ঝড়ের গতিতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনের পিঁপড়ার সারি মাড়িয়ে, ব্যাঙের গায়ে লাথি মেরে এক দৌড়ে থাকার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে জাপটে ধরেন চারুশিলাকে! চারুশিলা রান্নার তরকারি কুটে দিয়ে একটু আগেই ঘরে এসে বিছানায় বসে রিমোর্ট টিপে টিভিটা ছেড়েছেন, তাপসীর ঝাপটায় রিমোর্টটা তার হাত ফসকে পড়ে যায় মাটিতে আর ধাক্কা খায় আলমারির পায়ায়; প্রথমে কিছুটা চমকালেও মুহূর্তেই তাপসীর দৌড়ে আসার কারণ অনুধাবন করতে পারেন, দু-হাতে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেন তাপসীকে, অনুভব করেন যে তাপসী ভয়ে থরথর কাঁপছেন আর ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

চারুশিলা কান পাতেন রাস্তার দিক থেকে ভেসে আসা স্লোগানে- ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর; ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই, অভীক সরকারের ফাঁসি চাই।’ কী হয়েছে? কে এই অভীক সরকার? আর কেনই-বা তার ফাঁসি চাইছে এরা? অব্যক্ত প্রশ্নগুলো নিজেকেই করা, উত্তর অজানা।

ঝটিতি দৌড়ে আসায় তাপসীর খোঁপাটা এলিয়ে পড়েছে পিঠে, বুকের মধ্যে থাকা বড় জা’র মাথার আশি ভাগ পাকা চুলে হাত বুলিয়ে সান্ত¡না দেন চারুশিলা, ‘ভয় পেয়ে না দিদি; এটা বাংলাদেশ নয়, ভারত।’

ফ্রেমে বাঁধানো তাপসীর প্রয়াত বর পরেশের একটা সাদাকালো ছবির পিছন থেকে টিকটিকি ডেকে ওঠে। অন্য সময় হলে তাপসী ঘরের মেঝে কিংবা খাটে তর্জনীর তিনটে টোকা দিয়ে মুখে বলতেন ‘সত্যি সত্যি সত্যি’; কিন্তু এখন প্রবল উত্তেজনায় তার কানে-প্রাণে বর্শার মতো বিঁধছে কেবল ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান; টিকটিকির ডাক তাকে প্রভাবিত করে না।

চারুশিলা আবার কান পাতেন, ভাঙচুর হচ্ছে মনে হয়! কাঁচ ভাঙার শব্দ হয়, টিনের বেড়ায় আঘাতের শব্দ হয়, আরো কতো রকম শব্দ হয়; যা শুনে চারুশিলার মনেও এক টুকরো ভয়ের কালো মেঘ ঢুকে পড়ে। আর ঐ ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান তাপসীর মতো তাকেও বিচলিত করে, ঐ শব্দগুলো তার বুকে আঘাত করে বেগানা পুরুষের নিষ্ঠুর শক্ত হাতের মতো, যোনিতে আঘাত করে পাষণ্ড পুরুষের লিঙ্গের মতো! আজ এতো বছর পরেও বুকের খাঁচার পাখিটা আতঙ্কে ছটফট করে ওঠে। স্লোগানটা চারুশিলা প্রথম শোনেন ১৯৭১ সালে, শ্বশুরবাড়ির গ্রামে।

যশোরের কেশবপুরের ছায়া সুনিবিড় এক গ্রাম। মাঘ মাসের এক শীতের রাতে মাত্র ষোল বছর বয়সে এই গ্রামের বিলাস দাসের বউ হয়ে আসেন চারুশিলা। বর ছাড়াও মধ্যবিত্ত গৃহস্থবাড়িতে পান শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাসুর-জা, জা’য়ের ছোট্ট ফুটফুটে এক বছরের একটা মেয়ে।

চারুশিলার চেয়ে তাপসী বছর দুয়েকের বড়। বড় জা যে একটু বেশি রকমের সরল আর আলাভোলা এবং সংসারের কত্রী হবার বিন্দুমাত্র সাধও যে তার নেই, তা বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিনেই বুঝেছিলেন চারুশিলা। চারুশিলাকে বিয়ের আগে তার মা ভাল মতো করে কানভাঙানি দিয়েছিলেন, ‘যৌথ পরিবার, ভাগীদার আছে, বুঝে-শুনে চলিস। শুরু থেকেই নিজের বুঝটা নিজে বুঝে নিতি না পারলি আর কোনোদিনও নিতি পারবিনানে। বড় জা’রে শুরু থেকেই বুঝায়ে দিবি যে সংসারে সে আগে আসলি-উ দুইজনের সমান অধিকার। সে যদি বোঝে যে তুই দূর্বল, তালি কিন্তু তোর মাথায় কাঁঠাল ভাঙে খাবেনে!’

বৌভাতের পরদিনই চারুশিলা বুঝেছিলেন যে তাপসী তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার বদলে নিজের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে তাকে খাওয়ানোর জন্য অপেক্ষা করছেন! তাপসীর কাছ থেকে তিনি আর কি বুঝে নেবেন, তাপসী তো আগে থেকেই তাকে সব দিয়ে বসে আছেন, ‘নে, একন তুই আসিছিস আমি এট্টু বাঁচলাম, আমি ছাই বুঝিনে কিছু, মানষি আমরারে বুগদা কয়, শাশুড়ির বকা খাতি খাতি মলাম। মা আর তুই মিলে সংসারডা সামলা, আমারে দু-বেলা দু-মুঠো খাতি দিস আমি তাতেই খুশি।’

কথা সত্যি, তখন সংসারিক কাজে একেবারেই পটু ছিলেন না তাপসী। উঠোনের ধান নাড়তে গেলে পায়ের ধাক্কায় ধান ছিটকে যেতো অথবা নিজে হোঁচট খেতো, রান্না করতে গেলে ভাত হতো নরম অথবা শক্ত, রুটি বেলতো শ্রীলংকার মানচিত্রের মতো! আর এর সঙ্গে তার অসামান্য ধীরগতি। আজ তিনি সংসারের সকল কাজই পারেন, তবে বয়সের সাথে সাথে ধীর গতি আরো ধীরতর হয়েছে। চতুর তিনি আগেও ছিলেন না, এখনও নয়। বরং এখন কথা আগের চেয়েও কম বলেন, হাতে কাজ না থাকলে মূঢ়ের মতো বসে কি যেন ভাবেন। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনলে বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে যায় আর অস্থির হয়ে পড়েন, ঘামতে থাকেন, ছোট জা’কে জড়িয়ে ধরে আশ্রয় খোঁজেন।

বিয়ের পর চারুশিলা তাপসীকে আগলে রাখতেন; যেন বড় জা নয়, সংসার সম্পর্কে অজ্ঞ ছোট বোন। আর তাপসীও চারুশিলাকে পেয়ে নিশ্চিন্ত, শাশুড়ির তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ থেকে বাঁচার ঢাল চারুশিলা!

তাদের বরদের মধ্যেও কোনো বিরোধ ছিল না, বড় ভাই হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন, ছোট ভাই প্রাইমারী স্কুলের। মাঠে যা জমি ছিল তাতে সারা বছরের খোরাকি হয়ে যেতো। মাঝে মাঝে শাশুড়ির তেতো কথাটা বাদ দিলে সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু কে জানতো মাত্র দুই মাসের মাথায় সেই ভরন্ত, সুখ উপচে পড়া সংসারে ভাঙন লাগবে! বৈশাখ মাসের শুরুতেই পাকিস্থানী হানাদার আর তাদের দোসর এই দেশীয় দালালদের ভয়ে দেশ ছাড়তে হয় পুরো পরিবারকে। নয় মাস ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে কাটিয়ে পরিবারের তিনজন সদস্যকে হারিয়ে দেশে ফেরে চারজন। শ্বশুর-শাশুড়ি আর বড় ভাসুর ওখানেই মারা যায়, ভাসুর-শাশুড়ি কলেরায় আর স্ত্রী-পুত্রের শোকে ধুঁকে ধুঁকে একদিন শ্বশুরের হার্ট ফেল করে। চারুশিলা শূন্য ভিটেয় আবার নতুন করে সংসার শুরু করেন বর, বড় জা তাপসী আর তার ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে।

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রতি তখনই ঘেন্না ধরে যায় তাপসীর। দেশে ফিরে অনেকবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন, মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আর বোনের মতো ছোট জা চারুশিলার প্রেরণায় জীবনটাকে এতো দূরে টেনে নিয়ে এসেছেন।

হঠাৎ তাদের টিনের চালে ঢিল পড়ার শব্দ হয়। ভয়ে আঁৎকে উঠে চারুশিলাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন তাপসী, কেঁপে ওঠেন চারুশিলাও। প্রথম ঢিলটা পড়ার পর কয়েক সেকেন্ডের বিরতি, এরপর পর পর তিন-চারটি ঢিল পড়ে। আবার ঢিল! এখানেও ঢিল!
ঢিল! ঢিল! ঢিল! মাটির ঢিল! পোড়া ইটের ঢিল! কাঠের টুকরোর ঢিল! গরুর হাড়ের টুকরোর ঢিল! ভুলে থাকতে চাওয়া নেই দুর্বিসহ দিনগুলো স্মৃতির পুকুরে রুইমাছের মতো ঘাই মারে, জলবিম্ব ওঠে, ঢেউ ছড়ায় তাপসী আর চারুশিলার মস্তিষ্কের কোষে কোষে।

যে-রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য’র হাতে নির্মমভাবে খুন হন, তার পরের রাতেই তাদের বাড়ির টিনের চালে প্রথম ঢিল পড়েছিল। চারুশিলা আর তার বর বিলাস ঘর থেকে বের হন হারিকেন আর টর্চলাইট নিয়ে, বিলাস দুই ব্যাটারি টর্চলাইটের আলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফেলেন বাড়ির চারদিকে, তন্নতন্ন করে খুঁজেও কাউকে দেখতে পাননি তারা।
পরদিন ব্যাপারটা পাড়ার সবাইকে বললে, নিজামুদ্দিন শেখ বলে, ‘মনে অয় গায়েবী জ্বিনে ঢিল ফেলিছে!’

তাদের পাড়ায় মোটে চারটি হিন্দু পরিবার ছিল। এরপর গায়েবী জ্বিন পালা করে চারটি হিন্দুবাড়ির টিনের চালে ঢিল ফেলতে শুরু করে-শক্ত মাটির ঢিল, পোড়া ইটের ঢিল, কাঠের টুকরোর ঢিল, গরুর হাড়ের ঢিল! একটা মুসলমান পাড়ায় চারটে হিন্দু পরিবার থাকাটা হয়তো গায়েবী জ্বিনের পছন্দ হয়নি!

গায়েবী জ্বিনের উৎপাতে পরের বছরই অনন্তদের পরিবার ভিটে-জমি বিক্রি করে ভারতে স্থায়ী হয়। তখন থাকে মোটে তিনটে পরিবার-চারুশিলাদের, নিতাই মণ্ডল আর আদ্যনাথ দাসের পরিবার। মুজিববিহীন দেশের তখন টাল-মাটাল অবস্থা, কে কার কথা শোনে! স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আওয়ামীলীগকে নিশ্চি‎হ্ন করতে মুক্তিযুদ্ধের চার কাণ্ডরী-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে রাতের অন্ধকারে নির্মমভাবে কারাগারে হত্যা করা হয়।সেনাবাহিনীতে ঘন ঘন ছোট-বড় ক্যু হয়, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুদের খুনিদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিদেশে নিয়োগ করেন, পাকিস্থান থেকে রাজাকার গোলাম আজমকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার পায়ের নিচের মাটি ফিরিয়ে দেন। এলাকার রাজাকারের ছানাপোনাগুলো দম ফিরে পেয়ে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, দু-একজন মুক্তিযোদ্ধা খুনও হয়! কে খুন করে? গায়েবী জ্বিনেরা! তারপর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর যখন জেনারেল এরশাদ ক্ষতায় এসে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ধর্ম নিরপেক্ষ সংবিধান কাটাছেঁড়া করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে, তখন পাড়ার বাকি দুই ঘর হিন্দু তাদের জায়গা-জমি বেচে ভারতে ঠাঁই নেয়। পরিবার দুটির কর্তাদের যুক্তি ছিল এই যে, ‘এমনিতেই তো অত্যাচারে বাঁচি না, আর এখন তো দেশটাও আমাদের রইলো না, আমরা এখন পশুপাখির মতো, তাহলে কোন ভরসায় থাকবো!’

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তনের আগে থেকেই তিনটি পরিবার গায়েবী জ্বিনের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। রাত-বিরেতে ঘরের চালে ঢিল পড়তো, গোয়ালের গরু চুরি হতো; গোলা ঘরের ধান, গম, পিঁয়াজ ইত্যাদি ফসল চুরি হতো। পাকা ছোলা-গমের ক্ষেতে রাতে আগুন ধরিয়ে দিতো গায়েবী জ্বিন। রাতে গায়েবী জ্বিনের অত্যাচার, আর দিনে মানুষের। নিজামুদ্দিন শেখ কিংবা আহাদ মণ্ডলের গরু-ছাগল দু-চারদিন পর পরই ছুটে গিয়ে ক্ষেতের ফসল খেতো। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কোনো উপায় ছিল না। নিতাই মণ্ডল একবার আহাদ মণ্ডলের একটা ছাগল খোঁয়াড়ে দেওয়ায়, আহাদ মণ্ডল আর তার তিন ছেলে লাঠি নিয়ে তেড়ে এসেছিল নিতাই মণ্ডলকে মারতে। মুরুব্বিরা বলতো যে নিতাই মণ্ডল আর আহাদ মণ্ডলদের বংশবীজ একই, আহাদ মণ্ডলের কোনো এক পূর্বপুরুষ মুসলমান হয়েছিল। আরবী ভাষার নতুন নাম গ্রহণ করলেও তার পদবীটা আগের মণ্ডলই ছিল। জমিজমার পুরনো দলিলেও এ কথার সত্যতা মেলে। অথচ এক মণ্ডল আরেক মণ্ডলকে বাস্তুচ্যূত করে কতো ফন্দি-ই না আঁটে!

এতো অত্যাচার সহ্য করেও তিনটি পরিবারই নিজেরদের পূর্ব-পুরুষের ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে ছিল। কিন্তু যখন সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হয়, তখন যেন তিনটি পরিবারেরই ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়, আর তখনই নিতাই মণ্ডল এবং অদ্যনাথ দাস মনোঃপীড়ায় ভুগে সপরিবারে দেশান্তর হয়। তখন থাকে কেবল চারুশিলাদের একটি পরিবার, ছয়টি প্রাণি; চারুশিলা, চারুশিলার বর বিলাস, তাদের দুই মেয়ে, জা আর জা’য়ের এক মেয়ে।

নিতাই মণ্ডল আর আদ্যনাথ দাসের পরিবার ভারতে চলে গেলেও চারুশিলারা থেকেই যায়। চারুশিলার বর বিলাস সরকারী প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, তার বেতনের টাকায় আর ক্ষেতের ফসলে সংসার বেশ চলে। কিন্তু ভারতে গিয়ে তারা কী করবে আর খাবেই বা কী? বিলাসের এক কথা, ‘নিজের দেশ, নিজের বাড়ি ছেড়ে কই যাব, অত্যাচার করে করুক, সয়ে যাও। যে সহে সে রহে!’

কিন্তু জীবনটা যে কবির কবিতা কিংবা বইয়ের পাতার ভাবসম্প্রসারণ নয়, তা চারুশিলা বুঝতেন। মেয়ে তিনটাকে নিয়ে খুব চিন্তায় থাকতেন তিনি। রাস্তাঘাটে ওদেরকে উত্যক্ত করতো কাসের কিংবা গ্রামের ছেলেরা। তাদের অভিভাবকদের কাছে অভিযোগ করেও তেমন ফল হতো না। মাধ্যমিক পাশ করার পরই জা’য়ের মেয়ে আর নিজের বড় মেয়েকে খুলনায় কলেজে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে আসেন চারুশিলা আর বিলাস।

নব্বই সালের শরৎকালের এক দুপুরে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান বিলাস। চারুশিলার তখন অথৈ সাগরে পড়ার অবস্থা! ছোট মেয়ে তখন মাধ্যমিক দেবে, পাস করলে তার গন্তব্যও খুলনা। তিনটে মেয়েকে হোস্টেলে রেখে পড়ানোর খরচ অনেক, কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। তবু চারুশিলা ঝুঁকি নেন, পাস করার পর ছোট মেয়েকেও বড় দু’জনের কাছে পাঠিয়ে দেন। পুকুরটা তিন বছরের জন্য লিজ দিয়ে, ফসল বেচে আর বিলাসের পেনসনের টাকায় কোনো মতে তিন মেয়ের খরচ চালাতে থাকেন। চারুশিলার বাবাও মাঝে মধ্যে নাতনীদের হাত-খরচ দিতেন। তাপসীর বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। গাছের বড় কাঁঠালটা, আমটা-বেলটা-তালটার বেশি দেবার সামর্থ্য তাদের ছিল না। তবে তাপসীর বাপ-ভাই মাসে মাসে এসে খোঁজ-খবর নিতেন।

মনে হচ্ছে মিছিলটা দূরে সরে যাচ্ছে, ভাঙচুরের শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
‘হঠাৎ কী হলো চারু?’ চারুশিলাকে জড়িয়ে ধরেই বলেন তাপসী।
‘কী জানি দিদি! তুমি বোসো, আমি একটু পরেশদের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখি।’
‘না, এখন বের হোসনে। আমি একা থাকতে পারবো না।’
‘তাহলে তুমিও চলো।’
‘এখন বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।’
‘কিচ্ছুটি হবে না দিদি। চলো।’
চারুশিলা নাক টেনে বলেন, ‘পোড়া গন্ধ আসছে কিসের যেন।’
‘কড়াইতে মাছ দুটো বোধ হয় পুড়ে গেছে!’
‘আচ্ছা, চলো দেখি।’
সত্যিই মাছ দুটো পুড়েছে। তাপসী আবার চুলার কাছে গিয়ে বসেন।

মিছিলের স্লোগান এখন আর শোনা যাচ্ছে না। কিন্তু ক্ষুব্ধ মানুষের কথা ভেসে আসছে রাস্তার দিক থেকে, কান্নার সুর ভেসে আসছে। চারুশিলা পরেশদের বাড়ির দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বলেন, ‘ও পরেশ...পরেশ...’
‘আসছি বউদি।’
‘কী হয়েছে ভাই?’
‘আর ব’লো না, কোন এক বাচ্চা ছেলে নাকি কাবা শরীফের ছবি বিকৃত করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে, তাই তার ফাঁসির দাবিতে মিছিল আর ভাঙচুর করছে মোল্লার বাচ্চারা।’
‘এসব তো শুনেছি বাংলাদেশে হয়, হিন্দুদের নামে ফেসবুকে ছবি দেয়, তারপর হিন্দুদেরকে মারধর করে দেশছাড়া করা করে।’
‘এখন এখানেও শুরু হলো। তোল্লাই দিয়ে এগুলোকে মাথায় তুলেছে, এখন তো ধেই ধেই করে নাচবেই!’
‘আবার দাঙ্গা লেগে যায় কিনা কে জানে!’
‘মনে হয় না তেমন কিছু হবে। তবু সতর্ক থেকো বৌদি। রাতে শোরগোল শুনলে আমাদের বাড়িতে চলে এসো।’

রাতটা যেন আর ফুরোতেই চায় না। এমনিতে দুই জা আলাদা ঘরে থাকলেও আজ এক ঘরেই শোয়। বাড়িতে হয়তো অনেক ক্ষুদ্র প্রাণি আছে কিন্তু তৃতীয় কোনো মানুষ নেই। তিন মেয়েকে ফোন করে কথা বলেছেন দু’জনই, মেয়েরা চিন্তায় পড়েছে, তাদেরকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। তাপসীর মেয়ে স্মৃতির শ্বশুরবাড়ি চন্দননগর। গত মহররমের সময় তাজিয়া মিছিলকারীরা চন্দননগরে হিন্দুদের দোকান-পাট, ঘর-বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছিল। পরে অবশ্য হিন্দুরাও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, কোথাও কোথাও পাল্টা আক্রমণও করেছিল। চারুশিলার বড় মেয়ে তিথির শ্বশুরবাড়ি বারাসাত আর ছোট মেয়ে বীথির দূর্গাপুর।

রাতটা দু’জনের বেশ ভয়ে ভয়ে কাটে, মেয়েরা গভীর রাতেও ফোন করে খবর নেয়। সকালবেলাই আবার স্মৃতির ফোন, ‘মা-কাকিমা তোমরা চলে এসো। অনেক নাকি গণ্ডগোল হচ্ছে। খবরের কাগজে তো কোনো খবর বেরোয়নি, ফেসবুক থেকে অনেক খবর পাচ্ছি। বাংলাদেশ থেকে নাকি অনেক জঙ্গি ঢুকেছে, ওরা মুসলমানদের উস্কে দিচ্ছে। তোমরা চলে এসো।’

একটু পরই আবার তিথি-বীথির ফোন, ওদেরও একই কথা-‘তোমরা ঘরে তালা দিয়ে চলে এসো।’

তাপসী পারলে উড়ে যান মেয়েদের কাছে! চারুশিলা পরিস্থিতি আরেকটু বুঝতে চান, অপেক্ষা করতে চান। তাপসীকে বোঝান যে এটা তো বাংলাদেশ নয়, ভারত। কতোটা আর সাহস দেখাবে মুসলমানরা? পরেশদের বাড়ির লোকজনও একই কথা বলে।
কিন্তু পরিস্থিতি ভাল হবার পরিবর্তে আরো খারাপ হয়। দুপুরের দিকে স্লোগানমুখর আরেকটি বড় মিছিল বের হয়-
‘নারায়ে তাকবীর......আল্লাহু আকবর।’
‘ভারত থেকে আর্য জাতি......দূর হঠাও দূর হঠাও।’
‘সোনার বাংলা থেকে আর্য জাতি........দূর হঠাও দূর হঠাও।’
‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই......অভীক সরকারের ফাঁসি চাই।’

আট থেকে আশি, কে নেই এই মিছিলে? মিছিলকারীদের হাতে চাঁদ-তারা মার্কা সবুজ পতাকা, বাঁশ, লাঠি। মিছিলকারীদের স্লোগান শুনে আর দেহের ভাষা দেখে মনে হয় যেন ইসলামের মহা সর্বনাশ হয়ে গেছে, তাই তারা যুদ্ধের ময়দানে নেমেছে, ইসলামের জন্য রক্ত দিতে-জীবন উৎসর্গ করতে তারা প্রস্তুত!

চারদিক থেকে যা খবর আসে তা চিত্ত সুখকর নয়, উদ্বেগজনক। জিহাদী জোশে কিছু উন্মাদ মুসলমান বাদুড়িয়া-বসিরহাট সহ নানা জায়গার রাস্তা অবরোধ করেছে, ট্রেন অবরোধ করেছে, রাস্তায় গাড়ি পোড়াচ্ছে, পুলিশের গাড়িতেও আগুন দিচ্ছে, হিন্দুদের দোকান-পাট এবং ঘর-বাড়িতে আগুন দিচ্ছে। এমন কি এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না শববাহী গাড়িও, গাড়ি আটকে ভাঙচুর আর মানুষজনকে মারধর করছে। অথচ পুলিশ নিয়েছে দর্শকের ভূমিকা, ঠুঁটো জগন্নাথের মতো তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। প্রতিরোধ করার চেষ্টা দূরে থাক, উল্টো কোথাও কোথাও তারা নিজেরাই প্রাণ ভয়ে পালাচ্ছে উন্মাদ মুসলমানদের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার অতিরিক্ত পুলিশ কিংবা আধা সামরিক বাহিনী নামিয়ে দাঙ্গা থামানোর কোনো চেষ্টাই করছে না পাছে তাদের গায়ে সাম্প্রদায়িক তকমা লেগে যায় আর নির্বাচনে মুসলিম ভোট হারায়! মেকি ধর্ম নিরপেক্ষতা দেখাতে সংবাদ মাধ্যমও নিশ্চুপ। কিন্তু জলন্ত আগুনের ওপর যতোই ছাই চাপা দেবার চেষ্টা করা হোক, আগুন তার শিখায় উল্লোল তুলে নিজ ধর্ম পালন করবেই! খবর ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। উন্মাদ মুসলমানদের উগ্র কর্মকাণ্ড এখন ঘুরছে মানুষের মোবাইল-কম্পিউটারে।

তাই দেখে তাপসী আর চারুশিলার জন্য আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে মেয়েরা। বাড়িতে তালা দিয়ে ওদের ওখানে চলে যেতে বলছে। কিন্তু যাবে কী করে? ট্রেন বন্ধ, বাস বন্ধ। রাস্তায় কেবল ধর্মোন্মাদদের মিছিল আর জ্বালাও-পোড়াও কর্মকাণ্ড।

আবার এর উল্টো মানবিক চিত্রও আছে। কোথাও কোথাও মুসলমানরা আশ্রয় দিয়েছে আক্রান্ত হিন্দুদের, নিজেরা রান্না করে খাওয়াচ্ছে। দাঙ্গাবাজদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে।

ট্রেন-বাস বন্ধ; মেয়েদের কাছে যাবার কোনো উপায় নেই। দিনভর একটা অজানা আতঙ্ক তো ছিলই, সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক ডালডালা বিস্তার করেছে মগজের ভেতরে। সন্ধের আগেই রান্না করে শোবার ঘরে খাবার এনে রেখেছিলেন তাপসী। রাতে দরজা বন্ধ করে ভাত খেয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দুই জা, তখনই আবার শোরগোল কানে এলো; সঙ্গে দ্রুম দ্রুম শব্দ।
‘আমার ভয় করছে চারু।’
‘চলো পিছনের দরজা দিয়ে পরেশদের বাড়িতে যাই।’
‘তাই চল।’

ঘরের বাতি নিভিয়ে, পিছনের দরজা খুলে বেরিয়েই দেখলো তপনদের বাড়িতে আগুন জ্বলছে, আগুনের আভা ছড়িয়ে পড়েছে পরেশদের বাড়িতে, তাদের বাড়িতেও কিছুটা। শোরগোল চলছে। চারুশীলা তাপসীর হাত ধরে দৌড়ে বাড়ি থেকে নেমে এলেন মাঠের মধ্যে। পাটক্ষেতের আলপথ ধরে এগোলেন কিছুদূর, তারপর আলপথ ছেড়ে ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে চুপ করে বসে রইলেন দু’জন। দু’জনেই ভয়ে কাঁপছেন, বুকের হাপর অস্বাভাবিক উঠছে-নামছে। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলতে পারছেন না, কাঁদতেও ভুলে গেছেন। দুজনেরই চোখের সামনে ভাসছে ১৯৯২ সাল, বিভীষিকাময় ১৯৯২!

অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও দুই জা সন্ধ্যাবেলা রান্না করে রাতের খাবার খেয়ে শুতে যান। তিন মেয়েই তখন খুলনায়, হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে। চারদিক থেকে তখন কেবলই দুঃসংবাদ আসতে থাকে। দিল্লীতে মৌলবাদী হিন্দুরা বাবড়ি মসজিদ ভাঙায় সেখানে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা লেগে গেছে। প্রতিদিনই মানুষ মরছে। আর সেই দাঙ্গার ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের নানা জায়গায় মুসলমানরা হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে, হিন্দু পুরুষদের মারছে, নারীদের ধর্ষণ করছে। এইসব সংবাদ শুনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় কাটান তাপসী আর চারুশীলা। খুলনায় গিয়ে মেয়েদেরকে বাড়িতে আসতে নিষেধ করে আসেন, কলেজ আর হোস্টেল ছাড়া অন্য কোথাও যেতে নিষেধ করেন। কলেজে-হোস্টেলে নিরাপত্তার অভাব নেই, তবু দুই মায়ের মন উচাটন হয়। উচাটন মন নিয়েই দুই জায়ের সময় কাটে বাড়িতে। আশপাশের মুসলমানদের কেউ কেউ তাদেরকে আশ্বাস দেয় এই বলে যে তাদের কোনো ভয় নেই। আশ্বাস শুনে ভাল লাগে, কিন্তু মন দুচিন্তা মুক্ত হতে পারে না। এই উৎকণ্ঠার মধ্যেই এলো দিনের পরের সেই রাতটি। তারা দুই জা তখন ঘুমে অচেতন। হঠাৎ দরজায় করাঘাতের শব্দ আর মানুষের কণ্ঠ শুনে দু’জনেরই ঘুম ভেঙে যায়। বাইরের মানুষগুলোর কণ্ঠ চেনার চেষ্টা করে, চিনতে পারে না, অচেনা মানুষের কণ্ঠস্বর। তাদেরকে দরজা খুলতে বলে, দরজা না খোলায় দরাম দরাম লাথি পড়ে দরজার ওপর। তাপসী ভেতরের দরজা দিয়ে চারুশীলার ঘরে আসেন। চারুশীলাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। একসময় হুড়মুড় করে দরজা ভেঙে পড়ে। অন্ধকারে আট-দশজন পুরুষ বানের জলের মতো সর্বগ্রাসী ভঙ্গিতে ঘরে প্রবেশ করে। টর্চের আলো ফেলে তাদের ওপর। চারুশীলা তাপসীকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে লোকগুলোর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের যা কিছু নেবার নিয়ে যান, আমাদের কিছু বলবেন না।’

একজন এসে তাপসীর হাত ধরে। চারুশীলা জোর করে তাপসীর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু শক্তিতে পেরে ওঠেন না। তার কাছ থেকে তাপসীকে ছাড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে যায় পাশের ঘরে। তাপসী চিৎকার করতে গেলে একজন তার মুখ চেপে ধরে, মুখ চেপে ধরে চারুশীলারও। আট-দশজনের মধ্যে দুজনের মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা, বাকিদের উন্মুক্ত মুখ। টর্চের মুহূর্তের আলোয় মুখোশ পরা দুজনের একজনের গায়ের সবুজ জামাটি চেনা চেনা লাগে চারুশীলার, গেল ঈদে কেনা নতুন জামা! জামা চিনতে পেরেও জামার ভেতরের মানুষটিকে না চেনার ভান করেন চারুশীলা। একজন হঠাৎ চারুশীলার শরীর থেকে কাপড় খুলতে শুরু করে, আপ্রাণ চেষ্টা করেও চারুশীলা নিজেকে রক্ষা করতে পারেন না। কেউ তার হাত চেপে ধরে, কেউ মুখ, কেউ পা, সবুজ জামা পরা লোকটি মুখোশ খুলে উঠে আসে তার শরীরের ওপর; সবুজ জামার পর আরেকজন, তারপর আরেকজন, আরো একজন! দম বন্ধ হয়ে আসে চারুশীলার, মরে যেতে ইচ্ছে করে। মৃত্যু কামনা করেন, তবু বেঁচে থাকেন। সবুজ জামা পরা লোকটি আরো একবার উঠে আসে তার শরীরের ওপর, কয়েকজন টর্চ জ্বেলে জিনিসপত্র বস্তায় ভরতে থাকে। চারুশীলা নিথর চোখে বিনা প্রতিরোধে শুয়ে থাকেন শয্যায়। দু-চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের জল। দৃষ্টিতে ধরা পড়ে টর্চ জ্বেলে লুণ্ঠনের দৃশ্য।

উত্তেজনা প্রশমিত হলে সবুজ জামা পরা লোকটি তার শরীরের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে। চারুশীলার ইচ্ছে করে গলা টিপে লোকটির জিভ করে করে তাকে মেরে ফেলতে। কিন্তু পারে না, সেই শক্তি তার নেই। অন্যদের তাড়ায় লোকটি তার শরীরের ওপর থেকে উঠে পড়ে, একজন তার মুখের ওপর টর্চের আলো ফেলে শাসায়, ‘এক মাসের মইদ্যে ভারতে যাবি, নইলে কিন্তু আবার আসপানে!’

তাপসীর ঘর থেকে কয়েকজন বেরিয়ে আসে, তাদের পিঠে বস্তা। সবাই বেরিয়ে যায় ঘর থেকে, চারুশীলা শুয়েই থাকেন। তিনি যেন কাঁদতেও ভুলে গেছেন! বেশ কিছুক্ষণ পর তার মনে পড়ে তাপসীর কথা। অন্ধকারে হাতড়ে কাপড় খুঁজতে থাকেন, হাতে পান না। এঘরে হারিকেন কিংবা প্রদীপও নেই, আছে তাপসীর ঘরে। অন্ধকারে নগ্ন শরীরে পাশের ঘরে গিয়ে ডাকেন, ‘দিদি....।’

কোনো সাড়া দেন না তাপসী। চারুশীলা ভয় পেয়ে যান, পশুর দল দিদিকে মেরে ফেলেনি তো! আবার ডাকেন, ‘দিদি.....।’
ডাকতে ডাকতে বিছানার কাছে যান। বিছানায় বসা তাপসীর নগ্ন শরীরে হাত রাখেন, ‘দিদি.....।’

এবার চিৎকার করে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তাপসী। চারুশীলার বুকের ভেতর থেকেও ছিটকে বেরোয় কান্না। কাঁদতে কাঁদতে তাপসীকে জড়িয়ে ধরেন, তাপসীর হাত দুটিও জড়িয়ে ধরে চারুশীলার নগ্ন শরীর।

সুনসান গভীর রাত্রি। মাঝে মাঝে হারুদের কুকুরটা ডেকে ওঠে, বাঁশঝাড়ে কিচির-মিচির করে শালিকের ঝাক, পুকুরে বড় মাছের ঘাই দেবার শব্দ হয়, দুটো নগ্ন শরীর একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বসেই থাকে, কাঁদতেই থাকে!

আগুনের লেলিহান শিখা আরো ওপরে উঠেছে, আগুন ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশে, হয়তো তাদের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়েছে। আগুনের শো শো শব্দ শোনা যায়, বাঁশের গিঁট ফোটার শব্দ হয়, পোড়া গন্ধ ভেসে আসে নাকে। আর মানুষের শোরগোল তো আছেই। পাটক্ষেতে দুজনকেই মশা কামড়ায়, দুজনেই পা চুলকান। দুজনই ১৯৯২ এর বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসেন ২০১৭ এর ভারতে। বাংলাদেশের মুসলমানরা যে ভারতকে বলে হিন্দুস্থান, মালাউনের দেশ, মালুদের দেশ; সেই হিন্দুস্থানের মালাউন অথবা মালুদের ঘরেও আগুন দিয়েছে কিছু উন্মাদ মুসলমান!

তাপসী আর চারুশীল দুজন দুজনকে ছুঁয়ে পাটক্ষেতে বসে আছেন, দুজনেই ভয়ে কাঁপছেন, দুজন দুজনের উত্তাপ অনুভব করছেন। তাপসী হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ভিটেছাড়া হয়ে এখানে এলাম একটু শান্তিতে থাকবো বলে, এখানেও সেই অশান্তি, ......চারু, এবার আমরা কোথায় যাব?’

ঢাকা।
জুলাই-আগস্ট, ২০১৭

বিভাগ: 

Comments

Post new comment

Plain text

  • সকল HTML ট্যাগ নিষিদ্ধ।
  • ওয়েবসাইট-লিংক আর ই-মেইল ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই লিংকে রূপান্তরিত হবে।
  • লাইন এবং প্যারা বিরতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয়।
CAPTCHA
ইস্টিশনের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে ক্যাপচা ভেরিফিকেশনের ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে।

বোর্ডিং কার্ড

মিশু মিলন
মিশু মিলন এর ছবি
Offline
Last seen: 1 দিন 16 ঘন্টা ago
Joined: সোমবার, ফেব্রুয়ারী 20, 2017 - 9:06অপরাহ্ন

লেখকের সাম্প্রতিক পোস্টসমূহ

কু ঝিক ঝিক

ফেসবুকে ইস্টিশন

SSL Certificate
কপিরাইট © ইস্টিশন.কম ® ২০১৬ (অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম) | ইস্টিশন নির্মাণে:কারিগর